ভূমিকা :
আল-কুরআন ও আস-সুন্নাহর ইল্ম জানা যেমন যরূরী, তদনুযায়ী আমল করাও সমানভাবে যরূরী। একটির অনুপস্থিতিতে অন্যটি কোন গুরুত্ব বহন করে না; বরং নিরর্থক ও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, একটি অপরটির পরিপূরক। যেমন- একটি সুনিপুণ ও মযবূত ভবন নির্মাণের জন্য নির্মাণ শ্রমিকের বিল্ডিং নির্মাণ সংক্রান্ত যথেষ্ট জ্ঞান থাকা দরকার। নির্মাণ জ্ঞান ব্যতীত শত আন্তরিকতা সত্ত্বেও ভালমানের ভবন নির্মাণের চেষ্টা একজন শ্রমিকের নিষ্ফল প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না। আবার যথেষ্ট নির্মাণ জ্ঞানের অধিকারী হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকাতেও কোন স্বার্থকতা নেই। এতে নিজেরও কোন লাভ হয় না এবং তাকে দিয়ে সমাজ ও দেশের কল্যাণের আশাও করা যায় না। তেমনিভাবে আল-কুরআন ও আস-সুন্নাহর ইল্ম না জেনে ভালো আমল করার চেষ্টা করা বা ভালো আমলকারী বলে নিজেকে দাবী করা বোকামি বৈ আর কী হতে পারে। অন্যদিকে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হয়েও যে ব্যক্তি আমলহীন জীবন যাপন করে, সে নিজেই নিজের ক্ষতিসাধন করে এবং তাকে দিয়ে সমাজ, দেশ ও জাতির কোন কল্যাণের আশা করা যায় না।
দ্বীনী জ্ঞান অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা :
জানা ব্যতীত মানা যায় না। আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন শুধু তাঁরই দাসত্ব করার জন্য। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُوْنِ ‘আমার দাসত্ব করার জন্যই আমি জিন ও মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছি’ (যারি‘আত, ৫৬)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ‘জেনে রেখো! আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন মা‘বূদ নেই’ (মুহাম্মদ, ১৯)। কাউকে কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হলে তা পরিপালনের জন্য প্রথমে সেই কাজের নিয়ম-ক্বানূন ভালোভাবে জানতে হয়। কারণ, না জানলে মানবেন কী করে। তেমনিভাবে আল্লাহ্র দাসত্ব করতে হলে প্রথমে দাসত্ব করার পদ্ধতিসমূহ ভালোভাবে জেনে নেয়া প্রয়োজন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَرَتِّلِ الْقُرْآنَ تَرْتِيْلًا ‘কুরআন পাঠ কর তারতীলের সাথে অর্থাৎ বুঝে বুঝে ভাব প্রকাশযোগ্য ভঙ্গিতে’ (মুয্যাম্মিল, ৪)। তারতীলের সাথে কুরআন পাঠ করতে হলে প্রথমে তার পদ্ধতিসমূহ ভালোভাবে জানতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,إِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاء إِنَّ اللهَ عَزِيْزٌ غَفُوْرٌ ‘আল্লাহকে তাঁর বান্দাদের মধ্যে আলেম তথা জ্ঞানীরাই ভয় করে, আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল’ (ফাতির, ২৮)। এ আয়াতে আল-কুরআন ও আস-সুন্নাহর জ্ঞানে জ্ঞানান্বিত ব্যক্তিবর্গই উদ্দেশ্য। যেমন- একজন মানুষ তখনই কাউকে খুব বেশি বিশ্বাস অথবা ভয় করেন, যখন তার বিশ্বস্ততা অথবা ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি সম্যক জ্ঞান রাখেন। তেমনি আল-কুরআন ও আস-সুন্নাহর জ্ঞানে যে ব্যক্তি যত বড় জ্ঞানী হবে, তার মনে তত বেশি আল্লাহভীরুতা তৈরি হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَاذْكُرُوْا اللهَ كَمَا عَلَّمَكُم ‘আল্লাহকে সেভাবে স্মরণ কর, যেভাবে তিনি তোমাদের শিক্ষা দিয়েছেন’ (বাক্বারাহ, ২৩৯)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, فَاسْأَلُوْا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُوْن ‘যদি তোমরা না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞেস করে জেনে নাও’ (আম্বিয়া, ৭)। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, না জানার কারণে সঠিকভাবে আমল করতে না পারার অজুহাত আল্লাহ্র নিকট গৃহীত হবে না। কাজেই না জানা বিষয় জ্ঞানীদের কাছ থেকে জেনে নেয়া যরূরী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِيْنَ لَا يَعْلَمُوْنَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ ‘বলে দাও, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান? চিন্তা-ভাবনা কেবল তারাই করে, যারা বুদ্ধিমান’ (যুমার, ০৯)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَى وَالْبَصِيْرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِي الظُّلُمَاتُ وَالنُّوْرُ ‘বলে দাও, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান অথবা অন্ধকার ও আলো কি এক?’ (রা‘দ, ১৬)। এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান ব্যক্তির মধ্যে যেমন পার্থক্য রয়েছে, তেমনি জ্ঞানী ও জ্ঞানহীন ব্যক্তির মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক তফাৎ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يُؤتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاء وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوْتِيَ خَيْرًا كَثِيْرًا وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُوْلُواْ الأَلْبَابِ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيْم.
