কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইসলামের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

[প্রখ্যাত হিন্দু দার্শনিক প্রফেসর কে এস রামাকৃষ্ণ রাও-এর ইংরেজি গ্রন্থ Muhammad the Prophet of Islamএর বাংলায় নামকরণ করা হয়েছে ‘ইসলামের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামলেখক এই পুস্তিকাটিতে ইসলামের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনী ও তাঁর সত্যতাকে অতি সংক্ষেপে এবং চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। এ মূল্যবান গ্রন্থটির অন্যান্য জীবন্ত ভাষায় অনুবাদও হয়েছে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে পুস্তিকাটির বঙ্গানুবাদ সম্পন্ন করতে পেরে তাঁর শুকরিয়া আদায় করছি। গ্রন্থটি ঈষৎ পরিমার্জন করে সংক্ষিপ্তাকারে পেশ করা হলো।*

এখানে বলে রাখা দরকার, আবূ জাফর নামের এক দ্বীনী ভাইওপুস্তিকাটির অনুবাদ করেছেন। তবে দুটি কারণে এই অনুবাদটির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। প্রথমত, আবূ জাফর ভাইয়ের বঙ্গানুবাদটি বেশ চমৎকার বটে, কিন্তু ভাষা অনেক উচ্চ মার্গের। ফলে বাংলায় পারদর্শী নন, এমন পাঠকের জন্য পাঠ উদ্ধার করা কঠিন হবে। দ্বিতীয়ত, কিছু কিছু জায়গায় তিনি মূল থেকে দূরে সরে গেছেন। তবে একটি কথা না বললেই নয়, আমি তাঁর অনুবাদকে সামনে রেখে আমার অনুবাদের অনেক সংশোধন করেছি। তাঁর অনুবাদটি না পেলে বইটিতে অনেক ত্রুটি থেকে যেত। আল্লাহ তাঁকে উত্তম বদলা দান করুন- আমীন!]

প্রারম্ভ :

মুসলিম ইতিহাসবিদদের মতে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৫৭১ খ্রিস্টাব্দের ২০শে এপ্রিল আরব ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেন। ‘মুহাম্মাদ’ নামের অর্থ হচ্ছে ‘অতি প্রশংসিত’।

আমার বিবেচনায় তিনি আরবের সমস্ত সন্তানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর আগে ও পরে এই লাল বালির নিবিড় মরুভূমিতে যত কবি ও সম্রাট জন্মগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে তিনিই সর্বাধিক প্রভাব বিস্তারকারী ছিলেন। তাঁর আবির্ভাবকালে আরব দেশ একটি শূন্য মরুভূমি ছিল। কিন্তু এই শূন্যতার মধ্য থেকে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মহৎ

আত্মা গড়ে তোলে এক নতুন জগৎ, গড়ে তোলে এক নতুন জীবন, সংস্কৃতি ও সভ্যতা এবং গড়ে তোলে এমন এক নতুন সাম্রাজ্যের, যা মরক্কো থেকে ইন্ডিজ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয় এবং তিন মহাদেশ- এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের চিন্তাধারা ও জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।

অনুধাবন করা প্রয়োজন :

যখন আমি নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে লেখার ইচ্ছা করলাম, তখন আমি প্রথমে কিছুটা দ্বিধাবোধ করলাম কারণ, এ এমন এক ধর্ম সম্পর্কে লেখা, যে ধর্মের আমি নিজে অনুসারী নই। তাছাড়া এটা খুব নাজুক ও সংবেদনশীল বিষয়কারণ, পৃথিবীতে বহু ধর্মের অনুসারী পাওয়া যায় এবং একই ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন মত ও দল পাওয়া যায়। যদিও কখনো কখনো এটা দাবি করা হয় যে, ধর্ম নিতান্তই একটি ব্যক্তিগত ব্যাপার, তবুও এটা অনস্বীকার্য যে, আমরা লক্ষ করি বা না করি বিশ্বের সকল কিছুর মধ্যে ধর্মের সম্পৃক্ততা রয়েছে। যেভাবেই হোক ধর্ম আমাদের হৃদয়, মন ও আত্মার চেতন-অচেতন ও অবচেতন সত্তার সাথে মিশে আছে। ব্যাপারটি আরো গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে যখন মানুষের মনের মাঝে এই বিশ্বাস শক্তিশালী হয়ে উঠে যে, আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সবই এক কোমল ও নাজুক রেশমি রজ্জু দ্বারা আবদ্ধ

