[১]
সৌন্দর্যময়ী চাঁদটি মিষ্টি হাসিতে পুরো ধরাধামকে অপরূপ রূপে সজ্জিত করেছে। শুভ্র শীতল হাওয়া শূন্যে ভাসছে স্নিগ্ধ অনুভূতি নিয়ে। গাছপালার পত্রপল্লব নীরবে নিস্তব্ধে অন্ধকারে স্থির হয়ে রাতের ছোঁয়ায় ঘুমঘোরে বিভোর হচ্ছে। অদূরে অবস্থিত কুঠরিগুলোর জানালা থেকে আলোর আভা প্রকাশ পাচ্ছে। দিনের নীল আকাশ রাতের আঁধারে আবছা কালোতে রূপ নিয়েছে। চারিদিকে সব গুম মেরে আছে। মাঝেমধ্যে যান্ত্রিক কোলাহলের মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছে। চা দোকানের হালকা আড্ডার স্বর কর্ণগোচর হচ্ছে। পুলের নিচ দিয়ে স্তব্ধচিত্তে বেয়ে চলেছে অতি ছোটাকারের ঢেউমালা। মেঘমালার ছবি ফুটে উঠেছে পানিতে। ল্যাম্পপোস্টের আলোতে নদীর জলে চকচক রূপ দেখা দিয়েছে। পুলের দুধারের কাশফুলগুলো কখনো দোল খাচ্ছে সহসা আসা সমীরণের ছোঁয়ায়। নদীতে অর্ধডোবা শাপলা-পদ্মরাও হয়তো ঘুমের কোলে মাথা রেখেছে। সবখানে সব ঠিকঠাক আছে। কিন্তু ‘আমি’ তে কিছু একটা হয়েছে। এমন কিছু, যার দরুন এই আলোভরা আঁধারেও আমাতে ভর করেছে একরাশ আঁধার। এই আঁধারে ছেয়ে যাওয়া জীবনে আমি আকাল একটুখানি আলেয়ার। আমি অপেক্ষায়, এই আঁধার চুয়ে চুয়ে শেষ হওয়ার। তাই, সবার অগোচরে রবের গোচরে জল ফেলছি জলে। আঁখিপাতা চুয়ে নামা প্রতিটি ফোঁটা যেন, একেকটা পাপের ঢিবি। এতেই শান্তি, স্বস্তি। রবের তরে হাত পেতে সেই হাত চোখের অশ্রুতে ভিজানোতেই এক জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া।
[২]
মাঝে মাঝে আমরা ভালো থাকি না। এলোমেলো লাগে সব। মনে হয়, কোনো বারাকাহ নেই জীবনে। রাগ, ক্ষোভ, অস্বস্তি আর অশান্তি গ্রাস করে। পড়াশোনায় থাকে না মন। মনোযোগ থাকে না কোনো কাজে। জীবনের তাল আর লয় যেন মিলানোই যায় না। বিপদ আর ক্ষতি যেন ধেয়ে আসে পিছে। ভাল্লাগে না কিছুই। অবোধ্য, অব্যক্ত অপরিসীম বেদনায় সমস্ত বুক যেন মুচড়িয়ে উঠে। আফসোস ও পরিতাপে মাটিতে মিশে যেতে চাই আমরা। আমাদের হৃদয়ে জেগে উঠে এক আর্ত, যা বাহিরের কেউ শুনতে পায় না। এসবের পিছনে সবচেয়ে বড় একটা কারণ, ‘পাপ’। মাঝে মাঝে পাপ এসে ঘিরে নেয় জীবন। তখন জীবন হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়। মনের কিনারে উপচে পড়ে হতাশার স্রোত। কালবৈশাখি হয়ে তেড়ে আসে সময়। গুছানো সব অগোছালো হয়ে যায়। ক্বলবে দাগ পড়ে। স্বস্তি আর শান্তি নিরুদ্দেশ হয়। শরীর বেয়ে যুলমের নির্যাস বয়। পৃথিবী তখন হলদেটে মনে হতে থাকে। নিস্তেজ হয়ে যায় নিজেকে মানিয়ে নেবার শক্তি। তখন শুরু হয় ভালো না লাগা, নিরাশার আঁধার দেখা। মনে হতে থাকে, ‘এখানেই বুঝি সব শেষ! আর হয়তো দাঁড়াতে পারব না!’ এই ভেবে আমরা থেমে যাই। আশা হারাই। এতে করে আমরা আরও বেশি চিন্তিত হই। আর এখানেই আমরা ভুল করে বসি। যদি এমনই হয়। যদি আলো নিভে গিয়ে কালো ঘিরে বসে চারিধারে। চোখ যদি ভারী হয়ে হয়ে আসে। অন্তর যদি শক্ত হয়ে যায়। জীবন যদি থেমে যেতে চায়। তবে, তখনই মনে করতে হবে— ‘আল্লাহ তওবাকারীকে ভালবাসেন’। ‘পাপীদের মধ্যে তওবাকারী উত্তম’। এরপর… ছেড়ে দিতে হবে চোখের পানি। সিজদাহতে লুটে পড়তেহবে। এক সেকেন্ডও দেরি করা যাবে না। কারণ, মৃত্যু হঠাৎ করেই আসে…!