‘তিনি যাকে চান জ্ঞান দান করেন। আর যাকে জ্ঞান দেয়া হয়, সেতো বিরাট কল্যাণের অধিকারী। শিক্ষা লাভ করে কেবল তারাই, যারা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী। আল্লাহ অতি প্রশস্ত উদার, মহাজ্ঞানী’ (বাক্বারাহ, ২৬৮-২৬৯)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, الْعِلْمِ فَرِيْضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِم طَلَبُ ‘প্রত্যেক মুসলিমের ওপরে জ্ঞান অন্বেষণ করা ফরয’।[1] রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন مَنْ يُرِدِ اللهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّيْنِ ‘আল্লাহ যার কল্যান চান, তাকে তিনি দ্বীনের জ্ঞান দান করেন’।[2]
দ্বীনী জ্ঞান অর্জনকারীর জন্য অত্যাবশ্যকীয় কয়েকটি আমল :
(১) কথার সাথে কাজের গরমিল পরিহার করা :
অন্যকে উপদেশ দেয়ার কাজটি দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সহজ ও আকর্ষণীয় কাজ। এটি শয়তান এবং মানবীয় প্রবৃত্তির কাছে খুবই প্রিয়। যে কাজের জন্য আমরা অন্যকে আদেশ বা নিষেধ করছি, তা নিজেরাই পালন বা বর্জন করছি না। অথচ অন্যকে উপদেশ দেয়ার আগে প্রথমে নিজের জন্য উপদেশ গ্রহণ করা সবচেয়ে বেশি যরূরী। যেমন আমরা সূদ খাচ্ছি না, তবে ঘুষ, যৌতুক, কর্যে ফাঁকি, ভেজাল ইত্যাদি অপরাধে লিপ্ত আছি। ইয়াহূদীরা সর্বদা ধর্ম ও মানবতার বিষয়ে আকর্ষণীয় আদর্শের বুলি আওড়ায় কিন্তু নিজেরা এর সম্পূর্ণ বিপরীত কাজ করে। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন,أَتَأْمُرُوْنَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنسَوْنَ أَنفُسَكُمْ وَأَنتُمْ تَتْلُوْنَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُوْنَ ‘তোমরা কি মানুষদেরকে সৎকার্যে নির্দেশ দাও আর নিজেদের কথা ভুলে যাও! অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর! তবে কি তোমরা বুঝ না? (বাক্বারাহ, ৪৪)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُوْلُوْنَ مَا لَا تَفْعَلُوْنَ-كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللهِ أَنْ تَقُوْلُوْا مَا لَا تَفْعَلُوْنَ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যা কর না, তা তোমরা কেন বল? আল্লাহ্র দৃষ্টিতে অতিশয় অসমেত্মাষজনক যে, তোমরা যা কর না, তা বলবে’ (ছফ, ২-৩)। কথার সাথে কাজের গরমিলে লিপ্ত অনেকেই বুঝে অথবা না বুঝে এ অপরাধে অপরাধী। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
يُؤْتَى بِالرَّجُلِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَيُلْقَى فِى النَّارِ فَتَنْدَلِقُ أَقْتَابُ بَطْنِهِ فَيَدُوْرُ بِهَا كَمَا يَدُوْرُ الْحِمَارُ بِالرَّحَى فَيَجْتَمِعُ إِلَيْهِ أَهْلُ النَّارِ فَيَقُوْلُوْنَ يَا فُلَانُ مَا لَكَ أَلَمْ تَكُنْ تَأْمُرُ بِالْمَعْرُوْفِ وَتَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ فَيَقُوْلُ بَلَى قَدْ كُنْتُ آمُرُ بِالْمَعْرُوْفِ وَلَا آتِيْهِ وَأَنْهَى عَنِ الْمُنْكَرِ وَآتِيْهِ.