মানুষ সমাজবদ্ধ জীব : মানুষ এক সমাজবদ্ধ জীব। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে আমাদের জীবন বহু মানুষের সঙ্গে যুক্ত। আমরা একই জমির ফসল খাই, একই ঝরনার পানি পান করি এবং একই বায়ুমণ্ডলের বাতাসে শ্বাস নিই আমরা যখন একান্তভাবে আমাদের স্বমতের কট্টর ও আপসহীন ধারক, তখনো যদি একটু এটাও জানার চেষ্টা করতাম যে, আমাদের প্রতিবেশীরা কেমন করে চিন্তা-ভাবনা করে এবং তাদের কর্মের মুখ্য উদ্দেশ্য কী, তবে আমাদের এই জ্ঞান কমপক্ষে পরিবেশের সাথে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সহায়ক হতো। যদি আমরা এক-অপরের সাথে মধুর প্রতিবেশের সাথে বিশ্বের সকল ধর্মকেই জানার চেষ্টা করি, যাতে করে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমঝোতা বৃদ্ধি হয় এবং ভালোভাবে নিজের নিকট ও দূরবর্তী প্রতিবেশীগণের সম্মান করতে পারি, তাহলে এটা অত্যন্ত প্রশংসনীয় হতো। তাছাড়া আমাদের চিন্তা-ভাবনা প্রকৃতপক্ষে অতটা বিক্ষিপ্ত হয়নি, যতটা প্রকাশ্যে দেখা যায়। বাস্তবে আমাদের চিন্তাগুলো কিছু কেন্দ্রের আশেপাশে স্ফটিকের মতো রূপ ধারণ করে নেয়, যাকে পৃথিবীর মহান ধর্ম এবং জীবন্ত আত্মার আকারে আমরা দেখি, যেটা পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের পথ প্রদর্শন করে যদি আমরা এই পৃথিবীর আদর্শ নাগরিক হতে চাই, তাহলে পৃথিবীর প্রধান প্রধান ধর্ম বিশ্বাস ও তার দার্শনিক পদ্ধতি, যা সমগ্র মানবজাতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে সে সম্পর্কে অবহিত হওয়ার চেষ্টা করা আমাদের কর্তব্য।

ঐতিহাসিক নবী : এই প্রাথমিক বিবেচনা সত্ত্বেও ধর্মের ক্ষেত্রটি এমন যেখানে বিবেকের সাথে আবেগের প্রায় সংঘর্ষ হয়। এখানে পিছলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই নির্বোধ ব্যক্তিদের প্রতি সর্বদা নযরদারি করতে হয়। কারণ তারা ঐ জায়গাতেও প্রবেশ করতে আতঙ্কবোধ করে না যেখানে প্রবেশ করতে ফেরেশতারাও ভয় পায়। অবশ্য অন্য এক দিক থেকে কাজটি খুব জটিলও নয়। কারণ এমন এক ধর্মের রীতি-নীতি আমার আলোচনার বিষয়, যে ধর্ম ঐতিহাসিক এবং যার নবীও একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।

