মানুষ মাত্রই ভুল করে। তাই কেউ যদি অজ্ঞতাবশত কোনো ভুল করে বসে, তবে তার সঙ্গে নম্র ও সৌজন্যপূর্ণ আচরণ করা উচিত। যে ভুল করেছে, তার সমালোচনা করা, সবার সামনে অপমানিত করা কিংবা তাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা নম্রতার পরিপন্থি।
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কাউকে কোনো ভুল করতে দেখতেন, তখন তিনি তার সঙ্গে অত্যন্ত নম্র ও প্রজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করতেন এবং সুন্দর উপায়ে তাকে শিক্ষা দিতেন। তাঁর এই উত্তম চরিত্র ও শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে আমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।
আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন এক বেদুঈন এসে মসজিদের এক কোণে পেশাব করতে শুরু করলেন, ছাহাবায়ে কেরাম তাকে ধমক দিলেন, কিন্তু রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নিষেধ করলেন এবং বললেন, ‘তাকে পেশাব করতে দাও, বাধা দিয়ো না’। যখন পেশাব করা শেষ হলো রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন, ‘এই মসজিদগুলো পেশাব করা কিংবা নোংরা কিছু ফেলার জায়গা নয়; মসজিদ তৈরি করা হয় একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করার জন্য, কুরআন তেলাওয়াত করার জন্য এবং ছালাত আদায় করার জন্য’। অতঃপর একজনকে আদেশ করলেন যে, এক বালতি পানি এনে পেশাবের উপর ঢেলে দাও।[1]
عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ الْحَكَمِ السُّلَمِىِّ قَالَ بَيْنَا أَنَا أُصَلِّى مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ عَطَسَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ فَقُلْتُ يَرْحَمُكَ اللَّهُ فَرَمَانِى الْقَوْمُ بِأَبْصَارِهِمْ فَقُلْتُ وَاثُكْلَ أُمِّيَاهْ مَا شَأْنُكُمْ تَنْظُرُونَ إِلَىَّ فَجَعَلُوا يَضْرِبُونَ بِأَيْدِيهِمْ عَلَى أَفْخَاذِهِمْ فَلَمَّا رَأَيْتُهُمْ يُصَمِّتُونَنِى لَكِنِّى سَكَتُّ فَلَمَّا صَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَبِأَبِى هُوَ وَأُمِّى مَا رَأَيْتُ مُعَلِّمًا قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ أَحْسَنَ تَعْلِيمًا مِنْهُ فَوَاللَّهِ مَا كَهَرَنِى وَلاَ ضَرَبَنِى وَلاَ شَتَمَنِى قَالَ إِنَّ هَذِهِ الصَّلاَةَ لاَ يَصْلُحُ فِيهَا شَىْءٌ مِنْ كَلاَمِ النَّاسِ إِنَّمَا هُوَ التَّسْبِيحُ وَالتَّكْبِيرُ وَقِرَاءَةُ الْقُرْآنِ.