‘ক্বিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনয়ন করে জাহান্নামের অগ্নির মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। আগুনে তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়বে এবং গাধা যেমন যাতা (ঘানি) নিয়ে ঘুরে, তেমনি সে ঘুরতে থাকবে। তখন জাহান্নামবাসীরা তার নিকট সমবেত হয়ে বলবে, হে অমুক, তোমার কী হল? তুমি না আমাদেরকে সৎকাজে আদেশ দিতে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতে? সে বলবে, আমি তোমাদেরকে সৎকাজে আদেশ দিতাম কিন্তু নিজে করতাম না। আর অসৎকাজ থেকে নিষেধ করতাম, কিন্তু নিজেই তা করতাম।[3] অন্য হাদীছে এসেছে,مَثَلُ الَّذِيْ يُعَلِّمُ النَّاسَ الْخَيْرَ وَيَنْسَى نَفْسَهُ مَثَلُ الْفَتِيْلَة تُضِيءُ لِلنَّاسِ وَتُحْرِقُ نَفْسَهَا ‘যে ব্যক্তি লোকদেরকে ভালো শিক্ষা দেয় অথচ নিজেকে ভুলে বসে, সেই ব্যক্তির উদাহরণ একটি (প্রদীপের) পলিতার মত; যে লোকদেরকে আলো দান করে, কিন্তু নিজেই নিজেকে জ্বালিয়ে ধ্বংস করে’।[4]
অতএব, আমলবিহীন ইল্ম ক্বিয়ামতের দিন বড় শাস্তির কারণ হবে। আরবী প্রবাদে রয়েছে, رَجُلٌ بِلَا عَمَلٍ كَشَجَرَةٍ بِلَا ثَمَرٍ ‘আমলবিহীন ব্যক্তি ফলবিহীন বৃক্ষের ন্যায়’। জনৈক আরব কবি বলেন,
لَوْ كَانَ لِلعِلْمِ شَرَفٌ مِنْ دُونِ التُّقَى * لَكَانَ أَشْرَفَ خَلْقِ اللهِ إِبْلِيسُ
‘যদি তাক্বওয়াবিহীন ইল্মের কোন মর্যাদা থাকত, তবে ইবলীস আল্লাহ্র সৃষ্টিকুলের সেরা বলে গণ্য হত।[5]
(২) প্রতারণা থেকে বিরত থাকা এবং বিরত রাখা :
প্রতারণা হচ্ছে ভালোর সাথে মন্দের মিশ্রণ ঘটানো। আমাদের বর্তমান সামাজিক অবস্থা, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সর্বোপরি দৈনন্দিন লেনদেন বিবেচনা করলে পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান হয় যে, প্রতারণার ভয়াল ছোবল আমাদেরকে ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে। বিবাহ-শাদী একটি পবিত্র কাজ। এতেও আজকাল অদ্ভুত ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হচ্ছে। এক বোনকে দেখিয়ে অন্য বোনকে বিয়ে দেয়া হচ্ছে। ছেলে-মেয়ের দোষ-ত্রুটি গোপন করে বিয়ে দেয়া হচ্ছে। একে মোটেই পাপ মনে করা হচ্ছে না। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, لِمَ تَلْبِسُوْنَ الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوْنَ الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُوْنَ ‘কেন তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে সংমিশ্রণ করছ এবং জেনেশুনে সত্যকে গোপন করছ? (আলে-ইমরান, ৭১)। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,وَمِنَ النَّاسِ مَن يَقُوْلُ آمَنَّا بِاللهِ وَبِالْيَوْمِ الآخِرِ وَمَا هُم بِمُؤْمِنِيْنَ يُخَادِعُوْنَ اللهَ وَالَّذِيْنَ آمَنُوْا وَمَا يَخْدَعُوْنَ إِلَّا أَنفُسَهُم وَمَا يَشْعُرُوْنَ ‘আর মানুষের মধ্যে কিছু লোক এমন রয়েছে যারা বলে, আমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি অথচ আদৌ তারা ঈমানদার নয়, তারা আল্লাহ এবং ঈমানদারগণকে ধোঁকা দেয়। এতে তারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না অথচ তারা তা অনুভব করতে পারে না’ (বাক্বারাহ, ৮-৯)।
ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতারণাকারীগণ পরকালে মহাদুর্ভোগে পড়বে। এ ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَيْلٌ لِلْمُطَفِّفِيْنَ - الَّذِيْنَ إِذَا اكْتَالُوْا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُوْنَ - وَإِذَا كَالُوْهُمْ أَوْ وَزَنُوْهُمْ يُخْسِرُوْنَ - أَلَا يَظُنُّ أُوْلَئِكَ أَنَّهُمْ مَبْعُوْثُوْنَ.
