হালাল-হারাম
প্রশ্ন (৩৭): একটি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করি, যেখানে টিকিট বুকিং করে কমিশন পাওয়া যায়। তবে কাজ শুরু করতে আগে নিজের টাকা (ন্যূনতম ১০,০০০ টাকা) জমা/রিচার্জ করতে হয়, আর বেশি টাকা জমা দিলে আয়ও বাড়ে। যেমন- ১০০০০ টাকা জমা দিয়ে এর বিপরীতে আমি ৭৫টি টিকেট বুকিং করলে ১৫০০-২০০০/- গড়ে উপার্জন করে থাকি। এই ধরনের আয় ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল হবে কি?
প্রশ্নকারী : মেহেদী হাসান শাকিল
উত্তর: ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করার জন্য শুরুতেই কোনো ট্রাভেল ফ্র্যাঞ্চাইজির মেম্বারশিপ বা সদস্যপদ ক্রয় বাবদ যে অর্থ প্রদানের শর্তারোপ করা হয়, তা বৈধ নয় এবং এই অর্থ প্রদান ঘুষ প্রদানের নামান্তর। আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষদাতা এবং ঘুষগ্রহীতার প্রতি অভিসম্পাত করেছেন (আবূ দাঊদ, হা/৩৫৮০)। তবে টিকেট বুকিং বৈধ কাজ। এক্ষেত্রে শ্রম দেওয়া এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক, কমিশন ও বোনাস গ্রহণ করা বৈধ (ছহীহ বুখারী, ৩/৯৩; আল-মুগনী, ৫/৩৪৫)।
পারিবারিক জীবন
প্রশ্ন (৩৮): বিয়ের দিন নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর কোনো মেয়েপক্ষ যদি তার থেকে অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও ভালো কোনো ছেলের সঙ্গে বিবাহ দিতে চান, তাহলে সেটা শরীআত সম্মত কাজ হবে কি?
প্রশ্নকারী : জাকিরুন খাতুন
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
উত্তর: ইসলামী শরীআত মুসলিম ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর নতুন করে প্রস্তাব দেওয়া কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার মুসলিম ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৪২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১২)। তবে বিবাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা করতে হবে। তারপরেও এমন ঘটনার সম্মুখীন হলে আবারও ইস্তিখারা করা উচিত। কেননা আমরা মানুষ হিসেবে যাকে ভালো মনে করছি বাস্তবে সে তেমন নাও হতে পারে। আবার আমাদের ধারণায় নেতিবাচক কেউ ভালো হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যা অপছন্দ কর, হতে পারে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং যা ভালোবাস, হতে পারে তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর’ (আল-বাকারা, ২/২১৬)। তাই মেয়েপক্ষের সম্মতির পর অন্য কারো নতুন প্রস্তাব দেওয়া হারাম; যতক্ষণ না প্রথম প্রস্তাবকারী তার প্রস্তাব উঠিয়ে নেবে বা তাকে অনুমতি দেবে (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৪২; শারহু ছহীহ মুসলিম, ৯/১৯৭)। তবে যদি প্রথম পাত্র সম্পর্কে নতুন করে কোনো শারঈ ত্রুটি, যেমন- দ্বীনের দুর্বলতা, চরিত্রগত সমস্যা, প্রতারণা ইত্যাদি জানা যায়, তাহলে মেয়ের স্বার্থে বিয়ের কথা বাতিল করা জায়েয। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন এমন কোনো ব্যক্তি তোমাদের কাছে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীনদারিতা ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তার সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন করে দাও। যদি তোমরা তা না কর, তবে পৃথিবীতে ফিতনা ও ব্যাপক বিপর্যয় (অরাজকতা) সৃষ্টি হবে’ (তিরমিযী, হা/১০৮৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৯৬৭)। আর শুধু অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী হওয়া শরীআতের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় নয়। সুতরাং শারঈ কোনো ত্রুটি না থাকলে কেবল অধিক ধনী বা তুলনামূলক ভালো পাত্রের জন্য পূর্বনির্ধারিত বিয়ে বাতিল করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী, যাতে ওয়াদা ভঙ্গ হয়।
প্রশ্ন (৩৯): তালাক হয়েছে কিনা সন্দেহে ছিলাম। এরপর সব হিসাব করে স্ত্রীকে সেইফ থাকার জন্য ওয়ার্নিং দিয়ে বলেছিলাম, ‘একটি কিন্তু হয়ে গেছে, সাবধানে থাকবে’। এখন জানতে পারলাম আগেরটা হয়নি। তাহলে কি একটি হয়ে যাবে?
প্রশ্নকারী : তামজীদ
জামালপুর।
উত্তর: স্বামী সন্দেহের কারণে স্ত্রীকে সতর্ক করার উদ্দেশ্য ‘একটি কিন্তু হয়ে গেছে, সাবধানে থাকবে’ এভাবে বলাতে তালাক পতিত হবে না। কেননা তালাক শব্দ বলার মাধ্যমেই তালাক পতিত হয়। আর সংবাদ দেওয়া বা অতীত ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে তালাক সংঘটিত হয় না (মাজমূউ ফাতাওয়া, ৩৩/৮১-৮৩)।
প্রশ্ন (৪০): আমার বাবা-মা কয়েক বছর আগে ডিভোর্স করেছেন। বর্তমানে আমি মায়ের সঙ্গে থাকি। বাবা চান আমি তার কাছে গিয়ে থাকি, কিন্তু মা এতে রাজি নন। আমার আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত, তাই কাউকেই উল্লেখযোগ্যভাবে সাহায্য করতে পারছি না। এখন কার কথা শুনব?
উত্তর: এমতাবস্থায় মায়ের সাথেই থাকবে এবং পিতার সাথে সদাচারণ বজায় রাখবে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট থেকে কে সর্বোত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী? তিনি বললেন, ‘তোমার মা’। লোকটি জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা’। লোকটি জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা’। লোকটি জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৩৯৪)। তবে পিতার সাথে থাকা যদি উভয়ের জন্য বেশি কল্যাণকর হয়, তখন পিতার সাথে থাকবে আর মাতার সাথে সদাচারণ করবে এবং তাকে সান্ত্বনা দিবে।
প্রশ্ন (৪১): একজন নারীর ২৩ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। তিনি শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল এবং বর্তমানে গর্ভধারণের এক সপ্তাহ বা কিছু বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। পরিবার আশঙ্কা করছে যে, নতুন গর্ভধারণ মা ও দুগ্ধপোষ্য সন্তানের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ অবস্থায় শরীআতের দৃষ্টিতে এই প্রাথমিক পর্যায়ে গর্ভপাতের অনুমতি আছে কি?
প্রশ্নকারী : সাদেকুর রহমান
মিরপুর, ঢাকা।
উত্তর: ইসলামী শরীআতে গর্ভপাত করানো হারাম (বনী ইসরাঈল, ১৭/৩১)। প্রশ্নে বর্ণিত গর্ভবর্তী মা ও দুগ্ধপোষ্য শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি নিয়ে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, শুধুমাত্র এই আশঙ্কার ভিত্তিতে গর্ভপাত করানো জায়েয হবে না; যদিও তা গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায় হয়। তাই তাক্বওয়ার দাবি এটাই যে, গর্ভপাত করাবে না। তবে নিরুপায় হলে ভিন্ন বিষয়।
প্রশ্ন (৪২): আমি আমার স্ত্রীকে প্রথমে এক তালাক দিই। এরপর ২ মাস ২০ দিন পর পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে তাকে আরেকবার তালাক দিই এবং তখন থেকে আমরা আলাদা থাকি। এ সময় আমার স্ত্রী অন্য কোথাও বিবাহ করেনি। পরবর্তীতে প্রায় ১০ মাস পর স্ত্রীর পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে খোলা তালাক নেওয়া হয়। আমি শুনেছি, খোলা তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পুনরায় সংসার করতে চাইলে নতুন মোহরানা ও সাক্ষীসহ নতুন করে বিবাহ করতে হয়। এখন আমার প্রশ্ন হলো, যদি আমরা নতুন করে বিবাহ করি, তাহলে পূর্বের দেওয়া দুই তালাক কি বহাল থাকবে, নাকি নতুন বিবাহের মাধ্যমে তালাকের হিসাব নতুনভাবে শুরু হবে?
প্রশ্নকারী : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর: প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী উক্ত স্বামীর পক্ষ থেকে দুই তালাক সংঘটিত হয়েছে। দুই তালাকের পর তিন মাস অতিক্রম হয়ে যাওয়ায় সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। আর ১০ মাস পরে স্ত্রীর পক্ষ থেকে খোলা তালাকের কোনো কার্যকারিতা নেই। কেননা তখন তারা স্বামী-স্ত্রী ছিল না। এখন তারা চাইলে নতুন করে বিবাহে আবদ্ধ হতে পারেন। মাকিল ইবনু ইয়াসার রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বোনকে তার স্বামী তালাক দিয়ে তারপর পৃথক করে রাখে। যখন ইদ্দত পালন পূর্ণ হয়, তখন তার স্বামী তাকে আবার পয়গাম পাঠায়। মাকিল রাযিয়াল্লাহু আনহু অমত পোষণ করলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়, فَلاَ تَعْضُلُوهُنَّ أَنْ يَنْكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ ‘তারা তাদের স্বামীর সাথে পুনরায় বিধিমত বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে চাইলে তাদের তোমরা বাধা দিয়ো না’ (ছহীহ বুখারী, হা/৪৫২৯)। তবে নতুন বিবাহের পর তালাকের হিসাব নতুনভাবে শুরু হবে না, বরং পূর্বের দুই তালাক বিবেচনায় থাকবে। অতএব, যদি পরবর্তীতে আরেক তালাক প্রদান করা হয়, তাহলে মোট তিন তালাক কার্যকর হয়ে যাবে (আল-বাকারা, ২/২২৯; মাজমূউ ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়্যাহ, ৩২/২৮৯)।
উত্তরাধিকার বিধান
প্রশ্ন (৪৩): স্ত্রীর দেনমোহর বাকি রেখে স্বামী মারা যায়। তাহলে এটা কি স্ত্রীকে মাফ করে দিতে হবে নাকি স্বামীর সম্পদ থেকে নিবে? সম্পদ না থাকলে কি করবে?
প্রশ্নকারী : মুনয়িমা
কুমিল্লা।
উত্তর: দেনমোহর আল্লাহ প্রদত্ত স্ত্রীর হক্ব, স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা ফরয (আন-নিসা, ৪/২৪)। মোহর স্বামীর উপর ঋণ, সে মারা গেলে অন্যান্য ঋণের মতো তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে প্রথমে তা আদায় করতে হবে (মাজমূউ ফাতাওয়া, ৩২/২১০-২১১; আল-মুগনী, ৭/১৫৬)। তবে সম্পদ না থাকলে স্ত্রী চাইলে মাফ করতে পারেন (আল-বাকারা, ২/২৮০)।
প্রশ্ন (৪৪): স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরিজীবী। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের টাকায় যৌথভাবে কেনা সংসারের কিছু জিনিসপত্র রয়েছে এবং স্ত্রী তার স্বামীর পরিবার থেকে কিছু উপহারসামগ্রী পেয়েছে। এখন যদি স্ত্রী মারা যায়, তাহলে কি এসব জিনিসপত্র ও উপহারসামগ্রী উত্তরাধিকারসূত্রে বণ্টন করতে হবে?
প্রশ্নকারী : ফিরোজ
ঢাকা।
উত্তর: স্ত্রী যে উপহারসামগ্রী পেয়েছে সেগুলোর মালিক সে নিজেই। সুতরাং তার মৃত্যুর পর এগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে বণ্টন করা হবে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে যেসব জিনিসপত্র ক্রয় করেছে এবং তাদের কাউকে নির্দিষ্টভাবে মালিক বানানো হয়নি, সেগুলোর মালিক শুধু স্ত্রী নয়; বরং উভয়েই যৌথভাবে মালিক। সুতরাং স্ত্রীর মৃত্যুর পর শুধুমাত্র তার মালিকানাধীন অংশে তার ওয়ারিছদের অধিকার সাব্যস্ত হবে।
নারী সংক্রান্ত
প্রশ্ন (৪৫): আমাদের গ্রামে মহিলাদের মাহফিলে ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক দু‘আ, তাফসীর, বিভিন্ন বই থেকে আলোচনা হয়। তাদের উদ্দেশ্য ভালো। সেক্ষেত্রে মহিলারা এমন মাহফিলে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি?
