কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

প্রতারণা বরকত ধ্বংসের কারণ

post title will place here

[২৯ রবীউল আউয়াল, ১৪৪৮ হি. মোতাবেক ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ ড. হুসাইন ইবনু আব্দুল আযীয আলুশ শায়খ  হাফিযাহুল্লাহ। উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ড. আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথম খুৎবা

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি আমানতসমূহ যথাযথভাবে আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং বিশ্বাসঘাতকতা ও যাবতীয় খিয়ানত থেকে নিষেধ করেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মা‘বূদ নেই; তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর প্রতিপালক। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে নবী-রাসূলদের রিসালাতের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন এবং তাঁকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন।

হে আল্লাহ! আপনি তাঁর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি এবং তাঁর মর্যাদা ও মহত্ত্বের অধিকারী ছাহাবীগণের প্রতি অগণিত দরূদ, সালাম ও বরকত বর্ষণ করুন।

অতঃপর, হে মুসলিমগণ! আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করে চলুন। কেননা যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে চলে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে উত্তরণের পথ করে দেন এবং সংকটের পর তার জন্য স্বস্তি এনে দেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক্ব দিবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না’ (আত-তালাক, ৬৫/২–৩)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য তার কাজকে সহজ করে দেন’ (আত-তালাক, ৬৫/৪)।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! ইসলামের অকাট্য মূলনীতিগুলোর অন্যতম হলো মুসলিমদের সকল ক্ষেত্রে কল্যাণকামিতা অবলম্বন করা, সকল আচরণে সত্যবাদিতা বজায় রাখা এবং সকল প্রকার লেনদেনে আমানতদারি রক্ষা করে চলা। এই মূলনীতিগুলোর ভিত্তিতেই ইসলামী শরীআত যাবতীয় প্রতারণাকে হারাম করেছে। বিশেষত মানুষের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া সেসব নিন্দনীয় প্রতারণাকে হারাম করা হয়েছে, যা তাদের খাদ্য, পানীয়, পোশাক ও যানবাহনের ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতি করছে। এসব প্রতারণার ধরন এত বেশি যে, তার সবগুলো এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। আর এর ক্ষতি ও দুর্ভোগও এত ব্যাপক যে, তা হিসাব করে শেষ করা সম্ভব নয়। নিঃসন্দেহে এ ধরনের প্রতারণা বড় ধরনের খিয়ানত, গুরুতর অপরাধ এবং পৃথিবীতে ব্যাপক অনাচার সৃষ্টির অন্যতম কারণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের খিয়ানত করো না। আর খিয়ানত করো না নিজেদের আমানতসমূহের, অথচ তোমরা জানো’ (আল-আনফাল, ৮/২৭)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর যমীনে শান্তি স্থাপনের পর তোমরা সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৫৬)।

জীবনের বিভিন্ন ধাপে সংঘটিত নানা রূপ ও ধরনের প্রতারণাগুলো মহাপাপ ও মারাত্মক অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[1]

এভাবে যে কোনো পণ্যে প্রতারণা, ধোঁকা ও কারসাজি করে তার বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করাও অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভক্ষণ করার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব, তোমরা পরিমাপ ও ওযন পূর্ণ করে দাও এবং মানুষের প্রাপ্য বস্তুতে কোনো কমতি করো না’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৮৫)। অন্যত্র মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরস্পরের মধ্যে অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভক্ষণ করো না’ (আন-নিসা, ৪/২৯)।

ব্যবসায়িক লেনদেন হোক কিংবা অন্য কোনো ক্ষেত্রে হোক প্রতারণার মাধ্যমে কারও অধিকার হরণ করা মূলত মানুষের প্রাপ্য কমিয়ে দেওয়া এবং এমন যুলম করা, যা পরম সত্যের অধিপতি মহান আল্লাহ কখনোই পছন্দ করেন না।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়’ (আল-মুতাফফিফীন, ৮৩/১)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহ যাকে কোনো জনগণের দায়িত্বশীল করেছেন; অথচ সে নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের কল্যাণ সাধন করেনি, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না’।[2]

যার হাতে মুসলিমদের কোনো কল্যাণমূলক কাজের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে, সে মূলত তাদের ব্যাপারে আল্লাহর পক্ষ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন আমানতদার। এ ব্যাপারে জারীর ইবনু আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, তিনি যখন কোনো পণ্য বিক্রির জন্য উপস্থাপন করতেন, তখন তার ত্রুটিগুলো ক্রেতার কাছে স্পষ্ট করে তুলে ধরতেন। এরপর ক্রেতাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিয়ে বলতেন, আপনি চাইলে এটি গ্রহণ করুন, আর চাইলে ছেড়ে দিন। তখন তাকে বলা হলো, আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন! আপনি যদি এভাবে করেন, তাহলে তো আপনার কোনো পণ্যই বিক্রি হবে না! তিনি বললেন, আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, আমরা মুসলিমদের কল্যাণকামী ও হিতাকাঙ্ক্ষী হব।[3]

