[২৬ যুলহিজ্জাহ, ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ১২ জুন, ২০২৬ পবিত্র হারামে মাক্কীর (কা‘বা) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ ফয়সাল ইবনু জামীল ইবনু হাসান গাযাওয়ী হাফিযাহুল্লাহ।উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ড. আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]
প্রথমখুৎবা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁরই সাহায্য প্রার্থনা করি এবং তাঁরই নিকট ক্ষমা চাই। আমরা আমাদের নফসের অনিষ্ট ও আমলের মন্দ পরিণতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ যাকে হেদায়াত দান করেন, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না; আর যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে কেউ সৎপথ প্রদর্শন করতে পারে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ করুন এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও ছাহাবীগণের প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে কখনো মৃত্যুবরণ করো না’ (আলেইমরান, ৩/১০২)।
অতঃপর, দুনিয়ার জীবন কতই না তুচ্ছ ও মূল্যহীন! এখানে বিপদ-আপদ বারবার ফিরে আসে এবং এর দুঃখ-বেদনা নানাভাবে প্রকাশ পায়। এর স্বচ্ছতা ও সুখের সঙ্গে মিশে থাকে মলিনতা ও কষ্ট। এর মিষ্টতার পরেই আসে তিক্ততা। এর শুরু হয় কষ্ট দিয়ে, আর শেষ হয় ধ্বংস দিয়ে। এর আগমন প্রতারণাময়, আর এর প্রস্থান বেদনাদায়ক। এর ভোগ-বিলাস ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু এর পরিণতি স্থায়ী। এখানে হালাল ভোগের জন্য হিসাব দিতে হবে, আর হারাম ভোগের জন্য শাস্তি পেতে হবে।
এই দুনিয়া দ্রুত ধ্বংসশীল, অচিরেই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে। এর জনপদ ধ্বংস হয়ে যায়, এর বাসিন্দারা মৃত্যুবরণ করে। ধীরে ধীরে এর সৌন্দর্য ম্লান হতে থাকে, এর আনন্দ-উল্লাস হারিয়ে যায় এবং এর সবুজ সজীবতাও একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এরপরও কত মানুষ এই দুনিয়ার ভালোবাসায় আকৃষ্ট হয়, এর চাকচিক্যের পেছনে নিজের আত্মাকেই বিকিয়ে দেয় এবং এর প্রবৃত্তির সাগরে ডুব দেয়। কতক মানুষ তো শুধু দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের জন্যই বেঁচে থাকে, তাদের পরকালীন জীবনের কথা একবারের জন্যও চিন্তায় আসে না। কাজেই সে ব্যক্তি সর্বদা এক নিরবচ্ছিন্ন দুশ্চিন্তা ও নিরন্তর ক্লান্তির মধ্যে জীবন কাটাতে থাকে।
হে আমার দ্বীনী ভাইয়েরা! অহীর দুই উৎস তথা কুরআন ও সুন্নাহর বাণীগুলো আমাদের সামনে এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। মহান আল্লাহ দুনিয়ার মর্যাদা যে তুচ্ছ এবং এর বিষয়-আশয় যে নগণ্য, তা বর্ণনা করে ইরশাদ করেন, ‘তোমরা জেনে রাখো, দুনিয়ার জীবন তো কেবল ক্রীড়া-কৌতুক, শোভা-সৌন্দর্য, তোমাদের পারস্পরিক গর্ব-অহংকার এবং ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততিতে আধিক্যের প্রতিযোগিতা মাত্র। এর উপমা হলো বৃষ্টির মতো, যার উৎপন্ন ফসল কৃষকদের আনন্দ দেয়। তারপর তা শুকিয়ে যায়, তখন তুমি তা হলুদ বর্ণের দেখতে পাও। অতঃপর তা খড়কুটায় পরিণত হয়। আর আখেরাতে রয়েছে কঠিন শাস্তি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও সন্তুষ্টি। বস্তুত দুনিয়ার জীবন তো প্রতারণার সামগ্রী ছাড়া আর কিছুই নয়’ (আল-হাদীদ, ৫৭/২০)।
এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব, দুনিয়ার জীবন যেন কোনোভাবেই তোমাদেরকে প্রতারিত না করে এবং সেই মহাপ্রতারক (শয়তান) যেন আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদেরকে প্রতারিত না করে’ (ফাতির, ৩৫/৫)।
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাআলার নিকট যদি এই পৃথিবীর মূল্য মশার একটি পাখার সমানও হতো, তাহলে তিনি কোনো কাফেরকে এখানকার পানির এক ঢোকও পান করাতেন না’।[1]
জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলিয়াহ অঞ্চল থেকে মদীনায় আসার পথে এক বাজার অতিক্রমকালে তার উভয় পাশে বেশ লোকজন ছিল। যেতে যেতে তিনি ক্ষুদ্র কানবিশিষ্ট একটি মৃত বকরির বাচ্চার পাশ দিয়ে যেতে যেতে তার কাছে গিয়ে এর কান ধরে বললেন, ‘তোমাদের কেউ কি এক দিরহাম দিয়ে এটা ক্রয় করতে আগ্রহী?’ তখন উপস্থিত লোকেরা বললেন, কোনো কিছুর বদৌলতে আমরা এটা নিতে আগ্রহী নই এবং এটি নিয়ে আমরা কী করব? তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তাহলে বিনা পয়সায় সেটা নিতে কি তোমরা আগ্রহী হবে?’ তারা বললেন, এ যদি জীবিত হতো, তবুও তো এটা ত্রুটিযুক্ত। কেননা এর কান হচ্ছে ছোট ছোট। আর এখন তো সেটা মৃত, আমরা কীভাবে তা গ্রহণ করব? অতঃপর তিনি বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! এ তোমাদের কাছে যতটা নগণ্য, আল্লাহর কাছে দুনিয়া এর তুলনায় আরও বেশি নগণ্য’।[2]
হে মুমিন ভাইয়েরা! জ্ঞানী ও বিবেকবান সেই ব্যক্তি, যে সুস্পষ্ট উপলব্ধির সঙ্গে দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্যে প্রতারিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করে এবং মানুষকেও এর ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করে। যেমন মহান আল্লাহ ফেরাউনের পরিবারের একজন ঈমানদার ব্যক্তির কথা উল্লেখ করে ইরশাদ করেন, ‘হে আমার ক্বওম! এ দুনিয়ার জীবন কেবল ক্ষণকালের ভোগ; আর নিশ্চয় আখেরাতই হলো স্থায়ী আবাস’ (গাফির, ৪০/৩৯)। আর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়ার জীবনে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও এর প্রতি আসক্ত হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দরিদ্রতার আশঙ্কা করি না। বরং আমি আশঙ্কা করি যে, তোমাদের কাছে দুনিয়ার প্রাচুর্য আসবে যেমন তোমাদের পূর্বেকার লোকেদের কাছে এসেছিল, তখন তোমরা সেটা পাওয়ার জন্য পরস্পরে প্রতিযোগিতা করবে, যেমনভাবে তারা করেছিল। আর এই প্রাচুর্য তাদেরকে যেমনিভাবে ধ্বংস করেছিল, তোমাদেরকেও তেমনিভাবে ধ্বংস করে দেবে’।[3]
উছমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, দুনিয়া সবুজ-শ্যামল ও আকর্ষণীয় করে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার প্রতি বহু মানুষ ঝুঁকে পড়েছে। অতএব, তোমরা দুনিয়ার উপর নির্ভর করো না এবং এর প্রতি ভরসা রেখো না। কেননা এটি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়।[4]
অতঃপর হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ-এর সামনে দুনিয়ার আলোচনা করা হলে তিনি বললেন, দুনিয়া হলো ঘুমন্ত মানুষের স্বপ্নের মতো অথবা বিলীন হয়ে যাওয়া ছায়ার মতো। আর প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি কখনোই এমন বস্তুর দ্বারা প্রতারিত হয় না।[5]
হে আল্লাহর বান্দাগণ! অনেক মানুষ এমন আছে, যাদের অন্তরকে দুনিয়ার মায়া শক্তভাবে প্রভাবিত করে এবং দুনিয়া তাদের অনুভূতি, চিন্তা ও বিবেককে পুরোপুরি অধিকার করে নেয়। ফলে তারা দুনিয়ার কামনা-বাসনায় ডুবে যায় এবং তার বিপথসংকুল উপত্যকায় বিচরণ করে ধ্বংস হয়ে যায়। এরাই সেসব মানুষ যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, ‘আর পার্থিব জীবন তাদেরকে প্রতারিত করেছে’ (আল-আনআম, ৬/৭০)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর তারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে উৎফুল্লতায় আছে’ (আর-রা‘দ, ১৩/২৬)। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যারা দুনিয়ার জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট আছে এবং তা নিয়ে পরিতৃপ্ত রয়েছে’ (ইউনুস, ১০/৭)। অতএব, পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, মানুষ তার উদ্দেশ্য, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিদানের দিক থেকে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আখেরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য তার ফসলে প্রবৃদ্ধি দান করি, আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে তা থেকে কিছু দেই এবং আখেরাতে তার জন্য কোনো অংশই থাকবে না’ (আশ-শূরা, ৪২/২০)।
أقولُ قولي هذا، وأستغفرُ اللهَ لي ولكم.
