কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কুরআনুল কারীমের প্রতি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভালোবাসা

post title will place here

আল-কুরআনুল কারীম সমগ্র জগতের একচ্ছত্র অধিপতি মহান আল্লাহর বাণী। কুরআন মানবজাতির জন্য এক মহা নেয়ামত; এটি হেদায়াতের আলো, দয়ার প্রতীক, আরোগ্যের মাধ্যম, বরকতের উৎস এবং প্রশান্তির এক অনন্য অবলম্বন। কুরআন ও সৌভাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কুরআনবিহীন জীবন যেন বৃষ্টিবিহীন শুষ্ক মাটি, ধু-ধু মরুভূমি কিংবা শুকিয়ে যাওয়া বৃক্ষের মতো। কুরআন থেকে দূরে সরে মর্যাদা প্রত্যাশা করা মানে মরীচিকায় তৃষ্ণা মেটানোর আশা করা। কুরআন ছেড়ে কিছুই অর্জিত হয় না, আর কুরআনকে আঁকড়ে ধরলে প্রকৃত অর্থে কিছুই হারিয়ে যায় না।

যেমন কেবল কথায় মধুর স্বাদ বোঝানো কঠিন, তেমনি শুধু শব্দে কুরআনের মাধুর্য প্রকাশ করাও অসম্ভব। মসজিদের আলমারিতে দীর্ঘদিন ধরে সাজিয়ে রাখা মুছহাফগুলোর দিকে তাকালে আমাদের বুক কষ্টে ভারী হয়ে ওঠা উচিত, চোখ অশ্রুসজল হওয়া উচিত এবং অন্তর লজ্জায় নত হয়ে যাওয়া উচিত।

যে জনপদে রাতে তাহাজ্জুদের সময়ে কুরআনের সুমধুর তেলাওয়াতের পরিবর্তে গান-বাজনার শব্দ ভেসে আসে, যেখানে নামধারী মুসলিম তরুণ-তরুণীরা প্রকাশ্যে অশালীনতায় মেতে ওঠে, সেখানে আবার কুরআনের প্রতিধ্বনি ফিরিয়ে আনতেই হবে।

কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন, এটি গভীর আত্মসমালোচনার বিষয়। আমরা যত দাবিই করি না কেন, বাস্তবতা অত্যন্ত বেদনাদায়ক!

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী ছিলেন, তাই কুরআনের সাথে তাঁর সম্পর্কও ছিল সবার চেয়ে ভিন্ন ও গভীর। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বড় কষ্ট ও আগ্রহের সাথে এ কুরআন গ্রহণ করতেন। যায়েদ ইবনে ছাবেত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর অহী নাযিল হওয়ার সময় তাঁর ঊরু আমার ঊরুর উপর ছিল, আমি অনুভব করলাম যেন অহীর ভারে আমার ঊরু থেঁতলে গেল।[1] আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, প্রচণ্ড ঠাণ্ডার দিনেও যখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর অহী নাযিল হতো, তখন আমি দেখতাম যে তাঁর কপালের একপাশ দিয়ে ঘাম বয়ে যাচ্ছে।[2]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতীব আগ্রহের সাথে কুরআনুল কারীম গ্রহণ করতেন এবং তা যত দ্রুত সম্ভব মুখস্থ করার চেষ্টা করতেন। তাই যখন জিবরীল আলাইহিস সালাম অহী তেলাওয়াত করে শোনাতেন, তখন তার তেলাওয়াত শেষ হওয়ার পূর্বেই অধীর আগ্রহে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পড়তে শুরু করতেন।[3]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তারতীল সহকারে কুরআন তেলাওয়াত করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল, তাই তিনি তারতীল সহকারেই কুরআন তেলাওয়াত করতেন। মা হাফছা রাযিয়াল্লাহু আনহা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নফল ছালাতে তেলাওয়াত সম্পর্কে বলেন, তিনি এমন তারতীল সহকারে সূরা পাঠ করতেন যে, সূরাটি তার চেয়ে অধিক বড় সূরার থেকেও লম্বা হয়ে যেত।[4] আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তেলাওয়াত কেমন ছিল? তিনি বললেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদ্দের সাথে তেলাওয়াত করতেন। যেমন- বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম অর্থাৎ বিসমিল্লাহ-এ আল্লাহ শব্দটি মাদ্দের সাথে পড়তেন, রহমান-এ মীমকে মাদ্দের সাথে পড়তেন এবং আর-রহীম-এ হা কে মাদ্দের সাথে পড়তেন।[5]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন দ্রুত পড়তেন না। তিনি প্রত্যেক আয়াতে থামতেন। উম্মু সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে জিজ্ঞেস করা হলো, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তেলাওয়াত কেমন ছিল? তিনি বললেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে তেলাওয়াত করতেন যে, প্রত্যেকটি আয়াত পরবর্তী আয়াত থেকে আলাদা হয়ে যেত। একটি আয়াত তেলাওয়াত করে থেমে যেতেন, তারপর দ্বিতীয় আয়াত তেলাওয়াত করতেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বোঝালেন, বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। আল-হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামীন। আর-রহমানির রহীম। মালিকি ইয়াওমিদ্দীন।[6] উলামায়ে কেরাম বলেন, আয়াতের সমাপ্তি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থামার মাধ্যমেই জানা গেছে।

