কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা এবং নৈতিকতার দুর্গ

post title will place here

[১ রবীউল আউয়াল, ১৪৪৮ হি. মোতাবেক ১৪ আগস্ট, ২০২৬ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খখালেদ আল-মুহান্না হাফিযাহুল্লাহ । উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ড. আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথমখুৎবা

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি বান্দার সকল গোপন বিষয় সম্পর্কে অবগত। আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, তাঁর রয়েছে সর্বোত্তম নামসমূহ। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মনোনীত বান্দা ও রাসূল এবং তাঁর প্রিয় বন্ধু। মহান আল্লাহ তাঁর উপর, তাঁর সম্মানিত পরিবারবর্গ এবং নক্ষত্রতুল্য তাঁর ছাহাবীগণের উপর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।

অতঃপর, হে মানবমণ্ডলী! আপনারা তাক্বওয়া অবলম্বন করুন। কেননা তাক্বওয়াই হলো দ্বীনের ভিত্তি এবং সমগ্র সৃষ্টির উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অবশ্যপালনীয় হক্ব।

হে মুমিনগণ! আল্লাহ তাআলার আদেশ পালন এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে অর্জিত তাক্বওয়া বান্দার পক্ষ থেকে তার প্রতিপালকের প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসার প্রমাণ এবং তার বিশুদ্ধ ঈমানের নিদর্শন। তাই মানুষের উত্তম চারিত্রিক গুণাবলি তাক্বওয়া অর্জনে সহায়ক হয় এবং তার সুন্দর আদব-আখলাকও তাক্বওয়ার পথকে সুদৃঢ় করার উপায় হিসেবে কাজ করে। আর নিঃসন্দেহে ঈমান হলো আক্বীদা, কথা, আমল, চরিত্র প্রভৃতি শাখার সমষ্টি। যে ব্যক্তি এসব শাখা পূর্ণরূপে ধারণ করেছে, সে তার ঈমানকে পরিপূর্ণ করেছে এবং প্রকৃত তাক্বওয়া অর্জন করেছে। আর যে ব্যক্তি এসবের কোনো অংশে অবহেলা করেছে, সে যতটুকু অবহেলা করেছে, ততটুকু পরিমাণ ঈমান ও তাক্বওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

জেনে রাখুন! ঈমানের শাখাসমূহ ও মর্যাদাপূর্ণ গুণাবলির মধ্যে অন্যতম হলো লজ্জাশীলতার চরিত্র। এটি এমন একটি প্রশংসনীয় গুণ, যা সকল শরীআতেই স্বীকৃত ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ছিল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ঈমানের শাখা সত্তরটিরও কিছু বেশি, অথবা ষাটটিরও কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হলো আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই—এ কথা স্বীকার করা, আর এর সর্বনিম্ন শাখা হচ্ছে রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা। আর লজ্জা ঈমানের বিশিষ্ট একটি শাখা’।[1]

আল্লাহর বান্দাগণ! লজ্জাশীলতা হলো মানুষের অন্তরের এমন একটি গুণ, যা তাকে এমন কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, যা তার অন্তরকে পবিত্র ও সুন্দর করে এবং এমন কাজ থেকে বিরত রাখে, যা তাকে কলুষিত ও লাঞ্ছিত করে। এটি মুমিনের অন্তরে সুদৃঢ়ভাবে প্রোথিত একটি মহৎ চরিত্র। এই গুণ মুমিনকে তার রবের আদেশের প্রতি যত্নশীল হতে এবং তাঁর অবিরাম নেয়ামত ও অফুরন্ত অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। একই সঙ্গে এটি তাকে তার প্রতিপালকের হক্ব আদায়ে সচেষ্ট করে।

আর এই লজ্জাশীলতা তাকে অন্যায় ও ভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা করে। কারণ সে তার প্রতিপালকের ব্যাপারে সর্বদা সচেতন থাকে, যিনি তাকে দেখেন এবং তার গোপন বিষয় ও অন্তরের নিভৃত কথোপকথন পর্যন্ত জানেন।

সুতরাং যে ব্যক্তি লজ্জাশীলতার গুণে নিজেকে সুশোভিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে, সে যেন সব ধরনের কল্যাণকর গুণ নিজের মধ্যে একত্রিত করে নিয়েছে।

হে মুসলিমগণ! মহান আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে মুসলিমদেরকে এই পৃথিবীতে বসবাসের সুযোগ দিয়েছেন, লজ্জাশীলতার গুণ ছাড়া তা পূর্ণতা পায় না। কারণ একজন মুসলিমকে এমন সব বিষয়ের জন্য প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে তার দ্বীন ও ব্যক্তিত্বের মর্যাদা পূর্ণতা লাভ করে এবং সে তার প্রতিপালকের ইচ্ছানুযায়ী বান্দার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারে।

