কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

সূরা আল-ইনশিরাহর আলোকে সংকট-পরবর্তী মানুষ গঠনের দর্শন (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

post title will place here

কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি: সূরাটির বৈপ্লবিক ঘোষণা

সূরাটির কেন্দ্রীয় ঘোষণা আসে পঞ্চম ও ষষ্ঠ আয়াতে, আল্লাহ বলেন, ‘অতএব, নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি রয়েছে’ (আল-ইনশিরাহ, ৯৪/৫-৬)।

এখানে শব্দচয়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বলা হয়নি, কষ্টের অনেক পরে স্বস্তি আসবে; বলা হয়েছে, কষ্টের ‘সঙ্গে’ স্বস্তি রয়েছে। অর্থাৎ কষ্ট ও স্বস্তির সম্পর্ক সবসময় সরল সময়রেখার মতো নয়—প্রথমে শুধু কষ্ট, তারপর কষ্ট সম্পূর্ণ চলে গেলে স্বস্তি। বরং একটি কঠিন সময়ের ভেতরেও আল্লাহ স্বস্তির বিভিন্ন উপাদান উপস্থিত রাখতে পারেন।

কোনো বিপদ হয়তো মানুষকে তার আপনজনদের প্রকৃত ভালোবাসা চিনিয়ে দেয়। কোনো ব্যর্থতা তাকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনে। কোনো বিচ্ছেদ তাকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ দেয়। কোনো আর্থিক সংকট তাকে সংযম, পরিকল্পনা ও কৃতজ্ঞতা শেখায়। কোনো দীর্ঘ অপেক্ষা তার চরিত্রে ধৈর্য সৃষ্টি করে। আবার কখনও কষ্টের ভেতরে স্বস্তি আসে একটি দু‘আ, একটি উপলব্ধি, একজন সহানুভূতিশীল মানুষ কিংবা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি বিকল্প পথের মাধ্যমে।

এর মানে এই নয় যে, প্রতিটি বিপদের কল্যাণ আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারব। কষ্টকে রোমান্টিক করাও এই আয়াতের উদ্দেশ্য নয়। যুলম যুলমই, ক্ষতি ক্ষতিই, শোক শোকই। ইসলাম মানুষকে কৃত্রিম হাসি দিয়ে ব্যথা অস্বীকার করতে বলে না। বরং কুরআনের আশ্বাস হলো কষ্ট যত বাস্তবই হোক, সেটিই সামগ্রিক বাস্তবতা নয়। তার সঙ্গে আল্লাহর রহমত, সাহায্য, শিক্ষা ও সম্ভাবনার দরজাও উপস্থিত রয়েছে, যদিও মানুষ তা প্রথম মুহূর্তে দেখতে নাও পারে।

একই ঘোষণা পরপর দুবার আসা আশ্বাসটিকে হৃদয়ে গভীরভাবে স্থাপন করে। হতাশা মানুষকে একই নেতিবাচক কথা বারবার শোনায়, ‘আর কোনো পথ নেই’, ‘সব শেষ’, ‘তুমি পারবে না’। কুরআনও তার বিপরীতে আশার সত্যটি পুনরাবৃত্তি করে, কষ্টের সঙ্গে স্বস্তি আছে, অবশ্যই আছে।

আরবী ভাষার একটি সূক্ষ্ম দিকও এখানে লক্ষণীয়। দুই আয়াতেই ‘কষ্ট’ নির্দিষ্ট রূপে এসেছে, আর ‘স্বস্তি’ এসেছে অনির্দিষ্ট রূপে। বহু মুফাসসির এর মধ্যে এই আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত দেখেছেন যে, একই কষ্টের সঙ্গে আল্লাহ একাধিক স্বস্তির পথ সৃষ্টি করতে পারেন। এখান থেকে জনপ্রিয়ভাবে বলা হয়, একটি কষ্ট দুটি স্বস্তিকে পরাজিত করতে পারে না। তবে এই বক্তব্যকে কোনো যান্ত্রিক বা গাণিতিক সূত্র না বানিয়ে কুরআনের শক্তিশালী আশ্বাস হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত।

কখনও স্বস্তি আসে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার মাধ্যমে। ঋণ পরিশোধ হয়, অসুস্থতা সেরে যায়, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়, বিরোধ মিটে যায়। আবার কখনও পরিস্থিতি পুরোপুরি না বদলালেও মানুষ বদলে যায়। সে আগের চেয়ে বেশি ধৈর্যশীল হয়, অগ্রাধিকারের জ্ঞান লাভ করে, মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করতে শেখে। এই অন্তর্গত পরিবর্তনও স্বস্তির একটি গভীর রূপ।