দ্বিতীয়খুৎবা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি দুনিয়াকে পরীক্ষাক্ষেত্র এবং আখেরাতকে প্রতিদানের আবাস বানিয়েছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নাই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তুমি এ দুনিয়াতে একজন মুসাফির অথবা পথিকের মতো থাকো’।[6] আল্লাহ তাঁর প্রতি, তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি এবং তাঁর ছাহাবীগণের প্রতি শান্তি ও রহমত বর্ষণ করুন।
অতঃপর, হে আল্লাহর বান্দাগণ! একজন মুমিনের দুনিয়া সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থাকা উচিত। দুনিয়ার প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি করে এর প্রতি অনাসক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ব্যক্তি সন্ন্যাসবাদ গ্রহণ করবে, জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, কাজকর্ম ত্যাগ করবে অথবা আল্লাহ যে জিনিসগুলো হালাল করেছেন সেগুলোকে নিজের জন্য হারাম করে নেবে। বরং একজন মুমিন পৃথিবীকে আবাদ করার জন্য আদিষ্ট হয়েছে। তার জন্য জীবিকা হিসেবে দুনিয়ার পবিত্র ও উত্তম নেয়ামত ভোগ করা বৈধ। তার জন্য হালাল উপার্জনের জন্য চেষ্টা করা এবং অপচয় ও অহংকার ছাড়াই শরীআতের সীমার মধ্যে থেকে তা ভোগ করা বৈধ। অনুরূপভাবে একজন মুমিনের দুনিয়াবিমুখতা তাকে দুনিয়ার সংস্কার ও কল্যাণ সাধনে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে সে তাওহীদ, ঈমান ও সুন্নাহর প্রচারের মাধ্যমে সমাজ সংস্কার করে এবং শিরক, অকল্যাণ ও ফিতনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
দুনিয়ার নিন্দায় কুরআন ও সুন্নাহর যেসব বাণী এসেছে, সেগুলোর উদ্দেশ্য পৃথিবী, জীবন বা সময়কে নিন্দা করা নয়; বরং উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ায় সংঘটিত মন্দ কাজ, পাপাচার এবং আল্লাহর আনুগত্য থেকে মানুষের গাফেল হয়ে যাওয়াকে নিন্দা করা।
ইবনুল ক্বাইয়িম রাহিমাহুল্লাহ বলেন, বাস্তব অর্থে দুনিয়া নিন্দিত নয়। বরং নিন্দা নির্দেশিত হয় মানুষের সেই কর্মের প্রতি, যা সে দুনিয়ায় সম্পাদন করে। অন্যথা দুনিয়াই হলো আখেরাতের ভিত্তি ও তার শস্যক্ষেত্র। এখানেই মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করে, তাঁর পরিচয় লাভ করে, তাঁর যিকির করে এবং ভালোবাসা অর্জন করে। আর জান্নাতবাসীরা জান্নাতে যে সর্বোত্তম জীবন লাভ করবে, তা মূলত দুনিয়ায় তারা যা বপন করেছে তারই ফল। আর দুনিয়ার মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
হে মুসলিম উম্মাহ! রাত ও দিনের অবিরাম অতিক্রম, মাস ও বছরের ক্রমাগত শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যেই বিবেকবান মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উপদেশ ও শিক্ষা রয়েছে। এসম্পর্কে একজন প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি বলেছেন, সে কীভাবে দুনিয়া নিয়ে আনন্দিত হয়, যার প্রতিটি দিন তার এক মাসকে ধ্বংস করে, প্রতিটি মাস তার এক বছরকে কমিয়ে দেয়, আর প্রতিটি বছর তার জীবনকে ক্ষয় করে দেয়? সে কীভাবে দুনিয়া নিয়ে আনন্দিত হয়, যার বয়স তাকে তার নির্ধারিত মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, আর জীবন তাকে তার মৃত্যুর দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে?
