(ফেব্রুয়ারি’২৬ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ
মানুষকে শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করতে মহান আল্লাহ প্রতি যুগেই ফেরেশতার মাধ্যমে মহান আল্লাহর মনোনীত মানুষের নিকটে অহী প্রেরণ করে থাকেন। এই অহীরই একটি অংশ চারটি প্রসিদ্ধ আসমানী কিতাব। তাওরাত এসেছে তূর পাহাড়ের উপর মূসা আলাইহিস সালাম-এর নিকটে, যাবূর দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর উপর, ইনজীল ঈসা আলাইহিস সালাম-এর উপর আর এটি তাওরাতের ব্যাখ্যাস্বরূপ। সর্বশেষ কুরআন মাজীদ মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর। ঈমান বিল গায়েবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রব্বুল আলামীনের প্রেরিত তাঁর বাণীর উপর ঈমান আনা। যদিও কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণে অতীতের গ্রন্থগুলো মানসূখ হয়ে গেছে এবং সেগুলোর অবিকৃত কোনো রূপ আজ অবশিষ্ট নেই, তবুও সামগ্রিক অর্থে এগুলো যে মহান আল্লাহর বাণী এবং আসমানী কিতাব, তার প্রতি ঈমান থাকা জরুরী। আর মুত্তাক্বী তারাই যারা অতীতে অবতীর্ণ কিতাব এবং আপনার উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার প্রতি ঈমান রাখে।
وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ
ঈমান বিল গায়েবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পরকালের প্রতি ঈমান। এই জন্য এটিকে আবারও আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এটির সাথে ইয়াক্বীন কথাটি যুক্ত করা হয়েছে। পরকালের প্রতি ইয়াক্বীন থাকলে মানুষের জন্য সৎ আমল করা সহজ হয় এবং ইসলামের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করা সহজ হয়। কেননা সে সকল কিছুর প্রতিদান পরকালে চায়। এই দুনিয়ার কোনো মূল্য তার কাছে থাকে না। যুগে যুগে নবীরা ও তাদের ছাহাবীরা পরকালের প্রতি ইয়াক্বীনের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছে। যেমন- আছহাবে কাহাফ, আছহাবুল উখদূদসহ অসংখ্য জাতি শুধু পরকালের আশায় দুনিয়ার সকল কিছু বিসর্জন দিয়েছে। আর তাই তো মুত্তাক্বী তারাই হতে পারে, যাদের পরকালে ইয়াক্বীন রয়েছে। পরকালের বিশ্বাসে ইয়াক্বীন অর্জন করলে বিজয় সুনিশ্চিত। একটি দেশে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের জন্য অন্তত ২০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষের ঈমান বিল গায়েবে ইয়াক্বীন, বিশেষ করে পরকালে ইয়াক্বীন অর্জন অতীব জরুরী।
أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِنْ رَبِّهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
উপরের পাঁচটি গুণ তথা ঈমান বিল গায়েব, ছালাত, দান, আসমানী কিতাবে ঈমান এবং পরকালে ইয়াক্বীন— এগুলো যাদের মধ্যে থাকবে, তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নূরের উপরে থাকবে তথা হেদায়াতের উপরে থাকবে আর তারাই দুনিয়া ও পরকালে প্রকৃত সফলকাম। আর তারাই মুত্তাক্বী।
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا سَوَاءٌ عَلَيْهِمْ أَأَنْذَرْتَهُمْ أَمْ لَمْ تُنْذِرْهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ
মুত্তাক্বীদের সম্পর্কে জানার পর কাফেরদের সম্পর্কে জানা জরুরী। কারণ ঈমানের বিপরীত কুফর। কুফর শব্দের শাব্দিক অর্থ লুকিয়ে রাখা। কৃষক যেভাবে বীজ লুকিয়ে রাখে মাটিতে, কাফের তেমনি ঈমানকে লুকিয়ে রাখে। ঈমান আনয়নের পূর্বে অন্তরকে কুফর থেকে মুক্ত করা জরুরী। এজন্য কী কী করলে কুফর হয়, তা জানা অতি আবশ্যক। কাফেরদের মধ্যে এমনও কাফের আছে, যাদেরকে দাওয়াত দেওয়া অথবা না দেওয়া সমান। সত্যের দাওয়াত তাদের কাছে কোনো গুরুত্ব রাখে না। তাদের কথাই মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে আপনি ভীতি প্রদর্শন করেন অথবা না করেন, তা তাদের কাছে সমান। তারা কখনোই ঈমান আনয়ন করবে না’।
خَتَمَ اللَّهُ عَلَى قُلُوبِهِمْ وَعَلَى سَمْعِهِمْ وَعَلَى أَبْصَارِهِمْ غِشَاوَةٌ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ
যে সমস্ত কাফেরের অন্তরে দাওয়াত কোনো প্রভাব বিস্তার করে না, তার মূল কারণ হচ্ছে তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে অর্থাৎ তাদের অন্তর সীলগালা করে দেওয়া হয়েছে। অন্তরগুলো তিন ভাগে বিভক্ত— সুস্থ ও প্রশান্ত হৃদয়, অসুস্থ ও ভর্ৎসনাকারী হৃদয়। আর সর্বনিকৃষ্ট অন্তর হচ্ছে মৃত অন্তর, যে কল্যাণ-অকল্যাণ বুঝে না, সবসময় অকল্যাণের আদেশ করে এবং যে অন্তরে অকল্যাণ বা গুনাহের কোনো আফসোস থাকে না। এই অন্তরে দাগ পড়তে পড়তে পাতিলের তলার মতো কালো কুচকুচে হয়ে যায়। এই সমস্ত অন্তরে কোনো নূর থাকে না, তাদের চোখ থাকার পরেও তারা যেন দেখে না, কান থাকার পরেও তারা যেন শুনে না এবং অন্তর থাকার পরেও তারা যেন চিন্তা করে না।
তাদের অন্তরে মোহর মারা মূলত তাদেরই কর্মফল। যখন তাদের সামনে সত্য-মিথ্যা স্পষ্ট হয়েছে, তারপরও তারা গ্রহণ করেনি। সত্য বুঝার পরেও গ্রহণ না করার শাস্তি দিতেই তাদের অন্তরে মোহর মেরে দেওয়া হয়েছে। তাদের কথাই মহান আল্লাহ বলেছেন, মহান আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন আর তাদের চোখে ও কানে রয়েছে পর্দা। তাদের জন্য রয়েছে বড় শাস্তি।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক
ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।
