কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রবের বাণী (পর্ব-৮)

post title will place here

[সূরা আল-বাক্বারাহ: ৩০-৩৫ আয়াত]

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ

[আল-বাক্বারাহ: ৩০ আয়াত]

পূর্বের আয়াতে এসেছে, পৃথিবীর সকল কিছু মানুষের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে এবং মানুষের অধীন করা হয়েছে। আর এই আয়াতে মহান আল্লাহ পরিষ্কার করে দিচ্ছেন যে, সবকিছু মানুষের জন্য সষ্টি করা হলেও এগুলোর বিষয়ে মানুষের একচ্ছত্র আধিপত্য ও স্বাধীনতা নেই; বরং মানুষকে পৃথিবীর প্রতিনিধি তথা দায়িত্বশীল হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। পৃথিবীর সকল কিছুই তাদের কাছে মূলত আমানত। মানব সৃষ্টির সেই মহৎ উদ্দেশ্যের ঘটনার সারমর্ম হচ্ছে, পৃথিবীতে মানুষের পূর্বেও দীর্ঘদিন জিনদের বসবাস ছিল। তাদের পাপাচার, ফিতনা-ফাসাদের দীর্ঘ যাত্রার কোনো এক সময়ে মহান আল্লাহ একদিন মানুষ সৃষ্টির ইচ্ছা পোষণ করলেন। তিনি তাঁর সেই ইচ্ছার কথা ফেরেশতাদের বললেনআমি ীতে পৃথিবীতে নতুন প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে চাই মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের সাথে পরামর্শ করছেন এমন নয়, বরং তাঁর সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন। ফেরেশতারা জিনদের দীর্ঘ তিক্ত অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে মহান আল্লাহকে বললেনহে আল্লাহ! তাসবীহ পাঠ করার জন্য এবং পবিত্রতা ঘোষণা করার জন্য তো আমরাই যথেষ্ট, আবারও জিনদের মতো এমন এক জাতি সৃষ্টি করার কী প্রয়োজন আছে, যারা পৃথিবীতে ফিতনা-ফাসাদ তৈরি করবে ফেরেশতারা মহান আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি, বরং তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে মহান আল্লাহর হিকমা জানতে চেয়েছেন। আর এটিও মহান আল্লাহর দয়া যে, তিনিও ফেরেশতাদেরকে মানুষ সৃষ্টির হিকমা জানিয়ে দিচ্ছেন। মহান আল্লাহ বললেন, আমি যা জানি তোমরা তা জানো না তথা গায়েবের খবর ফেরেশতারাও জানতেন না। অদৃশ্যের খবর একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। মানুষ যে শুধু পাপাচার করবে এমন নয়; বরং তারা তওবাও করবে। তাদের মধ্যে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মতো মহান নবীও থাকবেন। আল্লাহর রাস্তায় জীবনদানকারী শহীদরাও থাকবেন। এই অদৃশ্যের খবরগুলো শুধু মহান আল্লাহ জানতেন।

وَعَلَّمَ آدَمَ الْأَسْمَاءَ كُلَّهَا ثُمَّ عَرَضَهُمْ عَلَى الْمَلَائِكَةِ فَقَالَ أَنْبِئُونِي بِأَسْمَاءِ هَؤُلَاءِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ

[আল-বাক্বারাহ: ৩১ আয়াত]

যাহোক মহান আল্লাহ আদম-সন্তানের সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়ার জন্য তাৎক্ষণিক একটি ব্যবস্থা করলেন। তিনি আদম আলাইহিস সালাম-কে পৃথিবীর সকল সৃষ্টিজীবের নাম শিক্ষা দিলেন আজকের যুগের বিমান, রকেট, মোবাইল, কম্পিউটারসহ সকল প্রযুক্তির জ্ঞান আদম আলাইহিস সালাম-এর ব্রেনে দেওয়া ছিল। তিনি সকল কিছু জানতেন। যুগের প্রয়োজনে বংশ পরম্পরায় সেই জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থেকেছে। জেনেটিক্যালি যা আদম আলাইহিস সালাম-এর জ্ঞানে ছিল না, তা মানুষ কোনোদিন আবিষ্কার করতে পারবে না। পিতার জ্ঞানে যা নেই, তা সন্তানের পক্ষে আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। কেননা শূন্য থেকে সৃষ্টি করার কোনো ক্ষমতা মানুষের নেই। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষের ব্রেনের বিভিন্ন পর্দা খুলতে থাকে আর মানুষ নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করতে থাকে।