‘তাদের জন্য দুর্ভোগ, যারা মাপে কম করে। লোকদের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওযন করে দেয়, তখন কম করে দেয়। তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে? (মুত্বাফফিফীন, ১-৪)। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে,وَلَا تَتَبَدَّلُوْا الْخَبِيْثَ بِالطَّيِّبِ ‘তোমরা খারাপ মালামালের সাথে ভালো মালামালের বদল কর না’ (নিসা, ২)। যারা ঠগবাজি করে, মাপে ও ওযনে মানুষকে কম দেয়, তাদের জন্য আল্লাহ তা‘আলার এ এক কঠিন ঘোষণা।
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ عَلَى صُبْرَةِ طَعَامٍ فَأَدْخَلَ يَدَهُ فِيْهَا فَنَالَتْ أَصَابِعُهُ بَلَلًا فَقَالَ مَا هَذَا يَا صَاحِبَ الطَّعَامِ قَالَ أَصَابَتْهُ السَّمَاءُ يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَىْ يَرَاهُ النَّاسُ مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّىْ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার খাদ্যপণ্যের একটি স্ত্তপের মধ্যে হাত প্রবেশ করালে কিছুটা আর্দ্রতা অনুভব করেন, তিনি খাদ্যশস্যের মালিককে বলেন, ‘কী ব্যাপার এ খাদ্যশস্য ভেজা কেন? তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ খাদ্যশস্যের ওপর বৃষ্টির পানি পড়েছিল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তবে ভিজে যাওয়া পণ্য উপরে রাখলে না কেন? যাতে মানুষ তা দেখতে পেত’। অতঃপর তিনি এরশাদ করেন, ‘শোন, যে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়’।[6]
সন্তানদের শিক্ষা-দীক্ষা ও শিষ্টাচার শেখানোতে অবহেলা করাও প্রতারণা করার শামিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلْيَخْشَ الَّذِيْنَ لَوْ تَرَكُوْا مِنْ خَلْفِهِمْ ذُرِّيَّةً ضِعَافًا خَافُوْا عَلَيْهِمْ فَلْيَتَّقُوا اللهَ وَلْيَقُوْلُوْا قَوْلًا سَدِيْدًا ‘যারা তাদের পশ্চাতে দুর্বল সন্তান-সন্ততি ছেড়ে গেছে, যাদের উপর তারা ভীত, তারা যেন ভয় করে। অতএব, তারা যেন আল্লাহ্র তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং তারা যেন সোজা কথা বলে’ (নিসা, ৯)। যে এই আয়াতকে গভীরভাবে চিন্তা করবে, সে অবশ্যই তার সন্তানদের ব্যাপারে ভীত হবে এবং মন্দ কাজ হতে বিরত থাকবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِه ‘তোমরা প্রত্যেকেই দায়িতবশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার অধীনস্থদের প্রতি দায়িত্বশীলতার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’।[7] মা‘ক্বেল ইবনে ইয়াসার আল-মুযানী রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যু শয্যায় বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,مَا مِنْ عَبْدٍ يَستَرْعِيْهِ اللهُ رَعِيَّةً يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوْتُ وَهُوَ غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ إِلَّا حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الجَنَّة ‘এমন কোন বান্দা নেই, যাকে আল্লাহ অধীনস্থদেরকে দায়িত্ব দিয়েছেন এবং সে মৃত্যুবরণ করেছে অধীনস্থদের ব্যাপারে প্রতারক অবস্থায়, আল্লাহ অবশ্যই তার উপরে জান্নাত হারাম করে দিবেন’।[8]
পরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রতারণার অসংখ্য উপায় ও মাধ্যম শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রচলিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষার্থীদের প্রতারণার কাজে অনেক শিক্ষক স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহায়তা করে থাকেন। ঈমানের অনুপস্থিতি, আল্লাহ্র ভয় ভিতরে না থাকাই এর প্রধানতম কারণ। অথচ আল্লাহ তা‘আলা সাবধান বাণী উচ্চারণ করে বলেন,
وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوْا اللهَ إِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ.
‘সৎকাজ ও আল্লাহভীরুতার কাজে একে অন্যের সাহায্য কর আর পাপ ও সীমালংঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা কর না। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা’ (মায়েদাহ, ২)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। হাদীছ বিশারদগণ বলেছেন, যে কোন কাজে-কর্মে প্রতারণা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ উক্তির আওতাভুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَإِن تُبْدُوْا مَا فِيْ أَنفُسِكُمْ أَوْ تُخْفُوْهُ يُحَاسِبْكُم بِهِ اللهُ.