এমনকি স্যার উইলিয়াম মূরের মতো ইসলাম বিরোধী সমালোচক কুরআন সম্পর্কে বলতে বাধ্য হন— ‘পৃথিবীতে সম্ভবত (কুরআন ব্যতীত) অন্য কোনো গ্রন্থ এমন নেই যা বারো শতাব্দী পর্যন্ত বিশুদ্ধ ও অবিকৃতরূপে এইভাবে সুরক্ষিত’। আমি এর সঙ্গে এই কথাও যুক্ত করতে পারি যে, নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক ব্যক্তি যাঁর জীবনের প্রতিটি ঘটনা অতীব যত্ন ও সতর্কতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ। এমনকি তাঁর জীবনের সমস্ত কর্ম ও আচরণগুলোও সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় সুরক্ষিত। তাঁর জীবন এবং কর্ম কিছুই রহস্যের পর্দায় আবৃত নয়। তাঁর সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করার জন্য আজ আর কাউকে বেশি মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। প্রাপ্ত তথ্যাদি এত নির্ভুল ও এত খাঁটি যে খোসা ছাড়িয়ে আবর্জনা মুক্ত করে সত্যের দানাগুলোকে আলাদা বেছে নেওয়ার দরকার পড়ে না। তাছাড়া আমার এই কাজ এখন কিছুটা সহজ। কারণ, এখন ঐ সমালোচকদের সংখ্যা বিরল যারা রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে থাকে। প্রফেসর বেভান তার ‘ক্যামব্রীজ মধ্য যুগের ইতিহাস’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘ইসলাম এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত ইউরোপে যা কিছু ছাপা হয়েছে তা সবই শুধু সাহিত্যিক কৌতুহল মাত্র’।

আমার জন্য নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন চরিত লেখার সমস্যা অনেকখানি সহজ হয়ে যাওয়ার কারণ- ওই ধরনের মিথ্যা ঐতিহাসিক তথ্যগুলোর সাহায্য নিতে আমরা এখন বাধ্য নই এবং ইসলাম সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা প্রকাশ করতে আমাদের সময়ও নষ্ট হয় না। উদাহরণস্বরূপ, ‘ইসলাম তরবারি-নির্ভর’ এই ধরনের মন্তব্য কোনো উল্লেখযোগ্য মহল থেকে আজ আর তেমন শোনা যায় না। ‘ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই’(আল-বাক্বারা, ২/২৫৬)। এটাই ইসলামের সুপরিচিত নীতি। বিশ্ববিখ্যাত ঐতিহাসিক গীবন বলেছেন, ‘মুসলিমদের সাথে ভুল এবং মারাত্মক অপবাদ আরোপ করা হয়েছে যে, তাদের কাজ হলো তরবারির সাহায্যে সকল ধর্মকে উৎখাত করা। এই ধরনের মিথ্যা অপবাদ কুরআন দ্বারা খণ্ডিত হয়ে যায় এবং খ্রিস্টান ধর্মের প্রতি বিজয়ী মুসলিম জাতির যে সার্বিক আচরণ, আইন ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে যে সহিষ্ণুতা পরিলক্ষিত হয় তা থেকেও প্রমাণিত হয় যে, এই অভিযোগ কতটা ভিত্তিহীন। প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনের যে অসাধারণ সাফল্য তার সঙ্গে তরবারির কোনো সম্পর্ক নেই। সেই সাফল্য একমাত্র তাঁর নৈতিক শক্তির উপরই প্রতিষ্ঠিত।

দ্বিতীয় অধ্যায় : মুছত্বফা (মনোনীত ব্যক্তি)

‘যারা নিজেদের রাগকে সংবরণ করে’ (আলে ইমরান, ৩/১৩৪)। এই সেই আরব যেখানে এক গোত্রের উট অপর গোত্রের গোচারণে ভুলক্রমে প্রবেশ করার মতো তুচ্ছ কারণে উত্তেজিত হয়ে এমন ভয়াবহ লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, যা ৪০ বছর ধরে চলতে থাকে। উভয় পক্ষের ৭০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং উভয় গোত্রেরই প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার মতো আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। সেই ক্রোধান্বিত যুদ্ধাংদেহী মনোভবের দুর্বিনীত আরব জাতিকে ইসলামের নবী আত্মসংযমের এমন পাঠ শেখালেন যে, তাঁরা যুদ্ধের ময়দানেও সুশৃঙ্খলভাবে ছালাত পড়তেন।

আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ : একথা সত্য যে, তাঁকে জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হতে হয়েছে, কিন্তু জেনে রাখা উচিত, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের পুরো চিত্রটাই বদলে দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ আরব উপদ্বীপ ইসলামের পতাকাতলে আসা পর্যন্ত শতাধিক যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু তাতে সর্বমোট প্রাণহানির সংখ্যা কয়েকশ’র বেশি নয়। তিনি বর্বর আরববাসীকে আবশ্যিকভাবে রীতিমতো জামাআতবদ্ধ হয়ে ছালাত পড়ার শিক্ষা দিয়েছেন। এমনকি যুদ্ধের ভয়াবহ প্রচণ্ডতার মধ্যেও দিনে পাঁচবার এই জামাআতবদ্ধ ছালাত আদায়ে কোনোরূপ ব্যত্যয় ঘটেনি। একদল মহান আল্লাহর উদ্দেশ্যে যখন সিজদারত, অন্যদল তখন শত্রুর মোকাবিলায় নিয়োজিত। ছালাত শেষে মুছল্লীরা যুদ্ধে যাচ্ছেন, আর যাঁরা ছিলেন যুদ্ধরত তাঁরা আসছেন ছালাতে।

বর্বরতার যুগে মানবতার বিস্তার যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত করা হয় এবং কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়- ‘কারো নাক-কান কেটে বিকৃত করো না, প্রতারণা করো না, বিশ্বাসঘাতকতা করো না, শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের হত্যা করো না, খেজুর ও ফলন্ত বৃক্ষ কেটো না ও পুড়িয়ে দিয়ো না এবং সন্ন্যাসি ও পূজাতে অথবা ইবাদত-বন্দেগীতে রত ব্যক্তিদের বিরক্ত করো না।’ নিকৃষ্টতম শত্রুর প্রতিও তাঁর আচরণ তাঁর অনুসারীদের জন্য এক উত্তম আদর্শ ছিল। মক্কা বিজয়ের পর তিনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্থানে উপনীত। এই সেই মক্কা, যে তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের উপর সীমাহীন অত্যাচার করেছে, বিতাড়িত করেছে, নির্দয়ভাবে বয়কট করেছে। এমনকি দু’শ মাইল দূরে গিয়েও তিনি রেহাই পাননি। সেই মক্কা আজ তাঁর অধীন। যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী তিনি সঙ্গতভাবেই তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে যে শত্রুতা, নির্দয়তা ও প্রতিহিংসার প্রদর্শন করেছিল আজ তার প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু ঐ শহরবাসীদের প্রতি কী ব্যবহার তিনি প্রদর্শন করলেন? মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হৃদয় প্রেম ও দয়াতে প্লাবিত হয়ে যায়, তিনি ঘোষণা করেন, ‘আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। যাও তোমরা সবাই মুক্ত-স্বাধীন’।

চরম শত্রুদের ক্ষমা : যুদ্ধের ময়দানে তাকে অবতীর্ণ হতে হয়েছে এ কথা সত্য, কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছানো মাত্র নিকৃষ্টতম শত্রুদেরকে ক্ষমা করে দেওয়া দিলেন। এমনকি তাদেরকেও ক্ষমা করে দিলেন যারা তাঁর প্রিয় চাচা হামযাকে হত্যা করে নাক-কান কেটে বিকৃত করেছিল এবং তাঁর বুক চিরে কলিজা বের করে চর্বণ করেছিল।[1]

মতবাদ অনুশীলনে পরিবর্তন : বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের নীতি ও মানবসাম্যের যে বাণী তিনি ঘোষণা করেছিলেন, মানবতার উন্নয়নে সে ছিল এক বিরাট অবদান। এই অবদানের মূল্য সম্ভবত ঐ সময় স্বীকার করা হবে, যখন বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত হবে। যখন বর্ণ-গোত্রের সকল কুসংস্কার ও ভেদরেখার অবসান হবে এবং মানব ভ্রাতৃত্বের এক শক্তিশালী ধারণা অস্তিত্বে আসবে।