মানুষ সাধারণত স্বস্তিকে শুধু নিজের কাঙ্ক্ষিত ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে। সে ভাবে, ‘আমি যা চাই, ঠিক সেভাবে ঘটলেই স্বস্তি’। কিন্তু আল্লাহর রহমত অনেক সময় প্রত্যাশিত দরজা দিয়ে আসে না। যে সুযোগটি আমরা চেয়েছিলাম সেটির দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু সেই বন্ধ দরজাই আমাদের ভিন্ন আরও নিরাপদ বা কল্যাণকর পথে নিয়ে যায়। যে সম্পর্কটি ধরে রাখতে চেয়েছিলাম তা শেষ হয়, কিন্তু সেই বিচ্ছেদ আমাদের আত্মসম্মান ও আধ্যাত্মিক সুস্থতা ফিরিয়ে দেয়। যে পরিকল্পনাটি ব্যর্থ মনে হয়েছিল, সেটিই ভবিষ্যতে বড় বিপদ থেকে রক্ষার মাধ্যম হয়ে ওঠে।

মুমিন তাই কষ্টের সময় শুধু মুক্তির অপেক্ষা করে না, সে কষ্টের ভেতরে থাকা স্বস্তির চিহ্নগুলোও খোঁজে। সে প্রশ্ন করে, এই পরীক্ষায় আল্লাহ আমাকে কী শেখাচ্ছেন? কোন অপ্রয়োজনীয় আসক্তি থেকে আমাকে মুক্ত করছেন? কোন মানুষগুলোর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করছেন? আমার ভেতরে কোন শক্তি সৃষ্টি হচ্ছে? কোন নতুন দরজা দেখার জন্য পুরোনো দরজাটি বন্ধ হয়েছে?

এই প্রশ্নগুলো কষ্টকে সঙ্গে সঙ্গে দূর করে না, কিন্তু কষ্টের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বদলে দেয়। আর অনেক সময় এই বদলে যাওয়া সম্পর্কই ভেঙে পড়া ও বিকশিত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে।

অবসর নয়, অর্থপূর্ণ স্থানান্তর

স্বস্তির সুসংবাদ দেওয়ার পর আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যখন আপনি অবসর পান, তখন পরিশ্রমে আত্মনিয়োগ করুন’ (আল-ইনশিরাহ, ৯৪/৭)।

এই আয়াত সূরাটিকে শুধু সান্ত্বনার বার্তায় সীমাবদ্ধ থাকতে দেয়নি। আশ্বাসের পর এসেছে কাজের নির্দেশ। অর্থাৎ কুরআনিক আশা নিষ্ক্রিয় অপেক্ষার নাম নয়। এটি মানুষকে শক্তি সঞ্চয় করে অর্থপূর্ণ কাজে ফিরে যেতে শেখায়।

‘যখন অবসর পান’ অর্থাৎ একটি দায়িত্ব শেষ হলে জীবনের উদ্দেশ্য শেষ হয়ে যায় না। এক ধরনের কাজ থেকে অবসর পেলে অন্য কল্যাণকর কাজে মনোযোগ দিতে হবে। দৈনন্দিন দায়িত্ব শেষ হলে ইবাদতে, ফরয কাজের পর নফল কল্যাণে, ব্যক্তিগত প্রয়োজন পূরণের পর পরিবার ও সমাজের সেবায় মানুষকে অর্থপূর্ণভাবে অগ্রসর হতে হবে।

কষ্টের সময় যেমন মানুষ ভেঙে পড়তে পারে, তেমনি সাফল্যের পরও সে বিপদে পড়তে পারে। দীর্ঘদিনের একটি লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর অনেকেই শূন্যতায় আক্রান্ত হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, চাকরি পাওয়া, কোনো বড় প্রকল্প শেষ করা বা একটি সংকট কাটিয়ে ওঠার পর সে বুঝতে পারে না, এখন কী করবে। যেমন- ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পর অনেকেই পড়ার কিছু খুঁজে পায় না। কারণ তার সমগ্র পরিচয় একটি লক্ষ্যকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল।