সেই প্রতিপালকই তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং বিবেক-বুদ্ধি দানের মাধ্যমে তাকে অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র করেছেন। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ইলহামের মাধ্যমে সে পাপাচারের পথ ও তাক্বওয়ার পথ সম্পর্কে জানতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘শপথ মানুষের এবং তাঁর, যিনি তাকে সুঠাম করেছেন। অতঃপর তাকে তার অসৎ কাজ ও তার সৎ কাজের জ্ঞান দান করেছেন’ (আশ-শামস, ৯১/৭-৮)।

লজ্জাশীলতা মূলত মানুষের স্বভাবজাত একটি গুণ। পাপের কাদায় নিমজ্জিত ব্যক্তি ছাড়া কেউই লজ্জাশীলতার এই স্বভাব থেকে বিচ্যুত হয় না। আর কারও লজ্জাশীলতা হারিয়ে গেলে তার অন্তর্দৃষ্টি নষ্ট হয়ে যায় এবং তার হৃদয় অন্ধ হয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে, একজন মুমিন যখন এমন কোনো কাজ করার চিন্তা করে, যা তার প্রতিপালকের অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে, তখন তার লজ্জাশীলতার স্বভাব সক্রিয় হয়ে তাকে সেই কাজ থেকে বিরত রাখে। কেননা এই লজ্জাশীলতা তার দ্বীনেরই অংশ এবং তার উপর অবশ্যপালনীয় একটি বিষয়।

এছাড়াও মুমিনের লজ্জাশীলতা তাকে বিভিন্ন অনুচিত কাজ থেকে বিরত রাখে। এটি তাকে মানুষ নিন্দনীয় মনে করে এমন কাজ প্রকাশ্যে করা থেকে বাধা দেয়। এটি অন্যের সম্পদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকানো, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং প্রয়োজনের সময়ে তার ভাইকে সহযোগিতা না করার প্রবণতা থেকে রক্ষা করে। এটি মূলত তার ব্যক্তিত্ব ও শালীনতার সাথে সম্পর্কিত বিষয়। আর দ্বীন ও ব্যক্তিত্বের পূর্ণতার মাধ্যমেই মানুষের মানবিকতা পূর্ণতা পায়। সুতরাং যার মধ্যে লজ্জাশীলতা নেই, তার মধ্যে মানবিকতার বাহ্যিক রূপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, কারণ লজ্জাশীলতা ঈমানের অন্তর্ভুক্ত বিষয় এবং ঈমানের একটি শাখা। এর মূল মুমিনের অন্তরে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে, আর এর শাখা-প্রশাখা তার ঈমানের শক্তি অনুযায়ী স্বীয় আচরণে প্রকাশ পায়।

প্রকৃত মুমিন তার প্রতিপালকের মহত্ত্ব উপলব্ধি করার কারণে তাঁর প্রতি লজ্জাশীল থাকে। কারণ সে তাঁর উত্তম নামসমূহ, গুণাবলি এবং কর্মের পরিপূর্ণতা ও মহিমা সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। ফলে সে তার প্রতিপালকের নেয়ামত ভোগ করে তাঁরই অবাধ্যতা করার ব্যাপারে লজ্জাবোধ করে। এছাড়া সে তার সৃষ্টিকর্তার মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা ও তুচ্ছতা উপলব্ধি করেও লজ্জাবোধ করে।

আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এ সময় লোকটি (তার ভাইকে) লজ্জা সম্পর্কে তিরস্কার করছিল এবং বলছিল যে, তুমি বেশি লজ্জা করছ, এমনকি সে যেন এ কথাও বলছিল যে, এটা তোমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি তাকে তার অবস্থার উপর ছেড়ে দাও। কারণ নিশ্চয়ই লজ্জাশীলতা ঈমানের অঙ্গ’।[2] অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও। কারণ লজ্জা ঈমানের অঙ্গ’।[3] অন্য বর্ণনায় এসেছে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘লজ্জাশীলতা কল্যাণ ছাড়া কোনো কিছুই বয়ে আনে না’।[4]

হে আল্লাহর বান্দাগণ! লজ্জাশীলতা মূলত দুটি বিষয় প্রত্যক্ষ করার ফল। প্রথম বিষয় হলো আল্লাহর সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের অনুভূতি, যেই অনুভূতি বান্দাকে দ্বীনের সর্বোচ্চ ইহসানের মর্যাদায় উন্নীত করে। কারণ বান্দা যখন উপলব্ধি করে যে, আল্লাহ তার সবকিছু সম্পর্কে অবগত এবং তাকে দেখছেন, তখন সে আল্লাহ তাআলার এই বাণী স্মরণে রাখে, ‘সে কি জানে না যে, আল্লাহ দেখছেন?’ (আল-আলাক্ব, ৯৬/১৪)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর সদা পর্যবেক্ষণকারী’ (আন-নিসা, ৪/১)।

