গুনাহ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা বান্দার ঈমানের পরিচায়ক। যদি মুমিন ব্যক্তি যথাযথ বিশ্বাস রাখে যে, তাকে তার রবের সামনে নিজের কথা ও কর্মের হিসাব দিতে হবে, তাহলে সে অবশ্যই হারাম-হালাল ও বৈধ-অবৈধের মাঝে পার্থক্য করবে। সমাজে এই বিশ্বাস যেই পরিমাণ দুর্বল হবে, হারাম ও অশ্লীলতা সেই পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। তাই প্রত্যেকটি মুসলিমসমাজের কর্তব্য হলো সেই ঈমানী পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য অবিরাম চেষ্টা করা। মানুষ গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে তবেই আল্লাহ তাআলার কাছে প্রিয় ও তাঁর নিকটবর্তী হতে পারবে। যে নিজেকে গুনাহ থেকে পবিত্র রাখে, সে আল্লাহর নিকট সম্মানিত। গুনাহ কখনো শান্তির মাধ্যম হতে পারে না।
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুঅতের আগে থেকেই নিজেকে গুনাহ, অশ্লীলতা, পৌত্তলিকতা, যেনা-ব্যভিচার, গান-বাজনা, মাদকদ্রব্য পান ইত্যাদি থেকে পবিত্র রাখতেন। অনুরূপভাবে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারাম খাদ্য সম্পর্কেও পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করতেন।
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضي الله عنه عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «إِنِّى لأَنْقَلِبُ إِلَى أَهْلِى فَأَجِدُ التَّمْرَةَ سَاقِطَةً عَلَى فِرَاشِى فَأَرْفَعُهَا لآكُلَهَا ثُمَّ أَخْشَى أَنْ تَكُونَ صَدَقَةً فَأُلْفِيَهَا».
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমি কোনো একদিন বাড়ি ফিরে দেখি যে, আমার বিছানার উপর একটি খেজুর পড়ে আছে, আমি তা খাওয়ার জন্য উঠাই, তখনই আমার আশঙ্কা হয় যে, সম্ভবত এ খেজুর ছাদাক্বার। তাই আমি তা ছুড়ে ফেলি’।[1]
কারণ নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য ছাদাক্বা-যাকাত গ্রহণ করা অবৈধ ছিল।[2] হালাল ও হারাম বাছাই করতে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহযুক্ত বস্তু থেকেও সাবধান থাকতেন। পক্ষান্তরে আমরা সুস্পষ্ট অবগতির পরও নানা হারাম ব্যবসায় জড়িত। আমাদের বিরুদ্ধাচরণ সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আমরা সম্পদের চরম নেশায় আত্মহারা হয়ে হালাল-হারাম তো পরওয়া করিই না, উপরন্তু কল্যাণকামী ও উপদেশ প্রদানকারী উলামায়ে কেরামকে বহু অবৈধ বিষয়ে নীরব থাকতে পর্যন্ত বাধ্য করি। আমরা দাম্ভিকতায় উন্মাদ হয়ে ইসলামী শিক্ষাকে তুচ্ছ ও দারিদ্র্যের নিশ্চিত কারণ মনে করি, সন্তানসন্ততিকে কুরআন ও ইসলামী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রেখে নিজেদেরকে জ্ঞানী আর অন্যদেরকে নির্বোধ বিবেচনা করি। ওহে জাতির লোকেরা! তোমাদের এ দুরবস্থা সত্যিই হৃদয়বিদারক!
অপরদিকে ইন্টারনেটের এ যুগে আমরা যেভাবে গুনাহে লিপ্ত হয়েছি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নারীর ছবি, মিউজিক, মিথ্যা কৌতুক, অবৈধ সম্পর্ক, জুয়া, সময়ের অপচয়... আরও কত কী! অনেক সময় যখন বৈধ কোনো ভিডিওতে অবৈধ মিউজিক চলে, তখন আমরা মনে করি যে, আমি তো ভিডিও দেখছি, মিউজিক তো শুনি না। এটাও শয়তানের একটা ওয়াসওয়াসা।
যারা ইন্টারনেটে পাপাচারে লিপ্ত, তওবা যাদের চিন্তনেই আসে না, তাদের হৃদয় দিনের পর দিন কঠোর হয়ে যাচ্ছে এবং তারা মহান আল্লাহর বিশেষ দয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। হে আল্লাহ! আমরা এ অবস্থা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই।
এ পৃথিবীতে অসংখ্য ফেতনা রয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যায়। কিন্তু আপনি কি জানেন, সর্বাপেক্ষা ধ্বংসাত্মক ফেতনা কী?
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ رضي الله عنهما عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «مَا تَرَكْتُ بَعْدِى فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ».
