(জুলাই’১৯ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
এ পর্যায়ে আমরা এমন কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে আলোকপাত করব, যে সম্পর্কে পরিবারের প্রধানের জ্ঞান থাকা যরূরী:
(১) তাদের জন্য খরচ করা :
পরিবারের প্রধানের দায়িত্ব হল, তিনি নিজের সম্পদ থেকে পরিবারের জন্য খরচ করবেন। নিজের যা আছে তা দিয়েই পরিবারের প্রয়োজন মেটাবেন, যাতে তারা অন্যের মুখাপেক্ষী না হয়।
নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিম ব্যক্তিকে সবকিছুর আগে নিজের পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করার আদেশ দিয়েছেন। তিনি জনৈক ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, وَابْدَأْ بِمَنْ تَعُولُ ‘যাদের ভরণ-পোষণ তোমার দায়িত্বে আছে, তাদের আগে দাও’।[1] আরেকটি হাদীছে এসেছে,
عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَبِيْعُ نَخْلَ بَنِي النَّضِيرِ وَيَحْبِسُ لِأَهْلِهِ قُوتَ سَنَتِهِمْ.
ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনূ নাযীরের খেজুর বিক্রি করতেন এবং পরিবারের জন্য এক বছরের খাদ্য জোগাড় করে রাখতেন’।[2]
বান্দা প্রতিদানের আশা নিয়ে তার পরিবারের জন্য কিছু খরচ করলে মহান রাববুল আলামীন তার জন্য বড় প্রতিদান রাখার মাধ্যমে বান্দার উপর অনুগ্রহ করেছেন। যেমন একটি হাদীছে এসেছে-
عَنْ أَبِي مَسْعُوْدٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا أَنْفَقَ الرَّجُلُ عَلَى أَهْلِهِ يَحْتَسِبُهَا فَهُوَ لَهُ صَدَقَةٌ.
আবু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মানুষ স্বীয় পরিবার-পরিজনের জন্য পুণ্যের আশায় যখন ব্যয় করে, তখন সেটা তার জন্য ছাদাক্বাহ হয়ে যায়’।[3]
ইবনে হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদীছের মধ্যকার احتساب শব্দের অর্থ হল, ‘প্রতিদানের আশা করা’। এ হাদীছের উপকারিতা হল, নিয়তবিহীন আমলের দ্বারা প্রতিদান অর্জিত হয় না।
এজন্য ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ আবু মাসঊদের উল্লেখিত হাদীছটি بَابٌ: مَا جَاءَ إِنَّ الأَعْمَالَ بِالنِّيَّةِ وَالحِسْبَةِ ‘অধ্যায়: আমলসমূহ সংকল্প ও পুণ্যের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়’-এর অধীনে উল্লেখ করেছেন। হাদীছে উল্লেখিত রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী عَلَى أَهْلِهِ বাক্যের দ্বারা এ খরচের মধ্যে স্ত্রী ও নিকটাত্মীয় সকলেই অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। পরিবারের উপর খরচ করা সকলের ঐকমত্যে ওয়াজিব। এটাকে শরী‘আত প্রণেতা ছাদাক্বাহ (অতিরিক্ত দান) বলে উল্লেখ করেছেন, যাতে লোকেরা এই ওয়াজিব আদায়ে কোন প্রতিদান নেই, এমনকি ছাদাক্বাহর মধ্যেও কোন প্রতিদান নেই এটা ভেবে না বসে।
পরিবারের জন্য খরচ করা ছাদাক্বাহর অন্তর্ভুক্ত- এটা জানার মাধ্যমে তারা যেন নিজের পরিবারকে বঞ্চিত করে অন্যকে দান করার ব্যাপারে উৎসাহী না হয়। পরিবারের জন্য খরচ করা ওয়াজিব হওয়া এবং তা ছাদাক্বাহ হিসাবে গণ্য হওয়ার মধ্যে কোন অসঙ্গতি নেই। বরং পরিবারের জন্য খরচ করা নফল দানের চেয়ে উত্তম।[4]
এ প্রসঙ্গে জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিমেণাক্ত হাদীছটি প্রণিধানযোগ্য।
عَنْ جَابِرٍ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ ابْدَأْ بِنَفْسِكَ فَتَصَدَّقْ عَلَيْهَا فَإِنْ فَضَلَ شَيْءٌ فَلِأَهْلِكَ فَإِنْ فَضَلَ عَنْ أَهْلِكَ شَيْءٌ فَلِذِيْ قَرَابَتِكَ فَإِنْ فَضَلَ عَنْ ذِي قَرَابَتِكَ شَيْءٌ فَهَكَذَا وَهَكَذَا يَقُولُ فَبَيْنَ يَدَيْكَ وَعَنْ يَمِيْنِكَ وَعَنْ شِمَالِكَ.
জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এ অর্থ তুমি প্রথমে তোমার নিজের জন্য ব্যয় কর, তারপর যদি কিছু বাকি থাকে, তাহলে তোমার পরিবারের লোকদের জন্য তা ব্যয় কর, অতঃপর তোমার নিকটাত্মীয়দের জন্য ব্যয় কর, এরপরও যদি কিছু অবকাশ থাকে, তাহলে তা এদিকে সেদিকে ব্যয় কর’ এ বলে তিনি সামনে ডানে ও বামে হাত দিয়ে ইঙ্গিত করলেন’।[5]
এর অর্থ এটা নয় যে, অন্যদের দান করতে আমরা ভুলে যাব। বরং অন্যরাও আমাদের দানের অংশীদার হবে। যে ব্যক্তি এই খরচ করার মধ্যে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করে সেই বুদ্ধিমান। সে ন্যায়সঙ্গতভাবে তার পরিবারের জন্য খরচ করবে। কোন প্রকার অপচয় করবে না। তার সম্পদ থেকে কিছু অবশিষ্ট রাখবে, যাতে বিভিন্ন কল্যাণকর কাজে ব্যয় করতে পারে।
(২) তাদের সাথে শরী‘আত মাফিক শিষ্টাচার দেখানো :
ইসলামী শরী‘আতে পুরুষের জন্য তার পরিবারের সাথে পালনীয় অনেক শিষ্টাচারের কথা বলা হয়েছে, তার জন্য এগুলো রক্ষা করা যরূরী।
এসব আদব বা শিষ্টাচারের মধ্যে রয়েছে- স্ত্রীর নিকট গমনের সময় নির্ধারিত দো‘আ পাঠ করা। যেমন নিমেণাক্ত হাদীছে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ يَبْلُغُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ إِذَا أَتَى أَهْلَهُ قَالَ بِاسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا فَقُضِيَ بَيْنَهُمَا وَلَدٌ لَمْ يَضُرُّهُ.
ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কেউ তার স্ত্রীর সাথে মিলনের পূর্বে যদি বলে, بِسْمِ اللهِ اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا ‘আল্লাহ্র নামে আরম্ভ করছি। আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে শয়তান থেকে দূরে রাখ এবং যা আমাদেরকে দান করবে, তাকেও শয়তান থেকে দূরে রাখ’। তারপর (এ মিলনের দ্বারা) তাদের কিসমতে কোন সন্তান থাকলে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না’।[6]
পরিবারের ব্যাপারে শরী‘আতের আরো একটি শিষ্টাচার হল, পুরুষ (সফর থেকে ফিরে) রাতের বেলাতেই স্ত্রীর নিকট গমন করবে না। যেমন জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদীছ বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ جَابِرٍ قَالَ نَهَى رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يَطْرُقَ الرَّجُلُ أَهْلَهُ لَيْلاً يَتَخَوَّنُهُمْ أَوْ يَلْتَمِسُ عَثَرَاتِهِم.
জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলা অতর্কিত ঘরে ফিরে স্ত্রীর প্রতি সন্দেহ পোষণ কিংবা দোষ-ত্রুটি খুঁজতে বারণ করেছেন’।[7]
এই হাদীছের মর্মার্থ হল, যখন সে কোন দীর্ঘ সফর শেষে রাতের বেলায় তার শহরে পৌঁছবে, তখন সরাসরি তার বাড়ীতে যাওয়া উচিত নয়। বরং স্ত্রীর নিকট লোক পাঠিয়ে খবর দিবে যে, সে তার শহরে পৌঁছেছে, যাতে স্ত্রী তাকে সম্ভাষণ জানানোর প্রস্ত্ততি নিতে পারে। নিজেকে ও বাড়ীকে পরিপাটি করে নেয়ার সুযোগ পায়। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللهِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا دَخَلْتَ لَيْلًا فَلاَ تَدْخُلْ عَلَى أَهْلِكَ حَتَّى تَسْتَحِدَّ المُغِيبَةُ وَتَمْتَشِطَ الشَّعِثَةُ.
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সফর থেকে রাতে প্রত্যাবর্তন করে গৃহে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ না অনুপস্থিত স্বামীর স্ত্রী ক্ষুর ব্যবহার করতে পারে এবং এলোকেশী স্ত্রী চিরুনি করে নিতে পারে’।[8]
এই হাদীছের মধ্যে ব্যবহৃত المُغِيبَة এর অর্থ হল, এমন স্ত্রী যার স্বামী তার থেকে দূরে চলে গেছে। এখানে تَسْتَحِدّ এর অর্থ হল, ক্ষুর ব্যবহার করা। অর্থাৎ শরীর থেকে অপ্রয়োজনীয় চুল পরিষ্কার করা।
পরিবারের লোকেরা যখন শারঈ শিষ্টাচারে মার্জিত একজন ব্যক্তিকে পায়, তখন সে তাদেরকে শারঈ শিষ্টাচার গ্রহণের ক্ষেত্রে উৎসাহিত করে। এটাই হল পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর সর্বোত্তম পন্থা।
(চলবে)
মূল : মুহাম্মাদ ইবনে ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ
অনুবাদ : আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৫৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৪২।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৩৫৭।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১০০২।
[4]. ফাতহুল বারী, ৯/৪৯৮ পৃঃ।
[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৯৭।
[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪১; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪৩৪।
[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৫।
[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৫২৪৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৫।