-মো. সামসুদ্দিন
উত্তর: কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পর্দার পরিবেশে স্থানীয় মহিলারা তা‘লীমী বৈঠকের আয়োজন করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে কিছু এলাকায় মহিলা মাহফিলের যে প্রচলন শুরু হয়েছে তা একাধিক কারণে জায়েয নয়। যেমন-
১. মহিলা বক্তার আওয়াজ মাইক ও লাউডস্পিকারের মাধ্যমে মাহফিল সংলগ্ন এলাকার পরপুরুষদের কানে পৌঁছানো হচ্ছে। অথচ নারীদের কণ্ঠেরও পর্দা রয়েছে (আল-আহযাব, ৩৩/৩২)।
২. এসব মাহফিলে অনেক মহিলা স্বামী বা মাহরাম ছাড়া দূর থেকে সফর করে আসে। অথচ একজন নারীর জন্য স্বামী বা মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েয নয় (ছহীহ বুখারী, হা/১১৯৭)।
৩. সাধারণ মাহফিলে পুরুষেরা মহিলাদের নিরাপত্তা ও পর্দার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলে ফিতনার আশঙ্কা কম থাকে। পক্ষান্তরে মহিলা মাহফিলের সার্বিক দায়িত্ব মহিলারাই পালন করে থাকে। ফলে তাদের নিরাপত্তা ও পর্দা লঙ্ঘিত হয় এবং ফিতনার প্রবল আশঙ্কা থাকে। মহিলাদের দাওয়াতী কাজের জন্য কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হলে পুরুষ আলোচক আছেন এমন মাহফিলে পুরুষদের আয়োজনের সাথে মহিলাদের পর্দার সাথে বসার আয়োজন করতে পারে।
কুরআন-হাদীছের ব্যাখ্যা
প্রশ্ন (৪৬): গায়রত কী? গায়রত কি কখনো ব্যক্তিকে অহংকারী করে তোলে?
উত্তর: গায়রত (আত্মমর্যাদা) হলো নিজের সাথে সম্পৃক্ত কোনো বিষয়ে অন্যের অংশগ্রহণকে অপছন্দ করা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিষয়গুলোতে এটা অতিমাত্রায় বিদ্যমান থাকে (তুহফাতুল আহওয়াযী, ৪/২৭৭)। গায়রত (আত্মমর্যাদা) ব্যক্তিকে অহংকারী বানায় না। বরং গায়রত (আত্মমর্যাদা) ভালো গুণ। হাদীছে এটাকে মুমিনের গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৬১)। বিশিষ্ট ছাহাবী সা‘দ বিন উবাদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যদি কোনো পুরুষকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখতাম, তাহলে তাকে (সেই পুরুষকে) তরবারির ধারালো অংশ দিয়ে আঘাত করতাম। তার এই বক্তব্য রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পৌঁছানো মাত্রই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা কি সা‘দ এর গায়রত (আত্মমর্যাদা) দেখে অবাক হচ্ছ? অবশ্যই আমি তার চেয়েও অধিক গায়রতসম্পন্ন এবং আল্লাহ তাআলা আমার চেয়ে অধিক গায়রতসম্পন্ন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৪৬)। মূলত অহংকারের সংজ্ঞা না জানার কারণে কিছু মানুষ গায়রতকে (আত্মমর্যাদা) অহংকার মনে করে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষায় অহংকারের সংজ্ঞা হলো, ‘সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯১)।
প্রশ্ন (৪৭): আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, গরু/ছাগলের বাচ্চা হলে তাদের গর্ভফুল বের করার জন্য পুঁইশাকের ডাল গলায় ঝুলিয়ে দেয়। এটা কি করা যাবে?
প্রশ্নকারী : আসাদুজ্জামান
উত্তর: গরু/ছাগলের বাচ্চা হলে তাদের গর্ভফুল বের করার জন্য পুঁইশাকের ডাল গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া একটি কুসংস্কার ও শিরকী কাজ। এর পক্ষে ইসলাম বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো নির্দেশনা নেই।
বিবিধ
প্রশ্ন (৪৮): এক লোককে আমি পছন্দ করি না। কিন্তু তার সাথে খারাপ ব্যবহারও করি না। দেখা হলে হেসেই কথা বলি। এর কারণে কি আমি মুনাফিক হব?-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
প্রশ্নকারী : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর: কাউকে অপছন্দ করার পরেও তার সাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখে ভালোভাবে কথা বলা মুনাফেকী নয়; বরং হাদীছে উত্তম কথা বলাকে ছাদাকা বলা হয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/২৮৯১) এবং হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাকে ভালো কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬২৬)। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইল। তিনি লোকটিকে দেখে বললেন, ‘সে গোত্রের নিকৃষ্ট লোক’। এরপর সে যখন এসে কথা বলল, তখন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনন্দ সহকারে হাস্যোজ্জ্বল মুখে তার সাথে মেলামেশা করলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৬০৩২)।
প্রশ্ন (৪৯): আমার এক আন্টির স্বামী ইন্তেকাল করেছে প্রায় ছয় মাস পূর্বে। আন্টি স্বপ্নে দেখেছেন, তিনি আর মাত্র কিছুদিন বাঁচবেন। এই অবস্থায় তিনি অনেক ভয় পাচ্ছেন। প্রশ্ন হলো ইসলামে স্বপ্নের বাস্তবতা কী? সব স্বপ্নের কি নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা আছে?
উত্তর: ক. হাদীছের ভাষ্যমতে স্বপ্ন তিন ধরনের হয়- ১. ভালো স্বপ্ন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ হয়ে থাকে। ২. মন্দ স্বপ্ন, যা শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতিপ্রদর্শন হয়ে থাকে। ৩. মস্তিষ্কপ্রসূত স্বপ্ন অর্থাৎ মানুষ জাগ্রত অবস্থায় যা ভাবে বা করে সেগুলো স্বপ্নে দেখে (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬৩)। এই হাদীছ থেকে বুঝা যায়, সকল স্বপ্ন অমূলক নয় এবং স্বপ্নের ভালো ও মন্দ দুটি দিকই রয়েছে।
তবে এক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হলো যদি ভালো স্বপ্ন হয়, তাহলে এমন ব্যক্তির কাছে তা প্রকাশ করা যাবে, যাকে স্বপ্নদ্রষ্টা পছন্দ করে এবং সে তার কল্যাণকামী (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬১)। হিংসুক ব্যক্তির কাছে ভালো স্বপ্নের বিবরণ প্রকাশ করা যাবে না (ইউসুফ, ১২/৫)। আর যদি মন্দ স্বপ্ন হয়, তাহলে তা প্রকাশ করতে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন এবং যেটা করণীয় তা বলে দিয়েছেন। করণীয় হলো, মন্দ স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙার পর তাৎক্ষণিক বাম দিকে তিন বার থুতু ফেলা এবং শয়তান ও স্বপ্নের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা, আর দুই রাকআত ছালাত আদায় করা (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬১)।
খ. ভালো স্বপ্নের ব্যাখ্যা আছে। তবে যাকে-তাকে তা জিজ্ঞেস করা যাবে না। কারণ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারা আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা, এটা মেহনত করে অর্জন করা কঠিন। যেমন ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং যাতে আমি তাকে (ইউসুফকে) শিক্ষা দিই স্বপ্নের ব্যাখ্যা’ (ইউসুফ, ১২/২১)। সুতরাং স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করার পূর্বে ব্যক্তিকে ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। এক্ষেত্রে বিখ্যাত স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী ও তাবেঈ মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন রাহিমাহুল্লাহ-এর গুণাবলিকে মানদণ্ড হিসেবে রাখা যেতে পারে। উল্লেখ্য, স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী যা বলবেন তাই চূড়ান্ত নয়।
প্রশ্ন (৫০): জনৈক মা তার সন্তানকে কারণে-অকারণে অভিশাপ দিয়ে থাকে। তাকে অভিশাপ দিতে নিষেধ করলেও শোনে না। এক্ষণে অভিশাপের ক্ষতি যেন সন্তানের জীবনে না আসে সেজন্য করণীয় কী?
উত্তর: ইসলাম সন্তান ও সম্পত্তির উপর অভিশাপ দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, সন্তানদের বিরুদ্ধে এবং সম্পদের বিরুদ্ধে বদদু‘আ (অভিশাপ) করো না। এমন সময়ের সাথে তা মিলে যেতে পারে যখন আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি তা কবুল করেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৯)। সন্তানের বিরুদ্ধে পিতামাতার দু‘আ কবুল হয়, এজন্য পিতামাতার কখনো সন্তানের বিরুদ্ধে বদদু‘আ করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দু‘আ নিঃসন্দেহে কবুল হয়, তার মধ্যে রয়েছে সন্তানের বিরুদ্ধে পিতামাতার দু‘আ’ (আবূ দাঊদ, হা/১৫৩৬; তিরমিযী, হা/১৯০৫)। তবে অন্যায় বদদু‘আ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনার রব কারও প্রতি যুলুম করেন না’ (আল-কাহফ, ১৮/৪৯)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘বান্দার দু‘আ সর্বদা গৃহীত হয়, যদি সে পাপের কাজ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য দু‘আ না করে এবং (দু‘আয়) তাড়াহুড়া না করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮২৩)। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের জন্য করণীয়- ১. মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখা (আল-ইসরা, ১৭/২৩)। ২. বদদু‘আর জবাবে বদদু‘আ না করা। ৩. নিয়মিত এই দু‘আ পড়া, حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيم (আবূ দাঊদ, হা/৫০৮১)। ৪. সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির ও দু‘আ পাঠ করা। বিশেষত, بسم اللَّه اللذي لايضر مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (তিরমিযী, হা/৩৩৮৮; আবূ দাঊদ, হা/৫০৮৮)।
মাসিক আল-ইতিছাম
জুলাই-২০২৬
আক্বীদা
প্রশ্ন (১):
রূহ (আত্মা) কী? এটি কি
পদার্থ, শক্তি, নাকি সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো সৃষ্টি?
-আশিক
ইকবাল
মাকলাহাট, নওগাঁ।
উত্তর: রূহ
(الروح) আল্লাহ তাআলার
সৃষ্ট একটি বাস্তব সত্তা, যা হলো সূক্ষ্ম
নূর। এটিকে শক্তি বা আমাদের পরিচিত পদার্থ বলার পক্ষে কুরআন-সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য দলীল
নেই। বরং এটি গায়েবী জগতের এমন এক সৃষ্টি, যার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে আল্লাহ
ছাড়া কেউ পূর্ণ জ্ঞান রাখে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা
আপনাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, রূহ আমার রবের আদেশসংক্রান্ত বিষয়। আর
তোমাদেরকে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে খুবই সামান্য’ (আল-ইসরা, ১৭/৮৫)। তবে কুরআন ও হাদীছের মাধ্যমে রূহ
সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তা হচ্ছে, রূহ দেহে প্রবেশ করে এবং দেহ থেকে বের হয় (ছহীহ বুখারী, হা/৩২০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৩)। ঘুমের সময় রূহ
আংশিকভাবে কবয করা হয় (আয-যুমার, ৩৯/৪২)। মৃত্যুর সময় রূহ
সম্পূর্ণভাবে কবয করা হয় (আস-সাজদা, ৩২/১১)। ফেরেশতারা রূহ গ্রহণ করেন ও নিয়ে যান (আন-নাহল, ১৬/৩২; আবূ দাঊদ, হা/৪৭৫৩)।
প্রশ্ন (২):
আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্মের ৫০ হাজার বছর পূর্বে তার ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেছেন।
অতঃপর তার মায়ের পেটে যখন চার মাস হয়, তখন
তার ভাগ্য কি পুনরায় লিপিবদ্ধ করা হয়?
-ইমরান
আমনুরা, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।
উত্তর: আল্লাহ তাআলা মানুষের তাকদীর
(ভাগ্য) সৃষ্টিজগত সৃষ্টি করার ৫০ হাজার বছর পূর্বেই লাওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ
করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৫৩)। এরপর
ভ্রূণের বয়স ১২০ দিন (চার মাস) হলে ফেরেশতাকে পাঠিয়ে তার তাকদীর পুনরায় লিখানো
হয় (ছহীহ বুখারী, হা/৩২০৮, ছহীহ মুসলিম,
হা/২৬৪৩)। তবে ভ্রূণ
অবস্থায় যে তাকদীর লেখা হয়, তা লাওহে মাহফূযে পূর্বলিখিত তাকদীরেরই অনুলিপি;
নতুন কিছু নির্ধারণ করা হয় না (শারহু
ছহীহ মুসলিম, খণ্ড ১৬, পৃষ্ঠা ১৯০-১৯১)। মূলত লাওহে মাহফূযের জ্ঞান আল্লাহর কাছে রয়েছে। এ ব্যাপারে
ফেরেশতাদের জ্ঞান না থাকায় ভ্রূণের ১২০ দিন হলে তার তাকদীর লেখা হয় অর্থাৎ ওইদিন সেই
ভ্রূণের সাথে দায়িত্বশীল ফেরেশতারা তার তাকদীরের মৌলিক কিছু বিষয় জানতে পারে, যেমন- তার রিযিক,
আয়ু।
প্রশ্ন (৩):
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম হিন্দু ধর্ম। একথা কি ঠিক? হিন্দু ধর্মের সাথে
পূর্বের কোনো নবী রাসূলের সম্পৃক্ততা আছে কি,
যেমনটা ইয়াহূদী ও নাছারার সাথে আছে?