যাহোক, মহান আল্লাহ পৃথিবীর সকল সৃষ্টি ও আবিষ্কার ফেরেশতাদের সামনে উপস্থাপন করলেন এবং তাদের কাছে এগুলোর নাম জানতে চাইলেন। এভাবে নাম জানতে চাওয়ার উদ্দেশ্য ফেরেশতাদের ছোট করা ছিল না; বরং পৃথিবীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আদম-সন্তানের জ্ঞান, যোগ্যতা ও সক্ষমতা প্রদর্শন করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।

قَالُوا سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

[আল-বাক্বারাহ: ৩২ আয়াত]

ফেরেশতারা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে মহান আল্লাহকে জানালেনহে আল্লাহ! আপনি মহাপবিত্রআমরা তো ততটুকুই জানি, যতটুকু আপনি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন এর বেশি কিছু আমাদের জানা নেই। আর প্রকৃত জ্ঞানী, সর্বজ্ঞাত  সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাময় তো শুধু্ আপনিই ফেরেশতাদের এই বিনয় প্রমাণ করে আদম আলাইহিস সালাম-এর যে জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব সেটাও মূলত আল্লাহরই দান। আদম-সন্তানও ততটুকুই জানে, যতটুকু মহান আল্লাহ শিখিয়েছেন। তাই ফেরেশতাদের এই বিনয় আদম-সন্তানকেও স্মরণে রাখা উচিত এবং কখনো ইবলীসের মতো জ্ঞানের বড়াইয়ে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়।

قَالَ يَاآدَمُ أَنْبِئْهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ فَلَمَّا أَنْبَأَهُمْ بِأَسْمَائِهِمْ قَالَ أَلَمْ أَقُلْ لَكُمْ إِنِّي أَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَأَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا كُنْتُمْ تَكْتُمُونَ

[আল-বাক্বারাহ: ৩৩ আয়াত]

এরপর মহান আল্লাহ আদম আলাইহিস সালাম-কে সেই সকল কিছুর নাম জানানোর জন্য বললেন আদম আলাইহিস সালাম সকল কিছুর নাম জানিয়ে দিলেন এর মাধ্যমে ফেরেশতাদের উপরে আদম আলাইহিস সালাম-এর জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলো। মানুষের মধ্যে ভালোমন্দ উভয় কাজ করার যে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল এবং যা দেখে ফেরেশতারা মানুষের থেকে ফিতনা-ফাসাদের আশঙ্কা করছিলেন, মানুষের সেই ইচ্ছাশক্তিকে ভালো কাজে লাগানোর জন্য মানুষকে জ্ঞানও দেওয়া হলো। মানুষের জ্ঞানই মানুষকে পৃথিবীর দায়িত্ব পালনে, হেদায়াতের রাস্তায় থাকতে এবং কল্যাণের কাজে সহযোগিতা করবে। যাহোক, আদম আলাইহিস সালাম যখন এভাবে সব নাম বলে দিলেন, তখন মহান আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং ফেরেশতাসহ সকল সৃষ্টিজীবের অজ্ঞতা ও দুর্বলতা উল্লেখ করে বললেনআমি তো তোমাদের বলেছিলাম, আসমান-যমীনের সকল অদৃশ্য জ্ঞান আমি রাখি শুধু তাই নয়, তোমরা যা প্রকাশ কর, তাও জানি আর তোমরা যা গোপন কর, সেটাও জানি এই বিষয়গুলো শুধু ফেরেশতাদের জন্য প্রযোজ্য নয়; বরং আদম-সন্তানের জন্যও প্রযোজ্য।