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী পরিমাণ তেলাওয়াত করতেন, তা বোঝার জন্য আমাদের রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রাতের ছালাত সম্পর্কে জানতে হবে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের ছালাতে কী পরিমাণ তেলাওয়াত করতেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক রাতে আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে রাতের ছালাত আদায় করতে লাগলাম, তিনি এত লম্বা ক্বিয়াম করলেন যে, আমার মধ্যে এক খারাপ ইচ্ছা আসল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো যে, সেই খারাপ ইচ্ছাটি কী? তিনি বললেন, আমার মন চাইল যে আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ছেড়ে বসে যাই।[7] হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রামাযান মাসের কোনো এক রাতে আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলাম। তিনি ছালাত আদায় করতে লাগলেন। তিনি পুরো সূরা আল-বাক্বারা তেলাওয়াত করলেন, তারপর সূরা আন-নিসা, তারপর সূরা আলে ইমরান...।[8]

কুরআনুল কারীম রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্ষে পূর্ণরূপে সংরক্ষিত ছিল এবং তিনি এক ঝাঁক ছাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম-কে কুরআন লিপিবদ্ধ করায় নিযুক্ত করেছিলেন। ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ তাদের সংখ্যা ২৩ জন উল্লেখ করেছেন। হেদায়াতপ্রাপ্ত চার খলীফা অর্থাৎ আবূ বকর, উমার, উছমান ও আলী এবং যায়েদ ইবনে ছাবেত, উবাই ইবনে কা‘ব, মুআবিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহুম তাদের অন্তর্ভুক্ত।[9]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম-সহ পুরো উম্মতকে কুরআন শেখা, শেখানো এবং পাঠ করার প্রতি উৎসাহিত করতেন। উক্ববা ইবনু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন আমরা ছুফফায় বসেছিলাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন, অতঃপর বলতে লাগলেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে এমন আছে, যে প্রতিদিন সকালে বুত্বহান কিংবা আক্বীক্ব গিয়ে কোনো পাপ বা আত্মীয়তা ছিন্ন না করেই দুটি উঁচু কুঁজবিশিষ্ট উট পেতে চায়?’ ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমরা সবাই তো এমন চাই। তিনি বললেন, ‘তাহলে কেউ মসজিদে গিয়ে কুরআনের দুটি আয়াত শেখে না কিংবা পড়ে না কেন? সেই দুটি আয়াত তার জন্য দুটি উটের চেয়েও উত্তম। তিনটি আয়াত তিনটি উটের থেকে ভালো। চারটি আয়াত চারটি উটের থেকে অধিক মূল্যবান। এভাবে যতগুলো আয়াত পাঠ করবে, তত সংখ্যক উটের চেয়ে বড় নেয়ামত হাছিল করবে’।[10] উছমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সেই, যে কুরআনের শিক্ষা অর্জন করে এবং মানুষকে কুরআন শিক্ষা দেয়’।[11]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চাইতেন যে, ছাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম যেন নিজে কুরআনের শিক্ষা অর্জন করেন, অপরকেও শিক্ষা দেন এবং এই ধারাবাহিকতা ক্বিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

একটু ভেবে দেখুন, আপনি যদি সত্যিই কুরআনকে ভালোবাসেন, তাহলে কি কুরআন শেখার চেষ্টা করেছেন? অন্যদের শেখানোর চেষ্টা করেছেন?

