কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

নফল ছিয়াম

post title will place here

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিচের এই দিনগুলোতে ছিয়াম পালন করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করেছেন—

১. শাওয়াল মাসের ছয় দিন ছিয়াম পালন করা: আবূ আইয়ূব আল-আনছারী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنْ صَامَ رَمَضَانَ ثُمَّ أَتْبَعَهُ سِتًّا مِنْ شَوَّالٍ كَانَ كَصِيَامِ الدَّهْرِ ‘যে ব্যক্তি রামযানের ছিয়াম পালনের পর শাওয়াল মাসের ছয় দিন ছিয়াম রাখল, সে যেন সারা বছর ছিয়াম রাখল’।[1]

২+৩. হজ্জে না যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য আরাফার দিন, আশূরার দিন তার পূর্বের দিন ছিয়াম: আবূ ক্বাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,سُئِلَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ؟ قَالَ يُكَفِّرُ السَّنَةَ الْمَاضِيَةَ وَالْبَاقِيَةَ وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَاشُورَاءَ؟ فَقَالَ يُكَفِّرُ السَّنَةَ الْمَاضِيَةَ ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আরাফার দিন ছিয়াম পালন করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, ‘তার পূর্বের এক বছর এবং পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়’। অতঃপর আশূরার ছিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘তা বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়’।[2]

উম্মুল ফাযল বিনতু হারেছ রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত,أَنَّ نَاسًا تَمَارَوْا عِنْدَهَا يَوْمَ عَرَفَةَ فِي صِيَامِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ بَعْضُهُمْ هُوَ صَائِمٌ وَقَالَ بَعْضُهُمْ لَيْسَ بِصَائِمٍ فَأَرْسَلْتُ إِلَيْهِ بِقَدَحِ لَبَنٍ وَهُوَ وَاقِفٌ عَلَى بَعِيرِهِ بِعَرَفَةَ فَشَرِبَهُ ‘লোকেরা আরাফার দিন তার নিকট রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছিয়াম পালন (করা বা না করা) সম্পর্কে আলোচনা করছিল। তাদের কেউ কেউ বলল, তিনি ছিয়ামরত নন। অতঃপর আমি তাঁর নিকট এক পেয়ালা দুধ পাঠালাম, তিনি আরাফাতে উটের উপর বসা অবস্থায় ছিলেন। দুধটুকু তিনি তখনই পান করে নিলেন’।[3]

আবূ গাত্বফান রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন,حِينَ صَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ إِنْ شَاءَ اللهُ صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আশূরার দিন ছিয়াম পালন করেন এবং লোকদেরকে ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন, তখন ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইয়াহূদী এবং নাছারা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘ইনশা-আল্লাহ! আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও ছিয়াম পালন করব’। বর্ণনাকারী বলেন, এখনও আগামী বছর আসেনি, এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ইন্তিকাল হয়ে যায়’।[4]

৪. মুহাররম মাসে অধিকহারে ছিয়াম পালন করা: আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,أَفْضَلُ الصِّيَامِ بَعْدَ رَمَضَانَ شَهْرُ اللهِ الْمُحَرَّمُ وَأَفْضَلُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الْفَرِيضَةِ صَلَاةُ اللَّيْلِ ‘রামাযান মাসের পর সবচেয়ে উত্তম ছিয়াম হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের ছিয়াম। আর ফরয ছালাতের পর সবচেয়ে উত্তম ছালাত হলো রাতের ছালাত’।[5]

৫. শা‘বান মাসে অধিকহারে ছিয়াম পালন করা: আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,مَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ قَطُّ إِلَّا رَمَضَانَ وَمَا رَأَيْتُهُ فِي شَهْرٍ أَكْثَرَ مِنْهُ صِيَامًا فِي شَعْبَانَ ‘আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রামাযান মাস ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পরিপূর্ণ এক মাস ছিয়াম পালন করতে দেখিনি। অনুরূপ শা‘বান মাস ব্যতীত অন্য কোনো মাসে অধিকাংশ দিন তাঁকে ছিয়ামরত দেখিনি’।[6]

