কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাবীদের অদ্ভুত নামের রহস্য

শায়খ আবূ আব্দুল আযীয মুহাম্মাদ ইউসুফ মাদানী হাফিযাহুল্লাহ আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারস, ভারত ও আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী, বাংলাদেশের স্বনামধন্য মুহাদ্দিছ। হাদীছ ও উছূলে হাদীছের বেশ কিছু কিতাব তার কাছে পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে, আল-হামদুলিল্লাহ। ২০২৫-এ আলিমিয়্যাহ ২য় বর্ষে উস্তাজি আমাদের সুনানে আবূ দাঊদ পড়াতেন। হাদীছ বর্ণনাকারীদের পুরো নাম বলা হাদীছের দারসে তার ব্যতিক্রম একটি বৈশিষ্ট্য। সনদে যখন আসত, হাদ্দাছানা মুসাদ্দাদ; তিনি তখন বলতেন, মুসাদ্দাদ ইবনে মুসারহাদ ইবনে মুসারবাল ইবনে মুগারবাল আল-আসাদী আল-বাছারী। এভাবে একের পর এক রাবীর নাম অনর্গল বলতেন তিনি। মজার কথা হলো, মাঝে মাঝে রাবীদের কিছু অদ্ভুত নাম আসত। আশাজ্জ, আ‘রাজ, আ‘মা, রাহওয়াইহ, হাদ্দাদ, হাযযা‘, আবুল লাহম, বাতীন, গুনদার, বুনদার, মুতাইয়্যান—এরকম। এগুলোর বাংলা অর্থ খুবই বিচিত্র, যেমন- কপাল ফাটা, ল্যাংড়া, অন্ধ, পথজাত, কামার, জুতাওয়ালা, গোশতওয়ালা, ভুঁড়িওয়ালা, চঞ্চল, গুদামজাতকারী, কাদামাখা—এরকম। খুব জানতে ইচ্ছে হতো, এরকম অদ্ভুত অদ্ভুত নাম কেন তাদের! নামগুলোর পিছনের রহস্য কী? উস্তাজিকে জিজ্ঞেস করে মাঝে মাঝে যখন নামকরণের কাহিনী শুনতাম, তখন খুব অবাক লাগত। সেই অবাক লাগা থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধান। রাবীদের অদ্ভুত নামের রহস্য উদ্ঘাটনের অনুসন্ধান। সেগুলোই বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে শেয়ার করব।

গুনদার (চঞ্চল):

গুনদার শব্দটি শুনতে বেশ মজার, তাই না? আমি হাদীছের দারসে ইবারত পড়ার সময় এই শব্দটি একটু হাইলাইট করে পড়ি। আরবী শব্দটির মতো এর বাংলা অর্থটিও বেশ মজার—সুদর্শন, লাবণ্যময় ও সতেজ তারুণ্যের অধিকারী যুবক। এ অর্থে আমরা সাধারণ বাংলায় বলতে পারি চঞ্চল, চটপটে বা দুষ্টু। মূলত এটি হাদীছের একজন রাবীর নাম, তার প্রকৃত নাম হলো মুহাম্মাদ ইবনু জা‘ফর আল-হুজালী। তাহলে তিনি এই আজব নামটি কীভাবে পেলেন?

তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ ইবনু জুরাইজের ছাত্র ছিলেন। আর তিনি ছিলেন পড়াশোনায় অদম্য কৌতূহলী এবং অনুসন্ধিৎসু। শায়খের কাছ থেকে হাদীছের সনদ সূক্ষ্মভাবে বুঝে নেওয়ার জন্য তার তীব্র চঞ্চলতা ও আকুলতা ছিল। হেজাযের ক্লাসমেটদের সাথে তিনি ক্লাসে হাদীছ নিয়ে বেশ গভীর অনুধ্যান ও প্রশ্নোত্তরের কলরবে মেতে উঠতেন। জ্ঞানার্জনে তার এমন একনিষ্ঠ ব্যাকুলতা ও অধ্যবসায় দেখে উস্তায ইবনু জুরাইজ একদিন তাকে বলেছিলেন, ما أنت إلاغندر অর্থাৎ তুমি তো দেখছি একটা গুনদার (চঞ্চল ও চটপটে)। সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় গুনদার। পরবর্তীতে উস্তাযের এই আদরের ডাকটিই হাদীছশাস্ত্রে তার মূল নামের চেয়েও বেশি বিখ্যাত হয়ে যায়।[1]