আল্লাহর দৃষ্টিতে রাজা-প্রজা সবাই সমান : ইসলামের এই বিশেষ দিকটির কথা বলতে গিয়ে মিস সরোজিনী নাইডু বলেন, ‘এটাই প্রথম ধর্ম, যে সাম্যের শিক্ষা দিয়েছে এবং সেটাকে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আযানের সঙ্গে সঙ্গে মুছল্লীরা যখন মসজিদে এসে সমবেত হয়, তখন ইসলামের এই সাম্যের বাণী দিনে পাঁচ বার বাস্তবরূপে রূপান্তরিত হয়। যেখানে চাষী-রাজা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশাপাশি দাঁড়ায় এবং উচ্চকণ্ঠে বলেন, ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থাৎ আল্লাহ সবচাইতে বড়। ভারতের এই মহান কবি তাঁর কথা অব্যাহত রেখে আরো বলেন, ‘ইসলামের এই অবিচ্ছেদ্য ঐক্য দেখে আমি অনেক প্রভাবিত ও মুগ্ধ হয়েছি। কারণ, এ এমন এক ঐক্য যা মানুষের মধ্যে সহজেই জাগিয়ে তোলে ভ্রাতৃত্ববোধ। যখন আপনি এক মিশরবাসী, এক আলজেরিয়ান, এক ভারতবাসী ও এক তুর্কি মুসলিমের সঙ্গে লন্ডনে সাক্ষাৎ করবেন, তখন আপনি অনুভব করবেন, তাঁদের দৃষ্টিতে কে মিশরী আর কে হিন্দুস্তানী এর কোনো গুরুত্ব নেই।

ইসলাম স্পেনকে সুসভ্য করে তুলেছে এবং ইসলামেই রয়েছে সামাজিক সমস্যার সমাধান : মহাত্মা গান্ধী তাঁর অতুলনীয় ভঙ্গিতে বলেন, ‘এটা বলা হয় যে, ইউরোপবাসী দক্ষিণ আফ্রিকাতে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ভয়ে ভীত। সেই ইসলাম সম্পর্কে এই ভয় (?) যে স্পেনকে সুসভ্য করেছে! যে মরক্কো পর্যন্ত জ্ঞানের আলোকবর্তিকা ছড়িয়েছে এবং সারা বিশ্বকে ভ্রাতৃত্বের দীক্ষা দিয়েছে! 

প্রকৃতপক্ষে দক্ষিণ আফ্রিকার ইউরোপিয়ানদের ইসলামকে ভয় পাওয়ার কারণ হচ্ছে তারা ভীত যে, ইসলামের অনুসারীরা কোথাও যদি সাদা চামড়ার মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার দাবি করে ফেলেন। যদি এমনটাই হয় তাহলে তাদের ভয় করা ঠিকই আছে। যদি সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা তাদের কাছে আতঙ্কজনক হয়, তাহলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার থেকে তাদের ভয় করার কারণও আমরা বুঝতে পারি।

হজ্জ এক জ্যান্ত প্রমাণ : পৃথিবী সাক্ষী, প্রতি বছর হজ্জ মৌসুমে বর্ণ, গোত্র ও মর্যাদার সকল প্রকারের বৈষম্য ও ভেদাভেদ মুক্ত কী বিষ্ময়কর আন্তর্জাতিক দৃশ্যই না ফুটে ওঠে। শুধু ইউরোপবাসী নয়; আফ্রিকান, পারসিক, ভারতীয় ও চীনা সবাই এক স্বর্গীয় পরিবারের সদস্য হিসেবে মক্কাতে একত্রিত হয়। সবার একই পোশাক, সেলাইবিহীন দুটি সাদা কাপড়, একটি কোমরে পরা ও অন্যটি কাঁধের উপর দিয়ে ছড়িয়ে রাখা, সবার মাথা খোলা থাকে, কোনো প্রকারের জাঁকজমক ও লোক প্রদর্শন থাকে না। বারংবার এই শব্দটি তাঁরা পাঠ করতে থাকেন, ‘আমি হাযির, হে আল্লাহ! আমি হাযির, আমি হাযির। আপনার কোনো অংশীদার নেই। আমি হাযির। নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও সকল নেআমত আপনার এবং কর্তৃত্ব আপনারই, আপনার কোনো অংশীদার নেই।’ এভাবেই সেখানে উঁচু-নিচুর কোনো ভেদাভেদ আর অবশিষ্ট থাকে না।

