কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অতুলনীয় বিনয়

post title will place here

মানুষের মনে যদি কখনো অহংকার ও অহমিকার অনুভূতি আসে, তাহলে তার স্মরণ করা উচিত যে, সে মহাপরাক্রমশালী, বিশ্বজাহানের মহাপরিচালক ও মহান স্রষ্টার এ বিশাল জগতে সামান্য মাটি থেকে তৈরি ছোট্ট একটি সৃষ্টি মাত্র। সে আদম আলাইহিস সালাম-এর অগণিত সন্তানের একজন, যাদের অধিকাংশই তার চেয়ে অধিক ক্ষমতাধর ও অধিক অর্থশালী। তার হাতে যত নেয়ামত রয়েছে, সবই সেই মহান দয়ালু ও অনুগ্রহশীলের পক্ষ থেকে আসা। মানুষ শিক্ষা ও মর্যাদার যতই উঁচু শিখরে পৌঁছে যাক না কেন, আর্থিক দৃঢ়তার যেই স্থানেই অবস্থান করুক না কেন, তার এ কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, সে এক অস্থায়ী পৃথিবীতে বসবাস করে। মধ্যাহ্নে সূর্য যতই তীব্র থাকুক না কেন সন্ধ্যাবেলায় তা অবশ্যই নিস্তেজ হয়ে যায়। এ পৃথিবীতে কিছুই স্থায়ী নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, مَا عِنْدَكُمْ يَنْفَدُ وَمَا عِنْدَ اللَّهِ بَاقٍ ‘তোমাদের কাছে যা আছে, তা নিঃশেষ হবে এবং আল্লাহর কাছে যা আছে, তা স্থায়ী’ (আন-নাহল, ১৬/৯৬)।

প্রকৃত মুমিন এ পৃথিবীতে এমনভাবে জীবন পরিচালনা করে যে, তার কাছে যতই সম্পদ থাকুক না কেন তার বাচনে ও আচরণে সর্বদা বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ পায়। তার কাছে যতই নেয়ামত থাকুক না কেন সে মানুষকে হেয় জ্ঞান করে না।

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়া ও আখেরাতে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। তিনি যে শিক্ষায় শিক্ষিত তার সাথে পৃথিবীর কোনো শিক্ষার তুলনা হয় না। তাকে আখেরাতে যত নেয়ামত দান করা হয়েছে, তার সামনে সারা পৃথিবীর নেয়ামত মূল্যহীন।

তাই কোনো প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ নিজেকে তার চেয়ে বেশি জ্ঞানী মনে করতে পারে না। কোনো প্রকৃত সভ্য ব্যক্তি নিজেকে তার চেয়ে অধিক সভ্য মনে করতে পারে না। তা সত্ত্বেও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যত বিনয়ী ও নম্র হয়ে জীবনযাপন করেছেন, তা সারা বিশ্বের জন্য অনুপম আদর্শ হয়ে থাকবে।

عَنْ أَبِى ذَرٍّ وَأَبِى هُرَيْرَةَ قَالاَ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَجْلِسُ بَيْنَ ظَهْرَىْ أَصْحَابِهِ فَيَجِىءُ الْغَرِيبُ فَلاَ يَدْرِى أَيُّهُمْ هُوَ حَتَّى يَسْأَلَ.

আবূ হুরায়রা ও আবূ যার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তারা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবায়ে কেরামের মাঝে এমনভাবে বসতেন যে, যখন বহিরাগত কেউ আসত (যে তাকে পূর্বে কখনো দেখেনি) সে বুঝতেই পারত না যে, কে এদের মধ্যে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; বরং তাকে জিজ্ঞেস করতে হতো যে, কে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।[1]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বদা তাঁর সাথীবর্গের খোঁজখবর রাখতেন। কোনো ছাহাবী নাম-পরিচয় ও মান-মর্যাদায় তুলনামূলক কম হলেও তিনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যথেষ্ট সম্মান পেতেন।

আবূ বারযাহ আল-আসলামী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, কোনো এক যুদ্ধ শেষে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেউ কি নিখোঁজ আছে?’ তারা বললেন, অমুক অমুককে পাওয়া যাচ্ছে না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও জিজ্ঞেস করলেন, ‘আরও কেউ নিখোঁজ আছে কি?’ তারা বললেন, আমরা অমুক অমুককে দেখতে পাচ্ছি না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবারও প্রশ্ন করলেন। ছাহাবায়ে কেরাম বললেন, আমরা আর কাউকে নিখোঁজ দেখছি না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘কিন্তু আমি জুলায়বীবকে[2] খোঁজ করছি। যাও তোমরা দেখো, সে কোথায় আছে’। ছাহাবায়ে কেরাম খোঁজ করতে গিয়ে দেখলেন তাকে হত্যা করা হয়েছে আর তার পাশে সাত জন নিহত পড়ে আছে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে গেলেন এবং তার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘(জুলায়বীব) সাত জনকে হত্যা করেছে, তারপরে তারা তাকে হত্যা করেছে। সে আমার খুব কাছের, তার ও আমার মাঝে অতীব গভীর সম্পর্ক’। অতঃপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে নিজে দুই হাতে উঠালেন এবং তাকে দাফন করা হলো।[3]