আমরা যখন কোনো মসজিদে প্রবেশ করে সুমধুর তেলাওয়াত শুনি, তখন স্বাভাবিকভাবেই আশা জাগে যে, সেই এলাকার মানুষ কুরআনকে ভালোবাসে এবং এর যথাযথ মর্যাদা রক্ষা করে। কিন্তু যদি দেখা যায়, মসজিদে এমন ব্যক্তি ইমামতি করছেন, যার কুরআন তেলাওয়াতের মৌলিক বিষয়গুলো পর্যন্ত শুদ্ধ নয়, যেমন- سص, تط, ذض-এর উচ্চারণে ত্রুটি রয়েছে; মাদ্দ, গুন্নাহ ও ইখফার কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না, তাহলে বুঝতে হবে, সেই সমাজে কুরআনের প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ও গুরুত্বের ঘাটতি রয়েছে।

কারণ যে জাতি কুরআনকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসে; তারা কুরআনের শুদ্ধ তেলাওয়াত, ছহীহ শিক্ষা এবং যোগ্য হাফেয ও ইমাম তৈরির ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নশীল হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কাছে যোগ্য ইমামের চেয়ে মসজিদের বাহ্যিক সৌন্দর্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মসজিদের প্রকৃত সৌন্দর্য তার ইট-পাথরে নয়; বরং শুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত, ইলম ও তাক্বওয়ার পরিবেশে।

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা অনুযায়ী যারা সর্বোত্তম, তাদেরকে ভালোবাসা কুরআনকে ভালোবাসার প্রমাণ; কারণ আপনি তাকে ভালোবাসবেন কুরআনের জন্য। কিন্তু যদি আপনি তাদেরকে অবহেলা করেন, তাদের থেকে দূরে থাকেন; তাহলে এটা আপনার কুরআন থেকে দূরে থাকার প্রমাণ। তাই আপনার দেখা উচিত, কেন আপনি কুরআন থেকে বঞ্চিত? আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ ‘যে ব্যক্তি কুরআনের একটি অক্ষর পাঠ করে সে একটি নেকী পায় এবং আল্লাহ তাআলা সেটিকে ১০টি নেকীতে পরিণত করেন। আমি বলি না যে, আলিফ লাম মীম একটি অক্ষর; বরং আলিফ একটি অক্ষর, লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর’।[12]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যের মুখ থেকে কুরআন শোনার আকাঙ্ক্ষা রাখতেন। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, ‘আমাকে একটু কুরআন শোনাও’। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! কীভাবে আপনাকে কুরআন শোনাই, আপনার উপরই তো কুরআন নাযিল হয়েছে? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আমার মনে আকাঙ্ক্ষা জাগে যে, আমি অন্যের কাছ থেকে কুরআন শুনি’। তখন তিনি সূরা আন-নিসা তেলাওয়াত করতে শুরু করলেন। যখন এই আয়াতটিতে পৌঁছালেন, فَكَيْفَ إِذا جِئْنا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنا بِكَ عَلى هؤُلاءِ شَهِيداً ‘সেদিন কী অবস্থা হবে, যখন প্রত্যেক জাতির মধ্য হতে আমি একজন সাক্ষী উপস্থিত করব এবং এদের (আপনার উম্মতের) সাক্ষীরূপে আপনাকে উপস্থিত করব’ (আন-নিসা, ৪/৪১)। ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে চেয়ে দেখলাম কিংবা কেউ আমাকে ইঙ্গিত করল, তখন আমি দেখলাম যে, তার চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়ে গেছে।[13] ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ-এর মতে, তার কান্নার সর্বাধিক সম্ভাব্য কারণ এই যে, তিনি জানেন, তিনি অবশ্যই সাক্ষ্য দেবেন এবং তার উম্মতের আমলে ঘাটতি থাকতে পারে, তাই তাদের শাস্তি হতে পারে।[14]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মনোযোগ সহকারে কুরআন শুনতেন, তখন বুঝতে পারতেন, তাই তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু বেরিয়ে আসত। আপনিও যদি মন দিয়ে কুরআন শোনেন, তাহলে উপলব্ধি করবেন যে, কুরআনের মাধুর্য অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। কুরআন অন্তরে একটি ভিন্ন অনুভূতি সৃষ্টি করে। যে ব্যক্তি কুরআনের আনন্দ একবার বুঝে নেবে, সে কখনো যেকোনো মূল্যেই তা হারাতে চাইবে না। কিছু মানুষ কুপ্রবৃত্তির অনুসরণে কুরআনের পরিবর্তে গান-বাজনাকে বাছাই করে নিয়েছে। গুনাহের গহ্বরে তারা এত গভীরে চলে গেছে যে, তাদের হৃদয়ে আর কুরআনের মাধুর্য পৌঁছায় না। অন্য দিকে একদল ল ও নাশীদে মগ্ন হয়ে কুরআন থেকে উদাসীন হয়ে গেছে। ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কুরআনের পরিবর্তে কবিতা, গান, কোনো কথা বা কারো পদ্ধতির প্রতি আকৃষ্ট হওয়া কুরআন পরিত্যাগ করার অন্তর্ভুক্ত।[15]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনকে এত ভালোবাসতেন যে, কোথাও কুরআনের আওয়াজ পেলে থমকে দাঁড়িয়ে যেতেন। আবূ মূসা আল-আশআরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন,لَوْ رَأَيْتَنِى وَأَنَا أَسْتَمِعُ لِقِرَاءَتِكَ الْبَارِحَةَ لَقَدْ أُوتِيتَ مِزْمَارًا مِنْ مَزَامِيرِ آلِ دَاوُدَ ‘যদি তুমি গত রাতে আমাকে দেখতে, যখন আমি তোমার তেলাওয়াত শুনছিলাম! তোমাকে দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর এক সুমধুর কণ্ঠ প্রদান করা হয়েছে’।[16]