সূরা আল-ইনশিরাহ শেখায়, মুমিনের জীবন কোনো একটি অর্জনে থেমে যায় না। একটি কাজের সমাপ্তি অন্য অর্থপূর্ণ কাজের সূচনা করে। পার্থিব দায়িত্বের পর আধ্যাত্মিক দায়িত্ব, ব্যক্তিগত উন্নতির পর সামাজিক অবদান, জ্ঞান অর্জনের পর জ্ঞান বিতরণ—জীবনের এক ক্ষেত্র থেকে অন্য ক্ষেত্রে কল্যাণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

তবে ‘পরিশ্রমে আত্মনিয়োগ’ করার অর্থ নিজেকে বিশ্রামহীন যন্ত্রে পরিণত করা নয়। ইসলাম শরীর, মন ও পরিবারের অধিকারের কথা বলে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা অনুযায়ী শরীরেরও মানুষের উপর অধিকার রয়েছে। অতএব, প্রয়োজনীয় বিশ্রামও দায়িত্বপূর্ণ জীবনের একটি অংশ। পার্থক্য হলো বিশ্রাম ও উদ্দেশ্যহীনতার মধ্যে। বিশ্রাম মানুষকে নতুন কাজের জন্য প্রস্তুত করে, আর উদ্দেশ্যহীনতা তার শক্তি ও সময়কে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে।

আধুনিক জীবনে মানুষ একদিকে অতিরিক্ত কর্মচাপে ক্লান্ত, অন্যদিকে অবসর পেলেই অর্থহীন বিনোদনের দীর্ঘ স্রোতে হারিয়ে যায়। কয়েক মিনিটের বিরতি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অমনোযোগী পর্দা-নির্ভরতায় পরিণত হয়। এতে শরীর স্থির থাকলেও মন প্রকৃত বিশ্রাম পায় না। সূরা আল-ইনশিরাহর শিক্ষা হলো অবসরকে শূন্যতায় পরিণত না করে নবায়নের সুযোগে রূপান্তর করা।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কাজ কষ্ট থেকে পালানোর উপায় হওয়া উচিত নয়। অনেক মানুষ নিজের অমীমাংসিত ব্যথা ভুলে থাকার জন্য অতিরিক্ত কাজে ডুবে যায়। বাইরে থেকে তাকে কর্মঠ মনে হলেও ভেতরে সে নিজের কষ্টের মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলছে। কুরআনিক কর্মশৃঙ্খলা হলো সচেতন কর্ম—যেখানে মানুষ নিজের ক্ষতকে স্বীকার করে, আল্লাহর সাহায্যে তা সামলায় এবং তারপর অর্থপূর্ণ দায়িত্বে আত্মনিয়োগ করে।

সুতরাং সংকটের পর সুস্থ হয়ে ওঠার একটি লক্ষণ হলো মানুষ আবার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারছে। সে শুধু অতীতের কষ্ট নিয়ে কথা বলছে না, বরং কষ্ট থেকে অর্জিত প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে নিজের ও অন্যের কল্যাণে এগিয়ে যাচ্ছে। যে ব্যক্তি নিজে অন্ধকার পার হয়ে অন্যের জন্য আলো বহন করে, তার সংকট তখন শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি থাকে না; বরং তা সামাজিক কল্যাণের উৎসে পরিণত হয়।

সকল আকাঙ্ক্ষার শেষ ঠিকানা

সূরার শেষ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর আপনার প্রতিপালকের প্রতিই আকৃষ্ট হোন’ (আল-ইনশিরাহ, ৯৪/৮)।

আধুনিক প্রেষণামূলক দর্শন প্রায়ই বলে, নিজেকে বিশ্বাস করো। কুরআনও মানুষকে তার সামর্থ্য কাজে লাগাতে উদ্বুদ্ধ করে, কিন্তু শেষ ভরসার জায়গা হিসেবে নিজেকে দাঁড় করায় না। কারণ মানুষ নিজেই একদিন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন ‘নিজেকে বিশ্বাস করো’ কথাটিও আর তাকে ধরে রাখতে পারে না। কুরআনের শিক্ষা তাই আরও গভীর অর্থাৎ কাজ করো, কিন্তু হৃদয় রেখো রবের কাছে। কারণ সেই আশ্রয়ই একমাত্র স্থায়ী আশ্রয়, যা কখনও সরে যায় না।

এই আয়াত পুরো সূরার গন্তব্য নির্ধারণ করে দেয়। হৃদয় প্রশস্ত হলো, বোঝা হালকা হলো, মর্যাদা সমুন্নত হলো, কষ্টের সঙ্গে স্বস্তির আশ্বাস পাওয়া গেল এবং নতুন কাজে আত্মনিয়োগের নির্দেশ এলো; কিন্তু এসবের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী? উত্তর হলো রবের দিকে ফিরে যাওয়া।