ত্বয়ালিসীর বর্ণনায় রয়েছে, فَوُضِعَ عَلَى ذِرَاعَيِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم حَتَّى حُفِرَ لَهُ فَمَا كَانَ لَهُ سَرِيرٌ إِلَّا ذِرَاعَيِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم. ‘কবর খনন করা পর্যন্ত রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতদ্বয়ই ছিল তার শয্যা’।[4]

জুলাইবীবের মতো একজন সাধারণ ছাহাবীর প্রতিও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এত স্নেহ তাঁর বিনয় ও নম্রতার প্রকাশ্য প্রমাণ।

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হেঁটে যেতেন, তখন ছোট ছোট বাচ্চাদের সাথে তাঁর দেখা হতো। তিনি অপেক্ষা করতেন না যে, আমি তো রাসূল, তারা আমাকে সালাম করবে; বরং তিনি নিজেই তাদেরকে সালাম দিতেন।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضي الله عنه أَنَّهُ مَرَّ عَلَى صِبْيَانٍ فَسَلَّمَ عَلَيْهِمْ وَقَالَ كَانَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم يَفْعَلُهُ .

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, তিনি একদিন কয়েকজন শিশুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি তাদেরকে সালাম করলেন। অতঃপর বললেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতেন।[5]

عَنْ أَنَسٍ رضي الله عنه قَالَ: «كَانَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم يَزُورُ الْأَنْصَارَ فَيُسَلِّمُ عَلَى صِبْيَانِهِمْ، وَيَمْسَحُ بِرُءوسِهِمْ، وَيَدْعُو لَهُمْ».

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কখনো আনছারীদের সাথে দেখা করতে যেতেন, তাদের সোনামণিদের সাথে সাক্ষাৎ হলে তাদেরকে সালাম করতেন, তাদের মাথায় হাত বুলাতেন এবং তাদের জন্য দু‘আ করতেন।[6]

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সাথে মিশতেন, তাঁর সদাচরণ ছিল অতুলনীয়। আবূ উমাইর[7] বলে আমার একটি ভাই ছিল, তিনি যখন আসতেন আবূ উমাইরকে বলতেন, يَا أَبَا عُمَيْرٍ، مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟ ‘হে আবূ উমায়ের! কী অবস্থায় সে নুগায়ের?’[8]+[9]

আবূ দাঊদের বর্ণনা অনুযায়ী, পাখিটি মারা যাওয়ায় আবূ উমাইর খুব দুঃখ পেয়েছিল, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এরূপ বলেছিলেন।[10]

যখন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাসায় অবস্থান করতেন, তখন তিনি একজন সাধারণ মানুষের মতো থাকতেন। নিজের সেবা নিজে করতেন এবং বাসার ছোট ছোট কাজে অংশ নিতেন।

আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য মানুষের মতোই একজন মানুষ ছিলেন, (যখন বাড়িতে থাকতেন) কাপড় থেকে উকুন পরিষ্কার করতেন, দুধ দোহন করতেন এবং নিজের সেবা নিজেই করতেন।[11]

عَنْ أَنَسٍ رضي الله عنه: أَنَّ رَجُلًا قَالَ: يَا مُحَمَّدُ يَا سَيِّدَنَا وَابْنَ سَيِّدِنَا، وَخَيْرَنَا وَابْنَ خَيْرِنَا فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ قُولُوا بِقَوْلِكُمْ، وَلَا تَسْتَجْرِيَنَّكُمُ الشَّيَاطِينُ، أَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللهِ، أَنَا عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ، وَمَا أُحِبُّ أَنْ تَرْفَعُونِي فَوْقَ مَنْزِلَتِي الَّتِي أَنْزَلَنِيهَا اللهُ».