আমরা কি এমন এক সমাজ চাই না, যেখানে কোনো বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কুরআনের সুমধুর তেলাওয়াত কানে ভেসে আসবে? যেখানে ঘরে ঘরে কুরআনের আলো জ্বলবে, শিশুদের কণ্ঠে কুরআনের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হবে, আর প্রতিটি পরিবার কুরআনের সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক গড়ে তুলবে?

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করতেন, তাই কখনো কখনো একটি আয়াতকে বারবার পড়ে যেতেন। আবূ যার গিফারী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাতে একটি আয়াত বারবার পড়তে থাকলেন, এমনকি এভাবে সকাল হয়ে গেল। আয়াতটি সূরা আল-মায়েদার ১১৮ নম্বর আয়াত।[17]

কুরআন আমাদেরকে জীবনযাপনের সর্বোত্তম পদ্ধতি শিক্ষা দেয়। মানুষ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ ও সুন্দর জীবনযাপন করতে চাইলে আর জান্নাতের পথে চলতে চাইলে, আমাদের জীবনকে কুরআনের আলোকে পরিচালিত করতে হবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনকে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করেছেন। যদি কেউ জানতে চায় যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র কেমন ছিল, তাহলে তার কুরআন পড়া উচিত। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে জিজ্ঞেস করা হয়, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র কেমন ছিল? তিনি বলেন, তাঁর চরিত্র ছিল আল-কুরআন।[18]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআনের সমস্ত শিক্ষা নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন। তাই আমরা যদি সত্যিই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ গ্রহণ করতে চাই, তাহলে আজ থেকেই আমাদের ভেবে দেখা উচিত, কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন হতে হবে।

দুঃখজনকভাবে, আমরা আল্লাহ তাআলার কালাম থেকে দূরে সরে শয়তানী ধ্বনি তথা গান-বাজনার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছি। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এক গভীর দুর্ভাগ্য।

সম্মানিত পাঠক! কুরআনুল কারীম এমন এক মহান নেয়ামত যে, যেদিন আপনি এর প্রকৃত মর্যাদা ও মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারবেন, সেদিন থেকে আর কখনো এর থেকে দূরে যেতে চাইবেন না। বরং যদি আপনাকে বলা হয়, কুরআন পরিত্যাগ করার বিনিময়ে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ আপনাকে দেওয়া হবে, তবুও আপনি তা গ্রহণ করতে রাজি হবেন না। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন!

হাসান আল-বান্না মাদানী

 কালিয়াচক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত; মুহাদ্দিছ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২৮৩২।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৩৩।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৪৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৭; তাফসীর ইবনে কাছীর, ৮/২৮৬।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৩৩।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৪৬।

[6]. আহমাদ, হা/২৬৫৮৩।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৭৩।

[8]. আহমাদ, হা/২৩৩৯৯।

[9]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ৫/৩৬১-৩৭৭।

[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮০৩।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০২৭।

[12]. তিরমিযী, হা/২৯১০।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮০০।

[14]. ফাতহুল বারী, ৯/৯৯।

[15]. তাফসীর ইবনে কাছীর, ৬/১০৮।

[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৯৩।

[17]. নাসাঈ, হা/১০১০।

[18]. আহমাদ, হা/২৫৮১৩।

Magazine