কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রবের বাণী (পর্ব-৫)

post title will place here

মুমিন, মুত্তাক্বী ও কাফেরদের বর্ণনা দেওয়ার পর মহান আল্লাহ মুনাফিক্বদের বর্ণনা দিচ্ছেন। মরুভূমিতে ইঁদুরের মতো এক প্রজাতির প্রাণী বসবাস করে, যাদের দুই মুখওয়ালা মাটির গর্ত থাকে। দ্বিমুখী সুড়ঙ্গের কোনো একটি শত্রু সন্ধান পেয়ে গেলে সে অন্য মুখ দিয়ে বের হয়ে যায়। এই দ্বিমুখিতা থেকেই মুনাফিক্ব শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। মুনাফিক্বী মূলত দুই প্রকার— প্রথমত, আমলগত নিফাক্বী, যেমন- মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, গালি দেওয়া ইত্যাদি এবং দ্বিতীয়ত, প্রকৃত ও অন্তরের নিফাক্বী। মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করলেন এবং বদরের যুদ্ধে বিজয় অর্জন করলেন, তখন অনেকেই দুনিয়াবী সামাজিক কারণে নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিতে শুরু করে, অথচ তাদের অন্তরে কুফরী ছিল। তাদের উদ্দেশ্যেই মূলত এই আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়েছে।

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ

আর মানুষদের মধ্যে মুনাফিক্বরা দাবি করে যে, তারা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান আনয়ন করেছে। অথচ তারা একনিষ্ঠভাবে অন্তর থেকে ঈমান আনয়ন করেনি।

শেষ দিন অর্থ হলো- যেদিন সময় আর চলমান থাকবে না, স্থির হয়ে যাবে এবং মানুষ যেদিন অনন্তকালের জগতে প্রবেশ করবে সেটিই শেষ দিন।

يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ

যারা দুনিয়াবী স্বার্থের কারণে একনিষ্ঠতার সাথে অন্তর থেকে ঈমান আনয়ন করে না, তারা নিজেদেরকে অনেক বুদ্ধিমান মনে করে। তারা মনে করে, তারা এভাবে মহান আল্লাহ ও মুমিনদেরকে বোকা বানাচ্ছে। অথচ নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে, মূলত তারা নিজেরাই নিজেদেরকে ধোঁকা দিচ্ছে, কিন্তু তারা সেটা বুঝতে পারে না। কেননা তাদের এই ধোঁকা দুনিয়াতে ও শেষ বিচারের দিনে ধরা পড়বে। দুনিয়াতে যখন দ্বীনের উপর টিকে থাকার জন্য কোনো পরীক্ষার মুখোমুখি হবে, তখন তারা কষ্ট করার ভয়ে নিজের মুনাফিক্বী প্রকাশ করে দিবে যেমন উহুদের যুদ্ধে জীবন বাঁচাতে মুনাফিক্বরা করেছিল। আর পরকালে তো মহান আল্লাহ অন্তর দেখবেন। সুতরাং মুনাফিক্বরা দুনিয়াতে ও পরকালে উভয় জগতে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে।

فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ فَزَادَهُمُ اللَّهُ مَرَضًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْذِبُونَ

তাদের অন্তরে মুনাফিক্বীর রোগ রয়েছে আর মহান আল্লাহ এই রোগকে আরো বাড়িয়ে দেন। তথা মহান আল্লাহ মুনাফিক্বদের ছাড় দেন। আর তারাও মনে করে যে, যেহেতু তাদের চালাকি ও কৌশল সফল হচ্ছে, তাই তারা আরো অধিক মুনাফিক্বীর পথে এগিয়ে যায়। এভাবে তারা পূর্ণ মুনাফিক্বে পরিণত হয়। আর তাদের এই মিথ্যা ও ধোঁকার কারণে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ لَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ قَالُوا إِنَّمَا نَحْنُ مُصْلِحُونَ - أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ الْمُفْسِدُونَ وَلَكِنْ لَا يَشْعُرُونَ

পৃথিবীতে যুগে যুগে এই ধরনের দ্বিচারিতায় পরিপূর্ণ অসংখ্য মানুষ রয়েছে। আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা এভাবে দ্বিমুখী আচরণের মাধ্যমে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, তখন তারা উত্তরে বলে, আমরা বরং শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী। আজকের যুগেও সন্ত্রাসী দেশগুলো নিজেদেরকে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে প্রচার করে। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামেই তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। একই অবস্থা ছিল মদীনার মুনাফিক্বদের। অথচ প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, সৃষ্টিকে তার সৃষ্টিকর্তার নিয়ম অনুযায়ী পরিচালনা করা। সৃষ্টিকর্তার নিয়মের ব্যত্যয় ঘটানো সৃষ্টিজীবের ক্ষতি আর এটিই ফেতনা-ফাসাদ। অতএব, যারা মহান আল্লাহর বিধানের প্রতি অন্তর থেকে ঈমান আনয়ন করে না, তারা ফাসাদ সৃষ্টিকারী; যদিও তারা বুঝতে পারে না।