-ইসহাক
চাঁপাই নবাবগঞ্জ।
উত্তর: সকল
নবী-রাসূল হিন্দু ধর্ম তথা মূর্তিপূজা বা শিরকের বিরুদ্ধে
দাওয়াত দিয়েছেন৷ পৃথিবীর প্রাচীন এবং
একমাত্র আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত ধর্ম হলো ইসলাম (আল্লাহ তাআলার একত্ববাদের ধর্ম), যা আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সর্বপ্রথম মানুষ আদম e-এর মাধ্যমে শুরু করে সকল নবী-রাসূল v-এর উপর অবতীর্ণ করেছেন (আলে ইমরান, ৩/১৯; আন-নাহল, ১৬/৩৬)। যে ইসলামের উপর আদম ও নূহ u-এর
মধ্যবর্তী দশ প্রজন্ম প্রতিষ্ঠিত ছিল (তাফসীর আত-তাবারী, সূরা আল-বাকারা, ২/২১৩, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ২৭৫–২৭৬; আল-মুসতাদরাক,
হা/৪০৫৭)। সুতরাং ‘পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ধর্ম হিন্দু ধর্ম’ কথাটি বিভ্রান্তিমূলক মিথ্যা
কথা। পূর্বের কোনো নবী-রাসূলের হিন্দু ধর্মের সাথে
সম্পৃক্ততা ছিল না। বরং সকল নবী-রাসূলের ধর্ম ছিল এক, তা হচ্ছে ইসলাম (ছহীহ
বুখারী, হা/৩৪৪৩; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৬৫)।
প্রশ্ন (৪):
আমাদের এখান থেকে প্রায় ৮০/১০০ কিলোমিটার দূরে সস্তিপুরে একটি মসজিদ আছে, যেটি রাতারাতি মাটি থেকে উঠে এসেছিল- এমন কথা প্রচলিত আছে।
অনেকে সেখানে মানত করে, সুস্থ হলে
মুরগি বা ছাগল দেব। এমন কাজ করা যাবে কি?
-মোহাম্মদ
সিয়াম
কুষ্টিয়া সদর।
উত্তর: কোনো
মসজিদকে কেন্দ্র করে এই বিশ্বাস রাখা যে, সেটি
অলৌকিকভাবে রাতারাতি মাটি থেকে উঠে এসেছে অথবা সেখানে মানত করলে রোগমুক্তি, সন্তান
লাভ, বিপদ দূর হওয়া ইত্যাদি বিশেষ বরকত পাওয়া যায়, এগুলো
কুসংস্কার ও শিরক। মানত আল্লাহ তাআলার ইবাদত (আল-হজ্জ, ২২/২৯)। মানত কেবল আল্লাহর জন্যই হতে হবে (ছহীহ বুখারী, হা/৬৬৯৬)। সুতরাং অসুস্থতা থেকে আরোগ্য চাইতে হলে সরাসরি আল্লাহর কাছে
চাইতে হবে। কোনো মাসজিদ, কবর বা বিশেষ স্থানের সাথে মানতকে জড়িয়ে দেওয়া এবং
সেখান থেকে বিশেষ বরকত প্রত্যাশা করা শিরক। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য; সুতরাং
তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে আহ্বান করো না’ (আল-জিন, ৭২/১৮)।
প্রশ্ন (৫):
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সর্বশক্তিমান। তিনি
‘হও’ বললেই সবকিছু হয়ে যায়। তাহলে
কুরআনে আসমান-যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করার কথা এসেছে কেন? এর পেছনে আল্লাহর হিকমত কী?
-মামুনুর রশিদ
জামালপুর।
উত্তর: প্রথমত, কুরআন মাজীদে যেমনিভাবে এই কথা এসেছে যে, আল্লাহ তাআলা ‘হও’ বললেই হয়ে যায় (ইয়া-সীন, ৩৬/৮২), তেমনিভাবে এই কথাও এসেছে যে, তিনি আসমান এবং যমীন ছয়
দিনে সৃষ্টি করেছেন (হূদ, ১১/০৭)।
সুতরাং আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজীদে যা বলেছেন তার প্রতি আমাদের অবশ্যই মজবুত ঈমান রাখতে হবে, এক্ষেত্রে আল্লাহর হিকমত আমাদের বুঝে আসুক বা না আসুক। দ্বিতীয়ত, মুফাসসিরগণ উক্ত বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একাধিক হিকমত উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে দুটি উল্লেখযোগ্য হিকমত হলো- ১. তাড়াহুড়া না করে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করে কর্ম সম্পাদন করার সবক শেখানো। মানুষ যেন এটা শেখে যে, আসমান এবং যমীন সৃষ্টি করতে যেখানে আল্লাহ তাআলার শুধু ‘হও’ বলাটাই যথেষ্ট ছিল, সেখানে তিনি তা
সৃষ্টি করলেন ছয় দিনে। তাহলে মানুষের জন্য কর্ম সম্পাদন করার ক্ষেত্রে কী
পরিমাণ পরিকল্পনা ও ধীরস্থিরতা অবলম্বন করা উচিত! (তাফসীরে কুরতুবী, ৭/২১৯)।
২. সূরা হূদের ৭ নম্বর আয়াতে ছয় দিনে আসমান এবং যমীন সৃষ্টি করার বিষয়টি উল্লেখ করার পর আল্লাহ তাআলা এর হিকমত সম্পর্কে বলেন, لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا অর্থাৎ তিনি ছয়
দিনে আসমান এবং যমীন সৃষ্টি করেছেন এটা পরীক্ষা করার জন্য যে, মানুষের মধ্যে কার আমল সবচেয়ে সুন্দর। সুতরাং এখানে দ্রুত আমল করা বা
বেশি সংখ্যক আমল করা বিবেচ্য নয়; বরং সুন্দর আমল বিবেচ্য। আর
সুন্দরভাবে
আমল করতে গেলে ধীরস্থিরতা অবলম্বন করতে হয় (তাফসীরে তাবারী, ১৫/২৫১)।
প্রশ্ন (৬):
বিয়ে ও রিযিক কি লাওহে মাহফূযে লেখা আছে?
-হাসান
ঢাকা।
উত্তর: হ্যাঁ, বিবাহ ও রিযিক লাওহে মাহফূযে লিখিত আছে। আল্লাহ তাআলা যেদিন
কলম সৃষ্টি করেছেন, সেদিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত যত
মাখলূক্ব সৃষ্টি হবে, তার সবই লাওহে মাহফূযে লিপিবদ্ধ আছে।
আল্লাহ তাআলা কলম সৃষ্টি করে বললেন, লেখো’। কলম
বলল, হে আমার প্রতিপালক! আমি কী লিখব? আল্লাহ তাআলা বললেন, ‘কিয়ামত
পর্যন্ত যা কিছু হবে সবই লিখো’। সে সময় কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু পৃথিবীর বুকে
সংঘটিত হবে, কলম সব কিছুই লিখে ফেলল (মুসনাদে
আহমাদ, হা/২২৭৫৭)। অন্যত্র
বর্ণিত হয়েছে, ‘ভ্রূণ মাতৃগর্ভে চার মাস অতিবাহিত
হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। ফেরেশতা তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেন
এবং লিখে দেন তার রিযিক, বয়স, আমল ও তিনি সৌভাগ্যবান নাকি দুর্ভাগা’ (ছহীহ
বুখারী, হা/৭৪৫৪; ইবনু
মাজাহ, হা/৭৬)। আর রিযিক
যেভাবে লিপিবদ্ধ আছে, বিবাহও সেভাবে নির্ধারিত আছে। এই
পৃথিবীতে কে কার স্বামী বা স্ত্রী হবে, তাও
নির্দিষ্ট রয়েছে। কেননা আসমান-যমীনের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন নয়।
পবিত্রতা
প্রশ্ন (৭):
কেউ সকালে মাসিক থেকে পবিত্র হয়েছে।
সারাদিন ঠিকঠাক মতোই ছালাত পড়েছে। কিন্তু রাতের বেলায় এসে দেখে তার হলুদ
হলুদ মাসিক দেখা যাচ্ছে, খুব হালকা
রং। এমতাবস্থায় তার কী করা উচিত? সে
কি আবার গোসল করবে, নাকি ছালাত
চালিয়ে যাবে?
-আসমা
মিরপুর, ঢাকা।
উত্তর: যদি নিশ্চিত পবিত্রতার পর হলুদ স্রাব আসে, তাহলে এটি মাসিক বলে গণ্য হবে না। তিনি ছালাত চালিয়ে যাবেন, নতুন করে গোসল করতে হবে না। উম্মু আতিয়্যাহ g বলেন, পবিত্রতার পর আমরা হলুদ ও মেটে রংয়ের স্রাবকে কোনো গুরুত্ব দিতাম না অর্থাৎ হায়েয গণ্য করতাম না (আবূ দাঊদ, হা/৩০৭)। অতএব, পবিত্রতার পর দেখা হলুদ স্রাব মাসিক নয়; এটি ওযূ ভঙ্গকারী অন্যান্য স্রাবের মতো। ছালাতের সময় ওযূ করে নিলেই যথেষ্ট।
ছালাত
প্রশ্ন (৮):
ছালাতে সূরা ফাতেহা বা অন্য সূরা পড়ার সময় আঊযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রজীম ও বিসমিল্লাহির
রহমানির রহীম পুরোটাই বলতে হয় নাকি শুধু বিসমিল্লাহ বলতে হয়?
-সাজ্জাদ
রহমান
মাগুরা।
উত্তর: ছালাতে
সূরা ফাতেহা পড়ার পূর্বে ‘আঊযু
বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রজীম ও বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ পুরোটাই পড়া সুন্নাত এবং অন্য সূরা পড়ার পূর্বে পূর্ণ বিসমিল্লাহির
রহমানির রহীম পড়া সুন্নাত (আবূ দাঊদ, হা/৭৭৫, ৭৮৮)।
প্রশ্ন (৯):
ঈদের খুৎবা শোনা কি ওয়াজিব? নাকি ছালাত
শেষে কেউ চাইলে চলে আসতে পারে?
-মো.
শিমুল
ঢাকা।
উত্তর: ছালামের
পর চলে যাওয়া জায়েয হলেও ভদ্রভাবে বসে থেকে গুরুত্ব সহকারে খুৎবা শোনা উচিত। আবূ
সাঈদ খুদরী c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী a ‘ঈদুল ফিতর’ ও ‘ঈদুল
আযহা’র দিন ঈদের মাঠে যেতেন এবং সেখানে তিনি প্রথম যে
কাজ শুরু করতেন তা হলো ছালাত। আর ছালাত
শেষ করে তিনি লোকদের দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন এবং তারা তাদের কাতারে বসে থাকত। তিনি
তাদের নছীহত করতেন, উপদেশ দিতেন এবং নির্দেশ দান করতেন (ছহীহ
বুখারী, হা/৯৫৬)। এছাড়া রাসূল a পুরুষদের কাছে খুৎবা দিয়ে মহিলাদের কাছে গিয়ে খুৎবা দিতেন।
এতক্ষণ তারা সেখানেই অবস্থান করত (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৪৯)।
প্রশ্ন (১০):
আমাদের মসজিদের সামনে দেয়াল থেকে ১/২
হাত দূরে কবর আছে। মসজিদ আগে হয়েছে, কবর
পরে হয়েছে। মাঝখানে সামান্য ফাঁকা জায়গা আছে। অন্য মসজিদ দূরে। এ অবস্থায় এই
মসজিদে ছালাত আদায় করা কি জায়েয? না
হলে করণীয় কী?
-মো.
রাহুল ইসলাম
নীলফামারী।
উত্তর: কবরের উপরে, কবরকে
সামনে রেখে কিংবা কবরকে পাশে রেখে ছালাত আদায় করা যাবে না। আবূ মারসাদ আল-গানাবী c
থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
a বলেছেন, ‘তোমরা কখনো কবরের উপর বসবে না এবং কবরের দিকে মুখ করে
ছালাতও আদায় করবে না’ (ছহীহ মুসলিম,
হা/২১৪০)। রাসূলুল্লাহ a কবরে চুনা লাগাতে,
তাতে লিখতে, তার উপর ঘর নির্মাণ করতে এবং তা
পদদলিত করতে নিষেধ করেছেন (তিরমিযী, হা/১০৫২)। নবী a
কবরের মাঝে ছালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন (বাযযার,
হা/৭৩৪০)। অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘নিশ্চয় তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা
তাদের নবীদের ও সৎলোকদের কবরগুলোকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। অতএব, সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ হিসেবে
গ্রহণ করো না। কেননা আমি তোমাদের এ থেকে নিষেধ করছি’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩২)। তবে কবর ও মসজিদের মাঝে যদি দেয়াল
থাকে, যা কবর থেকে মসজিদকে পৃথক করছে সে
ক্ষেত্রে ছালাত বৈধ হবে (মাজমূউ ফাতাওয়া,
১২/৩১)। আর যদি তা
না থাকে, তবে অতিসত্বর মসজিদ ও কবরস্থানকে
পৃথককারী আলাদা প্রাচীর নির্মাণ করতে হবে (আলবানী, তাহযীরুস সাজেদ, পৃ. ১২৭; শায়খ বিন বায, মাজমূউ ফাতাওয়া, ১৩/৩৫৭)।
প্রশ্ন (১১):
ছালাতে শুধু একদিকে সালাম ফিরিয়ে ছালাত শেষ করা যাবে কি?
-মকবুল
হোসেন
পাবনা।
উত্তর: দুই দিকে সালাম ফিরানোই রাসূল a-এর অধিক প্রচলিত সুন্নাহ এবং এটিই উত্তম (ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮২; মাজমূউ ফাতাওয়া, ২২/২৫৯-২৬১)। তবে ছালাতে শুধু একদিকে
সালাম ফিরিয়ে ছালাত শেষ করা জায়েয (আবূ দাঊদ, হা/১৩৪৭; তিরমিযী, হা/২৯৬; ইবনু মাজাহ, হা/৯১৯)।
প্রশ্ন (১২):
নারীরা গর্ভকালীন সময়ে বসে বসে ইশারায় ছালাত আদায় করতে পারবে কি?
