কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রবের বাণী (পর্ব-৬)

post title will place here

وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ

মহান আল্লাহ পূর্বের আয়াতে শিরক না করার যে আদেশ দিয়েছেন, সে আদেশ অনেক সময় এ অজুহাতে লঙ্ঘন করা হয় যে, তারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্যই এসব শিরক করে। যেমন তারা বলে, ‘আমরা আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দাদের সন্তুষ্টির মাধ্যমে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে চাই’। 

তাই যখন আল্লাহ স্পষ্টভাবে শিরক না করার নির্দেশ দেন, তখন সন্দেহ তৈরি হয়—এই আদেশ সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে কি-না। এজন্যই আল্লাহ চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলছেন, আমি আমার বান্দার উপর যে কুরআন নাযিল করেছি, সে বিষয়ে যদি তোমাদের সন্দেহ থাকে, তবে এর মতো একটি সূরা নিয়ে আসো...’

এটি শুধু একক চ্যালেঞ্জ নয়। বরং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সব সাহায্যকারী—মানুষ, জিন, শয়তান সবাইকে ডাকো, সবার সাহায্য নাও! সবাই মিলে চেষ্টা করো! যদি তোমরা সত্যবাদী হও।

فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ

তোমরা কখনো তা পারবে না’আরযখন তোমরা কুরআনের একটি সূরার মতো কোনো সূরা বানাতে পারবে না, তখন এটি প্রমাণিত হবে যে, কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকেই অবতীর্ণ। আর এটি প্রমাণিত হওয়ার পরও যদি তোমরা শিরকে লিপ্ত থাকো, তবে জাহান্নামকে ভয় করো! তোমাদের জন্য রয়েছে সেই জাহান্নাম যা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে আর যার জ্বালানি মানুষ ও পাথর।

এখানে গভীর তাৎপর্য আছে। যারা মূর্তি পূজা, খাম্বা পূজা ও করব পূজার মাধ্যমে শিরক করে, তাদের এই সকল শিরকগুলো ইট-পাথরের তৈরি। আল্লাহ জানিয়ে দিলেন, তোমরা যেমন জাহান্নামে থাকবে, তেমনি যাদের উপাসনা করতে সেই পাথরের মূর্তি ও খাম্বাও সেখানে থাকবে। এটি তাদের জন্য চরম লাঞ্ছনা ও শিক্ষা।

وَبَشِّرِ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ كُلَّمَا رُزِقُوا مِنْهَا مِنْ ثَمَرَةٍ رِزْقًا قَالُوا هَذَا الَّذِي رُزِقْنَا مِنْ قَبْلُ وَأُتُوا بِهِ مُتَشَابِهًا وَلَهُمْ فِيهَا أَزْوَاجٌ مُطَهَّرَةٌ وَهُمْ فِيهَا خَالِدُونَ

 আল্লাহ তাঁর নিয়ম অনুযায়ী জাহান্নামের বর্ণনার পরই জান্নাতের সুসংবাদ দেন। তিনি বলেন, সুসংবাদ দিন তাদেরকে, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে...’

এখানে লক্ষ্যণীয়, আল্লাহ অধিক আমলের কথা বলেননি; বলেছেন, সৎ আমল। সৎ আমল মানে দুটি শর্ত— ১. ইখলাছ, লোক দেখানো নয়; একমাত্র আল্লাহর জন্য। ২. সুন্নাহর অনুসরণ, নিজের মনমতো ইবাদত নয়; রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর পদ্ধতিতে হতে হবে।

ঈমান ও সৎ আমল যাদের থাকবে, তাদের জন্য থাকবে জান্নাত, যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হবে নদীনালা। যখনই তাদের ফলমূল দেওয়া হবে, তারা বলবে, ‘এ রিযিক্ব তো আমরা পূর্বেও পেয়েছি’ অর্থাৎ ফলগুলো দুনিয়ার পরিচিত ফলের মতো হবে কিন্তু স্বাদ, গুণ ও আনন্দ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও উন্নত। প্রতিবারই নতুন স্বাদ অনুভূত হবে। সেখানে তাদের জন্য থাকবে পবিত্র সঙ্গীএবং তারা সেখানে চিরস্থায়ী হবে।

إِنَّ اللَّهَ لَا يَسْتَحْيِي أَنْ يَضْرِبَ مَثَلًا مَا بَعُوضَةً فَمَا فَوْقَهَا فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَبِّهِمْ وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَيَقُولُونَ مَاذَا أَرَادَ اللَّهُ بِهَذَا مَثَلًا يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ

সূরা আল-বাক্বারা একটি মাদানী সূরা। এই সূরার পূর্বে অবতীর্ণ হওয়া কিছু মাক্কী সূরায় যেমন সূরা আল-হাজ্জ এর ৭৩ নম্বর আয়াতে মাছি ও সূরা আল-আনকাবূত এর ৪১ নম্বর আয়াতে মাকড়সাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রাণীর উদাহরণ দেওয়া হয়েছিল। কুরআনের প্রতি সন্দেহ পোষণের দলীল হিসেবে কেউ কেউ এগুলোকে পেশ করত। তাদের জবাব দিয়ে কুরআনের সত্যতা প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত আয়াতের ধারাবাহিকতায় মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো উদাহরণ দিতে লজ্জাবোধ করেন না—তা মশা হোক বা তার চেয়েও ক্ষুদ্র কিছু’

আল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন, সৃষ্টির ক্ষুদ্রতা দিয়ে তার গুরুত্ব নির্ধারিত হয় না। ছোট প্রাণীর মধ্যেও রয়েছে বিস্ময়কর হিকমাহ ও নিখুঁত সৃষ্টি। যেমন মশা মানুষের গন্ধ ও নিঃশ্বাস চিনতে পারে। মশার হুল থেকে এমন এনজাইম নিঃসরণ হয়, যা ব্যথানাশক এনেস্থিসিয়ার মতো কাজ করে। মানুষ শুরুতে বুঝতে পারে না। আবার মাছির চোখে ৬ হাজার লেন্স থাকে। সামনে পিছনে সব দিকে একসাথে দেখতে পায়। সে তার পা দিয়ে খাবারের স্বাদ নেয়। অন্যদিকে মাকড়সার শরীর থেকে যে মানের ফাইবার বের হয়, সেই মানের ফাইবার মানুষ এখনো তৈরি করতে পারেনি। মাকড়সার জ্যামিতিক সূক্ষ্মতাও অনেক আশ্চর্যের। যাহোক, মুমিনরা বুঝে এটি তাদের রবের পক্ষ থেকে সত্য। আর কাফেররা বলে, ‘এ উদাহরণ দিয়ে আল্লাহ কী বোঝাতে চাইলেন?’

আল্লাহ চাইলে তো সমালোচনা এড়ানোর জন্য এমন উদাহরণ নাও দিতে পারতেন। মহান আল্লাহ জানিয়ে দিচ্ছেন, এগুলো সবই পরীক্ষা। বাস্তব জীবনে বিপদে পড়লে যেমন বন্ধুর পরিচয় বুঝা যায়, আল্লাহর প্রতি মানুষের ধারণা কেমন এই ধরনের উদাহরণ ও আয়াতের প্রতি ঈমান থেকে সেটা বুঝা যায়।

এর মাধ্যমে অনেকেই হেদায়াত পায়, অনেকেই পথভ্রষ্ট হয়ে যায়। তবে পথভ্রষ্ট হয় কেবল ফাসেক্বরা।

الَّذِينَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِنْ بَعْدِ مِيثَاقِهِ وَيَقْطَعُونَ مَا أَمَرَ اللَّهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ

কারা সেই ফাসেক্ব? ‘যারা আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত’

রূহের জগতে মানুষ আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছে, তাঁকেই রব হিসেবে মানবে। কিন্তু তারা সে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করে এবং সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করে। এই তিনটির প্রত্যেকটিই একটি আরেকটির সাথে সম্পৃক্ত। আল্লাহর সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করলে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা সহজ হয়ে যায়। আর এই দু’টি ঘটলে ফাসাদ এমনিই ছড়িয়ে পড়ে।

অতএব, এই আয়াতসমূহে তিনটি বিষয় স্পষ্ট— ১. শিরকের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জ। ২. কুরআনের ভাষাগত ও জ্ঞানগত মু‘জিযা। ৩. ঈমান ও ফিসক্বের মধ্যকার পার্থক্য, যেখানে একই উদাহরণ কারও জন্য হেদায়াত, কারও জন্য পথভ্রষ্টতার কারণ।

 আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রাযযাক

ফাযেল, দারুল উলূম দেওবান্দ, ভারত; বিএ (অনার্স), মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
এমএসসি, ইসলামিক ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইউনিভার্সিটি অফ ডান্ডি, যুক্তরাজ্য।

Magazine