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ آمِنُوا كَمَا آمَنَ النَّاسُ قَالُوا أَنُؤْمِنُ كَمَا آمَنَ السُّفَهَاءُ أَلَا إِنَّهُمْ هُمُ السُّفَهَاءُ وَلَكِنْ لَا يَعْلَمُونَ

তাদের এই মুনাফিক্বী বুঝতে পেরে মদীনার মুমিনগণ তাদেরকে একনিষ্ঠ আত্মসমর্পণের দাওয়াত দেয়। তারা তাদেরকে ছাহাবীদের মতো নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে একনিষ্ঠভাবে ঈমান আনার জন্য বললে তারা উত্তরে বলে, আমরা তাদের মতো বোকা নই। তাদের কাছে মুমিন ছাহাবীদের সামাজিক স্ট্যাটাস ছিল অনেক নিচু ও হীন। তারা নিজেদের স্ট্যাটাসকে অনেক বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ ও সামাজিকভাবে উঁচু মনে করত। তাই তারা উত্তরে ছাহাবীদেরকে নির্বোধ বলে সম্বোধন করে। আজকের ‍যুগেও যারা ইসলাম পূর্ণভাবে মানতে চায়, তাদেরকে সমাজের নিচু বা বোকা মনে করা হয়। চাকরির জন্য যারা দাড়ি কাটতে আগ্রহী নয়, তাদেরকে এলিট শ্রেণি ‘ক্ষ্যাত’ (অনগ্রসর) মনে করে। তবে মহান আল্লাহর দৃষ্টিতে যারা দুনিয়াবী স্বার্থের জন্য দ্বীন বিসর্জন দেয়, তারাই বোকা। কেননা দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী আর পরকাল চিরস্থায়ী। তাই তো মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর জেনে রাখো, প্রকৃত অর্থে এই মুনাফিক্বরাই নির্বোধ; যদিও তারা তা জানে না’।

وَإِذَا لَقُوا الَّذِينَ آمَنُوا قَالُوا آمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا إِلَى شَيَاطِينِهِمْ قَالُوا إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِئُونَ

মুনাফিক্বদের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা যখন মুমিনদের সাথে উঠাবসা করে, তখন নিজেদেরকে মুমিন বলে পরিচয় দেয় আর যখন তাদের শয়তানদের কাছে যায়, তখন তাদেরকে বলে, আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি; বরং আমরা মুমিনদের সাথে মজা নিচ্ছি এবং ঠাট্টা করছি মাত্র। শয়তান দ্বারা এখানে মানুষ শয়তানই উদ্দেশ্য। তারা যেমন একদিকে মুমিন সাজার বাহানা করে দুনিয়াবী সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখত, আবার ইয়াহূদী ও মুশরিক শয়তানদের কাছে গিয়ে মুসলিমদের গোপন কথা বলে মুসলিমদের সাথে শত্রুতা করত। আর তারা মুসলিমদের সহজতা ও সরলতা নিয়ে হাসি ঠাট্টা করত। তারা তাদের এই ধোঁকাবাজি ও চালাকিকে অত্যন্ত গর্বের সাথে বর্ণনা করত।

اللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِي طُغْيَانِهِمْ يَعْمَهُونَ

তাদের গর্ব, অহংকার ও হাসি-ঠাট্টার জবাবে মহান আল্লাহ বলেন, মহান আল্লাহ নিজেও তাদের সাথে ঠাট্টা করছেন। আর মহাপরাক্রমশালী সত্তা যদি কারো সাথে উপহাস করেন, তাহলে তার অবস্থা কী হতে পারে? তারা যেমন এটা ভেবে গর্ব করছে যে, মুমিনরা তাদের চালাকি ধরতে পারে না। মহান আল্লাহ তেমনি তাদেরকে একটি ভ্রমের মধ্যে রেখে দিয়েছেন। যেমনটা বড়শির খাবার মুখে নিয়ে যখন মাছ দৌড়ে যায়, তখন সেও একটা ভ্রমের মধ্যে থাকে। কেননা তখন বড়শি নিক্ষেপকারী ব্যক্তি তার সুতা ঢিল দিয়ে রাখেন। ঠিক আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে তাদের পথভ্রষ্টতা ও অহংকারের ভ্রমে তাদেরকে ঢিল দিয়ে রেখেছেন। বড়শির লাঠি অথবা ঘুড়ির নাটাইয়ের মতো মানুষের জীবন-মৃত্যু থেকে সকল কিছুর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ মহান আল্লাহর হাতে আর এটিই তাঁর ঠাট্টা। কেননা যখন তিনি পাকড়াও করবেন, তখন কারো কোনো কৌশল কাজে আসবে না। অতএব, প্রকৃত বোকা তারাই এবং প্রকৃত হাসির পাত্র তারাই; মুমিনেরা নয়। মুমিনদের সাথে রয়েছেন মহাপরাক্রমশালী মহান আল্লাহ নিজেই।