মানুষ কাজ করবে, পরিকল্পনা করবে, চিকিৎসা নেবে, সহযোগিতা চাইবে, সম্পর্ক নির্মাণ করবে এবং উন্নতির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। কিন্তু তার হৃদয়ের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা কোনো মানুষ, প্রতিষ্ঠান বা পার্থিব ফলাফলের উপর নির্ভর করবে না। কারণ সৃষ্টি সীমাবদ্ধ, আর একমাত্র স্রষ্টাই অসীম।

আমাদের অনেক কষ্টের কারণ শুধু কোনো জিনিস না পাওয়া নয়; বরং সেই জিনিসটিকে হৃদয়ের চূড়ান্ত আশ্রয় বানিয়ে ফেলা। আমরা কখনও কোনো মানুষকে এমন জায়গায় বসাই, যেখানে শুধু আল্লাহর থাকার কথা। মনে করি, সে থাকলেই আমি নিরাপদ, সে প্রশংসা করলেই আমি মূল্যবান, সে চলে গেলে আমার জীবনের আর অর্থ নেই। কখনও চাকরি, সম্পদ, পদমর্যাদা বা সামাজিক পরিচয়কে এমনভাবে আঁকড়ে ধরি যে, সেগুলোর ক্ষতি আমাদের অস্তিত্বের ক্ষতি বলে মনে হয়।

শেষ আয়াত এই নির্ভরতার কেন্দ্র সংশোধন করে। মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু উপাসনাসুলভ নির্ভরতা নয়। জীবিকার জন্য প্রচেষ্টা থাকবে, কিন্তু রিযিকের প্রকৃত মালিককে ভুলে যাওয়া নয়। সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা থাকবে, কিন্তু সাফল্যকে আত্মমূল্যের একমাত্র মানদণ্ড বানানো নয়।

‘রবের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া’ শুধু মুখে দু‘আ করার বিষয় নয়। এর অর্থ সিদ্ধান্তে তাঁর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া, সংকটে তাঁর কাছে ফিরে যাওয়া, সাফল্যে তাঁর শুকরিয়া আদায় করা এবং কাজের পরিণাম তাঁর হাতে সমর্পণ করা। মানুষ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, কিন্তু ফলাফলের দাস হবে না। কারণ কর্ম মানুষের দায়িত্ব, আর ফলাফলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে।

এই আল্লাহমুখিতা মানুষকে অদ্ভুত এক স্বাধীনতা দেয়। তখন সে মানুষের প্রশংসা পেলে কৃতজ্ঞ হয়, কিন্তু অহংকারী হয় না; সমালোচিত হলে আত্মসমালোচনা করে, কিন্তু সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে না; সফল হলে কাজ চালিয়ে যায়, কিন্তু ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করে। কারণ তার যাত্রা কোনো একটি পার্থিব ফলাফলে শেষ নয়, তার যাত্রা একমাত্র আল্লাহর দিকে।

সূরা আল-ইনশিরাহর মানুষ গঠনের ধারাবাহিকতা

সূরাটির আয়াতগুলো গভীরভাবে লক্ষ করলে একটি ধারাবাহিক নির্মাণপ্রক্রিয়া দেখা যায়।

প্রথমে আল্লাহ অন্তরকে প্রশস্ত করেন, কারণ সংকীর্ণ অন্তর বড় দায়িত্ব বহন করতে পারে না। এরপর বোঝা হালকা করেন, কারণ অতীতের ভারে ন্যুব্জ মানুষ সামনে এগোতে পারে না। তারপর মর্যাদার প্রকৃত উৎস চিনিয়ে দেন, যাতে মানুষ সামাজিক স্বীকৃতির দাস না হয়। এরপর কষ্টের সঙ্গে স্বস্তির নিশ্চয়তা দেন, যাতে হতাশা তার ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে না পারে। তারপর কাজে আত্মনিয়োগের নির্দেশ দেন, যাতে আশা অলসতায় পরিণত না হয়। সবশেষে আল্লাহর প্রতি আকাঙ্ক্ষা নিবদ্ধ করেন, যাতে কাজ, সাফল্য ও স্বস্তি নতুন কোনো অহংকার বা আসক্তির জন্ম না দেয়।