বুনদার (গুদামজাতকারী):

গুনদারের মতোই আরেকটি নাম হলো বুনদার। আরবী ভাষায় বুনদার বলা হয় সেই ব্যবসায়ীকে, যে পণ্য মজুদ বা গুদামজাত করে রাখে। তাহলে কি এই রাবী ব্যবসায়ী ছিলেন? না, তিনি কোনো ব্যবসায়ী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন তাঁতি। তবে যেভাবে একজন বড় ব্যবসায়ী পুরো এলাকার পণ্য নিজের গুদামে জমা করে রাখেন, ঠিক তেমনই মুহাম্মাদ ইবনে বাশশার ইবনে উছমান ইবনে দাঊদ ইবনে কায়সান তার শহর বাছরার এবং তার আশপাশের প্রায় সব হাদীছ নিজের স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা করে ফেলেছিলেন, তাই তাকে হাদীছের বুনদার (গুদামজাতকারী) বলা হতো। তিনি ছিলেন হাদীছের এক মহা সংগ্রহশালা। কুতুবুস সিত্তাহ’র ছয়জন ‍মুহাদ্দিছের প্রত্যেকেই তার কাছে থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবূ দাঊদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আমি বুনদারের কাছ থেকে প্রায় ৫০ হাজার হাদীছ লিখেছি’। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় নিজ এলাকা থেকে বের হতে পারেননি, অথচ তিনি হাদীছের এক বিশাল ভাণ্ডার! কীভাবে? তার মা ছিলেন অসুস্থ। তিনি হাদীছ অন্বেষণের জন্য দূরদেশে সফর করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অসুস্থ মাকে রেখে যেতে পারেননি। তিনি মায়ের সেবাযত্ন করতে থাকেন। মা মারা যাওয়ার পরই কেবল তিনি ইলমের সফরে বের হয়েছিলেন। মায়ের আনুগত্য ও সেবাযত্নের বরকতেই তিনি হাদীছে ভাণ্ডার (বুনদার) হয়ে উঠেছিলেন।[2]

গুনজার:

গুনদার ও বুনদার-এর মতোই আজব আরেকটি নাম গুনজার। বুখারা অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা থেকে আরবীতে ঢুকে পড়া এই শব্দটি দ্বারা লালচে ভাব বা মহিলাদের একপ্রকার লাল প্রসাধনী বুঝানো হতো। অবাক করা কথা হলো, গুনজার রাবীর নাম; তাও আবার একজন নয়, দুই দুইজন রাবীর নাম! কেন এমন অদ্ভুত নাম হলো? কী তার কারণ?

হাদীছ শাস্ত্রের ইতিহাসে রাবীদের বাহ্যিক সৌন্দর্য ও নান্দনিকতার এক চমৎকার স্মারক এই গুনজার নামটি। তার আসল নাম ঈসাইবনেমূসাআত-তায়মী। বুখারা অঞ্চলের একজন রাবী। গোলাপি গালের অধিকারী ছিলেন তিনি। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তার ফর্সা চেহারার মাঝে দুটি লালচে আভাযুক্ত স্নিগ্ধ গাল দিয়েছিলেন, সেই লালচে আভার কারণেই তিনি উপহার পেয়েছিলেন একটি সুন্দর নাম ‘গুনজার’।

আরেকজন ছিলেন তারই ছাত্র। গুনজারের ছাত্র গুনজার। মুহাম্মাদ ইবনে আবূ বকর ইবনে আহমাদ আল-বুখারী আল-ওয়াররাক। তিনি তার উস্তায গুনজারের (ঈসা ইবনে মূসা) হাদীছগুলো খুব নিষ্ঠার সাথে খুঁজে বেড়াতেন ও লিখে রাখতেন। তরুণ বয়সে তিনি এই কাজে এতটাই নিমগ্ন ছিলেন যে, নিজের নাম ছাপিয়ে তার নাম হয়ে যায় গুনজার। এভাবেই উস্তাযের হাদীছ অনুসন্ধান ও অধ্যবসায়ে অবিরাম মনোযোগের কারণে একজন ছাত্র শিক্ষার উত্তরসূরি হিসেবে পেয়ে যায় উস্তাযের নাম গুনজার (গোলাপি গালের অধিকারী)।[3]