প্রত্যেক হাজী ইসলামের এক তাৎপর্যময় আন্তর্জাতিক মহিমা ও সৌরভ নিয়ে স্ব স্ব গৃহে ফিরে আসেন। প্রফেসর হার্গরোনজ বলেন, ‘ইসলামের আন্তর্জাতিক ঐক্য এবং সর্ব মানবিক ভ্রাতৃত্ব এমন এক বৈশ্বিক ভিত্তির উপর স্থাপিত, যা অন্য জাতিকে সর্বদা আলো দেখাতে থাকবে’। তিনি আরো বলেন, ‘প্রকৃত ঘটনা হলো এই যে, রাষ্ট্র-সংঘের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য ইসলামের যা কৃতিত্ব রয়েছে পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির ইতিহাসে এর উদাহরণ নেই’।

ইসলাম সারা বিশ্বের জন্য পথ প্রদর্শনকারী : কোনো সন্দেহ নেই, ইসলামের নবী সাম্যের শাসনকে সর্বোৎকৃষ্ট রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। খলীফা উমার, খলীফা আলী (নবীর জামাতা) খালীফা মানছূর, খলীফা মামুনের পুত্র আব্বাসসহ বহু খলীফা ও বাদশাহকে একজন সাধারণ অপরাধীর মতো ইসলামী আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। আমরা সকলেই জানি যে, সাদা বর্ণের সভ্য লোকেরা আজকের দিনেও কালো বর্ণের নিগ্রোদের সাথে কী আচরণ করে। আপনি ভেবে দেখুন, আজ থেকে চৌদ্দশ বছর পূর্বে ইসলামের পয়গম্বরের যুগের নিগ্রো বেলালের কথা, ইসলামের প্রথম যুগে ছালাতের জন্য আযান দেওয়ার কাজটা ছিল অতীব মর্যাদাপূর্ণ। এই সম্মান লাভ করেছিলেন বেলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু। মক্কা বিজয়ের পর নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে ছালাতের জন্য আযান দিতে বললেন। অতঃপর এই কালো বর্ণের ও মোটা ঠোঁটের নিগ্রো গোলাম মুসলিমদের সবচেয়ে পবিত্র ও ঐতিহাসিক ভবন কা‘বার ছাদে চড়ে আযান দিলেন। এই দৃশ্য দেখে কিছু অভিমানী আরব চেঁচিয়ে উঠল আর বলল, ‘উহু! দুর্দশা হোক ওর। আজ এই কালো নিগ্রো ক্রীতদাস আযান দেওয়ার জন্য পবিত্র কা‘বার ছাদে চড়ে গেছে। সম্ভবত এটাই বংশ ও জাতি মর্যাদার গর্ব ও কুসংস্কার ছিল যেটা নিরসন করার জন্য ইসলামের নবী একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন- তিনি বলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আল্লাহর জন্যই, যিনি আমাদেরকে অজ্ঞতা যুগের গর্ব ও অশ্লীলতা থেকে মুক্তি দান করেছেন। হে মানব সমাজ! জেনে রেখো, মানবজাতি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণি ধার্মিক ও আল্লাহ ভীরু, যারা আল্লাহর নযরে সম্মানিত। আর দ্বিতীয় শ্রেণি অপরাধী ও নিষ্ঠুর, যারা আল্লাহর নযরে ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট। অন্যথা সব মানুষই আদমের সন্তান এবং আল্লাহ আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন’। এরই অনুমোদন কুরআন মাজীদে এই শব্দ দ্বারা করা হয়েছে- ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, যে সর্বাধিক পরহেযগার’ (হুজুরাত, ৪৯/১৩)