‘যদি তোমরা মনের কথা প্রকাশ কর কিংবা গোপন কর, আল্লাহ তোমাদের কাছ থেকে তার হিসাব নেবেন’ (বাক্বারাহ, ২৮৪)। জেনে রাখা দরকার, দুনিয়া খুবই ক্ষণস্থায়ী। ভাল বা মন্দ যত ক্ষুদ্রই হোক, পরিণতিতে তা প্রভাব রাখবে।
(৩) চোগলখোরি থেকে বিরত থাকা এবং বিরত রাখা :
ঝগড়া-বিবাদ বা মনোমালিন্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে একজনের কথা অন্যের কাছে লাগানোই নামীমা বা চোগলখোরি। সকল ইসলামী চিন্তাবিদ এ সম্পর্কে একমত পোষণ করেন যে, চোগলখোরি সম্পূর্ণ হারাম। চোগলখোরের কার্যক্রম শয়তানী কার্যক্রম অপেক্ষাও অধিক ক্ষতিকর। কেননা, শয়তানী কার্যক্রম সংঘটিত হয় ওয়াসওয়াসার মাধ্যমে, আর চোগলখোরির কার্যক্রম চলে মান-সম্মানহানির দ্বারা। চোগরখোররা ফাসিক্ব। তাদের থেকে মুমিনগণকে সাবধানতা অবলম্বনের জন্য আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِن جَاءكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَأٍ فَتَبَيَّنُوْا أَن تُصِيْبُوْا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوْا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِيْنَ.
‘হে ঈমানদারগণ! যদি তোমাদের কাছে কোন ফাসিক্ব সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তা যাচাই করে নাও। না জেনে যদি কারো অনিষ্ট সাধন কর, তাহলে পরিণামে তোমরা কষ্ট ভোগ করবে’ (হুজুরাত, ৬)।
আল্লাহ তা‘আলা চোগলখোরের কথার অন্ধ অনুসরণ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَهِيْنٍ - هَمَّازٍ مَشَّاءٍ بِنَمِيْمٍ ‘সে ব্যক্তির অনুসরণ কর না, যে কথায় কথায় শপথ করে, সে লাঞ্ছিত, যে অসাক্ষাতে নিন্দা করে, যে একজনের কথা অন্যজনের কাছে লাগায়’ (ক্বালাম, ১০-১১)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ ‘চোগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’।[9] রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন,تَجِدُ مِنْ شَرِّ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللهِ ذَا الْوَجْهَيْنِ الَّذِيْ يَأْتِيْ هَؤُلَاءِ بِوَجْهٍ وَهَؤُلَاءِ بِوَجْهٍ ‘ক্বিয়ামতের দিন তোমরা সবচেয়ে অধম লোকদের দলভুক্ত ঐ ব্যক্তিকে দেখতে পাবে, যে ছিল দু’মুখো স্বভাবের। সে একজনের কাছে এক কথা, আরেকজনের কাছে আরেক কথা নিয়ে হাযির হয়’।[10] দ্বিমুখী স্বভাব দ্বারা এখানে দু’জনের সাথে দু’ধরনের কথা বলার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
(৪) মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকা এবং বিরত রাখা :
মিথ্যা সকল পাপের মূল। মিথ্যা ধ্বংস করে। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত খুব সহজ ও সাবলীলভাবে মিথ্যা কথা বলে দুনিয়াবী সামান্য স্বার্থ হাছিল করে যাচ্ছি। এতে নিজের স্থায়ী ধ্বংস জেনেও এ থেকে বিরত হচ্ছি না। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, مَا يَلْفِظُ مِن قَوْلٍ إِلَّا لَدَيْهِ رَقِيبٌ عَتِيْدٌ ‘মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করুক না কেন তা লিপিবদ্ধ করার জন্য তৎপর প্রহরী তার নিকটেই রয়েছে’ (ক্বাফ, ১৮)। আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেছেন,وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُوْلـئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْؤُوْلًا ‘যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে অনুমান দ্বারা পরিচালিত হয়ো না। নিশ্চয় কান, চক্ষু ও অন্তকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে’ (বানী ইসরাঈল, ৩৬)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إنَّ الصِّدْقَ يَهْدِيْ إِلَى البِرِّ وَإِنَّ البِرَّ يَهْدِيْ إِلَى الجَنَّةِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَصْدُقُ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ صِدِّيْقًا وَإِنَّ الكَذِبَ يَهْدِيْ إِلَى الفُجُوْرِ وَإِنَّ الفُجُوْرَ يَهْدِيْ إِلَى النَّارِ وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيَكْذِبُ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابا.