أُولَئِكَ الَّذِينَ اشْتَرَوُا الضَّلَالَةَ بِالْهُدَى فَمَا رَبِحَتْ تِجَارَتُهُمْ وَمَا كَانُوا مُهْتَدِينَ

 কল মুনাফিক্বরা এভাবে ধোঁকাবাজির মাধ্যমে মূলত দ্বীনের বিনিময়ে দুনিয়া ক্রয় করেছে। হেদায়াতের বিনিময়ে পথভ্রষ্টতা ক্রয় করেছে তাদের এই ক্রয়-বিক্রয় লাভজনক নয় তারা চাইলে প্রকৃত অর্থে হেদায়াত গ্রহণ করতে পারত, কেননা তাদের অন্তর কাফেরদের মতো মোহর মারা মৃত নয়; বরং তাদের অন্তর অসুস্থ। যেখানে হেদায়াতের নূর প্রবেশ করেছিল, কিন্তু তারা সেই নূর আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে হেদায়াতপ্রাপ্ত হতে পারেনি

مَثَلُهُمْ كَمَثَلِ الَّذِي اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهُ ذَهَبَ اللَّهُ بِنُورِهِمْ وَتَرَكَهُمْ فِي ظُلُمَاتٍ لَا يُبْصِرُونَ - صُمٌّ بُكْمٌ عُمْيٌ فَهُمْ لَا يَرْجِعُونَ

মুনাফিক্বদের এই অবস্থাকে আরো স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য মহান আল্লাহ দুটি বাস্তব উদাহরণ পেশ করেছেন। প্রথমত, তাদের দৃষ্টান্ত এমন ব্যক্তির ন্যায়, যে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে এক টুকরো আলোর ব্যবস্থা করল। অতঃপর যখন চারিদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ল, তখনই মহান আল্লাহ তাদের দৃষ্টিশক্তি ছিনিয়ে নিলেন আর তারা পুনরায় অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে গেল। এই দৃষ্টান্ত সেই মুনাফিক্বদের জন্য, যারা সত্যের নূর দেখার পরও সামান্য দুনিয়াবী স্বার্থের কারণে সেই নূরকে গ্রহণ করতে পারেনি। তথা আলো পাওয়ার পরেও তারা অন্ধকারে ডুবে গেছে, তাদের কান থাকার পরেও যেন তারা বধির, মুখ থাকার পরেও বোবা, চোখ থাকার পরও অন্ধ। তাই তাদের পক্ষে আর অন্ধকার থেকে প্রত্যবর্তন করা সম্ভব নয়।

أَوْ كَصَيِّبٍ مِنَ السَّمَاءِ فِيهِ ظُلُمَاتٌ وَرَعْدٌ وَبَرْقٌ يَجْعَلُونَ أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ مِنَ الصَّوَاعِقِ حَذَرَ الْمَوْتِ وَاللَّهُ مُحِيطٌ بِالْكَافِرِينَ - يَكَادُ الْبَرْقُ يَخْطَفُ أَبْصَارَهُمْ كُلَّمَا أَضَاءَ لَهُمْ مَشَوْا فِيهِ وَإِذَا أَظْلَمَ عَلَيْهِمْ قَامُوا وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَذَهَبَ بِسَمْعِهِمْ وَأَبْصَارِهِمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

দ্বিতীয়ত, তাদের দৃষ্টান্ত এমন ব্যক্তির ন্যায়, যে এক বৃষ্টিস্নাত দিনে পথ চলছে, যেখানে চারিদিক অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ থেকে বৃষ্টি হচ্ছে, সাথে মেঘের গর্জন  বিজলি চমকও রয়েছে মেঘের গর্জনে মৃত্যুর ভয়ে তারা তাদের কানে ঙু প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে বিজলির চমক যেন তাদের দৃষ্টিশক্তিকে কেড়ে নিচ্ছে এই রকম ভয়ঙ্কর পরিবেশে যখনই বিজলি থেকে একটু আলো প্রকাশ পাচ্ছে, তখনই তারা সেই আলোতে চলার চেষ্টা করছে আর যখন আলো বিদায় নিচ্ছে, তখন তারা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকছে যদি মহান আল্লাহ চাইতেন, তাহলে তাদের দৃষ্টি  শ্রবণশক্তি একেবারে ছিনিয়ে নিতেন আর মহান আল্লাহ কাফেরদেরকে চারিদিক থেকে ঘিরে রেখেছেন আর তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান

