বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট। ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাঈল বনাম ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে বিশ্বজুড়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০-৩০ শতাংশ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেখানে অস্থিরতা তৈরি হওয়া এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়াই এই সংকটের মূল কারণ। বর্তমানে এই সংকট এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (OECD) তথ্যমতে, তীব্র জ্বালানি সংকটের জেরে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার গত বছরের ৩.৪ শতাংশ থেকে কমে ২.৯ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বহু দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক দেশ বাধ্য হয়ে কোটা পদ্ধতি চালু করছে। জ্বালানি সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে প্রতিটি খাতে। সরবরাহ কমার কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে, যার চাপ সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগে। পরিবহন খরচ এবং কৃষি খাতে সেচ ও সারের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো ডলার সংকটের পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির অতিরিক্ত ব্যয়ে তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় হলো নবায়নযোগ্য জ্বালানির (সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ) ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি করা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (IEA) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে জীবাশ্ম জ্বালানি বাদ দিয়ে দ্রুত বিদ্যুতায়ন নিশ্চিত করলে ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বছরে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় বাঁচাতে পারবে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক কূটনীতি জোরদার করে সরবরাহ রুটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নতুন বিকল্প জ্বালানি উৎসে বিনিয়োগ বাড়ানোই পারে বিশ্বকে এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে।