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক ব্যক্তি এসে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, হে মুহাম্মাদ! হে আমাদের নেতা![12] হে আমাদের নেতার সন্তান! হে সর্বোত্তম ও সর্বোত্তমের সন্তান! রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা কথা বলায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো, শয়তানের প্রতিনিধি হয়ে যেয়ো না, আমি মুহাম্মাদ ইবেন আব্দুল্লাহ, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল, আমি পছন্দ করি না যে, তোমরা আমাকে সেই স্থান থেকে উঁচু করো, যে স্থান আল্লাহ তাআলা আমাকে দান করেছেন’।[13] ইবনু কুরকুল বলেন, (এ হাদীছ দ্বারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদেরকে প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা থেকে নিষেধ করেছেন।[14]

আব্দুল্লাহ ইবনে শিখখীরের হাদীছে প্রায় এভাবেই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রশংসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বললেন, قولوا بقولكم أو بعض قولكم ‘তোমরা কথা বলায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো’। আযীমাবাদী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এর অর্থ হতে পারে এই যে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অতীব বিনয়ী হয়ে উপরিউক্ত প্রশংসাগুলো হতে কিছু ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।[15]

কিন্তু যদি মানুষ বিনয়ী না হয়, তাহলে সে প্রশংসা ও তার মাত্রা সম্পর্কে সজাগ থাকে না।

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গাধার মতো নিম্ন শ্রেণির পশুর উপর আরোহণ করেছেন।

عن أسامة بن زيد k أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَكِبَ عَلَى حِمَارٍ، عَلَيْهِ قَطِيفَةٌ فَدَكِيَّةٌ، وَأُسَامَةُ وَرَاءَهُ.

উসামা ইবনে যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি গাধার উপর আরোহণ করলেন, যার পিঠে একটি পালান রাখা ছিল এবং পালানের নিচে একটি ঝালরবিশিষ্ট ফাদাকী[16] কাপড় বিছানো ছিল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে উসামা রাযিয়াল্লাহু আনহু বসে ছিলেন।[17]

কোথাও আমন্ত্রণ পেলে আমরা বিশেষ আতিথ্য আশা করি। সম্পর্কের উপর বস্তুকে প্রাধান্য দিই। ত্রুটি চোখে পড়লে সেটাকে চাপা না দিয়ে তা নিয়ে সমালোচনা করি। দস্তরখানে যদি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে সাধারণ খাবার পেশ করা হয়, তাহলে সন্তুষ্ট হওয়া কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারকে নয়, আমন্ত্রণকারীর আন্তরিকতাকে মূল্যায়ন করতেন।

আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যদি আমাকে একটি পায়া কিংবা হাতের অংশ খেতেও ডাকা হয়, তবুও আমি সেই দাওয়াত কবুল করব এবং যদি আমাকে উপহারস্বরূপ একটি পায়া কিংবা হাতের অংশ দেওয়া হয়, তবুও আমি তা গ্রহণ করব’।[18]

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ঘরে অবস্থান করতেন, যে বালিশের উপর মাথা রাখতেন এবং যা কিছু ব্যবহার করতেন তা হতো একেবারেই সাধারণ।

উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখলাম যে, তিনি একটি চাটাইয়ের উপর শুয়ে আছেন। মাথার তলায় ছাল-খোসা ভরা চামড়ার একটি বালিশ। তাঁর পায়ের কাছে কোনো এক প্রকার আঠা রাখা আছে এবং মাথার দিকে কিছু চামড়া ঝুলন্ত। আমি দেখলাম রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শরীরের এক পার্শ্বে চাটাইয়ের দাগ পড়ে গেছে। এ অবস্থা দেখে আমি কাঁদতে লাগলাম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কেন কাঁদছ?’ উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, কিসরা ও কায়সার কতই না নেয়ামত ভোগ করছে এবং আপনি রাসূল হওয়া সত্ত্বেও (আপনার এই করুণ অবস্থা!)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘উমার! তুমি কি সন্তুষ্ট নও যে, পৃথিবীর সব নেয়ামত তারা পেয়ে যাক আর আখেরাতের সব নেয়ামত আমরা পেয়ে যাই?’[19]

আজ বহু মুসলিম এ কথা বুঝে না যে, আমাদের রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই সর্বোত্তম, তাঁর আদর্শই প্রকৃত সফলতার পথ। তাঁর আনিত শিক্ষা ও সভ্যতাই কল্যাণের চাবি। আমাদের অধিকাংশই আমলগতভাবে মানতে পারেনি যে, কুরআন ও হাদীছের শিক্ষাই সর্বশ্রেষ্ঠ। আমরা আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখলেও আখেরাতকে ভালোবাসতে পারিনি। দ্বীনী শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করলেও দ্বীনী শিক্ষার আমেজ অনুভব করতে পারিনি। আমাদের আচরণে স্পষ্ট দ্বিচারিতা দেখা যায় যে, আমরা ইসলামী শিক্ষার প্রতি তৎপরতা দাবি করি ঠিকই; কিন্তু নিজের পরিবারে সেই শিক্ষাকে স্থান দিতে পারি না। আখেরাতকে প্রাধান্য না দেওয়ায় আমরা বস্তুবাদী হয়ে পড়েছি। দিনের পর দিন আমাদের ইসলামী সভ্যতা অনৈসলামিক সভ্যতার সাথে মিশে যাচ্ছে। অহীর আলো থেকে দূরে সরে যাওয়ায় আমাদের হৃদয় কঠোর হয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, সমাজে কঠোরচিত্ত অহংকারীদের সংখ্যা যত বেশি হবে, মানুষের জীবন থেকে সুখ-শান্তি ততই কমে যাবে। তাই মানুষের হৃদয় থেকে এই অহংকার ও কঠোরতা মুছে ফেলার জন্য আমাদের সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে, তাহলেই আমরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রকৃত অনুসারী হতে পারব। আল্লাহ তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