কাদামাখা ছেলে:

আবূ জা‘ফর মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে সুলায়মান আল-হাযরামী। তিনি কূফার এক প্রখ্যাত মুহাদ্দিছ। তিনি লিখেছেন মুসনাদ ও তারীখ। ইমাম দারাকুত্বনীর মতে, তিনি নির্ভরযোগ্যতায় পাহাড়ের মতো শক্ত। তিনি হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছেন পাঁচ শতাধিক শায়খের কাছ থেকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো তার নাম মুতাইয়্যান, যার বাংলা অর্থ কাদামাখা। এমন একজন হাদীছের পণ্ডিতের নাম কাদামাখা! হ্যাঁ। এই নামটি শুধু নাম নয়, বরং এই নামের পিছনের গল্পটি ঘুরিয়ে দিয়েছিল তার জীবনের মোড়। কী ছিল সেই গল্প?

একবার তাকেই জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তার এই নাম সম্পর্কে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘ছোটবেলায় আমি আমারই মতো বাচ্চাদের সাথে খেলাধুলা করতাম। আমি ছিলাম তাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা। আমরা একসাথে পানিতে ডুব-সাঁতার খেলতাম। আমার বন্ধুরা খেলার মাঝে আমার পিঠে কাঁদা মাখিয়ে দিত। একদিন বিখ্যাত মুহাদ্দিছ আবূ নুআইম ফযল ইবনু দুকাইন আমাকে দেখে বললেন, ‘ইয়ামুতাইয়্যান! (হেকাদা মাখা ছেলে!) তুমি ইলমের মজলিসে হাযির হওনা কেন?’ এই কথা শোনার পর আমার বোধোদয় হলো। এরপর আমি হাদীছ অন্বেষণ শুরু করলাম। কিন্তু আমার সেই অনুপ্রেরণাদাতা উস্তায আবূ নুআইমকে আমি পাইনি। ততদিনে তিনি মারা গেছেন।

এভাবেই একজন শিশুর কাঁদা মেখে খেলার দৃশ্য দেখে একজন উস্তাযের স্নেহের পরশে বলা একটি কথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল জীবনের মোড়। ছেলেবেলায় উস্তায আবূ নুআইমের মুখ থেকে আসা সেই ‘মুতাইয়্যান’ (কাদামাখা ছেলে) ডাকটিকেই তিনি স্মৃতি ও প্রেরণা হিসেবে বহন করেছেন সারাটি জীবন।[4]

আতরদানি:

মুশকাদানাহ নামটি কত সুন্দর আর ইউনিক, তাই না? নামটি থেকেই যেন মিশকের সুবাস পাওয়া যাচ্ছে। মূলত নামটি দুইটি শব্দযোগে গঠিত। مُشْك+ دَانَة= مُشكدانَة। مُشْك (মুশক) শব্দটির বাংলা অর্থ কস্তুরী বা উন্নতমানের মৃগনাভি সুগন্ধি। আর دَانَة (দানাহ) শব্দের মানে হলো পাত্র, দানি বা আধার। অর্থাৎ ‘মুশকাদানাহ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হলো কস্তুরীর পাত্র বা সুগন্ধির দানি (Perfume Holder)। অদ্ভুত কথা হলো, এটি একজন রাবীর নাম।

মুশকাদানাহ রাহিমাহুল্লাহ-এর আসল নাম আবূ আব্দুর রহমান আব্দুল্লাহ ইবনু উমার ইবনু মুহাম্মাদ ইবনু আবান আল-কূফী। ইমাম মুসলিম, আবূ দাঊদ ও আবূ যুরআহ রাযী রাহিমাহুমুল্লাহ-সহ অনেক মুহাদ্দিছ তার থেকে সরাসরি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তিনি ছিলেন খুব পরিপাটি ও সুরুচিপূর্ণ। তিনি সবসময় পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত পোশাক পরিধান করতেন এবং নিজেকে সবসময় আতরের সুবাসে সুবাসিত করে রাখতেন। তার শায়খ ছিলেন আবূ নুআইম ফযল ইবনু দুকাইন। শায়খের হাদীছের দারসে বসার আগে তিনি নিজেকে অত্যন্ত পরিপাটি ও সুবাসিত করে তুলতেন। তাই আবূ নুআইম তাকে দারসে আসতে দেখলেই বলতেন, جاء مشكدانة অর্থাৎ ‘ঐযে, মুশকাদানাহ (আতরদানি) এসেছে!’ সেই থেকে তিনি মুশকাদানাহ বা আতরদানি নামটি পরিগ্রহণ করেন।[5]