মুআবিয়া ইবনুল হাকাম আস-সুলামী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদিন আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছালাত আদায় করছিলাম, হঠাৎ একজন হাঁচি দিয়ে আল-হামদুলিল্লাহ বললেন আর আমি উত্তরে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলে ফেললাম। লোকজন আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। আমি বললাম, হায়! আমার মা আমাকে হারিয়ে দিল (আমি ধ্বংস হয়ে গেলাম), আপনারা আমার দিকে তাকাচ্ছেন কেন? তখন তারা ঊরুর উপর হাত মেরে আমাকে চুপ করাতে লাগলেন, তাই আমি চুপ হয়ে গেলাম। যখন ছালাত শেষ হলো, আমার পিতা-মাতা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য উৎসর্গ হোক, আমি কোনো দিন তাঁর চেয়ে উত্তম শিক্ষাদানকারী দেখিনি, না তাঁর পূর্বে, না তাঁর পরে, না তিনি আমাকে ধমক দিলেন, না প্রহার করলেন আর না কোনো গালমন্দ করলেন। তিনি (শুধু এতটুকু) বললেন, ‘ছালাতে মানুষের কোনো কথা বলা যাবে না। ছালাত কেবল তাকবীর, তাসবীহ এবং কুরআন তেলাওয়াত করার নাম...’।[2]
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদের এক কোণে বসে ছিলেন, একজন ব্যক্তি আসলেন, ছালাত আদায় করলেন, তারপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাম করলেন। তিনি উত্তর দেওয়ার পর বললেন, ‘যাও আবার ছালাত আদায় করো, তুমি ছালাত আদায় করনি’। এভাবে তিনি তাকে একাধিক বার ফিরে গিয়ে ছালাত আদায় করার আদেশ করলেন। তৃতীয় বার ছাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এর চেয়ে ভালো জানি না, আপনি আমাকে শিখিয়ে দিন। অতঃপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ছালাতের বহু জরুরী বিষয় শেখালেন...।[3]
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে কোনো কটু কথা বললেন না। আর তাকে বারবার ফিরিয়ে পাঠানোর কারণ হতে পারে যে, তিনি তার নিজে নিজেই সংশোধন করে নেওয়ার আশা করছিলেন কিংবা তার মধ্যে শেখার আগ্রহ তৈরি করছিলেন অথবা বুঝাতে চাচ্ছিলেন যে, ছালাত কত মনোযোগ সহকারে পড়া আবশ্যক! ওয়াল্লাহু আ‘লাম!
মসজিদে কাউকে ভুল করতে দেখলে কিছু মানুষ তার সঙ্গে এমন অদ্ভূত আচরণ করে, যা ইসলামী চরিত্র ও নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষার সঙ্গে কখনোই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কাউকে চেয়ারে বসে ছালাত আদায় করতে দেখলে এমনভাবে কথা বলা হয় যে, এরপর তিনি কাতারের শেষ প্রান্ত ছাড়া মাঝখানে কিংবা ইমামের পেছনে দাঁড়ানোর সাহসই পান না। কোনো শিশুকে ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করতে দেখলে তাকে উৎসাহিত করা তো দূরের কথা, এমনভাবে তাকে ধমক দেওয়া হয় যে, এরপর সে মসজিদে আসতেই অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। আবার কোনো ছোট শিশুকে হাফপ্যান্ট পরে ছালাত আদায় করতে দেখলে তাকে বকাঝকা করা হয়, অথচ তাকে উৎসাহিত করা এবং নম্র ভাষায় সঠিক বিষয়টি বুঝিয়ে দেওয়াই উচিত ছিল।
সালাম ফেরানোর পর যখন যিকির-আযকারের সময়, তখন তা বাদ দিয়ে কারও ভুল নিয়ে চেঁচামেচি করা কিংবা সবার সামনে তাকে সংশোধন করা তার কল্যাণকামিতার পরিচয় নয়; বরং তা তার অবমাননা।
ভুল সংশোধন ও উপদেশ প্রদান ইসলামের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। তবে ভুল সংশোধন যেন ভুল পদ্ধতিতে না হয়। কারও ভুল চিহ্নিত করার সময় যেন মনে শ্রেষ্ঠত্বের ভাব না আসে। মুসলিমরা যদি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতার মনোভাব নিয়ে সংশোধনের কাজ করেন, তাহলেই গড়ে উঠবে একটি প্রকৃত শিক্ষিত ও উন্নত মুসলিম সমাজ।
ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ বলেন, সালাফে ছালেহীন প্রকাশ্যে উপদেশ প্রদান করা পছন্দ করতেন না; বরং তারা চাইতেন, তা যেন গোপনে করা হয়। কারণ অন্যের ভুল-ত্রুটি আড়াল করে তাকে সংশোধন করা তার প্রকৃত কল্যাণকামিতার পরিচয়।[4]
অন্যদিকে, আমাদের চোখের সামনে বহু ভুল ও অন্যায় সংঘটিত হতে থাকে; কিন্তু আমরা অনেক সময় অযৌক্তিক নীরবতা পালন করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হেদায়াত দান করুন- আমীন!
কালিয়াচক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত; মুহাদ্দিছ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২২১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৫।
[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৩৭।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬৬৭।
[4]. আল-ফারকু বায়নান নছীহাতি ওয়াত তাঈর, পৃ. ১৭।