-মাসুদ রানা
সৈয়দপুর, নীলফামারী।
উত্তর: গর্ভবতী নারী যদি দাঁড়িয়ে থাকতে সক্ষম হয়, কিন্তু যথানিয়মে রুকূ-সিজদা করতে সক্ষম না হয়; তাহলে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে এবং রুকূ-সিজদার জন্য দাঁড়ানো অবস্থায় ইশারা করবে। আর
যদি দাঁড়িয়ে থাকতে এবং রুকূ-সিজদা করতে সক্ষম না হয়, তাহলে বসে ছালাত আদায় করবে এবং রুকূ-সিজদার জন্য ইশারা করবে (ছহীহ বুখারী, হা/১১১৭; মুওয়াত্ত্বা মালিক, হা/৪৬৪)।
প্রশ্ন (১৩):
ছালাতের মুকাব্বির মুছল্লী না হলে, তার ইক্তিদা করলে ছালাত হবে কি?
-শাহিদুল ইসলাম
কালিহাতী,
টাঙ্গাইল।
উত্তর: মুকাব্বির ইক্তিদা করবে ইমামের আর মুছল্লী ইক্তিদা করবে মুকাব্বিরের। মুকাব্বির মূলত ইমামের আওয়াজকে পৌঁছিয়ে দেয়। আর মুকাব্বির হতে হবে মুছল্লীদের মধ্য থেকে। জামাআতের ছালাতে শরীক হয়নি এমন ব্যক্তি মুকাব্বির হতে পারবে না
(ছহীহ মুসলিম, হা/৪১৩)।
প্রশ্ন (১৪):
জামাআতে ফরয ছালাত আদায়কালে যদি মুছল্লীর কোনো ভুল হয়, তাহলে তার করণীয় কী? যেমন- ইমাম রুকূতে গেছে আর মুছল্লী ভুল করে সিজদায় গেছে।
-বাদিউল ইসলাম
কুষ্টিয়া।
উত্তর: ইমাম যদি রুকূতে যায় এবং মুছল্লী ভুল করে সিজদায় চলে যায়, তাহলে মুছল্লীর করণীয় হলো দ্রুত রুকূতে ফিরে আসা এবং ইমামের সাথে রুকূ সম্পন্ন করা (ছহীহ বুখারী, হা/৩৭৮)।
এমতাবস্থায়
মুক্তাদীর ভুল হলে তা ভুল বলে গণ্য হয় না।
ছিয়াম
প্রশ্ন (১৫):
ইচ্ছাকৃতভাবে নফল ছিয়াম, যেমন- আশূরার ছিয়াম ভঙ্গ করলে কি গুনাহ হবে, নাকি কাযা ও কাফফারাও ওয়াজিব হবে?
-খাঁন
ইলিয়াস
ফরিদপুর।
উত্তর: ইচ্ছাকৃতভাবে নফল ছিয়াম, যেমন- আশূরা, আরাফা, সোমবার-বৃহস্পতিবারের ছিয়াম
ইত্যাদি ভঙ্গ করলে কাযা ও কাফফারা কোনোটিই ওয়াজিব নয়। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা g বলেন, রাসূল a আমার নিকট এসে বলতেন, ‘তোমাদের কাছে কোনো খাবার আছে কি?’ আমরা না বললে তিনি বলতেন, ‘আমি ছিয়াম রাখলাম’। একদিন তিনি
আমাদের কাছে আগমন করলে আমরা বলি, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদেরকে কিছু হাইস (উত্তম
খাবার) হাদিয়া দেওয়া হয়েছে। আমরা তা আপনার জন্য রেখে দিয়েছি। তিনি বললেন, ‘আমাকে তা দেখাও; অবশ্য
আমি সকালে ছিয়ামের নিয়্যত করেছি। পরে তা খেয়ে ছিয়াম ছেড়ে দিলেন (ছহীহ মুসলিম,
হা/১১৫৪)। বরং নফল ছিয়াম পালনকারী তার ছিয়াম এর ব্যাপারে স্বাধীন; ইচ্ছা করলে ছিয়াম পূর্ণ করবে, ইচ্ছা করলে ভঙ্গ করবে (তিরমিযী, হা/৭৩২, নাসাঈ, হা/৩৮২২)।
যাকাত ও দান-ছাদাকা
প্রশ্ন (১৬):
আমি একজন এমপিওভুক্ত গণিত শিক্ষক, মাসে গড়ে প্রায় ৪০,০০০ টাকা আয় করি। ছয় মাস
আগে বিয়ে করেছি। স্ত্রীর
কাছে ৩ ভরি এবং আমার দেওয়া ১ ভরিসহ মোট ৪ ভরি স্বর্ণ আছে। আমার
কোনো সঞ্চয় বা জমিজমা নেই, শুধু গ্রামে একটি বাড়ি আছে, যেখানে বাবা-মা থাকেন। বিয়ের
সময় নেওয়া ৫ লক্ষ টাকার ব্যাংক ঋণ এখনও আছে। এই অবস্থায়
কি আমার উপর যাকাত ফরয হবে?
-মো. আলী হায়দার
ময়মনসিংহ।
উত্তর: প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী আপনার উপর যাকাত ফরয নয়। কেননা সম্পদ নিসাব পরিমাণ হয়নি। আপনার স্ত্রীর ৪ ভরি স্বর্ণ তারই মালিকানাধীন। এটা আপনার উপর যাকাত ফরয হওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়
(আবূ দাঊদ, হা/১৫৭৩)।
প্রশ্ন (১৭):
যে টাকা মানুষকে দান করার নিয়্যতে রাখা হয়, সেটা দান না করে তা দিয়ে ইসলামী বই কিনে পড়া যাবে কি?
-সাদ
পূর্ব শাহী ঈদগাহ, সিলেট।
উত্তর: দান করার নিয়্যতে টাকা রাখলে তা দানই করতে হবে। রাসূল a বলেন, ‘নিশ্চয় আমলের ফলাফল নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল’ (ছহীহ বুখারী, হা/১)।
কেননা ভালো কাজের নিয়্যত করা মাত্রই এক নেকী অর্জিত হয়। আর
তা বাস্তবায়ন করলে নূন্যতম দশ নেকী অর্জিত হয় এবং ব্যক্তির ইখলাছ ও সুন্দরভাবে আমল করার ভিত্তিতে উক্ত নেকী সাতশত বা তার চেয়েও অধিক গুণ বৃদ্ধি করা হয় (ছহীহ বুখারী, হা/৬৪৯১; ফাতহুল বারী, ১১/৩২৬)।
তাই দান করার নিয়্যতে রাখা টাকা দিয়ে বই না কিনে দানই করবে। তবে জরুরী কারণে নিয়্যত পরিবর্তন করতে পারে।
জায়েয-নাজায়েয
প্রশ্ন (১৮):
ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কোনো দলকে সাপোর্ট করা, বিভিন্ন
দলের পতাকা বাড়ির ছাদে লাগানো, তাদের জার্সি গায়ে পরা, তাদের
খেলা সম্পর্কে মিছিল-মিটিং করা যাবে কি?
-মোস্তফা
মনোয়ার
হারাগাছ, রংপুর।
উত্তর: বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন শয়তানের পরিকল্পিত
চক্রান্তের অন্যতম অংশ। গোপনে পাপ করিয়ে অভ্যস্ত করার পর শয়তান চক্রান্ত করে
কীভাবে বিশ্বপরিসরে পৃথিবীর প্রায় সকল মানুষকে একসঙ্গে
পাপ করানো যায়। তখন সে তারই অনুসারী পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার মোড়লদের মস্তিষ্কে বিশ্বকাপ
ফুটবল আয়োজনের পরিকল্পনা ঢুকিয়ে দেয়। এই মোড়লরা নৈতিকতা, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক রক্ষণশীলতা ইত্যাদির তোয়াক্কা না করে গরীবদের পকেট থেকে
তাদের কষ্টার্জিত অর্থ বাগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে শয়তানের উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে।
আবার এদের সঙ্গে যোগ দেয় স্বার্থবাদী ও ভণ্ড রাজনীতিবিদরা। কারণ জনগণকে
বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় মত্ত রাখতে পারলে তারা রাজনৈতিক বহু ফায়দা লুটে নিতে সক্ষম
হবে। বর্তমানে হচ্ছেও তাই। মানুষ এতটাই মত্ত হয়েছে যে, পুরো দেশ রসাতলে গেলেও কোনো পরোয়া নেই। এছাড়াও বিশ্বকাপ ফুটবল
আয়োজনে রয়েছে নানা ধরনের ঈমানবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড। উল্লেখযোগ্য কিছু কর্মকাণ্ড নিম্নে
উল্লেখ করা হলো-
১. ফুটবল
বিশ্বকাপ মূলত মানুষকে পশুতে রূপান্তরিত করে। কেননা ফুটবল বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অনেক
মানুষ এমন উন্মত্ত, বিবেকহীন, চিৎকার-চেঁচামেচি ও নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করে, যা কুরআনের ভাষায় চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তার চাইতেও নিকৃষ্ট (আল-ফুরকান, ২৫/৪৩-৪৪)।
২. ফুটবল
বিশ্বকাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জুয়ার আসর। এটি বিশ্বব্যাপী জুয়া, বেটিং (কোনো খেলা, ঘটনা বা ফলাফল সম্পর্কে পূর্বানুমান করে অর্থ বা মূল্যবান কিছু
বাজি রাখা) ও হারাম অর্থ লেনদেনের অন্যতম বৃহৎ উপলক্ষ, যা কুরআনে আল্লাহ তাআলা শয়তানের অপবিত্র কাজ ও হারাম বলে ঘোষণা
করেছেন (আল-মায়েদা, ৫/৯০-৯১)।
৩. ফুটবল
বিশ্বকাপে বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ হয়, যা একজন মুসলিমকে সাংস্কৃতিকভাবে ইয়াহূদী-খ্রিষ্টানে রূপান্তরিত
করে। বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে মুসলিমরা অমুসলিমদের ধর্মীয় বা তাদের স্বাতন্ত্র্যসূচক
সংস্কৃতি (প্রতীক, পতাকা, জার্সি, স্লোগান
ও জীবনধারা) অন্ধভাবে অনুকরণ করে, তাদের
প্রতি নিষিদ্ধ পর্যায়ের ভালোবাসা পোষণ করে। যে ব্যাপারে রাসূল a বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিদের রীতি-নীতি বিঘত-বিঘত ও হাত-হাত অনুসরণ
করবে...’ ছাহাবীগণ বললেন, ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের? তিনি বললেন, ‘তাহলে আর কারা?’ (ছহীহ বুখারী, হা/৭৩২০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৯)। আর যারা তাদের প্রতি নিষিদ্ধ পর্যায়ের ভালোবাসা পোষণ ও তাদের
সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, তারা তাদের অন্তর্ভুক্ত
(আল-মায়েদা, ৫/৫১; আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১)।
৪. ফুটবল
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে গান, বাদ্যযন্ত্র
ও হারাম বিনোদনের আয়োজন করা হয়, যা হারাম।
রাসূল a বলেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন
কিছু লোক হবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও
বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৯০)।
৫. ফুটবল
বিশ্বকাপে দলীয় সমর্থনকে কেন্দ্র করে ঝগড়া, গালি, মারামারি
ও সম্পর্ক নষ্ট করার মাধ্যমে বিভক্তি ও শত্রুতা সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা পরস্পর বিবাদে
লিপ্ত হয়ো না; তাহলে তোমরা
দুর্বল হয়ে পড়বে’ (আল-আনফাল, ৮/৪৬)।
৬. ফুটবল
বিশ্বকাপে দলীয় পক্ষপাত, অনর্থক সময়
ও অর্থের অপচয় করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই’ (আল-ইসরা, ১৭/২৭)। বিশ্বকাপ ফুটবল একজন মুসলিমকে
ইসলামী সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত করে দেয়। সুতরাং একজন মুসলিমের জন্য ফুটবল বিশ্বকাপকে
কেন্দ্র করে কোনো দলকে সাপোর্ট করা, বিভিন্ন দলের পতাকা বাড়ির ছাদে লাগানো, তাদের জার্সি পরিধান করা, তাদের খেলা সম্পর্কে মিছিল-মিটিং করাসহ ফুটবল বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট
সকল বিষয় হারাম (মাজমূউ ফাতাওয়া, ২০/১৬৪)। আল্লাহ তাআলা
আমাদের সবাইকে হেফাযত করুন।
প্রশ্ন (১৯):
আমার সামনের দুটি দাঁতের মাঝখানে কিছুটা ফাঁকা আছে। এই ফাঁকাটি আমার জন্মগত না, কাঠি দিয়ে খোঁচানোর কারণে ফাঁকা হয়ে গেছে, এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে মাঝখানের ফাঁকাটি বন্ধ করার জন্য কোনো
চিকিৎসা নেওয়া যাবে কি? এবং সামনে
দুটি দাঁত সামান্য লম্বা তা কেটে সমান করা যাবে কি? নাকি
এটি সৃষ্টির পরিবর্তন হবে।?