এই ধারাবাহিকতা আজকের মানুষের পুনর্গঠনের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমরা প্রায়ই শুধু দ্রুত স্বস্তি চাই, কিন্তু স্বস্তি ধারণ করার মতো হৃদয় নির্মাণ করতে চাই না। বোঝা নামাতে চাই, কিন্তু ভুল অভ্যাস ও অসুস্থ নির্ভরতাগুলো ছাড়তে চাই না। মর্যাদা চাই, কিন্তু চরিত্র গঠন করতে চাই না। সাফল্য চাই; কিন্তু সাফল্যের পর কীভাবে আল্লাহর প্রতি বিনয়ী থাকতে হয়, তা শিক্ষা গ্রহণ করি না।

সূরা আল-ইনশিরাহ আমাদের জানায়, প্রকৃত পুনর্গঠন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি অন্তর, চিন্তা, কর্ম ও আকাঙ্ক্ষার সমন্বিত পরিবর্তন।

উপসংহার: কষ্টমুক্ত নয়, কষ্টজয়ী মানুষ চাই

সূরা আল-ইনশিরাহ এমন কোনো জীবনের প্রতিশ্রুতি দেয় না, যেখানে আর কখনও দুঃখ, চাপ বা অনিশ্চয়তা আসবে না। বরং এটি এমন মানুষ গড়ে তোলে, যে কষ্টের মধ্যেও নিজের রবকে হারায় না; যে বোঝা অনুভব করার পরেও জানে, বোঝা নামানোর মালিক আছেন; যে মানুষের অবজ্ঞায় নিজের মূল্য ভুলে যায় না; যে অন্ধকারের মধ্যেও স্বস্তির সম্ভাবনা খোঁজে এবং যে একটি অধ্যায় শেষ হলে অর্থপূর্ণ নতুন অধ্যায় শুরু করে।

এই সূরার শিক্ষা তাই শুধু ‘আশা রাখো’ নয়। এর আহ্বান আরও বিস্তৃত—হৃদয়কে প্রশস্ত করো, অদৃশ্য বোঝাকে স্বীকার করো, আল্লাহর সাহায্যের সামনে নিজেকে সমর্পণ করো, মর্যাদার জন্য মানুষের দরজায় বন্দি থেকো না, কষ্টের ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বস্তিকে চিনতে শেখো, এক কাজ শেষে আরেক কল্যাণকর কাজে এগিয়ে যাও এবং সব আকাঙ্ক্ষার শেষ ঠিকানা বানাও একমাত্র আল্লাহকে।

জীবনের কঠিন সময়ে আমরা প্রায়ই জানতে চাই, ‘এই কষ্ট কখন শেষ হবে?’ সূরা আল-ইনশিরাহ আমাদের আরও গভীর একটি প্রশ্ন করতে শেখায়, ‘এই কষ্টের মধ্য দিয়ে আল্লাহ আমাকে কেমন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছেন?’

সম্ভবত সব সংকটের উত্তর তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। সব ক্ষতের কারণও মানুষের কাছে স্পষ্ট হয় না। কিন্তু মুমিনের নিশ্চিত বিশ্বাস থাকে যে, কষ্ট একা আসে না। তার সঙ্গে আল্লাহর রহমত থাকে, শিক্ষার দরজা থাকে, নতুন শক্তির সম্ভাবনা থাকে এবং থাকে রবের দিকে আরও গভীরভাবে ফিরে যাওয়ার আহ্বান।

অতএব, সূরা আল-ইনশিরাহ কষ্টমুক্ত জীবনের মানচিত্র নয়, বরং এটি কষ্টের মধ্য দিয়ে প্রশস্ত হৃদয়ের মানুষ হয়ে ওঠার মানচিত্র। যে মানুষ ভেঙে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে বিনয় শেখে, বোঝা থেকে নির্ভরতা শেখে, অপেক্ষা থেকে ধৈর্য শেখে এবং স্বস্তি লাভ করে কৃতজ্ঞ হতে শেখে।

সূরা আল-ইনশিরাহ তাই শুধু হতাশ মানুষের সান্ত্বনা নয়; এটি সংগ্রামরত মানুষের জন্য একটি জীবনদর্শন। শেষ পর্যন্ত সূরাটি মূলত সেই মানুষটিকেই নির্মাণ করে—যে সংকটে রবকে হারায় না, স্বস্তিতে রবকে ভুলে যায় না এবং জীবনের প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহর হিকমত ও রহমতের উপর আস্থা রাখে।

আব্দুর রহমান বিন আব্দুর রাযযাক 

* ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, ভারত; বিএ (অনার্স), কিং আব্দুল আযীয বিশ্ববিদ্যালয়, জেদ্দা, সঊদী আরব।

Magazine