অসাধারণ পরিবর্তন : ইসলামের নবী এমন পরিবর্তন নিয়ে আসলেন যে সবচাইতে উন্নত ও সম্মানিত বংশের আরবরা এই নিগ্রো গোলামের সঙ্গে নিজ কন্যার বিবাহের প্রস্তাব করেছিলেন। ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা ও আমীরুল মুমিনীন যিনি ইতিহাসে উমার নামে পরিচিত, তিনি এই নিগ্রো গোলামের সঙ্গে দেখা হলেই অবিলম্বে দাঁড়িয়ে যেতেন এবং এই শব্দ দ্বারা তাঁকে স্বাগত জানাতেন— ‘আসুন! আমাদের সর্দার, আমাদের নেতা’। পৃথিবীর বুকে ঐ সময়ের সব থেকে অহংকারী জাতি আরবদের মধ্যে কুরআন এবং নবী মুহাম্মাদ কেমন অসাধারণ পরিবর্তন এনে ছিলেন! এজন্যই জার্মানের শ্রেষ্ঠতম কবি গ্যাটে কুরআন মাজীদ সম্পর্কে বলেন, ‘এ এমন এক গ্রন্থ যার প্রভাব যুগ যুগ ধরে একইভাবে অব্যাহত থাকবে। আর এটাই হলো সেই কারণ যার জন্য জর্জ বার্নার্ড শ বলেন, ‘আগামি ১০০ বছরের মধ্যে ইংল্যান্ড তথা ইউরোপের মধ্যে যদি কোনো ধর্মের শাসন করার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সেটা হচ্ছে ইসলাম’।

ইসলাম নারীকে মুক্ত করেছে : ইসলামের সাম্যের মূল্যবোধ নারীজাতিকে পুরুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করেছে। স্যার চার্লস আর্চিবাল্ড হ্যামিল্টন বলেন, ‘ইসলাম এটা শিক্ষা দেয় যে, নারী ও পুরুষ জন্মগতভাবে নিষ্পাপ এবং উভয়কেই এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। উভয়ের কাছে একই আত্মা রয়েছে এবং উভয়ের মধ্যে মানসিক, আধ্যাত্মিক, এবং নৈতিক দৃষ্টিতে উন্নতি করার সমানরূপে ক্ষমতা রয়েছে’।

একজন নারীর পিতার সম্পত্তির উপর অধিকার : আরব দেশে এই প্রথা প্রচলিত ছিল যে, উত্তরাধিকারের অধিকারী পুরুষেরাই হবে, যারা বর্শা এবং তরবারি নিয়ে লড়াই করতে পারে। কিন্তু ইসলাম নারীর রক্ষক হয়ে এলো এবং নারীকে পৈত্রিক সম্পত্তির অধিকারিণী বানালো। ইসলাম আজ থেকে শত শত বছর পূর্বে নারীদের সম্পত্তিতে মালিকানার অধিকারিণী বানিয়েছে। যে ইংল্যান্ড আজ গণতন্ত্রের কেল্লা বলে অভিহিত, সেই ইংল্যান্ড ১২০০ বছর পর ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে ইসলামের এই বিধান গ্রহণ করে এবং এর জন্য ‘the married women's act’ (বিবাহিতা মহিলাদের আইন) নামক আইনটি পাশ করে। কিন্তু এই ঘটনার ১২০০ বছর পূর্বেই ইসলামের নবী এটা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, পুরুষ ও নারী পরস্পরের পরিপূরক, এক অপরের অর্ধাংশ। নারীর অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত এবং এটা লক্ষ্য রাখা উচিত, নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার পাচ্ছে কি না।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)


মূল : প্রফেসর কে এস রামাকৃষ্ণ রাও

চেয়ারম্যান, দর্শন বিভাগ, মহীশুর মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়, কর্ণাটক, ভারত।

অনুবাদ ও পরিমার্জন : আব্দুর রহমান বিন লুতফুল হক ভারতী

 পিএইচডি গবেষক, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।


[1]. হিন্দ বিনতে উতবা রাযিয়াল্লাহু আনহা কর্তৃক হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু -এর কলিজা খাওয়া সম্পর্কে বর্ণিত সবগুলো হাদীছই দুর্বল (মুসনাদে আহমাদ, হা/৪৪১৪; সীরাতে ইবনে ইসহাক্ব, পৃষ্ঠা ৩৩৩)। তাই একজন ছাহাবিয়্যার প্রতি অপবাদ আরোপ করা কোনোভাবেই উচিত নয়। 

Magazine