سورةالبقرة
بسم الله الرحمن الرحيم
الم (1) ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ (2) الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ (3) وَالَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِمَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ وَمَا أُنْزِلَ مِنْ قَبْلِكَ وَبِالْآخِرَةِ هُمْ يُوقِنُونَ (4) أُولَئِكَ عَلَى هُدًى مِنْ رَبِّهِمْ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ (5)
الم
‘আলিফ-লাম-মীম’ বিচ্ছিন্ন কিছু বর্ণ, যাকে আরবীতে হুরূফে মুক্বাত্তা‘আত বলা হয়। বাংলায় যেমন আমরা বলি ক, খ, গ। তারপর কোনো কবিতা লেখা শুরু করি। যেমন কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ক, খ, গ এই বর্ণগুলোর মাধ্যমেই রচিত হয়েছে, তেমনি কুরআন মাজীদও আলিফ, লাম, মীম এই বর্ণগুলো দিয়েই তৈরি হয়েছে। এই বর্ণগুলো আরবদের নিকট পরিচিত হলেও তারা কুরআনের মতো একটি সূরা বা আয়াত তৈরি করতে ব্যর্থ, যা কুরআনের ভাষাগত মু‘জিযার একটি প্রমাণ বহন করে।
ذَلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِلْمُتَّقِينَ
‘আর মহান এই কিতাব কুরআন কারীম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে মর্মে এই কিতাবে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই’। নিশ্চিতভাবে এটি মহান আল্লাহর বাণী, যা জিবরীল আলাইহিস সালাম-এর মাধ্যমে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।
তাক্বওয়া শব্দের অর্থ পরহেয করা। মানুষ যেমন ডায়েট করা অবস্থায় সকল খাবার খায় না তথা মেপে ও বাছাই করে খায় এবং চিনিজাতীয়, ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট খাবার এড়িয়ে চলে, ভিটামিন ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেশি খায়; অনুরূপ বাস্তব জীবনের অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে যারা পরকালকে সামনে রেখে অন্তরের নূর ও পবিত্রতার জন্য ক্ষতিকর কাজগুলো এড়িয়ে চলতে চায়, তারাই মুত্তাক্বী। অন্ধকার রাস্তায় জঙ্গলের মধ্যে চললে যেমন সাপ-বিচ্ছু, জোঁক, পোকা-মাকড়, কাঁটা ইত্যাদি দেখে দেখে ধাপ ফেলতে হয়; তেমনি দুনিয়াতে চলার ক্ষেত্রে যারা এমনিভাবে ভ্রান্তি থেকে বেঁচে সঠিক রাস্তায় চলতে চায়, তাদের জন্য সঠিক পথ প্রদর্শনকারী হচ্ছে এই কিতাব।
الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ
গায়েব বা অদৃশ্য দ্বারা সকল ধরনের গায়েব উদ্দেশ্য। ফেরেশতা, শয়তান, রূহ, নাফস, জান্নাত, জাহান্নাম, কবরের আযাব, ক্বিয়ামত, জিনদের জগৎ, আসমানের জগৎ সবই গায়েবের অংশ। গায়েবের কার্যকরণের সূত্রের সাথে দুনিয়ার কার্যকরণের সূত্রের মিল নেই। দুনিয়ায় এক টাকা দান করলে কমে যায়, কিন্তু গায়েবে সেটা বেড়ে যায়। মুসলিমদের গোলামী থেকে মুক্তির প্রথম শর্তই হচ্ছে গায়েবে ইয়াক্বীন তৈরি করা। এজন্য মহান আল্লাহ নবীদেরকে বিভিন্ন গায়েব দেখাতেন, যেমনটা মি‘রাজের সফরে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখিয়েছেন। গায়েবে ইয়াক্বীন তৈরি হলেই আল্লাহর উপর ভরসা মযবূত হয়। ফেরাউনের মতো শক্তিশালী শাসকের বিরুদ্ধে দুর্বল ও অসহায় বানূ ইসরাঈলকে মুক্ত করার জন্য মূসা আলাইহিস সালাম-এর অন্তরে গায়েবে ইয়াক্বীন তৈরি করার লক্ষ্যেই তাকে মহান আল্লাহ লাঠি থেকে সাপে পরিণত করার মু‘জিযা দেখিয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে, মহান আল্লাহর শক্তির সামনে ফেরাউনের শক্তি শূন্য।
আর মুত্তাক্বী বা পরহেযগার ব্যক্তির কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তারা গায়েব বা অদৃশ্যের উপর ইয়াক্বীন রাখে।
وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ
মহান আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কখনোই বিজয় সম্ভব নয়। আর মহান আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো ছালাত। দুনিয়ার জগৎ থেকে গায়েবের জগতে যোগাযোগের মাধ্যম ছালাত। মানুষের মোবাইলে যেমন পাসওয়ার্ড, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ফেস ভেরিফিকেশন থাকে— এগুলো দিয়ে মোবাইলের লক ওপেন করা হয়; ছালাত তেমনি মহান আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার বন্ধ দরজাকে খুলে দেয়। হাজার মাইল দূর থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছাত্র যেমন শিক্ষকের সাথে লাইভ ক্লাস করে; ছালাত হলো তার চেয়েও হাজার গুণ উন্নত প্রযুক্তি, যা দিয়ে বান্দা সরাসরি মহান আল্লাহর সাথে লাইভ কানেক্টেড হয়। যতক্ষণ বান্দার অন্তর মহান আল্লাহর দিকে নিবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ মহান আল্লাহ বান্দার মুখোমুখি থাকেন। আর তাই ঈমান বিল গায়েবে ইয়াক্বীন অর্জনের পর মুত্তাক্বীরা নিয়মিত ছালাত প্রতিষ্ঠায় অভ্যস্ত হয়ে থাকে। আর প্রতিষ্ঠা অর্থ অন্যকে বাধ্য করা নয়, বরং নিজেই পরিপূর্ণ হুকুম-আহকাম ও খুশূ-খুযূর সাথে ছালাত আদায় করা।
وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ
গোলামী থেকে মুক্তির জন্য অর্থনৈতিক মুক্তি খুব জরুরী। অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য দান-ছাদাক্বার কোনো বিকল্প নেই তথা জান্নাত বিক্রি হয় টাকার বিনিময়ে। কুরআনে সবসময় ছালাতের সাথে যাকাত তথা অর্থনৈতিক ইবাদতকে যুক্ত করা হয়েছে। মুত্তাক্বীদের বৈশিষ্ট্য বলতে গিয়ে এখানেও মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর তাদেরকে আমি যে রিযিক্ব দিয়েছি, তা থেকে দান করে’। মহান আল্লাহ আমাদেরকে আমাদের টাকা দান করতে বলেননি, বরং তাঁরই দেওয়া টাকা দান করতে বলেছেন তথা মহান আল্লাহ আমাদের ধনসম্পদের উপর আমাদের মালিকানাকে অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এগুলো সব তিনিই দিয়েছেন। তাঁর দেওয়া টাকা তাঁর রাস্তায় ব্যয় করার মাধ্যমে তিনি আমাদের জান্নাত দিবেন। আর আল্লাহর সাথে এই ক্রয়-বিক্রয় একটি শতভাগ লাভজনক ব্যবসা। তাই প্রত্যেক মুত্তাক্বী মুমিনের উচিত হলো হালাল উপায়ে প্রচুর টাকা-পয়সা ইনকামের চেষ্টা করা এবং আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক
* ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,
সঊদী আরব; এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।