বান্দা যখন এই বিষয়টি অন্তরে দৃঢ়ভাবে অনুভব করে এবং তার প্রতিটি কথা ও কাজের সময় আল্লাহকে নিজের সামনে উপস্থিত মনে করে, তখন তার অন্তরে স্বীয় প্রতিপালকের প্রতি লজ্জাশীলতা সৃষ্টি হয়। এর ফলে সে এমন কোনো কথা বলে না বা কাজ করে না, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। বরং সে কেবল এমন কাজই করে, যা তাকে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে সহায়তা করে এবং তাঁর কাছে মর্যাদাশীল করে তোলে।

আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো নিজের অপরাধ ও ত্রুটির অনুভূতি। বান্দা আল্লাহর হক্ব আদায় এবং তাঁর নির্দেশ পালন করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাধনা ও চেষ্টা করার পরও নিজেকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করবে। কারণ তার উপর তার প্রতিপালকের হক্ব তার সাধ্যের তুলনায় অনেক বেশি।

বিশেষ করে, আল্লাহ তার উপর যে অসংখ্য নেয়ামত বর্ষণ করেছেন, সেগুলো যখন সে স্মরণ করে, তখন উপলব্ধি করে যে, আল্লাহর প্রতি তার যে আনুগত্য ও দাসত্ব প্রকাশ করা উচিত, তার তুলনায় সে যা আদায় করছে, তা অত্যন্ত নগণ্য।

হে মুমিনগণ! যখন একজন মুমিনের সামনে আল্লাহর কোনো হক্ব কিংবা তাঁর বান্দাদের কোনো হক্ব আদায় করার সুযোগ আসে, তখন লজ্জাশীলতা তার অন্তরে জাগ্রত থাকে এবং তার উপর অর্পিত হক্ব আদায়ের জন্য উৎসাহিত করতে থাকে। আবার যখন কোনো ধ্বংসাত্মক কামনার বিষয় তার সামনে উপস্থিত হয়, যে বিষয়ে তার নফস তাকে আহ্বান করে, তখনও সেই লজ্জাশীলতা তাকে ছেড়ে যায় না। ফলে সে সেই কামনা থেকে নিজেকে বিরত রাখে এবং লজ্জাশীলতা তার ও সেই পাপের মধ্যে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে সে তার কামনার অতল গহ্বরে পতিত হওয়া থেকে এবং তার পাপের নিম্নতম স্তরে অধঃপতিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করে।

হে ঈমানদার ভ্রাতৃমণ্ডলী! লজ্জাশীলতা কখনও মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য হিসেবে তার মধ্যে জন্মগতভাবে বিদ্যমান থাকে। এটি তখন বান্দার প্রতি আল্লাহর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার কখনও নিজের নফসের সঙ্গে সাধনা করে এবং তাকে লজ্জাশীলতার অভ্যাস করানোর মাধ্যমে লজ্জাশীলতা অর্জিত হয়, যা একপর্যায়ে তার স্বভাবে পরিণত হয়। তখন তার নফস সকল মন্দ ও অশোভন বিষয় পরিত্যাগ করে উত্তম গুণ ও নেক কাজের দিকে অগ্রসর হয়।

লজ্জাশীলতা যখন কোনো মানুষের অন্তরে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সে মানুষের সামনে কিংবা তাদের অনুপস্থিতিতে নিজের দেহকে শালীনতার পোশাকে সজ্জিত করে এবং নিজের সতর আবৃত রাখে। কারণ সে মানুষের প্রতি লজ্জা করার আগে আল্লাহর কাছে লজ্জাবোধ করে। মুআবিয়া আল-কুশাইরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের লজ্জাস্থানের কতটুকু ঢেকে রাখব, আর কতটুকু খোলা রাখব? তিনি বলেন, ‘তোমার লজ্জাস্থান আপন স্ত্রী ও ক্রীতদাসী ছাড়া অন্যদের থেকে হেফাযত করবে’। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার অভিমত কী, লোকেরা যদি একত্রে বসবাস করে? তিনি বলেন, ‘যদি তুমি তা কাউকে না দেখিয়ে পার, তবে অবশ্যই তা দেখাবে না’। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ যদি নির্জন থাকে? তিনি বলেন, ‘আল্লাহ অধিক অগ্রগণ্য যে, মানুষের চেয়ে তাঁর প্রতি বেশি লজ্জাশীল হতে হবে’।[5]

أقولُ قولي هذا، وأستغفرُ اللَّهَ العظيمَ الجليلَ لي ولكم.