-নাম প্রকাশে
অনিচ্ছুক।
উত্তর: প্রশ্নে উল্লেখিত উক্ত ফাঁকাটি বন্ধ করে স্বাভাবিক অবস্থায়
ফিরিয়ে আনার জন্য চিকিৎসা নেওয়া যায়, যদি তা সৃষ্টির পরিবর্তন ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য না হয় (শারহু ছহীহ মুসলিম, ১৪/১০৭)। অস্বাভাবিক যেকোনো
ত্রুটি দূর করার জন্য দাঁতের চিকিৎসা করা যায়। তবে সৌন্দর্য গ্রহণের উদ্দেশ্যে
লম্বা দাঁত কেটে সমান করা সৃষ্টির পরিবর্তন, যা হারাম। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আল্লাহর অভিশাপ সেই নারীদের উপর যারা উল্কি আঁকে, আঁকিয়ে
নেয় এবং যারা ভ্রু উপড়ে ফেলে বা পাতলা করে আর সৌন্দর্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে দাঁতের মাঝে
ফাঁক সৃষ্টি করে। আর যারা আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিকে পরিবর্তন করে (ছহীহ বুখারী, হা/৪৮৮৬ ও ৫৯৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৫)।
প্রশ্ন (২০):
একজন ব্যক্তি নিজ টাকায় মসজিদ নির্মাণ করে ওয়াকফ করেছেন। বর্তমানে নিচতলা মসজিদ
হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তিনি এখন মসজিদের উপরের কয়েকটি তলা অর্থের বিনিময়ে নিয়ে
সেখানে আবাসিক ফ্ল্যাট করতে চান, আর
সেই অর্থ মসজিদের কাজে ব্যয় হবে। এটা করা যাবে কি?
-আব্দুল
কাদির
ঢাকা।
উত্তর: যদি তিনি জমিসহ পুরো ভবনকে মসজিদ হিসেবে ওয়াকফ করে দেন,
তাহলে পরবর্তীতে তিনি উপরের তলাগুলো অর্থের বিনিময়ে নিজস্ব আবাসিক ফ্ল্যাট বানাতে
পারবেন না। কারণ ওয়াকফ সম্পত্তি আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। উমার ইবনুল খাত্তাব c-এর ওয়াকফ সম্পর্কে রাসূল a বলেন, ‘তুমি চাইলে মূল সম্পত্তি (ওয়াকফ হিসেবে) আটকে রাখো এবং এর ফল দান করো। তা
বিক্রি করা যাবে না, হিবা করা যাবে না এবং উত্তরাধিকারসূত্রে বণ্টন করা যাবে না’
(ছহীহ বুখারী, হা/২৭৩৭; ছহীহ মুসলিম,
হা/১৬৩২)। কোনো বস্তু ওয়াকফ করা হলে তা ওয়াকফকারীর মালিকানা থেকে
বের হয়ে যায় (আল-মুগনী, ৬/১৮৫)। তবে মসজিদের উন্নয়নের জন্য উপর তলা বা নিচ তলায় হোক একাধিক ফ্ল্যাট
তৈরি করে ভাড়া দেওয়া যায়।
প্রশ্ন (২১):
বাইরে বের হলে স্বামী হাত-পা মোজা পরতে বলে,
কিন্তু গরমের কারণে স্ত্রী না পরলে কোনো পাপ হবে কি?
-সাকিবুল
হাসান
ঢাকা।
উত্তর: কব্জি
পর্যন্ত হাত ও মুখমণ্ডল খোলা জায়েয হলেও তাক্বওয়ার দাবি এটাই যে হাত-পায়ে মোজা পরে
এবং মুখমণ্ডল ঢেকে বের হবে। আয়েশা g ইফকের ঘটনায় বলেন, তিনি (ছাফওয়ান)
আমাকে চিনতে পেরে ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি
রাজিউন’ পড়লে আমি তা শুনতে পেয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম এবং চাদর টেনে আমার চেহারা
ঢেকে ফেললাম (ছহীহ বুখারী, হা/৩৮৩৫)। আয়েশা
g হজ্জের
ব্যাপারে বলেন, আমাদের সামনে কোনো পুরুষ এলে আমরা মুখের উপর কাপড় ঝুলিয়ে
দিতাম। যখন আমরা ওদের সামনে চলে যেতাম, তখন
মুখমণ্ডল খুলে রাখতাম (আবূ দাঊদ, হা/১৫৬২)। এজন্য
স্বামীর নির্দেশ মান্য করে মোজা পরেই বাহিরে বের হওয়া উচিত।
প্রশ্ন (২২):
বাসে জার্নির সময় দেখা যায় অনেকে কাউন্টার থেকে সামনে গিয়ে গাড়ির স্টাফদের সাথে
ডিল করে ৬০০ টাকার আসল ভাড়া ৪০০ টাকা দিয়ে ভ্রমণ করে। আমিও যদি এভাবে জার্নি করি
তাহলে কি পাপ হবে?
-ফাতেমা
তুজ জহুরা
নওগাঁ।
উত্তর: কোম্পানির অনুমোদিত ছাড় না হয়ে থাকলে ৬০০ টাকার সিট ৪০০
টাকায় স্টাফের সাথে গোপন সমঝোতা করে ভ্রমণ করা বৈধ নয়, এতে প্রতারণা ও আমানতের খিয়ানতে সহযোগিতা
করা হয় (আল-মায়েদা, ৫/২; ছহীহ মুসলিম, হা/১০১)। স্টাফ গোপনে টাকা নিয়ে কোম্পানির ক্ষতি করে, আর যাত্রী
জেনেশুনে এতে অংশ নিলে গুনাহগার হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ
করো না’ (আন-নিসা, ৪/২৯)।
প্রশ্ন (২৩):
বিকাশ, নগদে প্রাপ্ত রিওয়ার্ড পয়েন্ট
ব্যবহার করা কি জায়েয? এটা ব্যবহার
করলে কিছু টাকা পাওয়া যায়।
-মুস্তাকিম
ঝিনাইদহ।
উত্তর: বিকাশ বা নগদে লেনদেন করার পর যে
রিওয়ার্ড পয়েন্ট বোনাস বা উপহার হিসেবে কোম্পানির পক্ষ থেকে পাওয়া যায়, তা ব্যবহার করে যে অর্থ বা সুবিধা পাওয়া
যায়, তা গ্রহণ ও ব্যবহার করা জায়েয। কেননা তা হাদিয়া হিসেবে গণ্য হবে। আর হাদিয়া (উপহার)
গ্রহণ করা জায়েয (ছহীহ বুখারী,
হা/২৫৮৫)।
প্রশ্ন (২৪):
আমার নাম আলমগীর। ইসলামে
এ নাম রাখা কি জায়েয,
নাকি পরিবর্তন করা জরুরী?
-মো. আলমগীর হোসেন
চারাবাগ,
আশুলিয়া,
সাভার, ঢাকা।
উত্তর: আলমগীর ফার্সি শব্দ। এর
অর্থ হলো পৃথিবীর বাদশাহ বা পৃথিবীর নিয়ন্ত্রক। এই
ধরনের নাম রাখা উচিত নয়। আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলার
কাছে কিয়ামতের দিনে ঐ লোকের নাম সবচেয়ে ঘৃণিত,
যে তার নাম রেখেছে রাজাদের রাজা’ (ছহীহ বুখারী,
হা/৬২০৬)। নাম রাখা হয়ে গেলে তা পরিবর্তন করে সুন্দর অর্থবহ নাম রাখা উচিত। আয়েশা g হতে বর্ণিত,
নবী a নিকৃষ্ট নামসমূহ পরিবর্তন করে (ভালো নাম রেখে) দিতেন (তিরমিযী, হা/২৮৩৯)।
প্রশ্ন (২৫):
আমার আপন ভাতিজি (বয়স ৪ বছর)
আমাকে আব্বু বলে ডাকতে পারবে কি? বাবা না থাকায় তার জন্মনিবন্ধনে বাবার জায়গায় আমার নাম দিতে পারব কি?
-আলীনুর ইসলাম
জামালপুর।
উত্তর: শ্রদ্ধা ও সম্মান বিবেচনা করে চাচাকে আব্বু বলে সম্বোধন করা যায়। রাসূল a বলেন, ‘হে উমার! তুমি কি উপলব্ধি করছ না যে, কোনো ব্যক্তির চাচা তার
পিতার সমতুল্য’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২১৬৭)। কিন্তু জন্মনিবন্ধনে পিতার জায়গায় চাচার নাম ব্যবহার করা জায়েয নয়। অভিভাবক হিসেবে নাম দেওয়া যায়; পিতা হিসেবে নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃ-পরিচয়ে ডাকো; আল্লাহর কাছে এটাই অধিক
ইনছাফপূর্ণ। অতঃপর যদি তোমরা তাদের পিতৃ-পরিচয় না জান,
তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই এবং তোমাদের
বন্ধু’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫)। আবূ যার c হতে
বর্ণিত, নবী a-কে
বলতে শুনেছেন, ‘কোনো লোক যদি নিজ পিতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও অন্য কাউকে তার পিতা বলে
দাবি করে, তবে সে আল্লাহর কুফরী করল’ (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫০৮)।
প্রশ্ন (২৬):
ছোট বাচ্চাদের বানিয়ে বানিয়ে ভালো ভালো শিক্ষণীয় গল্প বলা যাবে কি? মূলত গল্পগুলো বাস্তবে ঘটেনি, কিন্তু শিক্ষণীয় বিষয় আছে।
-মাহমুদা
ফেনী।
উত্তর: বানানো গল্পে যদিও শিক্ষণীয় বিষয় থাকে; কিন্তু সেটা বানানো, অবাস্তব বা মিথ্যা-ই হয়। এজন্য শিশুদেরকে এসব বানানো গল্প শোনানো উচিত নয়, যাতে করে তাদের শূন্যমস্তিষ্ক মিথ্যা বা
বানানো গল্পের প্রভাবমুক্ত
থাকে। রাসূল a বলেন, ‘ওই ব্যক্তির জন্য ধ্বংস!
যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা কথা বলে। তার জন্য দুর্ভোগ!’ (আবূ
দাঊদ, হা/৪৯৯০)। রাসূল
a বলেন, ‘যে হাসির ছলেও মিথ্যা বলে না,
আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝে একটি প্রাসাদ
বানানোর দায়িত্ব নিলাম’
(আবূ দাঊদ, হা/৪৮০০)। নবী-রাসূল, ছাহাবী ও
তাদের পরবর্তী মনীষীদের গল্প বা জীবনীতে যথেষ্ট শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। শিশুদেরকে এসব গল্প আকর্ষণীয় উপস্থাপনার মাধ্যমে শোনানো যেতে পারে।
প্রশ্ন (২৭): মহিলা মাদ্রাসায় পুরুষ শিক্ষক শিক্ষকতা করতে পারবে কি? দলীলসহ জানাবেন।
-শাহীন
দিনাজপুর।
উত্তর: মহিলা মাদ্রাসায় পুরুষ শিক্ষক শর্তসাপেক্ষে
শিক্ষকতা করতে পারবে। উল্লেখযোগ্য শর্ত হলো-
১. ফিতনামুক্ত পরিবেশ হতে হবে।
২. পর্দার আড়ালে থেকে দারস প্রদান করতে হবে।
৩. অপ্রয়োজনীয় কথা বলা যাবে না।
৪. ছাত্রীরা কোমল স্বরে বা
আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে কথা বলবে না (আল-আহযাব, ৩৩/৩২, ৫৩; তাফসীরে কুরতুবী, ১৪/২২৭; ছহীহ বুখারী, হা/১০১)।
তবে বর্তমান ফিতনার যুগে মহিলা মাদ্রাসায় মহিলা শিক্ষিকা দ্বারাই পাঠ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন (২৮):
গরুর অণ্ডকোষ খাওয়া যাবে কি? অনেকে এটাকে মাকরূহ বলেছেন।
-হানযালা
ঢাকা।
উত্তর: গরুর অণ্ডকোষ খাওয়া জায়েয। কারো রুচি হলে সে
খেতে পারে। অণ্ডকোষ খাওয়া অপছন্দনীয় সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো যঈফ (সিলসিলা যঈফা, হা/৪২৯২)।
প্রশ্ন (২৯):
ফেসবুকে কোনো বুকশপ ‘গিভওয়ে’ আয়োজন করে, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের পেজে ইনভাইট, লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ও বন্ধুদের মেনশন করার শর্ত দেওয়া হয়। এরপর
লটারির মাধ্যমে কিছু বিজয়ীকে হাদিয়া দেওয়া হয়। এতে
কোনো অর্থ লেনদেন নেই, তবে অংশগ্রহণকারীরা সময় ও শ্রম ব্যয় করে এবং পেজের প্রচার হয়। এ ধরনের
গিভওয়ে আয়োজন ও এতে অংশগ্রহণ করা শরীআতসম্মত কি?
-সামিউল ইসলাম
গাইবান্ধা।
উত্তর: প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী ফেসবুকে কোনো বুকশপ (বইয়ের দোকান) কর্তৃক গিভওয়ে আয়োজন করা এবং এতে অন্যদের অংশগ্রহণ করা জায়েয। তবে শর্ত হলো উক্ত বুকশপের বইসমূহ এবং এর
যাবতীয় কার্যক্রম ইসলাম বিরোধী না হওয়া। অন্যথায় এ
গিভওয়েতে অংশগ্রহণ করা জায়েয হবে না। কারণ আল্লাহ তাআলা কল্যাণকর কাজে সহযোগিতা করতে বলেছেন এবং গুনাহের কাজে সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন (আল-মায়েদা, ৫/২)।
প্রশ্ন (৩০):
রুকইয়া করে অর্থ উপার্জন করা বা রুকইয়া করাকে কি পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যাবে?