‘নিশ্চয় সত্যবাদিতা পুণ্যের পথ দেখায়। আর পুণ্য জান্নাতের দিকে পথ নির্দেশ করে। আর মানুষ সত্য কথা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্র নিকট তাকে ‘মহাসত্যবাদী’রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়। নিঃসন্দেহে মিথ্যাবাদিতা নির্লজ্জতা ও পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়। আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। আর মানুষ মিথ্যা বলতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নিকট তাকে ‘মহামিথ্যাবাদী’রূপে লিপিবদ্ধ করা হয়’।[11] তিনি আরো বলেন,كَفَى بِالمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِع ‘মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা কিছু শোনে (বিনা বিচারে) তা-ই বর্ণনা করে’।[12]
(৫) মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান থেকে বিরত থাকা ও বিরত রাখা :
মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা আমাদের সমাজে অতি সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউ এটিকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছে। অর্থের বিনিময়ে যে কোন মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে সে প্রস্তুত। আবার কেউ ক্ষমতার লোভে নোংরা এ কাজে জড়িত থাকছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَاجْتَنِبُوْا قَوْلَ الزُّوْرِ ‘তোমরা মিথ্যাকথন থেকে দূরে থাক’ (হজ্জ, ৩০)। তিনি আরও বলেন, وَالَّذِيْنَ لَا يَشْهَدُوْنَ الزُّوْرَ ‘(তারাই পরম দয়াময়ের দাস) যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না’ (ফুরক্বান, ৭২)। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ ‘নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সময়ের প্রতীক্ষায় থেকে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন’ (ফজর, ১৬)। একদা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الكَبَائِرِ قُلْنَا بَلَى يَا رَسُوْلَ اللهِ قَالَ الْإِشْرَاكُ بِاللهِ وعُقُوْقُ الوَالِدَيْنِ وَكَانَ مُتَّكِئًا فَجَلَسَ فَقَالَ أَلَا وَقَوْلُ الزُّوْرِ فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلنَا لَيْتَهُ سَكَتَ.
‘তোমাদেরকে কি অতি মহাপাপের কথা বলে দেব না? আমরা বললাম, ‘অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! তিনি বললেন, ‘আল্লাহ্র সাথে কোন কিছুকে শরীক করা এবং মাতা-পিতার অবাধ্যাচরণ করা’। তারপর তিনি হেলান ছেড়ে উঠে বসলেন এবং বললেন, ‘শোন! আর মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া’। শেষোক্ত কথাটি তিনি বারবার বলতে থাকলেন। এমনকি অনুরূপ বলাতে আমরা (মনে মনে) বললাম, যদি তিনি চুপ হতেন।[13]
(৬) গীবত করা, তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকা ও বিরত রাখা :
গীবত হল দোষারোপ করা, কুৎসা রটনা, পিছনে সমালোচনা করা, পরচর্চা করা, পরনিন্দা করা, কারো অনুপস্থিতিতে তার দোষগুলো অন্যের সামনে তুলে ধরা। গীবতের সবচেয়ে উত্তম সংজ্ঞা দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা কি জানো গীবত কাকে বলে? ছাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালো জানেন। তিনি বলেন, ‘তোমার কোন (দ্বীনী) ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপসন্দ করে, তাই গীবত’। ছাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি যে দোষের কথা বলি সেটা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলেও কি গীবত হবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তুমি যে দোষের কথা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে, তবে তুমি অবশ্যই গীবত করলে আর তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে, তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছ’।[14]
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ ‘পশ্চাতে ও সম্মুখে পরনিন্দাকারীর জন্য দুর্ভোগ’ (হুমাযাহ, ১)। গীবত মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার শামিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِّنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيْهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوْهُ وَاتَّقُوْا اللهَ إِنَّ اللهَ تَوَّابٌ رَّحِيْم.
‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কেউ যেন কারো গীবত না করে। তোমাদের কেউ কি চায় যে, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করবে? তোমরা তো এটাকে ঘৃণাই করে থাক’ (হুজুরাত, ১২)। অত্র আয়াত প্রমাণ করে যে, গীবত করা মৃত ব্যক্তির গোশত ভক্ষণ করার শামিল। গীবতকারীদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন আমাকে মি‘রাজে নিয়ে যাওয়া হল, তখন আমি তামার নখ বিশিষ্ট একদল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তারা নখগুলো দিয়ে তাদের মুখম-ল ও বক্ষদেশে আঘাত করে ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরীল আলাইহিস সালাম! এরা কারা? জিবরীল আলাইহিস সালাম বললেন, এরা দুনিয়াতে মানুষের গোশত ভক্ষণ করত এবং তাদের মান-সম্মান নষ্ট করত অর্থাৎ তারা মানুষের গীবত ও চোগলখোরি করত।[15] রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেছিলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! গীবত কি যেনার চেয়েও মারাত্মক? জবাবে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, কারণ কোন ব্যক্তি যেনার পর (বিশুদ্ধ) তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমা করেন কিন্তু গীবতকারীকে যার গীবত করা হয়েছে, তিনি মাফ না করলে আল্লাহ মাফ করবেন না’।[16] অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি তার কোন ভাইকে এমন কোন পাপের কারণে লজ্জা দিল, যার জন্য সে তওবা করেছে, ঐ পাপ না করা পর্যন্ত তার মৃত্যু হবে না’।[17]
(৭) ঘুষ দেয়া ও নেয়া থেকে বিরত থাকা ও বিরত রাখা :
ঘুষ বর্তমানে একটি সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। দায়িত্বশীল পদে থেকে নিয়মিত বেতন-ভাতা পাওয়া সত্ত্বেও বাড়তি কিছু গ্রহণ করাই ঘুষ। অনেক সময় স্বীয় অসৎ উদ্দেশ্য হাছিলের জন্য ঘুষ দেয়া হয়। আবার অনেক সময় টাকা-পয়সা ছাড়াও উপহারের নামে নানা সামগ্রী প্রদান করা হয়। সুতরাং যেভাবেই হোক, আর যে নামেই হোক তা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। ঘুষগ্রহীতা ও ঘুষদাতা সমান অপরাধী। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لَعْنَةُ اللهِ عَلَى الرَّاشِيْ وَالْمُرْتَشِيْ ‘ঘুষ প্রদানকারী ও গ্রহণকারী উভয়ের উপরই আল্লাহ্র লা‘নত’।[18]
হাদীছের ভাষায় ঘুষকে বলে ‘রিশওয়াহ’ বা দড়ি। দড়ি দিয়ে কুপের ভেতর থেকে বালতি টেনে উঠাবার মত ঘুষ অন্যের হক্ব নিজের ঘরে নিয়ে আসে। এই প্রক্রিয়ায় তিনটি পক্ষ থাকে: (১) রাশী رَاشِي ‘যে ঘুষ প্রদান করে’, (২) মুরতাশী مُرْتَشِي ‘যে ঘুষ গ্রহণ করে’ এবং (৩) রায়েশ رَائِش ‘যে অনুঘটক হয়ে কাজ করে’ অর্থাৎ ঘুষখোর ও ঘুষদাতার মধ্যে যে যোগাযোগ ঘটিয়ে থাকে। ঘুষ বা উৎকোচ আসে নযরানার রূপ ধরে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন ছাহাবীকে কর্মচারী নিয়োগ করে যাকাত আদায়ের জন্য পাঠালেন। তিনি ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললেন, এটা যাকাতের মাল আর এটা আমাকে উপঢৌকনস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। এতে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘সরকারী কর্মচারীর কি হল! আমরা যখন তাকে কোন দায়িত্ব দিয়ে কোথাও প্রেরণ করি, তখন সে ফিরে এসে বলে এই মাল আপনাদের (সরকারের) এবং এটা আমাকে প্রদত্ত উপহার। সে তার বাড়ীতে বসে থেকে দেখুক তাকে উপহার দেওয়া হয় কি-না’।[19]
ইসলামের পরশ আমাদের ক্বলবে পৌঁছেনি বলেই আজ আমরা ঘুষকে উপহার ভাবি। অফিসের ফাইল ঘুষ না পেলে সামনে চলে না। যার ফলে দেশ ও জাতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয় না। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মেধাহীনদের রাজত্ব চলে। ঘুষ দিয়ে যে চাকুরি পেতে হয়, সেই চাকুরিকে সেবা মনে করার কোন কারণ নেই। আর তাই ঘুষ দিয়ে শিক্ষকের চাকুরি পাওয়া লোকটির কাছ থেকে তার ছাত্ররা কতটুকু জ্ঞানী হবে তা নিয়ে মনে অনেক সংশয় থেকে যায়। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাড়াহুড়া করে অসৎভাবে উপার্জন করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, তিনি বলেন,
أَنَّ نَفْسًا لَنْ تَمُوتَ حَتَّى تَسْتَكْمِلَ رِزْقَهَا أَلَا فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَجْمِلُوا فِي الطَّلَبِ وَلَا يَحْمِلَنَّكُمُ اسْتِبْطَاءُ الرِّزْقِ أَنْ تَطْلُبُوهُ بِمَعَاصِي اللَّهِ فَإِنَّهُ لَا يُدْرَكُ مَا عِنْدَ اللَّهِ إِلَّا بِطَاعَتِهِ