দ্বিতীয়খুৎবা

সমস্ত প্রশংসা পরম স্নেহশীল ও অতি দয়ালু মহান আল্লাহর জন্য, যিনি অফুরন্ত দাতা ও অনুগ্রহকারী। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, যাঁর সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত’ (আল-ক্বলম, ৬৮/৪)।

অতঃপর, লজ্জাশীলতা নবী-রাসূল, আল্লাহর নেককার বান্দা এবং আল্লাহভীরু বান্দাদের অন্যতম মহান চরিত্র। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই এসব বিষয় নবীকে কষ্ট দিত, কিন্তু তিনি তোমাদের ব্যাপারে লজ্জাবোধ করতেন’ (আল-আহযাব, ৩৩/৫৩)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মূসা আলাইহিস সালাম অত্যন্ত লজ্জাশীল ছিলেন, তিনি সবসময় শরীর ঢেকে রাখতেন। তার দেহের কোনো অংশ খোলা দেখা যেত না, তা থেকে তিনি লজ্জাবোধ করতেন। এ কারণে বনী ইসরাঈলের কিছু লোক তাকে খুব কষ্ট দিত’।[6] আবূ সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, পর্দার ভেতরে কুমারীদের চেয়েও নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি লাজুক ছিলেন। যখন তিনি তার কাছে অপছন্দনীয় কিছু দেখতেন, তখন আমরা তার চেহারাতেই এর আভাস পেয়ে যেতাম।[7] অতঃপর মহান আল্লাহ শুআইব আলাইহিস সালাম-এর কন্যার প্রশংসা করে বলেন, ‘অতঃপর নারীদ্বয়ের একজন লাজুকভাবে হেঁটে তার কাছে এসে বলল যে, আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন, যেন তিনি আপনাকে পারিশ্রমিক দিতে পারেন, আমাদের পশুগুলোকে আপনি যে পানি পান করিয়েছেন তার বিনিময়ে’ (আল-ক্বাছাছ, ২৮/২৫)।

লজ্জাশীলতা হলো বান্দা ও তার প্রতিপালকের অবাধ্যতার মাঝে একটি শক্তিশালী পর্দা। আর ব্যক্তির লজ্জাশীলতা কমে যাওয়া তার দুর্ভাগ্য, আত্মার মৃত্যু এবং অন্তর মৃতপ্রায় হয়ে যাওয়ার অন্যতম লক্ষণ। কারণ ‘হায়া’ (الحياء) শব্দটি ‘হায়াত’ (الحياة বা জীবন) শব্দ থেকে উদ্ভূত। কাজেই যার মধ্যে লজ্জাশীলতা নেই, তার অন্তর মৃত। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তায়মিয়্যাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, অতঃপর ‘হায়া’ (الحياء) শব্দটি ‘হায়াত’ (الحياة) থেকে উদ্ভূত। কেননা জীবন্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তির মধ্যে এমন লজ্জাশীলতা থাকে, যা তাকে অশ্লীল ও নিকৃষ্ট কাজ থেকে বিরত রাখে। বস্তুত অন্তরের জীবনই মানুষকে সেসব নিকৃষ্ট কাজ থেকে বাধা দেয়, যা অন্তরকে কলুষিত করে।

সুতরাং যার কাছ থেকে লজ্জাশীলতার গুণ ছিনিয়ে নেওয়া হয়, সে যা ইচ্ছা তাই করতে থাকে, সব ধরনের নিকৃষ্ট কাজে লিপ্ত হয় এবং প্রত্যেক অশ্লীলতার পথে পা বাড়ায়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষ পূর্ববর্তী নবীদের উপদেশ থেকে যা লাভ করেছে তার একটি হলো যদি তুমি লজ্জাই না কর, তবে যা ইচ্ছা তাই কর’।[8]

তাই বলা যায়, পাপ ও গুনাহ থেকে বিরত রাখার জন্য লজ্জাশীলতার মতো শক্তিশালী চরিত্রই যথেষ্ট। ইমাম মুজাহিদ ইবনু জাবর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, মুমিনের মধ্যে যদি লজ্জাশীলতা ছাড়া আর কোনো গুণ নাও থাকে, তবুও সেটিই তাকে পাপাচার থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট।


 [1]. ছহীহ বুখারী, হা/৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৫।

 [2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১১৮।

 [3]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪।

 [4]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১১৭।

 [5]. তিরমিযী, হা/২৭৬৯, ২৭৯৪; আবূ দাঊদ, হা/৪০১৭, আলবানী হাদীছটিকে ‘হাসান’ বলেছেন।

 [6]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪০৪; তিরমিযী, হা/৩২২১।

 [7]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪০৪; তিরমিযী, হা/৩২২১।

 [8]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১২০।

Magazine