-নাসির উদ্দীন
নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।
উত্তর: রুকইয়া একটি শরীআতসম্মত আমল, যা অসুস্থতা থেকে আরোগ্য
লাভসহ যেকোনো অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে কুরআন মাজীদের সূরা, আয়াত, হাদীছে বর্ণিত দু‘আ ইত্যাদি পড়ে ঝাড়ফুঁক করার
মাধ্যমে করা হয়। রাসূল a নিজে
নিজের উপর রুকইয়া করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৩৯) এবং ছাহাবীদের উপরও রুকইয়া করতেন (ছহীহ বুখারী,
হা/৩৩৭১)। ছাহাবায়ে
কেরাম n কারো
চাহিদার ভিত্তিতে তার উপর রুকইয়া করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫০০৭)। উল্লিখিত
আলোচনা থেকে বুঝা যায়, রুকইয়া একটি শরীআতসম্মত আমল। কিন্তু এটি কোনো পেশা বা অর্থ উপার্জনের
মাধ্যম নয়। বরং রুকইয়ার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর অনুমোদিত পদ্ধতি অবলম্বন করে নিজে উপকৃত
হওয়া এবং অন্যের উপকার করা। এ প্রসঙ্গে রাসূল a বলেন, من استطاع منكم أن ينفع أخاه فليفعل ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি
(রুকইয়ার মাধ্যমে) তার ভাইকে উপকৃত করার সক্ষমতা রাখে, সে
যেন অবশ্যই তা করে’ (ছহীহ মুসলিম,
হা/২১৯৯)। এ
হাদীছ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, রুকইয়ার উদ্দেশ্য উপকার করা, অর্থ উপার্জন করা নয়।
তবে রুকইয়ার উপর যদি কেউ স্বাভাবিক হাদিয়া প্রদান করে তা গ্রহণ করা যায়,
নির্ধারিত ফি হিসেবে নয়। যেমন- কোনো এক গোত্রের
সরদারকে সাপে কাটার পর এক ছাহাবী তার ঝাড়ফুঁক করলে তারা ছাগল হাদিয়া দিয়েছিল এবং ছাহাবীগণ
তা গ্রহণ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫০০৭)।
বর্তমানে রুকইয়াকে কেন্দ্র করে যেসব অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তা খুবই দুঃখজনক।
এসব অসঙ্গতির মূল কারণ হলো রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা। হিজরী প্রথম তিন শতাব্দী, যা হাদীছের ভাষ্যমতে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ তিন শতাব্দী, এই সময়ের মনীষীদের কেউ রুকইয়াকে
পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। অথচ রুকইয়ার বিষয়টি নববী যুগ
থেকে অদ্যাবধি চলমান রয়েছে। এছাড়াও যেসকল কারণে রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা নাজায়েয
তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
১. রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলে এবং এটাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানালে রুকইয়ার
মূল উদ্দেশ্য ব্যহত হয়। কারণ এর মূল উদ্দেশ্য হলো
নিজে উপকৃত হওয়া এবং অন্যের উপকার করা (ছহীহ মুসলিম,
হা/২১৯৯)।
২. বর্তমানে রাকীরা (রুকইয়াকারী) রুকইয়ার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের জন্য এতটাই উন্মাদ
হয়ে গেছে যে, সাধারণ মানুষের কোনো সমস্যার কথা শুনলেই সেটাকে জিন বা জাদুর মিথ্যা প্রভাব হিসেবে
দেখায় এবং ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিকে আতঙ্কিত করে ফেলে। ফলে নিজের সুরক্ষা বিবেচনায় আতঙ্কিত
ব্যক্তি ওই ভণ্ড রাকীর চাহিদামতো অর্থ প্রদানের জন্য রাজি হয়ে যায়। এভাবে তারা মানুষের
সম্পদকে অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করছে। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (আল-বাকারা, ২/১৮৮)।
৩. বর্তমানে রুকইয়ার মাধ্যমে মানুষের ঈমান হরণের এক মহড়া চলছে। ভণ্ড রাকী আতঙ্কিত
ব্যক্তির বাসায় যাওয়া মাত্রই দাবি করছে, এই বাসায় প্রচুর জিন বাস করে অথবা এই বাসার প্রত্যেক
সদস্যদের জাদু করা হয়েছে ইত্যাদি। অথচ এগুলোর গায়েবী বিষয়। সে নিজে গায়েব জানার দাবি
করে নিজের ঈমান নষ্ট করার পাশাপাশি জনসাধারণকেও শিরকে নিমজ্জিত করছে। কত ভয়াবহ ব্যাপার!
অথচ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কেউই গায়েব জানে না (আন-নামল, ২৭/৬৫)।
৪. কিছু নারীলিপ্সু লোক আছে, যারা নারীদের শ্লীলতাহানি ও ইযযত নষ্ট করার জন্য রুকইয়ার
মতো একটি শারঈ আমলকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়। কারণ নারীরা সরল। তাদের সরলতার সুযোগ
নিয়ে ভণ্ড রাকীরা টার্গেট করে নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করার পাশাপাশি তাদের সাজানো সংসার
পর্যন্ত ভেঙে দিচ্ছে। এগুলো বাস্তব ঘটনা। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا
تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ ‘তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য
কোনো অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না’
(আল-আনআম, ৬/১৫১)।
৫. বর্তমানে রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে আল্লাহর বিধানকে খেলতামাশার
বস্তুতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। প্রতারণা, উদ্ভট দাবি,
মাত্রাতিরিক্ত ফি নির্ধারণ, বাসায় অবস্থানের শর্তারোপ
করা ইত্যাদি যতসব কুকর্মের দ্বারা আল্লাহর বিধান ‘রুকইয়া’-কে খেলতামাশার বস্তু বানানো হচ্ছে, যা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, لَا
تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا ‘তোমরা আল্লাহর বিধানসমূহকে হাসিঠাট্টার বস্তু বানিয়ো না’ (আল-বাকারা, ২/২৩১)।
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে,
রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা বা এটাকে অর্থ উপার্জনের
মাধ্যম বানানো জায়েয নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকটা বুঝার এবং আমল করার তাওফীক দান
করুন। তবে যারা সৎ নিয়্যতে শারঈ বিধিনিষেধ মেনে মানুষের সাথে ধোঁকাবাজি বা অসৎ পথ
অবলম্বন না করে সত্য ও সঠিকভাবে রুকইয়া প্রদান করবে, তারা অবশ্যই এর
বিনিময়ে আল্লাহর নিকট উত্তম প্রতিদান পাবে।
প্রশ্ন (৩১):
আমলের ফযীলতের ক্ষেত্রে যঈফ হাদীছ কি গ্রহণযোগ্য? ফযীলতের যঈফ হাদীছগুলোর উপর আমল করা যাবে কি?
-রেযওয়ান হাসান
মুন্সীগঞ্জ।
উত্তর: মূল প্রশ্নের উত্তর জানার পূর্বে এটা জানা জরুরী যে, আল্লাহ তাআলা তাঁর মনোনীত বান্দাদের মাধ্যমে এত পরিমাণ ছহীহ হাদীছ আমাদের পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দিয়েছেন যে, যঈফ হাদীছের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার প্রয়োজন নেই। যঈফ হাদীছের প্রতি আমল
করা যাবে না। কেননা ছাহাবী, তাবেঈ ও মুহাদ্দিছগণ যে সমস্ত মূলনীতি এবং শর্ত
আরোপ করেছেন তাতে কোনো ক্ষেত্রেই যঈফ হাদীছ গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম বুখারী, মুসলিম, ইয়াহইয়া ইবনু মাঈন, ইবনুল আরাবী মালেকী, ইবনু হাযম, ইবনু তায়মিয়্যাহ o প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিছগণ সকল ক্ষেত্রে
যঈফ হাদীছ বর্জন করেছেন (ক্বাওয়াইদুত
তাহদীছ, পৃ. ১১৩)।
প্রশ্ন (৩২):
এক নারী জিনে আক্রান্ত বলে ধারণা করা হচ্ছে। সুস্থ
হওয়ার জন্য তিনি শিরকী-কুফরী তাবীয বা পদ্ধতি গ্রহণ করতে চান না। কিন্তু
স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে এসব নিতে বাধ্য করছে; না নিলে সংসার ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। এ অবস্থায়
তার করণীয় কী?
-সুমাইয়া
বগুড়া।
উত্তর: জিনে আক্রান্ত হওয়ার ধারণা বেশিরভাগ অমূলক হয়। সামান্য অস্বাভাবিক আচরণ পরিলক্ষিত হলেই কিছু মানুষ মনে করে, জিনে আক্রান্ত হয়েছে। তবে যদি অতিমাত্রায় অস্বাভাবিক আচরণ পরিলক্ষিত হয়, তাহলে শারঈ রুকইয়া গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু কোনোভাবেই শিরকী তাবীয ইত্যাদি গ্রহণ করা যাবে না। এক্ষেত্রে স্বামী যদি জোর করে, তাহলে তার আনুগত্য করা যাবে না। রাসূল a বলেন, ‘কোনো আনুগত্য নেই গুনাহের কাজে’ (ছহীহ
বুখারী, হা/৭২৫৭)। স্বামী ও
তার পরিবারের লোকদেরকে কোনো বিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে শিরকের পরিচয় ও ভয়াবহতা বুঝানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রশ্ন (৩৩):
তিন বছর ধরে একটি পোষা পুরুষ বিড়াল ঘরে-ঘরে স্প্রে করে প্রস্রাব করে। পশুচিকিৎসকের
মতে, নিউটার (প্রজনন ক্ষমতা অপসারণ) করালে সমস্যা দূর হবে। এ অবস্থায়
বিড়ালকে নিউটার করানো শরীআতের দৃষ্টিতে জায়েয কি? এতে গুনাহ হবে কি? উল্লেখ্য, বিড়ালটি বাইরে দিয়ে আসলে আবার বাসায় আসে।
-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর: পশু প্রাণীর উপর কোনো শারঈ বিধান নেই। কাজেই যে
বিড়াল বাসায় থাকলে ক্ষতি হবে বা কোনো সমস্যা তৈরি হবে তাকে বাহিরে ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। কেননা বিড়ালকে বাসায় রাখাটা জরুরী নয়।
হালাল-হারাম
প্রশ্ন (৩৪):
এখন ধানের মৌসুমে ধানের দাম কম থাকে, সে
জন্য ধান কিনে রেখে ৩-৪ মাস পর দাম বাড়লে বিক্রয় করা বা স্টক ব্যবসা করা যাবে কি?
-নাম প্রকাশে
অনিচ্ছুক
মহাদেবপুর, নওগাঁ।
উত্তর: মানুষের
ক্ষতি ও বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির
উদ্দেশ্যে খাদ্য বা পণ্য স্টক করা হারাম (ছহীহ
মুসলিম, হা/১৬০৫)। তবে প্রশ্নে উল্লেখিত পদ্ধতিতে ধান সিজনে ক্রয় করে স্টক
ব্যবসা করা জায়েয, যদি স্টক করার
মাধ্যমে মানুষের ক্ষতিসাধন ও বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা না হয় (মাজমূউ ফাতাওয়া, ২৮/৭৫-৭৬)। তবে অনেক সময় কিছু শস্য স্টক করাতেই কল্যাণ রয়েছে, যেমন- বিভিন্ন সবজি জাতীয়
পণ্য।
প্রশ্ন (৩৫):
কেউ যদি স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে বিদেশে যায় এবং সেখানে স্টুডেন্ট ভিসায় সপ্তাহে ২০
ঘণ্টা কাজ করার অনুমতি থাকে, কিন্তু সে
যদি অধিক আয় করার জন্য অতিরিক্ত হালাল পরিশ্রম করে; তাহলে এই অতিরিক্ত আয় কি তার জন্য হালাল হবে?
-জিহাদ
গাজীপুর।
উত্তর: যদি কোনো ব্যক্তি স্টুডেন্ট ভিসার শর্ত মেনে একটি দেশে প্রবেশ করে এবং ভিসার শর্তে সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা কাজের অনুমতি থাকে, তাহলে ইচ্ছাকৃতভাবে সেই সীমা অতিক্রম করা উচিত নয়। অতিরিক্ত কাজটি হালাল হলেও চুক্তি ভঙ্গ ও আইন লঙ্ঘনের কারণে সে গুনাহগার হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘হে মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ করো’ (আল-মায়েদা, ৫/১)। রাসূল a বলেন, ‘মুসলিমগণ তাদের শর্তাবলির উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে’ (আবূ দাঊদ, হা/৩৫৯৪)। যে ব্যক্তি কোনো দেশে নিরাপত্তা ও অনুমতি (ভিসা) নিয়ে প্রবেশ করে, তার উপর সেই দেশের সঙ্গে সম্পাদিত শর্তাবলি মেনে চলা আবশ্যক
(আশ-শারহুল মুমতে‘, ৮/৪৬১)।
সুতরাং তার অতিরিক্ত আয় হালাল হলেও, চুক্তি
ভঙ্গ করা অনুচিত।
প্রশ্ন (৩৬):
আমার একটি সেলুন আছে, যাতে
বিভিন্ন লোকদের সুন্নাত পরিপন্থী চুল কাটতে ও দাঁড়ি শেভ করতে হয়। এই ইনকাম কি
হালাল হবে?