পথহারা (الضَّال) ও দুর্বল (الضعيف):

একজন ছিলেন পথহারা, আর আরেকজন দুর্বল। অথচ তারা দুজনই ছিলেন হাদীছের নির্ভরযোগ্য রাবী। কী! আশ্চর্য মনে হচ্ছে? একজন যঈফ আবার কীভাবে ছিক্বাহ হয়! একজন পথহারা ব্যক্তি কীভাবে আবার হাদীছের রাবী হয়! চলুন তাহলে জেনে নিই পথহারা ও দুর্বল রাবীর পেছনের গল্প।

ক্লাসে যখন একই নামের দুজন ছাত্র থাকে, তখন তাদের নাম হয়ে যায় অমুক-১, অমুক-২। বাছরার মুহাদ্দিছ মুআবিয়া ইবনু আব্দুল কারীম আছ-ছাক্বাফী রাহিমাহুল্লাহ-এর ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। তবে তার এই অদ্ভুত উপাধির পেছনের ঐতিহাসিক কারণটি ছিল নিতান্তই একটি ভৌগোলিক দুর্ঘটনা! তিনি একবার এক সফরে বের হন। সফরের ধুলোমলিন অলিতেগলিতে চলতে চলতে তিনি মক্কার রাস্তায় পথ হারিয়ে ফেলেন। সেই সফরে তার একজন পথসঙ্গীর নামও ছিল মুআবিয়া। ফলে কেউ যখন ‘মুআবিয়া’ বলে ডাক দিত, তখন অন্যজন সাড়া দিতেন। তাই দুই মুআবিয়ার মাঝে পার্থক্য করতে মানুষজন মক্কায় পথ হারিয়ে ফেলা মুআবিয়াকে বলতে শুরু করলেন, ‘মুআবিয়া আয-যল’ (পথহারা মুআবিয়া)।[6]

আরবী ভাষার অলংকারশাস্ত্রে একটি চমৎকার ব্যবহার আছে, تسمية الشيء بالضّدّ অর্থাৎ ‘কোনো বস্তুকে তার বিপরীত শব্দে অভিহিত করা’। যেমন- চরম অন্ধ ব্যক্তিকে আশার ছলে ‘বাছীর’ (দৃষ্টিমান) বলা। বালাগাতের এই ব্যবহারটাই ব্যবহৃত হয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াহইয়া আত-তারসূসী রাহিমাহুল্লাহ-এর ক্ষেত্রে। ইবনু হিব্বান রাহিমাহুল্লাহ-এর ভাষ্যানুযায়ী, হাদীছ মুখস্থ ও সংরক্ষণে তার দক্ষতা এতটাই নিখুঁত ও প্রখর ছিল যে, অতিরিক্ত মেধার কারণে প্রশংসার রূপক হিসেবে তাকে ‘যঈফ’ (দুর্বল) বলা হতো।[7]

তাকে যঈফ নামকরণের আর একটি মত হলো, তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল ও ক্ষীণকায় ছিলেন। তার এই উপাধি দেওয়া হয়েছিল দৈহিক স্বাস্থ্যের বর্ণনাস্বরূপ। হাদীছ বর্ণনায় বা সনদের ক্ষেত্রে তিনি দুর্বল ছিলেন, বিষয়টি মোটেও এমন না। বরং ইবনু হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ-এর মতে, তিনি ছিলেন ছিক্বাহ।[8]

জুতাওয়ালা:

ছহীহ বুখারীর ক্লাসে একবার এক রাবীর নাম আসে خالد الحذاء(জুতা ওয়ালা খালেদ)। আরবী الحذاء শব্দের অর্থ হলো জুতা। আর জুতা যে তৈরি করে বা সেলাই করে, তাকে বলা হয় الحذاء তথা জুতাপ্রস্ততকারী। রাবীর নামটি পড়েই শায়খ আব্দুল খালেক সালাফী উস্তাযী হাফিযাহুল্লাহ মুচকি হাসি দিয়ে বললেন, ‘তাহলে এই রাবী মুচি ছিলেন নাকি গো?’ এরপর তিনি আমাদের বললেন, ‘তিনি জীবনে কোনোদিন একটি জুতাও তৈরি করেননি। কখনো কোনো জুতা বিক্রিও করেননি। তিনি কেবল বাছরার জুতাবাজারে গিয়ে মুচিদের পাশে বসে থাকতেন বলে মানুষ তাকে الحذاء (জুতাওয়ালা) ডাকা শুরু করে’।