এই দৃষ্টান্ত তাদের জন্য, যারা ঈমানের নূর পেয়েছে ঠিকই; কিন্তু দুনিয়াবী বিপদ-আপদে সেই নূরের উপর টিকে থাকার ইস্তিক্বামাত, ছবর ও হিম্মত তাদের নেই। সামান্য বিপদেই তারা দ্বীন বিসর্জন দিয়ে দেয়। তাদের অবস্থা সেই ব্যক্তির ন্যায়, যে দুনিয়াবী বিপদ-আপদের ভয়ে অহীর নূর থেকে পূর্ণ উপকার গ্রহণ করতে পারছে না।

অতএব, মুনাফিক্বী থেকে বাঁচতে কোনো দুনিয়াবী স্বার্থের লোভে অথবা কোনো দুনিয়াবী বিপদ-আপদ ও মৃত্যুর ভয়ে ঈমানের নূর পরিত্যাগ করা যাবে না। বরং তাকে পরিপূর্ণভাবে আলিঙ্গন করতে হবে। ঈমানের উপর অটল থাকার জন্য সকল দুনিয়াবী স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে পরকালের বিজয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। শুধু স্বার্থ বিসর্জন নয়, বরং সকল দুনিয়াবী বিপদ-আপদ এমনকি মৃত্যু ভয়কে জয় করতে হবে।

يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ - الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

সূরা আল-বাক্বারার শুরু থেকে এতক্ষণ পর্যন্ত তিন ধরনের বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মানুষ আমরা দেখেছি— মুত্তাক্বী, কাফের ও মুনাফিক্ব। কুরআনের নূরের আলো যে পূর্ণরূপে গ্রহণ করেছে, সেই মুত্তাক্বী; যার অন্তর মৃত ও মোহর মারা, সে কাফের এবং যে নূর পেয়েও দুনিয়াবী কারণে পরিপূর্ণ গ্রহণ করতে পারেনি, সে মুনাফিক্ব। এই আলোচনার পর মহান আল্লাহ কুরআনের মূল দাওয়াতকে মানুষের সামনে স্পষ্ট করে তুলছেন। কুরআনের সারমর্ম দাওয়াত হচ্ছে, ইলাহ হওয়ার একমাত্র যোগ্য সেই, যে রব। তথা ইবাদতের একমাত্র যোগ্য সেই, যে সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে এবং পৃথিবীর সকল ব্যবস্থাপনা যার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। মহান আল্লাহ পৃথিবীর সকল মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্বোধন করে তাদেরকে বলছেন, হে দুনিয়ার সকল মানুষতোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত করো, যিনি শুধু তোমাকে সৃষ্টি করেননি; বরং তোমাকে, তোমার পূর্বে এবং তোমার পরের সকলকে সৃষ্টি করেছেন যিনি পৃথিবী গোলাকার এবং ঘূর্ণায়মান হওয়ার পরেও সেখানে তোমাদের বসবাসের ব্যবস্থা করেছেন ঠিক যেভাবে তোমরা তোমাদের বিছানায় আারামে ঘুমাও, এই পৃথিবীও তেমনি বসবাসের জন্য মহাশূন্যের মধ্যে সবচেয়ে আরামদায়ক গ্রহ। তোমাদের বাড়ির ছাদ যেমন তোমাদেরকে বাইরের সকল বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে, পৃথিবীর আকাশও এমনভাবে সাজানো যে সূর্যের সকল ক্ষতিকর রশ্মি, উল্কাপিণ্ড ইত্যাদি থেকে তোমাদেরকে রক্ষা করে।

শুধু তাই নয়, এই পৃথিবীতে জীবন ধারণের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ হচ্ছে পানি, যা অন্য গ্রহে নেই। সেই পানি তিনি আকাশ থেকে বর্ষণ করেন এবং সেই পানি দিয়েই তিনি মাটি থেকে ফল-ফলাদি  শস্য উৎপাদন করে থাকেন তথা মানুষের জীবন ধারণের সবেচেয় গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিষয় মাটি ও পানি আর এই দুটির একচ্ছত্র মালিক হলেন মহান আল্লাহ। অতএব, যেহেতু তোমরা জান সৃষ্টির ক্ষমতা আল্লাহর, পানি দেওয়ার ক্ষমতা আল্লাহর, মাটি থেকে ফসল ফলানোর ক্ষমতা আল্লাহর; সেহেতু তোমরা ইবাদত করার ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে যুক্ত করো না

আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক*

 ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।

Magazine