-আ.
রউফ
রাজশাহী।
উত্তর: দাঁড়ি
মুণ্ডিয়ে দেওয়া বা সুস্পষ্ট হারাম স্টাইলে চুল কাটা হারাম ও গুনাহের কাজে সহযোগিতা করার শামিল (আল-মায়েদা, ৫/২; ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৯)। রাসূল a বলেন, «من تشبه بقوم فهو منهم» ‘যে
ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত’ (আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১)। নবী a বলেছেন, «خالفوا المشركين» ‘তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধাচরণ করো’ (ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৯২)। আল্লাহ তাআলা যে জিনিস থেকে উপকৃত হওয়া হারাম করেছেন, তার
বিনিময়ে মূল্য বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করাও হারাম (মাজমূউ ফাতাওয়া, ২৯/২২-২৩)। সুতরাং দাঁড়ি মুণ্ডিয়ে বা সুস্পষ্ট হারাম
স্টাইলে চুল কাটার পারিশ্রমিক হালাল হবে না। তবে
সাধারণভাবে চুল কাটার পারিশ্রমিক হালাল।
প্রশ্ন (৩৭):
একটি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করি, যেখানে টিকিট বুকিং করে কমিশন পাওয়া যায়। তবে
কাজ শুরু করতে আগে নিজের টাকা (ন্যূনতম ১০,০০০ টাকা) জমা/রিচার্জ করতে হয়, আর বেশি টাকা জমা দিলে আয়ও বাড়ে। যেমন-
১০০০০ টাকা জমা দিয়ে এর বিপরীতে আমি ৭৫টি টিকেট বুকিং করলে ১৫০০-২০০০/- গড়ে উপার্জন করে থাকি। এই ধরনের
আয় ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল হবে কি?
-মেহেদী হাসান শাকিল
ফুলতলা-চৌড়হাস, কুষ্টিয়া সদর, কুষ্টিয়া।
উত্তর: ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করার জন্য শুরুতেই কোনো ট্রাভেল ফ্র্যাঞ্চাইজির মেম্বারশিপ বা সদস্যপদ ক্রয় বাবদ যে অর্থ প্রদানের শর্তারোপ করা হয়, তা বৈধ নয় এবং এই অর্থ প্রদান ঘুষ প্রদানের নামান্তর। আব্দুল্লাহ বিন আমর c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a ঘুষদাতা এবং ঘুষগ্রহীতার প্রতি অভিসম্পাত করেছেন (আবূ দাঊদ, হা/৩৫৮০)।
তবে টিকেট বুকিং বৈধ কাজ। এক্ষেত্রে শ্রম দেওয়া এবং এর
বিনিময়ে পারিশ্রমিক,
কমিশন ও বোনাস গ্রহণ করা বৈধ (ছহীহ বুখারী, ৩/৯৩; আল-মুগনী, ৫/৩৪৫)।
পারিবারিক জীবন
প্রশ্ন (৩৮):
বিয়ের দিন নির্ধারিত হয়ে যাওয়ার পর কোনো মেয়েপক্ষ যদি তার থেকে অর্থনৈতিক ও ধর্মীয়
দিক থেকেও ভালো কোনো ছেলের সঙ্গে বিবাহ দিতে চান,
তাহলে সেটা শরীআত সম্মত কাজ হবে কি?
-জাকিরুন
খাতুন
পশ্চিমবঙ্গ,
ভারত।
উত্তর: ইসলামী শরীআত মুসলিম ভাইয়ের বিবাহের প্রস্তাবের উপর নতুন
করে প্রস্তাব দেওয়া কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। রাসূল a বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যেন তার মুসলিম ভাইয়ের বিবাহের
প্রস্তাবের উপর প্রস্তাব না দেয়’ (ছহীহ
বুখারী, হা/৫১৪২; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪১২)। তবে বিবাহের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা করতে
হবে। তারপরেও এমন ঘটনার সম্মুখীন হলে আবারও ইস্তিখারা করা উচিত। কেননা আমরা মানুষ
হিসেবে যাকে ভালো মনে করছি বাস্তবে সে তেমন নাও হতে পারে। আবার আমাদের ধারণায় নেতিবাচক
কেউ ভালো হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যা অপছন্দ কর, হতে পারে তা তোমাদের জন্য
কল্যাণকর এবং যা ভালোবাস, হতে পারে তা তোমাদের জন্য
অকল্যাণকর’ (আল-বাকারা, ২/২১৬)। তাই মেয়েপক্ষের
সম্মতির পর অন্য কারো নতুন প্রস্তাব দেওয়া হারাম; যতক্ষণ না প্রথম প্রস্তাবকারী
তার প্রস্তাব উঠিয়ে নেবে বা তাকে অনুমতি দেবে (ছহীহ বুখারী, হা/৫১৪২; শারহু ছহীহ মুসলিম, ৯/১৯৭)। তবে যদি প্রথম পাত্র সম্পর্কে নতুন করে কোনো শারঈ ত্রুটি, যেমন- দ্বীনের
দুর্বলতা, চরিত্রগত সমস্যা, প্রতারণা ইত্যাদি জানা যায়, তাহলে মেয়ের স্বার্থে
বিয়ের কথা বাতিল করা জায়েয। আবূ হুরায়রা c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘যখন এমন
কোনো ব্যক্তি তোমাদের কাছে বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে, যার দ্বীনদারিতা ও চরিত্রে
তোমরা সন্তুষ্ট, তখন তার সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন করে দাও। যদি তোমরা তা না কর, তবে
পৃথিবীতে ফিতনা ও ব্যাপক বিপর্যয় (অরাজকতা) সৃষ্টি হবে’ (তিরমিযী, হা/১০৮৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৯৬৭)। আর শুধু
অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী হওয়া শরীআতের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয় নয়। সুতরাং শারঈ কোনো
ত্রুটি না থাকলে কেবল অধিক ধনী বা তুলনামূলক ভালো পাত্রের জন্য পূর্বনির্ধারিত
বিয়ে বাতিল করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী, যাতে ওয়াদা ভঙ্গ হয়।
প্রশ্ন (৩৯):
তালাক হয়েছে কিনা সন্দেহে ছিলাম। এরপর সব হিসাব করে স্ত্রীকে সেইফ থাকার জন্য
ওয়ার্নিং দিয়ে বলেছিলাম, ‘একটি কিন্তু
হয়ে গেছে, সাবধানে থাকবে’। এখন জানতে পারলাম আগেরটা হয়নি। তাহলে কি একটি হয়ে যাবে?
-তামজীদ
জামালপুর।
উত্তর: স্বামী সন্দেহের কারণে স্ত্রীকে
সতর্ক করার উদ্দেশ্য ‘একটি কিন্তু হয়ে গেছে, সাবধানে থাকবে’
এভাবে বলাতে তালাক পতিত হবে না। কেননা তালাক শব্দ বলার মাধ্যমেই তালাক পতিত হয়। আর সংবাদ দেওয়া বা অতীত ঘটনা বর্ণনার মাধ্যমে তালাক সংঘটিত
হয় না (মাজমূউ ফাতাওয়া, ৩৩/৮১-৮৩)।
প্রশ্ন (৪০):
আমার বাবা-মা কয়েক বছর আগে ডিভোর্স করেছেন। বর্তমানে আমি মায়ের সঙ্গে থাকি। বাবা
চান আমি তার কাছে গিয়ে থাকি, কিন্তু
মা এতে রাজি নন। আমার আর্থিক সামর্থ্যও সীমিত, তাই
কাউকেই উল্লেখযোগ্যভাবে সাহায্য করতে পারছি না। এখন কার কথা শুনব?
-জুবায়ের
মাহবুব জাবেদ
উপশহর, সিলেট।
উত্তর: এমতাবস্থায়
মায়ের সাথেই থাকবে এবং পিতার সাথে সদাচারণ বজায় রাখবে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ a-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট থেকে কে সর্বোত্তম ব্যবহার
পাওয়ার অধিকারী? তিনি বললেন, ‘তোমার
মা’। লোকটি জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা’। লোকটি
জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি
বললেন, ‘তোমার মা’। লোকটি জিজ্ঞেস করল, তারপর
কে? তিনি বললেন, ‘তোমার
বাবা’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৩৯৪)। তবে
পিতার সাথে থাকা যদি উভয়ের জন্য বেশি কল্যাণকর হয়,
তখন পিতার সাথে থাকবে আর মাতার সাথে সদাচারণ করবে এবং তাকে সান্ত্বনা দিবে।
প্রশ্ন (৪১):
একজন নারীর ২৩ মাস বয়সী একটি সন্তান রয়েছে। তিনি
শারীরিকভাবে অনেক দুর্বল এবং বর্তমানে গর্ভধারণের এক সপ্তাহ বা কিছু বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। পরিবার
আশঙ্কা করছে যে, নতুন গর্ভধারণ মা ও দুগ্ধপোষ্য সন্তানের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এ অবস্থায়
শরীআতের দৃষ্টিতে এই প্রাথমিক পর্যায়ে গর্ভপাতের অনুমতি আছে কি?
-সাদেকুর
রহমান
মিরপুর,
ঢাকা।
উত্তর: ইসলামী শরীআতে গর্ভপাত করানো হারাম (বনী ইসরাঈল, ১৭/৩১)। প্রশ্নে বর্ণিত গর্ভবর্তী মা
ও দুগ্ধপোষ্য শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি নিয়ে যে আশঙ্কা করা হচ্ছে, শুধুমাত্র এই আশঙ্কার ভিত্তিতে গর্ভপাত করানো জায়েয হবে না; যদিও তা গর্ভধারণের প্রাথমিক পর্যায় হয়। তাই তাক্বওয়ার দাবি এটাই যে, গর্ভপাত করাবে না। তবে নিরুপায় হলে ভিন্ন বিষয়।
প্রশ্ন (৪২):
আমি আমার স্ত্রীকে প্রথমে এক তালাক দিই। এরপর
২ মাস ২০ দিন পর পারিবারিক মনোমালিন্যের কারণে তাকে আরেকবার তালাক দিই এবং তখন থেকে আমরা আলাদা থাকি। এ সময়
আমার স্ত্রী অন্য কোথাও বিবাহ করেনি। পরবর্তীতে
প্রায় ১০ মাস পর স্ত্রীর পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে খোলা তালাক নেওয়া হয়। আমি
শুনেছি, খোলা তালাকের পর স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পুনরায় সংসার করতে চাইলে নতুন মোহরানা ও সাক্ষীসহ নতুন করে বিবাহ করতে হয়। এখন
আমার প্রশ্ন হলো, যদি আমরা নতুন করে বিবাহ করি, তাহলে পূর্বের দেওয়া দুই তালাক কি বহাল থাকবে, নাকি নতুন বিবাহের মাধ্যমে তালাকের হিসাব নতুনভাবে শুরু হবে?
-নাম
প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর: প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী উক্ত স্বামীর পক্ষ থেকে দুই তালাক সংঘটিত হয়েছে। দুই তালাকের পর
তিন মাস অতিক্রম হয়ে যাওয়ায় সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে। আর
১০ মাস পরে স্ত্রীর পক্ষ থেকে খোলা তালাকের কোনো কার্যকারিতা নেই। কেননা তখন তারা স্বামী-স্ত্রী ছিল না। এখন তারা চাইলে নতুন করে বিবাহে আবদ্ধ হতে পারেন। মাকিল ইবনু ইয়াসার c-এর
বোনকে তার স্বামী তালাক দিয়ে তারপর পৃথক করে রাখে। যখন ইদ্দত পালন পূর্ণ হয়,
তখন তার স্বামী তাকে আবার পয়গাম পাঠায়। মাকিল c অমত পোষণ করলে এ আয়াত অবতীর্ণ হয়, فَلاَ تَعْضُلُوهُنَّ أَنْ يَنْكِحْنَ أَزْوَاجَهُنَّ ‘তারা তাদের স্বামীর সাথে
পুনরায় বিধিমত বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতে চাইলে তাদের তোমরা বাধা দিয়ো না’ (ছহীহ
বুখারী, হা/৪৫২৯)।
তবে নতুন বিবাহের পর তালাকের হিসাব নতুনভাবে শুরু হবে না, বরং পূর্বের দুই তালাক বিবেচনায় থাকবে। অতএব, যদি পরবর্তীতে আরেক তালাক প্রদান করা হয়, তাহলে মোট তিন তালাক কার্যকর হয়ে যাবে (আল-বাকারা, ২/২২৯; মাজমূউ ফাতাওয়া ইবনু তাইমিয়্যাহ, ৩২/২৮৯)।
উত্তরাধিকার বিধান
প্রশ্ন (৪৩):
স্ত্রীর দেনমোহর বাকি রেখে স্বামী মারা যায়। তাহলে এটা কি স্ত্রীকে মাফ করে দিতে
হবে নাকি স্বামীর সম্পদ থেকে নিবে? সম্পদ না থাকলে কি করবে?