হে আল্লাহর বান্দাগণ! আপনারা সেই মনোনীত নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি দরূদ ও সালাম পাঠ করুন, যিনি এই দুনিয়ার প্রতি অনাসক্তির সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এই দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? আমার এবং দুনিয়ার উদাহরণ তো এমন এক আরোহীর মতো, যে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিল, তারপর সেখান থেকে চলে গেল এবং ছায়াটিকে পিছনে ফেলে রেখে গেল’।[7]
আহ! তাঁর দুনিয়াবিমুখতা কতই না মহান ছিল! অতএব, আপনারা তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলুন, তাঁর হেদায়াতের পথ অবলম্বন করুন এবং প্রতিপালকের এই নির্দেশ পালন করুন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণ করো’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৬)।
হে আল্লাহ! আপনার পথে সংগ্রামরত নিপীড়িতদের সাহায্য করুন, আপনার পথে জিহাদকারী ও দেশের সীমান্তরক্ষীদের সহায়তা করুন। আমাদেরকে আমাদের দেশ ও ঘরে নিরাপত্তা দান করুন। আমাদের নেতা ও শাসকদের সংশোধন করুন এবং আমাদের নেতৃত্ব এমন ব্যক্তিদের হাতে দিন, যারা আপনাকে ভয় করে এবং আপনার সন্তুষ্টিমূলক কাজের অনুসরণ করে।
হে আল্লাহ! ফিলিস্তীনে এবং বিশ্বের সর্বত্র আমাদের ভাইদের সহায় হোন। তাদের দুশ্চিন্তা দূর করুন, তাদের বিপদাপদ লাঘব করুন, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ঐক্য সুদৃঢ় করুন, তাদের বিষয়াদি নিজের দায়িত্বে নিন, তাদের ক্ষুধা দূর করুন, তাদের ভয়-ভীতি থেকে নিরাপত্তা দিন, তাদের বিচ্ছিন্নতাকে ঐক্যে পরিণত করুন, তাদের ছিন্নভিন্ন অবস্থাকে সুসংগঠিত করুন এবং তাদের পক্ষে কৌশল অবলম্বন করুন, তাদের বিরুদ্ধে নয়।
হে আল্লাহ! আমাদের জন্য আমাদের দ্বীনকে যথোপযোগী করে দিন, যা আমাদের সকল বিষয়ের রক্ষাকবচ। আমাদের দুনিয়াকেও যথোপযুক্ত করে দিন, যেখানে রয়েছে আমাদের জীবন-জীবিকা। আর আমাদের আখেরাতকেও যথোপযোগী করে দিন, যেখানে হবে আমাদের প্রত্যাবর্তন। সর্বোপরি আমাদের জীবনকে আমাদের জন্য কল্যাণকর এবং মৃত্যুকে সকল অনিষ্ট থেকে মুক্তির কারণ বানিয়ে দিন- আমীন!
[1]. তিরমিযী, হা/২৩২০; সিলসিলা ছহীহা, হা/৯৪০।
[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৫৭।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৪০১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৬১।
[4]. তারীখে তাবারী, ৪/৪২২।
[5]. ইবনুদ দুনইয়া, কিতাবুয যুহদ, পৃ. ৩১।
[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪১৬।
[7]. তিরমিযী, হা/২৩৭৭; ইবনু মাজাহ, হা/৪১০৯, হাদীছ ছহীহ।
