ভূমিকা:
রামাযান কেবল একটি ইবাদতপূর্ণ মাস নয়; বরং এটি একজন মুমিনের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি পরিকল্পিত প্রশিক্ষণকাল, যার লক্ষ্য তাক্বওয়া অর্জন, নফসের সংস্কার এবং ঈমানের পুনর্গঠন। কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর আলোকে সালাফে ছালেহীন রামাযানকে যেভাবে দেখেছেন, তা আজকের আবেগনির্ভর ও আচারকেন্দ্রিক রামাযান চর্চা থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আল্লাহ তাআলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়াবান হতে পার’ (আল-বাক্বারা, ২/১৮৩)।
এই আয়াতেই রামাযানের উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট হয়েছে আর তা হলো তাক্বওয়া অর্জন। সালাফে ছালেহীন রামাযানকে কখনোই কেবল ‘ছিয়াম রাখার মাস’ হিসেবে দেখেননি; বরং তারা একে দেখেছেন তাক্বওয়া অর্জনের একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া হিসেবে।
১. ছিয়াম: ক্ষুধার নাম নয়, নফসকে নিয়ন্ত্রণের নাম
সালাফদের কাছে ছিয়াম ছিল শুধু পানাহার বর্জন নয়; বরং তারা বিশ্বাস করতেন, যে ছিয়াম জিহ্বাকে সংযত করে না, চোখকে লজ্জাশীল করে না এবং অন্তরকে আল্লাহভীরু করে না, সে ছিয়াম তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করে না। জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,إِذَا صُمْتَ فَلْيَصُمْ سَمْعُكَ وَبَصَرُكَ وَلِسَانُكَ عَنِ الْكَذِبِ وَالْمَآثِمِ ‘তুমি যখন ছিয়াম রাখ, তখন যেন তোমার কান, চোখ ও জিহ্বাও ছিয়াম রাখে’।[1]
আজ আমরা অনেক সময় ছিয়ামকে একটি শারীরিক ইবাদতে সীমাবদ্ধ করে ফেলি, অথচ সালাফদের কাছে এটি ছিল নৈতিক ও আত্মিক শুদ্ধতার একটি সামগ্রিক অনুশীলন।
২. কুরআন ও রামাযান: পাঠ নয়, আত্মসমর্পণ
রামাযান মানেই কুরআন, এটি একটি পরিচিত কথা। কিন্তু সালাফদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য এখানেই যে, তারা কুরআন শেষ করার জন্য পড়তেন না, বরং নিজেকে কুরআনের সামনে সমর্পণ করার জন্য পড়তেন।
ইমাম ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ বলেন,وَكَانَ مَالِكٌ إِذَا دَخَلَ رَمَضَانُ يَفِرُّ مِنْ قِرَاءَةِ الْحَدِيثِ وَمُجَالَسَةِ أَهْلِ الْعِلْمِ، وَأَقْبَلَ عَلَى قِرَاءَةِ الْقُرْآنِ مِنَ الْمُصْحَفِ অর্থাৎ ‘ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ যখন রামাযান আসত, তখন হাদীছ পাঠ ও আলেমদের মজলিস ছেড়ে দিতেন এবং মুছহাফ থেকে কুরআন তেলাওয়াতে মনোনিবেশ করতেন। ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ রামাযান এলে হাদীছের দারস বন্ধ করে দিতেন এবং বলতেন, এটি কুরআনের মাস’।[2]
তাদের কুরআন তেলাওয়াত ছিল ধীর, গভীর ও চিন্তাশীল। প্রতিটি আয়াত তাদের আমলকে বদলে দিত, চরিত্রকে গড়ে তুলত। আর আজ আমাদের তেলাওয়াতের গতি বেড়েছে, কিন্তু কুরআনের প্রভাব কমে গেছে। এই বাস্তবতা আমাদের আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।
৩. ইখলাছ: রামাযানের অদৃশ্য আমল