-মুনয়িমা
কুমিল্লা।
উত্তর: দেনমোহর আল্লাহ প্রদত্ত স্ত্রীর হক্ব, স্ত্রীকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা ফরয (আন-নিসা, ৪/২৪)। মোহর স্বামীর উপর ঋণ, সে মারা গেলে অন্যান্য ঋণের মতো তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে প্রথমে তা আদায় করতে হবে (মাজমূউ ফাতাওয়া, ৩২/২১০-২১১; আল-মুগনী, ৭/১৫৬)। তবে সম্পদ না থাকলে স্ত্রী চাইলে মাফ করতে পারেন (আল-বাকারা, ২/২৮০)।
প্রশ্ন (৪৪):
স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরিজীবী। স্বামী-স্ত্রী
উভয়ের টাকায় যৌথভাবে কেনা সংসারের কিছু জিনিসপত্র রয়েছে এবং স্ত্রী তার স্বামীর পরিবার থেকে কিছু উপহারসামগ্রী পেয়েছে। এখন
যদি স্ত্রী মারা যায়,
তাহলে কি এসব জিনিসপত্র ও উপহারসামগ্রী উত্তরাধিকারসূত্রে বণ্টন করতে হবে?
-ফিরোজ
ঢাকা।
উত্তর: স্ত্রী যে উপহারসামগ্রী পেয়েছে সেগুলোর মালিক সে নিজেই। সুতরাং তার মৃত্যুর পর
এগুলো উত্তরাধিকারসূত্রে
বণ্টন করা হবে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী যৌথভাবে যেসব জিনিসপত্র ক্রয় করেছে এবং তাদের কাউকে নির্দিষ্টভাবে মালিক বানানো হয়নি, সেগুলোর মালিক শুধু স্ত্রী নয়; বরং উভয়েই যৌথভাবে মালিক। সুতরাং স্ত্রীর মৃত্যুর পর শুধুমাত্র তার মালিকানাধীন অংশে তার ওয়ারিছদের অধিকার সাব্যস্ত হবে।
নারী সংক্রান্ত
প্রশ্ন (৪৫):
আমাদের গ্রামে মহিলাদের মাহফিলে ছহীহ হাদীছ ভিত্তিক দু‘আ, তাফসীর, বিভিন্ন বই থেকে আলোচনা হয়। তাদের
উদ্দেশ্য ভালো। সেক্ষেত্রে
মহিলারা এমন মাহফিলে অংশগ্রহণ করতে পারবে কি?
-মো. সামসুদ্দিন
শীতল মাঠ, পত্নীতলা,
নওগাঁ।
উত্তর: কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পর্দার পরিবেশে স্থানীয় মহিলারা তা‘লীমী বৈঠকের আয়োজন করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে কিছু এলাকায় মহিলা মাহফিলের যে
প্রচলন শুরু হয়েছে তা একাধিক কারণে জায়েয নয়। যেমন-
১. মহিলা বক্তার আওয়াজ মাইক ও
লাউডস্পিকারের
মাধ্যমে মাহফিল সংলগ্ন এলাকার পরপুরুষদের
কানে পৌঁছানো হচ্ছে। অথচ নারীদের কণ্ঠেরও পর্দা রয়েছে (আল-আহযাব, ৩৩/৩২)।
২. এসব মাহফিলে অনেক মহিলা স্বামী বা
মাহরাম ছাড়া দূর থেকে সফর করে আসে। অথচ একজন নারীর জন্য স্বামী বা
মাহরাম ছাড়া সফর করা জায়েয নয় (ছহীহ বুখারী, হা/১১৯৭)।
৩. সাধারণ মাহফিলে পুরুষেরা মহিলাদের নিরাপত্তা ও
পর্দার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলে ফিতনার আশঙ্কা কম
থাকে। পক্ষান্তরে মহিলা মাহফিলের সার্বিক দায়িত্ব মহিলারাই পালন করে থাকে। ফলে তাদের নিরাপত্তা ও পর্দা লঙ্ঘিত হয় এবং ফিতনার প্রবল আশঙ্কা থাকে। মহিলাদের দাওয়াতী কাজের জন্য কোনো আয়োজনের প্রয়োজন হলে পুরুষ আলোচক আছেন এমন মাহফিলে পুরুষদের আয়োজনের সাথে মহিলাদের পর্দার সাথে বসার আয়োজন করতে পারে।
কুরআন-হাদীছের ব্যাখ্যা
প্রশ্ন (৪৬):
গায়রত কী? গায়রত কি কখনো ব্যক্তিকে অহংকারী করে তোলে?
-মিহাদ হাসান
মেলান্দহ,
জামালপুর।
উত্তর: গায়রত (আত্মমর্যাদা)
হলো নিজের সাথে সম্পৃক্ত কোনো বিষয়ে অন্যের অংশগ্রহণকে অপছন্দ করা। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার বিষয়গুলোতে এটা অতিমাত্রায় বিদ্যমান থাকে (তুহফাতুল আহওয়াযী, ৪/২৭৭)। গায়রত (আত্মমর্যাদা) ব্যক্তিকে অহংকারী বানায় না। বরং গায়রত (আত্মমর্যাদা) ভালো গুণ। হাদীছে এটাকে মুমিনের গুণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৬১)। বিশিষ্ট ছাহাবী সা‘দ
বিন উবাদাহ c বলেন, যদি কোনো পুরুষকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে দেখতাম, তাহলে তাকে (সেই পুরুষকে) তরবারির ধারালো অংশ দিয়ে আঘাত করতাম। তার এই
বক্তব্য রাসূল a-এর নিকট পৌঁছানো মাত্রই রাসূল a বললেন, ‘তোমরা কি সা‘দ এর গায়রত (আত্মমর্যাদা)
দেখে অবাক হচ্ছ? অবশ্যই আমি তার চেয়েও অধিক গায়রতসম্পন্ন এবং আল্লাহ তাআলা আমার চেয়ে অধিক গায়রতসম্পন্ন’ (ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৪৬)।
মূলত অহংকারের সংজ্ঞা না জানার কারণে কিছু মানুষ গায়রতকে (আত্মমর্যাদা) অহংকার মনে করে। রাসূল a-এর ভাষায় অহংকারের সংজ্ঞা হলো, ‘সত্যকে অস্বীকার করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৯১)।
প্রশ্ন (৪৭):
আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে, গরু/ছাগলের বাচ্চা হলে তাদের গর্ভফুল বের করার জন্য পুঁইশাকের ডাল গলায় ঝুলিয়ে দেয়। এটা
কি করা যাবে?
-আসাদুজ্জামান
চিরিরবন্দর,
দিনাজপুর।
উত্তর: গরু/ছাগলের বাচ্চা হলে তাদের গর্ভফুল বের করার জন্য পুঁইশাকের ডাল গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া একটি কুসংস্কার ও শিরকী কাজ। এর
পক্ষে ইসলাম বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো নির্দেশনা নেই।
বিবিধ
প্রশ্ন (৪৮): এক লোককে আমি পছন্দ করি না। কিন্তু তার সাথে খারাপ ব্যবহারও করি না। দেখা হলে হেসেই কথা বলি। এর কারণে কি আমি মুনাফিক হব?-নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
উত্তর: কাউকে অপছন্দ করার পরেও তার সাথে হাস্যোজ্জ্বল মুখে ভালোভাবে কথা বলা মুনাফেকী নয়; বরং হাদীছে উত্তম কথা বলাকে ছাদাকা বলা হয়েছে (ছহীহ বুখারী,
হা/২৮৯১) এবং হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাকে ভালো কাজ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬২৬)।
আয়েশা g হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী a-এর নিকট প্রবেশের অনুমতি চাইল। তিনি লোকটিকে দেখে
বললেন, ‘সে গোত্রের নিকৃষ্ট লোক’। এরপর সে যখন এসে কথা বলল,
তখন নবী a আনন্দ সহকারে হাস্যোজ্জ্বল
মুখে তার সাথে মেলামেশা করলেন (ছহীহ বুখারী, হা/৬০৩২)।
প্রশ্ন (৪৯):
আমার এক আন্টির স্বামী ইন্তেকাল করেছে প্রায় ছয় মাস পূর্বে। আন্টি
স্বপ্নে দেখেছেন, তিনি আর মাত্র কিছুদিন বাঁচবেন। এই অবস্থায়
তিনি অনেক ভয়
পাচ্ছেন। প্রশ্ন
হলো ইসলামে স্বপ্নের বাস্তবতা কী? সব স্বপ্নের
কি নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা আছে?
-শেখ বায়েজিদ হোসেন
বাগেরহাট।
উত্তর: ক. হাদীছের ভাষ্যমতে স্বপ্ন তিন ধরনের হয়- ১. ভালো স্বপ্ন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ হয়ে থাকে। ২. মন্দ স্বপ্ন, যা শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতিপ্রদর্শন হয়ে থাকে। ৩. মস্তিষ্কপ্রসূত স্বপ্ন অর্থাৎ মানুষ জাগ্রত অবস্থায় যা
ভাবে বা করে সেগুলো স্বপ্নে দেখে (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬৩)। এই
হাদীছ থেকে বুঝা যায়, সকল স্বপ্ন অমূলক নয় এবং স্বপ্নের ভালো ও মন্দ দুটি দিকই রয়েছে।
তবে এক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা হলো যদি ভালো স্বপ্ন হয়, তাহলে এমন ব্যক্তির কাছে তা
প্রকাশ করা যাবে, যাকে স্বপ্নদ্রষ্টা পছন্দ করে এবং সে তার কল্যাণকামী (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬১)।
হিংসুক ব্যক্তির কাছে ভালো স্বপ্নের বিবরণ প্রকাশ করা যাবে না (ইউসুফ, ১২/৫)।
আর যদি মন্দ স্বপ্ন হয়, তাহলে তা প্রকাশ করতে রাসূল a নিষেধ করেছেন এবং যেটা করণীয় তা বলে দিয়েছেন। করণীয় হলো, মন্দ স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙার পর
তাৎক্ষণিক বাম দিকে তিন বার থুতু ফেলা এবং শয়তান ও স্বপ্নের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা, আর দুই রাকআত ছালাত আদায় করা (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬১)।
খ. ভালো স্বপ্নের ব্যাখ্যা আছে। তবে যাকে-তাকে তা জিজ্ঞেস করা যাবে না। কারণ স্বপ্নের ব্যাখ্যা করতে পারা আল্লাহ প্রদত্ত যোগ্যতা, এটা মেহনত করে অর্জন করা কঠিন। যেমন ইউসুফ e-এর ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এবং যাতে আমি তাকে (ইউসুফকে)
শিক্ষা দিই স্বপ্নের ব্যাখ্যা’ (ইউসুফ, ১২/২১)।
সুতরাং স্বপ্নের ব্যাখ্যা জিজ্ঞেস করার পূর্বে ব্যক্তিকে ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। এক্ষেত্রে বিখ্যাত স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী ও
তাবেঈ মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন p-এর গুণাবলিকে মানদণ্ড হিসেবে রাখা যেতে পারে। উল্লেখ্য, স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী যা
বলবেন তাই চূড়ান্ত নয়।
প্রশ্ন (৫০):
জনৈক মা তার সন্তানকে কারণে-অকারণে অভিশাপ দিয়ে থাকে। তাকে
অভিশাপ দিতে নিষেধ করলেও শোনে না। এক্ষণে অভিশাপের ক্ষতি যেন সন্তানের জীবনে না
আসে সেজন্য করণীয় কী?
-আবূ
হুরায়রা সিফাত
মান্দা, নওগাঁ।
উত্তর: ইসলাম সন্তান ও সম্পত্তির উপর অভিশাপ দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। রাসূল a বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে, সন্তানদের বিরুদ্ধে এবং সম্পদের বিরুদ্ধে বদদু‘আ (অভিশাপ) করো না। এমন সময়ের সাথে তা মিলে যেতে পারে যখন আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়া হলে তিনি তা কবুল করেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৩০০৯)। সন্তানের বিরুদ্ধে পিতামাতার দু‘আ কবুল হয়, এজন্য পিতামাতার কখনো সন্তানের বিরুদ্ধে বদদু‘আ করা উচিত নয়। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দু‘আ নিঃসন্দেহে কবুল হয়, তার মধ্যে রয়েছে সন্তানের বিরুদ্ধে পিতামাতার দু‘আ’ (আবূ দাঊদ, হা/১৫৩৬; তিরমিযী, হা/১৯০৫)। তবে অন্যায় বদদু‘আ আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনার রব কারও প্রতি যুলুম করেন না’ (আল-কাহফ, ১৮/৪৯)। রাসূল a বলেন, ‘বান্দার দু‘আ সর্বদা গৃহীত হয়, যদি সে পাপের কাজ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য দু‘আ না করে এবং (দু‘আয়) তাড়াহুড়া না করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৬৮২৩)। এমন পরিস্থিতিতে সন্তানের জন্য করণীয়- ১. মায়ের সাথে সদ্ব্যবহার অব্যাহত রাখা (আল-ইসরা, ১৭/২৩)। ২. বদদু‘আর জবাবে বদদু‘আ না করা। ৩. নিয়মিত এই দু‘আ পড়া, حَسْبِيَ اللَّهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا هُوَ عَلَيْهِ تَوَكَّلْتُ وَهُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيم (আবূ দাঊদ, হা/৫০৮১)। ৪. সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির ও দু‘আ পাঠ করা। বিশেষত, بسم اللَّه اللذي لايضر مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (তিরমিযী, হা/৩৩৮৮; আবূ দাঊদ, হা/৫০৮৮)।