‘কোন প্রাণী তার রিযিক্ব পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কখনও মরবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় কর এবং আবেদনে সৌন্দর্য বজায় রাখো। তোমার রিযিক্ব ধীরগতিতে আসার কারণে তা আল্লাহ্র নাফরমানীর মাধ্যমে চেয়ো না। কারণ তাঁর নিকট যা আছে তা লাভ করতে হলে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই করতে হবে’।২০ এই ঘুষের যামানায় পাকা দড়িবাজরা তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে দেখে আল্লাহ্র নেক বান্দারা মাঝে মাঝে ভাবে যে, নেক নিয়তের কি কোন দাম নেই? এটা কি বোকামি? কিন্তু তিতা ফলের চারা লাগিয়ে যেমন সুমিষ্ট ফলের আশা করা যায় না, তেমনি দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে উঠা ব্যবস্থাপনার কাছে কোন কল্যাণ আশা করা যায় না। তাই ঘুষ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,
فَبَدَّلَ الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا قَوْلًا غَيْرَ الَّذِيْ قِيلَ لَهُمْ فَأَنزَلْنَا عَلَى الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا رِجْزاً مِّنَ السَّمَاء بِمَا كَانُوْا يَفْسُقُوْن.
২০. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৮৬৬।
‘অতঃপর যালিমরা কথা পাল্টে দিল যা কিছু তাদের বলে দেয়া হয়েছিল তা থেকে। এ কারণে যারা যুলুম করল, তাদের উপর নাযিল করলাম আকাশ হতে এক মহাশাস্তি। কারণ, তারা অধর্ম-অন্যায় কাজ করেছিল’ (বাক্বারা, ৫৯)। এ আয়াতে সত্যকে বদলে দেওয়ার শাস্তির কথা উল্লেখ আছে। ঘুষও সত্যকে বদলে দেয়। পাসকে ফেল দেখিয়ে দেয়। একজন হক্বদারের হক্ব বদলে দিয়ে অন্যকে অন্যায়ভাবে সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে,
وَلَا تَأْكُلُوْا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ وَتُدْلُوْا بِهَا إِلَى الْحُكَّامِ لِتَأْكُلُوْا فَرِيْقًا مِّنْ أَمْوَالِ النَّاسِ بِالْإِثْمِ وَأَنتُمْ تَعْلَمُوْنَ.
‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কর না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের বা প্রশাসকদের কাছে পেশ কর না’ (বাক্বারাহ, ১৮৮)।
শেষকথা :
জানার সাথে সাথে মানার নামই হল প্রকৃত সফলতা। তাই দ্বীনী ইল্ম জানার যেমন কোন বিকল্প নেই, তেমনি দ্বীনী ইল্ম অনুযায়ী আমল না করে স্থায়ী সফলতা লাভের কোন বিকল্প উপায় নেই। দুনিয়ার জীবনের শেষ আছে। পরকালীন জীবনের কোন শেষ নেই। স্থায়ী জীবনে স্থায়ী কল্যাণ লাভের লক্ষ্যে প্রত্যেক দ্বীনী ইল্মধারীকে আলোচিত মন্দ আমলসমূহ থেকে নিজে বিরত থাকা এবং অন্যকে বিরত রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো উচিত। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে সেই তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
[1]. ইবনে মাজাহ, হা/২২৪; মিশকাত, হা/২১৮।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৩৭; মিশকাত, হা/২০০।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৮৯।
[4]. ছহীহ তারগীব, হা/১৩০।
[5]. নবীদের কাহিনী, ১/১৩ পৃঃ।
[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০২, মিশকাত, হা/২৮৬০।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৯৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮২৯।
[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৭১৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪২।
[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০৫।
[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫২৬।
[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৯৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬০৭।
[12]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫।
[13]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৭৬।
[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৯।
[15]. আবুদাঊদ, হা/৪৮৭৮।
[16]. বায়হাক্বী, হা/৬২৩৩, তাবারানী, হা/৬৭৬৫।
[17]. তিরমিযী, মিরকাত, হা/৪৮৫৫।
[18]. ইবনে মাজাহ, হা/২৩১৩।
[19]. আবুদাঊদ, ৩য় খ-, হা/২৯৪৩।
