[সূরা আল-বাক্বারাহ: ৩৬-৩৮ আয়াত]
فَأَزَلَّهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَى حِينٍ
[আল-বাক্বারাহ: ৩৬ আয়াত]
কিন্তু শয়তান তাদের পদস্খলন ঘটাল। অসংখ্য বৈধ নেয়ামত থেকে তাদের দৃষ্টি সরিয়ে নিষিদ্ধ একটি গাছের দিকে আকৃষ্ট করল।
আদম-সন্তানের অন্তরে ওয়াসওয়াসা তথা গোপন মেসেজ দেওয়ার ক্ষমতা মহান আল্লাহ শয়তানকে দিয়েছিলেন। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে সে আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম-এর হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তাদেরকে বুঝাল যে, যদি তারা এই গাছের নিকটবর্তী হয়, তাহলে তারা জান্নাতে চিরস্থায়ী থাকতে পারবে। শয়তানের প্ররোচনায় পা দিয়ে আদম আলাইহিস সালাম-এর পা পিছলে গেল এবং তিনি সরল পথ থেকে ছিটকে পড়লেন। শয়তানের পরিকল্পনা সফল হলো। তাদেরকে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে যেতে হলো।মহান আল্লাহ তখন বললেন, তোমরা পৃথিবীতে নেমে যাও। সেখানে তোমাদের এক পক্ষ অন্য পক্ষের চিরস্থায়ী শত্রু হবে। একটি নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পৃথিবীতেই তোমাদের বসবাস এবং জীবিকা থাকবে।
পৃথিবীতে মানুষের জীবন তাই নিছক আরামের জীবন নয়। এখানে শয়তানের সঙ্গে তার লড়াই চিরন্তন। বৈধতার বিশাল পৃথিবী সামনে থাকা সত্ত্বেও নিষিদ্ধ বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হবে। আর প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, সে কি তার রবের সীমারেখা মানবে, নাকি শয়তানের প্ররোচনার কাছে আত্মসমর্পণ করবে?
فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
[আল-বাক্বারাহ: ৩৭ আয়াত]
এরপর আদম আলাইহিস সালাম নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। তিনি অহংকার করলেন না, আত্মপক্ষ সমর্থন করে কোনো যুক্তি দিলেন না এবং নিজের ব্যর্থতার জন্য অন্য কাউকে দায়ী করলেন না; বরং অনুতপ্ত হলেন এবং নিজের রবের দিকে ফিরে আসতে চাইলেন।
মহান আল্লাহ নিজেই তাকে তওবার ভাষা শিক্ষা দিলেন। আদম আলাইহিস সালাম তার রবের শেখানো সেই ভাষায় ক্ষমা চাইলেন। আদম আলাইহিস সালাম-কে শিক্ষা দেওয়া সেই ভাষাটি হলো, ‘হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের প্রতি যুলম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’।
আল্লাহ তার তওবা কবুল করে নিলেন। নিশ্চয়ই তিনি বারবার তওবা কবুলকারী এবং পরম দয়ালু। এখানেই আদম ও ইবলীসের পথ আলাদা হয়ে গেছে। উভয়ের জীবনেই পরীক্ষা এসেছিল। ইবলীস অবাধ্যতার পর অহংকার করেছিল এবং নিজের অবস্থানকে সঠিক প্রমাণ করতে চেয়েছিল। আর আদম আলাইহিস সালাম ভুলের পর অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে রবের দিকে ফিরে এসেছিলেন।
মানুষের মর্যাদা এই নয় যে, সে কখনো ভুল করবে না; বরং মানুষের মর্যাদা হলো, ভুল বুঝতে পারলে সে অহংকার ছেড়ে রবের দিকে ফিরে আসবে।
قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُمْ مِنِّي هُدًى فَمَنْ تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ
[আল-বাক্বারাহ: ৩৮ আয়াত]
এই সুদীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনার পর মহান আল্লাহ পৃথিবীতে মানবজাতির জন্য একটি চিরস্থায়ী নীতিমালার ঘোষণা দেন, যে নীতিমালা অনুসরণ করাই মুক্তি ও সফলতার একমাত্র পথ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সবাই পৃথিবীতে নেমে যাও। সেখানে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত তোমাদের জীবন অতিবাহিত হবে। শয়তান তোমাদের চিরশত্রু হিসেবে থাকবে। প্রবৃত্তির টান, পার্থিব জীবনের মোহ এবং নানাবিধ পরীক্ষা তোমাদের সামনে উপস্থিত হবে।
তবে এসব পরীক্ষা, বিভ্রান্তি ও অন্ধকারাচ্ছন্ন পিচ্ছিল পথে আমি তোমাদের দিশাহীন অবস্থায় ছেড়ে দেব না। বরং আলোর মশালস্বরূপ পথপ্রদর্শক হিসেবে যুগে যুগে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে হেদায়াত পাঠাব। নবী-রাসূলগণ আসবেন এবং আসমানী কিতাবসমূহ নাযিল হবে। কিতাব সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করে সঠিক পথের দিশা দেবে আর নবী-রাসূলগণ সেই হেদায়াত বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে দেখাবেন।
অতএব, যারা আমার হেদায়াতের কথা জানবে এবং নিজেদের চিন্তা, বিশ্বাস ও জীবনকে সেই হেদায়াতের অনুসারী করবে, তাদের জন্য কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা কোনো দুঃখও করবে না। ভবিষ্যতে কী ঘটবে, এই পথে চলতে গিয়ে দুনিয়ায় কী বিপদ আসবে কিংবা মৃত্যুর পর তাদের পরিণতি কী হবে—এসব আশঙ্কা তাদের গ্রাস করবে না। কারণ তাদের দায়িত্ব মহান আল্লাহ নিজেই গ্রহণ করবেন। একইভাবে অতীতের ব্যর্থতা, দুনিয়ার কষ্ট-ক্লেশ কিংবা হারিয়ে যাওয়া নেয়ামতের জন্যও তারা অনুতাপ ও দুঃখে নিমজ্জিত থাকবে না। কেননা তারা তখন জান্নাতে প্রবেশ করবে।
সুতরাং তারা এমন একটি পথ গ্রহণ করেছে, যার চূড়ান্ত গন্তব্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং চিরস্থায়ী জান্নাত।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক
ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।