তার পুরো নাম হলো খালেদ ইবনে মেহরান আল-বাছরী। তার মুখস্থশক্তি ছিল বেশ গভীর। জীবনে কখনো তিনি কিছু লিখে রাখেননি। শুধু একটি দীর্ঘ হাদীছ লিখেছিলেন। এরপর সেটি মুখস্থ হয়ে যাওয়ার পর লেখাটি মুছে দিয়েছিলেন।

তার এই অদ্ভুত নামের আরেকটি বৈচিত্র্যময় ব্যাখ্যা আছে। তিনি বনূ মুজাশি‘ গোত্রের এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। আর তার শ্বশুরবাড়ি ছিল মুচিপাড়ায় (হাযযাঈন এলাকায়)। বিয়ের পর তিনি স্ত্রীর সাথে শ্বশুরবাড়ি মুচিপাড়ায় থাকতে শুরু করেছিলেন। সেই এলাকার নামানুসারেই তার নাম হয়ে যায় আল-হাযযা (মুচি)।[9]

বজ্রপাত:

মেঘের ঘনঘটায় অন্ধকার হয়ে আসা আকাশে গুড়মুড়িয়ে এক ঝিলিকে আলোর ঝলকানি হয়ে চমকে ওঠে বিজলি, আর মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে যায় পৃথিবী। তারপর বাতাসে হুড়মুড়িয়ে শুরু হয় বৃষ্টির ঝাপটা। বিজলি তো আকাশেই দেখা যায়। বৃষ্টির আগমুহূর্তে মেঘের আড়াল থেকে বিদ্যুতের চমকের মতো এই যমীনের বুকেও বিচরণ করত এক বিজলি বা বজ্রপাত। হ্যাঁ, তার নামই ছিল ছায়েক্বাহ (صاعقة), বাংলায় যার অর্থ বজ্রপাত বা বিজলি।

মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুর রহীম আল-বাগদাদী, পেশায় তিনি ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী (বাযযায)। কিন্তু হাদীছের জগতে তার পরিচয় কাপড়ের ব্যবসায়ী হিসেবে নয়; বরং আকাশ চিরে ছুটে আসা বজ্রপাতের নামে। কিন্তু কেন তাকে বজ্রপাত (ছায়েক্বাহ) বলা হতো?

কারণ তার স্মৃতিশক্তি ছিল অসাধারণ, ধারণশক্তি ছিল বিস্ময়কর, মুখস্থশক্তি ছিল দুর্দান্ত, মেধাশক্তি ছিল তীব্র ও ক্ষিপ্র, আর স্মরণশক্তি ছিল বজ্রের ঝলকের মতোই তীক্ষ্ণ। হাদীছ সংরক্ষণ ও স্মরণে তার দক্ষতা ছিল এতটাই প্রখর যে, মুহাদ্দিছগণ তাকে বজ্রপাত (ছায়েক্বাহ) নামে অভিহিত করেছিলেন।[10]

অধ্যয়নরত, কুল্লিয়্যাহ ১ম বর্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।


[1]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৭/৫৩৪; ইয়াসীর আল-হামাদানী, হায়াতুত তাবেঈন, পৃ. ১০১৭।

[2]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৯/৫০৮।

[3]. সামআনী, আল-আনসাব, ৯/১৭৭; তাহযীবুল কামাল, ২৩/৩৭।

[4]. সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ১১/২৮; ড. মাহমূদ আত্ব-ত্বহহান, তায়সীরু মুছত্বলাহিল হাদীছ, পৃ. ২২২।

[5]. ইবনু হিব্বান, ছিক্বাত, ৮/৩৫৮; আল-কামাল ফী আসমাইর রিজাল, ৬/২৪২; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৯/১৭৮।

[6]. তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল, ২৮/১৯৯।

[7]. তাহযীবুত তাহযীব, ২/৪২৭।

[8]. তাকরীবুত তাহযীব, ১/৫৪৩।

[9]. সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৬/১৯৬।

[10]. তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল, ৮/২৬।

Magazine