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ أَبَى وَاسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ الْكَافِرِينَ

[আল-বাক্বারাহ: ৩৪ আয়াত]

আদম আলাইহিস সালাম-এর এই জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হওয়ার পর মহান আল্লাহ এর স্বীকৃতিস্বরূপ উপস্থিত সকলকে তাকে সিজদা করার আদেশ দিলেন। সেখানে উপস্থিতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন ফেরেশতা; তবে একজন জিনও ছিল, যার নাম ইবলীস। ইবলীস তার জ্ঞান ও দীর্ঘ ইবাদতের কারণে আসমানে ফেরেশতাদের সঙ্গে অবস্থান ও যাতায়াতের সুযোগ লাভ করেছিল। কিন্তু সে ফেরেশতা ছিল না, সে ছিল জিন।

তবে উপস্থিত সংখ্যা বেশিরভাগ ফেরেশতা হওয়ায় মহান আল্লাহ ফেরেশতাদের নাম নিয়ে বললেনহে ফেরেশতারা! তোমরা আদমকে সিজদা করো ফেরেশতারা ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। নিজেদের জ্ঞান নিয়ে তাদের কোনো অহংকার ছিল না। তারা আগেই স্বীকার করেছিলেন যে, তারা ততটুকুই জানেন, যতটুকু আল্লাহ তাদের শিক্ষা দিয়েছেন। অদৃশ্যের জ্ঞান ও সব গূঢ় রহস্য একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। এই বিনয় ও আনুগত্যের কারণেই ফেরেশতারা কোনো দ্বিধা ছাড়াই সঙ্গে সঙ্গে সিজদায় অবনত হলেন।

কিন্তু ইবলীস ছিল ভিন্ন স্বভাবের। সে নিজের জ্ঞান ও মর্যাদা নিয়ে অহংকারে লিপ্ত ছিল। তাই সে পাল্টা যুক্তি দেখিয়ে বলল, মানুষ মাটি থেকে সৃষ্টি, আর আমি আগুন থেকে সৃষ্টি। সুতরাং আমার মর্যাদা মানুষের চেয়ে বেশি। তাই আদমকে সিজদা করা আমার জন্য অপমানজনক। এই অহংকার ও অবাধ্যতার কারণেই ইবলীস সিজদা করতে অস্বীকার করল এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল

وَقُلْنَا يَاآدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ

[আল-বাক্বারাহ: ৩৫ আয়াত]

আদম আলাইহিস সালাম-কে সৃষ্টির পর মহান আল্লাহ তার বাম পাঁজরের হাড় থেকে তার স্ত্রী হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করেন। তারপর তিনি আদম আলাইহিস সালাম-কে বললেনতুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো আর যা ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে ভক্ষণ করো তবে একটি নির্দিষ্ট গাছের নিকটবর্তী হয়ো না যদি এই গাছের নিকটবর্তী হও, তাহলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে মহান আল্লাহ চাইলে এই গাছ ভক্ষণ করার অনুমতি দিতে পারতেন, কিন্তু তখন আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার কোনো মানদণ্ড থাকত না। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও স্বতন্ত্র জ্ঞানের যে পরীক্ষা সেটি তখনই সম্ভব, যখন মানুষকে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা দেওয়া হবে। সীমারেখা মেনে চলার অর্থ পরাধীনতা নয়। কেননা আদম আলাইহিস সালাম-এর জন্য সমগ্র জান্নাতের সকল ফল ও সকল গাছ বৈধ ছিল। অর্থাৎ সে স্বাধীন ছিল, তবে সীমিত স্বাধীনতা; লাগামহীন স্বাধীনতা নয়। আর এটিই ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষের পরীক্ষার মানদণ্ড।

(ইনশা-আল্লাহচলবে)


* ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।

Magazine