আজকাল নানা ধরনের প্রতারণা শুধু মানুষের অর্থ-সম্পদ আত্মসাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এ ধরনের প্রতারণার ফলে মানুষের স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং তারা দুরারোগ্য ব্যাধি ও প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর ফলে মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আর যারা এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত, তারা একই সঙ্গে একাধিক অপরাধ, নানা ধরনের গুনাহ এবং জঘন্য কর্মকাণ্ডের দায় বহন করে। ফলে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই তাদের এসব অপকর্মের শাস্তি ভোগ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যার কথা দুনিয়ার জীবনে তোমাকে অবাক করে এবং সে তার অন্তরে যা রয়েছে, তার উপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখে। আর সে কঠিন ঝগড়াকারী। আর যখন সে ফিরে যায়, তখন যমীনে প্রচেষ্টা চালায় তাতে ফাসাদ করতে এবং শস্য ও প্রাণী ধ্বংস করতে। আর আল্লাহ ফাসাদ ভালোবাসেন না’ (আল-বাক্বারা, ২/২০৪–২০৫)। এই আয়াতের মর্মার্থ এ ধরনের প্রতারকদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যথার্থভাবে মিলে যায়। আল্লাহ আমাদেরকে এ ধরনের গুনাহ ও অনিষ্ট থেকে হেফাযত করুন- আমীন!

অতএব, হে মুসলিম ভাই! আল্লাহকে ভয় করুন এবং সব ধরনের প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি থেকে বেঁচে থাকুন। কেননা প্রতারণার পরিণতি দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনেই আপনার জন্য ভয়াবহ হবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের কাছে এমন কোনো পণ্য বিক্রি করা বৈধ নয়, যাতে কোনো ত্রুটি রয়েছে; তবে সে যদি তা ক্রেতাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, তাহলে ভিন্ন কথা’।[4]

হে বিশ্বজগতের প্রতিপালক! আমাদেরকে সব ধরনের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে দূরে রাখুন- আমীন!

হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাদেরকে হারাম থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিন এবং আপনার অনুগ্রহে আপনি ব্যতীত অন্য সবার থেকে আমাদেরকে অমুখাপেক্ষী করে দিন।

اللهمَّ صلِّ وسلِّمْ على نبينا محمدٍ.

দ্বিতীয় খুৎবা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য—এমন প্রশংসা, যা কখনো নিঃশেষ হবে না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই; তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনিই তাঁর সকল বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! তাঁর প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজনের প্রতি এবং তাওহীদকে সর্বাধিক পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নকারী ছাহাবীগণের প্রতি দরূদ, সালাম ও বরকত বর্ষণ করুন।

অতঃপর, হে মুসলিমগণ! একজন মুসলিমের বৈশিষ্ট্য হলো সে উত্তম চরিত্রের অধিকারী হবে, আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করে চলবে এবং সব ধরনের প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে দূরে থাকবে। আর সে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবে। এর মাধ্যমেই সে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা ও কল্যাণ লাভ করবে।

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ক্রেতা-বিক্রেতা (একে অপরের সাথে) বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের উভয়ের ইখতিয়ার থাকবে। যদি তারা উভয়ে সত্য কথা বলে এবং (পণ্যের দোষ-ত্রুটি) যথাযথ বর্ণনা করে, তবে তাদের কেনাবেচায় বরকত হবে; আর যদি তারা মিথ্যা বলে ও (ত্রুটি) গোপন করে, তবে তাদের কেনাবেচার বরকত নষ্ট হয়ে যাবে’।[5]

অতএব, হে মুসলিম ভাই! আপনি মহান আল্লাহর ব্যাপারে সত্যবাদী হোন এবং তাঁর সৃষ্টির সঙ্গেও সত্যবাদিতা অবলম্বন করুন। তাহলে তিনি আপনার জন্য প্রত্যেক সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন এবং আপনাকে এমন উৎস থেকে রিযিক্ব দান করবেন, যার কথা আপনি কল্পনাও করতে পারেননি।

হে আল্লাহ! সকল মুসলিম নর ও নারীদের ক্ষমা করুন। আমাদেরকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা কথা ও কাজে সত্যবাদী, আমানত যথাযথভাবে আদায়কারী এবং প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা থেকে সদা দূরে থাকে। হে মহামহিম রব! আমাদেরকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন। আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন এবং আমাদেরকেও আপনার ফয়সালা ও দানে সন্তুষ্ট রাখুন। হে মহাশক্তিধর প্রতিপালক! আপনি মুসলিমদের ঐক্যকে নেকী ও তাক্বওয়ার উপর সুসংহত করে দিন। তাদেরকে নিজেদের অন্তরের অনিষ্ট এবং তাদের মন্দ কাজের পরিণতি থেকে রক্ষা করুন। তাদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য করুন। হে আল্লাহ! সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আপনারই জন্য। আপনার কাছেই আমরা সাহায্য প্রার্থনা করি। আপনার সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।


 [1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০১।

 [2]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৫০।

 [3]. ত্ববারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর, হা/২৫১০। এই হাদীছের অন্তর্গত ‘আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ মর্মে অঙ্গীকার করেছিলাম যে, আমরা মুসলিমদের কল্যাণকামী ও হিতাকাঙ্ক্ষী হব’- অংশটি ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৬)।

 [4]. ইবনু মাজাহ, হা/২২৪৬, হাদীছ ছহীহ।

 [5]. ছহীহ বুখারী, হা/২১১০।

Magazine