إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
মহান আল্লাহ যদি রব্বুল আলামীন হয়, তাহলে বান্দা হচ্ছে সেই রবের আবদ। জগৎসমূহের অভিভাবকের দাস মানুষ। রবের শ্রেষ্ঠত্ব যেমন রুবূবিয়্যাত, তেমনি বান্দার শ্রেষ্ঠত্ব উবূদিয়্যাত। যে যত ভালো দাস, সে তত শ্রেষ্ঠ। এই সম্পর্কের বাহিরে মানুষের সাথে মহান আল্লাহর আর দ্বিতীয় কোনো সম্পর্ক নাই। মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ দাস হচ্ছেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অন্তরে মহান আল্লাহর নেয়ামতের কারণে তৈরি হওয়া নিষ্কলুষ ভালোবাসা, মহান আল্লাহর দয়া ও রহমতের প্রতি সীমাহীন আশা ও মহান আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার কারণে শাস্তি পাওয়ার ভয় এই তিনটি একত্রিত হয়ে প্রকৃত ইবাদত বা দাসত্ব তৈরি হয়। দাসত্ব শুধু শরীরে হয় না; দাসত্ব শুরু হয় মনে। মনের ইখলাছ, তাওয়াক্কুল ও ইনাবায়। তারপর তার প্রভাব ফুটে উঠে শরীরে, মুখে, অর্থনীতিতে, ইবাদতে, মানুষের হক্বে, ছবর ও রিযায়, হারাম থেকে বাঁচায়, অন্যায়ে বাধা, জিহাদ ও রাজনীতিতে এককথায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে। এই ধরনের মন ও শরীরের পূর্ণাঙ্গ দাসত্ব জীবনের সকল ক্ষেত্রে একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য করার অর্থই হচ্ছে, হে আল্লাহ! আমরা শুধুই আপনারই দাসত্ব করি। অন্য কারো নয়।
বিপদে-আপদে সাহায্য প্রার্থনা—ইবাদতেরই একটি প্রকার। পৃথিবীর সকল মানুষ স্বাভাবিক সময়ে কাউকে না খুঁজলেও বিপদ-আপদে পড়লে ঠিকই সর্বশক্তিমান কারো আশ্রয় খুঁজে। দুনিয়াবী কার্যকরণের বিষয়গুলোতে মানুষের সাহায্য নেওয়া ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন কেউ গাড়ি ঠেলে নেওয়ার জন্য মানুষকে ডাক দিয়ে বলে, আমার গাড়িটি একটু ঠেলে উঠিয়ে দাও। অথবা অসুস্থ হলে ডাক্তারের চিকিৎসা গ্রহণ করা ইত্যাদি। ইবাদত মূলত দুনিয়াবী কার্যকরণের সূত্র ছাড়াই অলৌকিক ক্ষমতার মালিক মনে করে কারো নিকটে সাহায্য চাওয়া। যেমন- কেউ কবিরাজ, গণক, জিন ইত্যাদির সাহায্য প্রার্থনা করে থাকে। এই ধরনের সাহায্য চাওযা একপ্রকারের ইবাদত। আর ইবাদত শুধু মহান আল্লাহর জন্য। অতএব, হৃদয় মন ও শরীর দিয়ে পরিপূর্ণ ভালোবাসা, ভক্তি ও শ্রদ্ধার মাধ্যমে আমরা একমাত্র মহান আল্লাহর প্রশ্নাতীত আনুগত্য করি এবং শুধু তাঁর নিকটেই সাহায্য কামনা করি। তিনি ব্যতীত অন্য কারও সরিষা সমপরিমাণ দাসত্ব করি না। চুল সমপরিমাণ সাহায্যও প্রার্থনা করি না।
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ - صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ غَيْرِ الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ
মানুষের জীবন একটি পথের মতো। যার শুরু ও শেষ আছে। যা সরল রেখার মতো একমুখী। জীবনের সেই রেখা সময়। যেখানে ডানে-বামে বা পিছনে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। সময়ের এই সরলরেখার জীবন তখনি কার্যকরী ও সফল জীবন হিসেবে গণ্য হবে, যখন এই পথে চলার ধরন গায়েবে নির্ধারিত ধরনের সাথে মিলে যাবে। যা মহান আল্লাহ মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন এবং অহীর মাধ্যমে নবীদের কাছে পাঠিয়েছেন। প্রতিটি যন্ত্র তৈরির পর বিজ্ঞানীরা যেমন ম্যানুয়াল বা নির্দেশিকা লিখে যন্ত্রের সাথে যুক্ত করে দেয়, ঠিক তেমনি মানুষের সৃষ্টিকর্তা মানুষের জন্য সরলপথের যে নির্দেশিকা লিখেছেন—সেটিই ছিরাতে মুস্তাক্বীম, যার উপর যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ জীবন পরিচালনা করে সফল হয়েছেন। সেই পথে চলার দু‘আ করে বলা হচ্ছে, হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সেই সঠিক ও সোজা পথ প্রদর্শন ও সেই পথে চলার তাওফীক্ব দান করুন, যে পথে আপনার দয়াপ্রাপ্ত বান্দারা অতীতে চলে গেছেন। পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্তদের পথে আমাদের পরিচালিত করবেন না।
প্রত্যেক যুগে দয়াপ্রাপ্ত হচ্ছেন নবীগণ ও তাদের অনুসারীরা। আর পথভ্রষ্ট হচ্ছে যারা স্বাভাবিকভাবে নবীর দাওয়াত গ্রহণ করেনি। অভিশপ্ত হচ্ছে নবীর পথে বাধাপ্রদানকারীরা। যাদের অনেকেই আল্লাহর গযবপ্রাপ্ত হয়েছে। শেষ উম্মতে দয়াপ্রাপ্ত হচ্ছেন শেষ নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ছাহাবীগণ এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত যারা তাদের অনুসরণ করবে। আর পথভ্রষ্ট হচ্ছে খ্রিষ্টানেরা। কেননা তারা সত্য জানে না। সত্য জানলে তাদের মেনে নেওয়ার মানসিকতা রয়েছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে থাকে খ্রিষ্টানেরাই। অভিশপ্ত হচ্ছে ইয়াহূদীরা। কেননা তারা সত্য জানার পরও হিংসা ও অহংকারের কারণে সেটিকে ধ্বংস করতে চায়। এছাড়া ক্বিয়ামত পর্যন্ত যারা ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের পথ ও সভ্যতা অনুসরণ করবে, তারাই শয়তানের আঁকাবাঁকা পথের অনুসারী। যার শেষ ফলাফল জাহান্নাম। আর আল্লাহর পথ সহজ ও সরল, যার শেষ বিন্দু জান্নাত।
শিক্ষা:
সাত আয়াতবিশিষ্ট কুরআন মাজীদের শ্রেষ্ঠতম সূরা উম্মুল কুরআন হচ্ছে সূরা আল-ফাতিহা। আল্লাহর নাম ও গুণাবলি, তাঁর নিরঙ্কুশ আধিপত্য ও বান্দার নিষ্কলুষ দাসত্ব, সরল পথের পরিচয় ও তাতে হেদায়াতে আল্লাহর সাহায্য কামনার মতো ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক সকল শিক্ষার সন্নিবেশ এই সূরায় সংঘটিত হয়েছে। এই সূরা ছাড়া ছালাত হয় না। এই সূরা দিয়ে যেকোনো অসুস্থতায় ঝাড়ফুঁক করা যায়। এই সূরা পাঠ শেষে উঁচু স্বরে আমীন বলা সুন্নাত।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
* ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।