‘পাপ’ হচ্ছে উত্তপ্ত এক বারুদ, যা কখন কীভাবে আমাদের ভিতরকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেয়, আমরা বুঝতেও পারি না। আর আমরা মূলত পাপ করি শয়তানের ওয়াসওয়াসায়। শয়তান আমাদের কানে মধুবর্ষণ করে আমাদেরকে ফেলে দেয় পাপের নর্দমায়। শয়তানের কাজই তো আমাদের ভুল পথে চালনা করা। আমরা যেন ভুল পথে বৈঠা হাঁকাই, সেকারণেই তার যত কারসাজি। শয়তান হচ্ছে নোংরা একটা ময়লার স্তূপ। কারণ, সে অন্তরসমূহকে ময়লা করে দেয়। সে একটা কাঁটার গাছ। জীবনপথে পদে পদে সে আমাদের কাঁটাবিষ্ট করে। সে ছদ্মবেশীও বটে। কখন কোন বেশে থাকে বোঝা মুশকিল। সে এক দক্ষ যাদুকর, যাদুর প্রভাবেই তো সে খারাপটাকেও ভালো করে দেখায়। বুদ্ধিমত্তাও তার মাঝে কম নেই। আমাদের পাপ কাজ করিয়ে সে পিছন ফিরে দৌড়ায়। সে ভীতুর ডিম, সে আল্লাহকে ভয় করে। সে দক্ষ শিকারি, তার পাতা ফাঁদগুলো খুবই সূক্ষ্ম। সে পাপের নৌকার মাঝি, নৌকা চালায় এমন নদে, যে নদ পেরুলেই উত্তপ্ত আগুন। সে মিষ্টিভাষী, পাপের পথে তার আহ্বানটা অসাধারণ। সে এক নিমোকহারাম, যিনি তাকে সৃষ্টি করলেন, তার সাথেই সে হারামি করেছে। তাই সে অভিশপ্ত, বিতাড়িত।
[৩]
আমাদের এটা মনে রাখতে হবে যে, সে যত কিছুই হোক আল্লাহর চেয়ে ক্ষমতাধর নয়। এমনকি তার ক্ষমতাগুলোও আল্লাহর দেওয়া। সে যতই আমাদের পাপের নর্দমায় ডুবাক না কেন, আল্লাহ তাঁর ক্ষমার ঝরনায় আমাদের অবগাহন করাবেনই ইনশাআল্লাহ।
তাই, পাপের পর ভেঙে পড়া যাবে না। রবের দ্বারে ক্ষমার ভিখারি হয়ে হাত উত্তোলন করে ভেজা ভেজা চোখে বলতে হবে, ‘হে অন্তর্যামী রব! আমি দোষী, আমি পাপী। আমাকে আর পাপে কলুষিত রেখো না, হে গফূর! আমাকে তোমার ক্ষমা ভিক্ষা দাও। আমার চক্ষু ফেঁটে বেরিয়ে আসা অশ্রুফোটাগুলো কবুল করে নাও। আমার ক্বলবে পাপের যে ফোঁটা ফোঁটা দাগ, তা শুভ্র কাপড়ের মতো ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে দাও। আমাকে আর ময়লা করে রেখো না রব! আমার মাঝে আর পাপের মাঝে মাগরিব-মাশরিকের দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও’।