উসামা ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আমি আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে বড় কোনো ফেতনা ছেড়ে যাইনি’।[3]
আমাদের যুবকদের চারিত্রিক অবক্ষয়ের বড় একটা কারণ হলো এই ফেতনা। নিজের ছেলেমেয়েকে আল্লাহভীরু ও লজ্জাশীল করে গড়ে তুলুন। কো-এডুকেশন বা সহশিক্ষা ও অবৈধ মেলামেশা থেকে তাদের দূরে রাখুন। বিবাহসহ অন্যান্য সকল অনুষ্ঠানে তরুণ-তরুণীদের অবাধ মেলামেশার বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। যুবকদের দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করুন।
নারীদের ফেতনা এক বড় ফেতনা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ফেতনা থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতেন। উমায়মা বিনতু রুক্বায়ক্বা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে বায়আত করার জন্য আমরা কয়েকজন মহিলা তাঁর কাছে আসলাম... আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা আপনার হাতে হাত রেখে বায়আত করতে চাই। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমি নারীদের সাথে হাত মেলাই না’। বায়আতের সময় হাতে হাত রাখা হয়, কিন্তু নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের সাথে এরূপ বায়আত করলেন না। অতঃপর তিনি বললেন, ‘আমার একজন মহিলার সাথে কথা বলা ও একশজন মহিলার সাথে কথা বলা সমান। আমার একজনের সাথে বায়আত করা বাকীদের জন্য যথেষ্ট’।[4]
এ ফেতনার যুগে মুক্তির পথ হলো নিজের চক্ষুকে নিয়ন্ত্রণ করা। কারণ চোখ হৃদয়ের জন্য বার্তাবাহক। যখন চোখ কোনো হারাম বস্তু দেখে, তখন হৃদয় তা নিয়ে ভাবতে শুরু করে এবং শয়তান সেই হারামে লিপ্ত হওয়ার প্ররোচনা দিতে থাকে।
জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো এক মহিলার উপর চোখ পড়ল, (কোনো নারীকে দেখে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনে ওয়াসওয়াসা আসতে পারে এমন ধারণা রাখা যাবে না)’।[5] কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে) নিজের স্ত্রী যায়নাব বিনতু জাহশ রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে আসলেন, প্রয়োজন পূরণ করার পর ছাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করে বললেন,إنّ المَرْأَةَ تُقْبِلُ في صُورَةِ شيطانٍ، وتُدْبِرُ في صُورَةِ شيطانٍ، فَإذا أبْصَرَ أحَدُكُمُ امْرَأَةً فَلْيَأْتِ أهْلَهُ؛ فإنّ ذلكَ يَرُدُّ ما في نَفْسِهِ ‘নারী শয়তানের রূপে আসে, শয়তানের রূপে যায়; তাই যখন কেউ কোনো নারীকে দেখবে, সে যেন নিজের স্ত্রীর কাছে চলে যায়। কারণ কেউ যদি এরূপ করে, তাহলে তার ওয়াসওয়াসা কেটে যাবে’।[6]
শয়তানের রূপে আসা-যাওয়ার অর্থ এই যে, সে ফেতনা ও ওয়াসওয়াসার কারণ।[7] নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্দেহের কারণ থেকেও দূরে থাকতেন।
উম্মুল মুমিনীন ছাফিয়্যাহ বিনতু হুয়াই রাযিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, রামাযানের শেষ দশকে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ই‘তিকাফে ছিলেন। আমি তাঁর সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে গেলাম, কিছুক্ষণ কথা বলার পর আমি তাঁর কাছ থেকে ফিরে আসলাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার সাথে ছিলেন, যখন আমরা দরজার কাছে পৌঁছলাম, তখন পাশ দিয়ে দুজন আনছারী ছাহাবী যাচ্ছিলেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনে আশঙ্কা হলো যে, এরা তাঁর সম্পর্কে কুধারণা করতে পারে, তাই তিনি বলতে লাগলেন, ‘দাঁড়াও, ইনি ছাফিয়্যাহ বিনতু হুয়াই, অন্য কেউ নন’। তারা বললেন, সুবহানাল্লাহ! হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একথা তাদের কঠিন মনে হলো। হুশাইমের বর্ণনায় রয়েছে, তারা বললেন, আমরা কি আপনার সম্পর্কে কুধারণা করতে পারি?[8] নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরায় চলাচল করে, তাই আমার ভয় হলো যে, তোমাদের মনে শয়তান কোনো ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করতে পারে’।[9]
সর্বদা গুনাহ ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকাই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ, আমরা কি তাঁর এই আদর্শ গ্রহণ করতে পেরেছি? আমরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসা দাবি করি, তাঁর বিরুদ্ধে একটা শব্দও সহ্য করি না; কিন্তু বাতিল আক্বীদা, অবৈধ কথা ও কর্মে নিরন্তর তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকি। আল্লাহ আমাদের হেদায়াত দান করুন- আমীন!
হাসান আল-বান্না মাদানী
কালিয়াচক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত; মুহাদ্দিছ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৭০।
[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০৬৯।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৯৬।
[4]. নাসাঈ, হা/৪১৮১।
[5]. ইকমালুল মু‘লিম, ৪/৫৩১।
[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০৩।
[7]. ইকমালুল মু‘লিম, ৪/৫৩১।
[8]. ফাতহুল বারী, ৪/২৭৯।
[9]. ছহীহ বুখারী, হা/২০৩৫।