৬. সোম ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম পালন করা: উসামা ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,إِنَّ نَبِيَّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَصُومُ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ وَسُئِلَ عَنْ ذَلِكَ فَقَالَ إِنَّ أَعْمَالَ الْعِبَادِ تُعْرَضُ يَوْمَ الِاثْنَيْنِ وَيَوْمَ الْخَمِيسِ ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোম ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম রাখতেন। তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘সোমবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর নিকট বান্দার আমলসমূহ পেশ করা হয়’।[7]

৭. প্রতি মাসে তিন দিন ছিয়াম পালন করা: আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন,صُمْ مِنَ الشَّهْرِ ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ فَإِنَّ الحَسَنَةَ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا وَذَلِكَ مِثْلُ صِيَامِ الدَّهْرِ ‘প্রত্যেক মাসে তিন দিন ছিয়াম পালন করো। কেননা প্রতিটি নেক আমলের ১০ গুণ ছওয়াব পাওয়া যায় আর এটা এক বছর ছিয়াম পালন করার সমান’।[8]

আরও পছন্দনীয় হলো মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ছিয়াম পালন করা।

আবূ যার রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন,يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا صُمْتَ مِنَ الشَّهْرِ ثَلَاثَةَ أَيَّامٍ فَصُمْ ثَلَاثَ عَشْرَةَ وَأَرْبَعَ عَشْرَةَ وَخَمْسَ عَشْرَةَ ‘হে আবূ যার! তুমি প্রতি মাসে তিন দিন ছিয়াম পালন করতে চাইলে ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে তা পালন করো’।[9]

৮. এক দিন ছিয়াম পালন করা, এক দিন বিরত থাকা (দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর ছিয়াম): আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,أَحَبُّ الصِّيَامِ إِلَى اللهِ صِيَامُ دَاوُدَ كَانَ يَصُومُ يَوْمًا وَيُفْطِرُ يَوْمًا ‘আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাধিক প্রিয় ছিয়াম হলো দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর ছিয়াম। তিনি এক দিন ছিয়াম পালন করতেন আর এক দিন ছিয়ামবিহীন অবস্থায় থাকতেন’।[10]

৯. যিহজ্জের ১০ দিন: হুনায়দা ইবনু খালেদ রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি তার স্ত্রী থেকে এবং নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো এক স্ত্রী সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন,كَانَ رَسُولُ اللهِصَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ أَوَّلَ اثْنَيْنِ مِنَ الشَّهْرِ وَالْخَمِيسَ ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্জ মাসের নয় তারিখ পর্যন্ত, আশূরার দিন, প্রত্যেক মাসে তিন দিন এবং মাসের প্রথম সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছিয়াম পালন করতেন’।[11]

মূল: ড. আব্দুল আযীম আল-বাদাবী

অনুবাদ: হাফীযুর রহমান বিন দিলজার হোসাইন

প্রিন্সিপ্যাল, দারুস সালাম ইসলামী কমপ্লেক্স, পিরুজালী ময়তাপাড়া, গাজীপুর।


[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৪; আবূ দাঊদ, হা/২৪৩৩; তিরমিযী, হা/৭৫৯; ইবনু মাজাহ, হা/১৭১৬; মিশকাত, হা/২০৪৭।

[2]. ইরওয়াউল গালীল, হা/৯৫৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৪, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১১২৩; আবূ দাঊদ, হা/২৪৪১; মিশকাত, হা/২৪৪২।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩৪; আবূ দাঊদ, হা/২৪৪৫।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৬৩; আবূ দাঊদ, হা/২৪২৯; নাসাঈ, হা/১৬১৩; তিরমিযী, হা/৪৩৮; মিশকাত, হা/২০৩৯।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৬৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৬; আবূ দাঊদ, হা/২৪৩৪।

[7]. আবূ দাঊদ, হা/২৪৩৬, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৯; আবূ দাঊদ, হা/২৪২৭, ‘তাতে মাঝের বাক্যটি নেই’; নাসাঈ, হা/২৩৯২।

[9]. ছহীহুল জামে‘, হা/৭৮১৭; তিরমিযী, হা/৭৬১; নাসাঈ, হা/২৪২৪; মিশকাত, হা/২০৫৭, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে হাসান ছহীহ বলেছেন।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৯; নাসাঈ, হা/১৬৩০; আবূ দাঊদ, হা/২৪৩৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৭১২।

[11]. আবূ দাঊদ, হা/২৪৩৭; নাসাঈ, হা/২৪১৮, আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।

Magazine