সালাফী মানহাজের অন্যতম মূলনীতি হলো ইখলাছ অর্থাৎ সব আমল একমাত্র আল্লাহর জন্য হওয়া। রামাযান এই ইখলাছ পরীক্ষার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র। কারণ ছিয়াম এমন একটি ইবাদত, যা লোকচক্ষুর আড়ালে পালন করা যায়। তাই হাদীছে কুদসীতে এসেছে,قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصَّوْمَ، فَإِنَّهُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ ‘আল্লাহ তাআলা বলেন, ছিয়াম আমার জন্য আর আমিই তার প্রতিদান দিব’।[3]
সালাফরা রামাযানে লোকদেখানো আমল থেকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতেন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল মানুষের সন্তুষ্টি নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
৪. ক্বিয়ামুল লায়ল ও আত্মসংলাপ:
তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ সালাফদের কাছে বিনোদন ছিল না, বরং তা ছিল নিজের নফসের সঙ্গে গভীর আত্মসংলাপের সময়। দীর্ঘ কিয়ামে তারা নিজেদের গুনাহ স্মরণ করতেন, আখেরাতের ভয় অনুভব করতেন এবং আল্লাহর সামনে ভেঙে পড়তেন।
আজকের দ্রুতগতির তারাবীহ আমাদের শরীরকে ক্লান্ত করে, কিন্তু হৃদয়কে নাড়া দেয় না। এটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
৫. ঈদের পরে রামাযান টিকে থাকে কি?
সালাফদের দৃষ্টিতে রামাযানের সাফল্য নির্ধারিত হতো ঈদের পরেও একজন মানুষের আমল কেমন থাকে তার মাধ্যমে। কারণ সত্যিকারের রামাযান মানুষকে বদলে দেয়। হাসান আল-বাছরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,إِنَّ مِنْ عَلَامَةِ قَبُولِ الْحَسَنَةِ الْحَسَنَةَ بَعْدَهَا، وَإِنَّ مِنْ عُقُوبَةِ السَّيِّئَةِ السَّيِّئَةَ بَعْدَهَا অর্থাৎ ‘আল্লাহ কোনো বান্দার রামাযান কবুল করলে তিনি তাকে তার পরেও নেক আমলের তাওফীক্ব দেন’।[4]
অতএব, যে রামাযান শুধু ক্যালেন্ডারে আসে ও যায়; কিন্তু জীবনে পরিবর্তন আনে না, সে রামাযান নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা দরকার।
উপসংহার:
রামাযান কোনো সংস্কৃতি নয়, কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি নববী পদ্ধতিতে গড়ে ওঠা তাক্বওয়ার মাসব্যাপী কর্মশালা। সালাফে ছালেহীনের মানহাজ আমাদের শেখায় যে, রামাযানকে কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস হিসেবে নয়; বরং অনুভবে, আমলে ও চরিত্রে গভীরভাবে ধারণ করতে হবে।
আসুন! আমরা রামাযানকে শুধু পালন না করে নিজেদের পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। কারণ রামাযান আসে প্রতি বছর, কিন্তু আমরা যে বেঁচে থাকব এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন- আমীন!
আদিল বিন ফোরকান
শিক্ষার্থী, ৯ম শ্রেণি, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, ‘কিতাবুছ ছিয়াম’, ২/৪২২; বায়হাক্বী, শুআবুল ঈমান, হা/৩৫৭৫।
[2]. ইবনু রজব আল-হাম্বলী, লাতায়িফুল মাআরিফ, একই বক্তব্য সালাফদের রামাযান-আমল হিসেবে অন্যান্য কিতাবেও অর্থগতভাবে এসেছে, তবে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র হলো লাতায়িফুল মাআরিফ।
[4]. ইবনু রজব আল-হাম্বলী, লাতায়িফুল মাআরিফ, রামাযান পরবর্তী আমল প্রসঙ্গে ইমাম ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ হাসান আল-বসরী রাহিমাহুল্লাহ-এর এই উক্তি উদ্ধৃত করেছেন; আবূ নুআইম আল-ইসফাহানী, হিলইয়াতুল আউলিয়া, ২/১৪৭।