হাসান আল-বান্না মাদানী

কালিয়াচক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত; মুহাদ্দিছ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।


[1]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬৯৮।

[2]. একজন আনছার ছাহাবী। দুয়েকটি হাদীছেই তার উল্লেখ পাওয়া গেছে। তিনি দেখতে একটু অসুন্দর ছিলেন। তার সম্পর্কে আর কোনো তথ্য পায়নি (দেখুন: মুসনাদ আবূ ইয়া‘লা, হা/৩৩৪৩; ইবনুল আছীর, উসদুল গাবাহ, ১/৫৫০; ইবনু হাজার, আল-ইছাবাহ, ১/৬০০)।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৭২।

[4]. মুসনাদ ত্বয়ালিসী, হা/৯৬৬; ইবনু আব্দিল বার্র এরই কাছাকাছি অর্থবোধক একটি শব্দ বর্ণনা করেছেন এবং সেটিকে ছহীহ বলেছেন (দেখুন: আল-ইসতীআব, ১/২৭৩)।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২৪৭; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৬৮।

[6]. নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, হা/৮২৯১।

[7]. তার পিতার নাম আবূ তালহা যায়েদ ইবনে সাহল, তার ও আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর মা এক; তবে বাবা ভিন্ন (দেখুন: আল-ইসতীআব, ৪/১৭২১)।

[8]. নুগায়ের শব্দটির আসল রূপ নাগর, একটি ছোট পাখি বিশেষ।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১২৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২১৫০।

[10]. আবূ দাঊদ, হা/৪৯৬৯।

[11]. মুসনাদ আহমাদ, হা/২৬১৯৪।

[12]. আরবী শব্দ সায়্যিদুনা এর অর্থ আমাদের নেতা। অন্য হাদীছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্য সায়্যিদ শব্দ ব্যবহার করেছেন (ছহীহ মুসলিম, হা/২২৭৮)। হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সায়্যিদের আখ্যা দিয়েছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩৬২৯)। আর সা‘দ ইবেন মুআয রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্যও এই উপাধি ব্যবহার করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩০৪৩)। নিঃসন্দেহে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম উম্মাহর নেতা, তারপরও ছাহাবী ও তাবেঈদের ভাষায় দরূদে তাঁর জন্য সায়্যিদুনা শব্দের প্রয়োগ পাওয়া যায় না এবং এই ধরনের শব্দ যে গুলূ ও অতিরঞ্জনের দিকে নিয়ে যায় তা বলাই বাহুল্য। ছাহাবী ও তাবেঈগণ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অসংখ্য হাদীছ বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তাতেও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সায়্যিদুনা বলে আখ্যায়িত করা হয়নি। তাই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য উক্ত শব্দটি প্রয়োগ করায় সতর্কতা অবলম্বন করাই সমীচীন বলে মনে হয়। ওয়াল্লাহু আ‘লাম (দেখুন: বকর আবূ যায়েদ, মু‘জামুল মানাহিল লাফযিয়্যাহ, পৃ.১৩৪; আলবানী; আছলু ছিফাতি ছলাতিন্নাবী, ৩/৯৪১)।

[13]. নাসাঈ, আস-সুনানুল কুবরা, হা/১০০০৬।

[14]. মাত্বালিউল আনওয়ার, ২/১১০।

[15]. আওনুল মা‘বূদ, ১৩/১১১।

[16]. ফাদাক মদীনার পূর্ব উত্তরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক স্থান, সপ্তম হিজরীতে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই স্থানটি বিজিত হয় (দেখুন: সামআনী, আল-আনসাব, ১০/১৫০; হামাবী, আল-মু‘জামুল বুলদান, ৪/২৩৮)।

[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৬৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭৯৮।

[18]. ছহীহ বুখারী, হা/২৫৬৮।

[19]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৯১৩।

Magazine