কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

মসজিদে নিষিদ্ধ কাজসমূহ

ভূমিকা :

পৃথিবীর যে কোন স্থানে মানুষ সিজদা করে, সেটাই তার জন্য মসজিদ। যেমন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হাদীছে বর্ণিত কয়েকটি জিনিস গনীমত হিসাবে দেয়া হয়েছে, যা অন্য কোন নবীকে দেয়া হয়নি। তার মধ্যে অন্যতম একটি মসজিদ, وَجُعِلَتْ لِيْ الْأرْضُ كُلُّهَا مَسْجِدًا ‘আমার জন্য পুরো যমীনকেই সিজদার স্থান বা মসজিদ রূপে নির্ধারণ করা হয়েছে’।[1] তবুও আমরা পৃথিবীতে আল্লাহ্র ইবাদত বন্দেগী করার লক্ষ্যে নির্মিত নির্দিষ্ট ঘরকেই মসজিদ হিসাবে জানি। তাই উক্ত ঘরে এমন কিছু কাজ রয়েছে, যা ঐ ঘরের সম্মানার্থে নিষিদ্ধ, তাই হচ্ছে আমার আলোচনার শিরোনাম। এ সম্পর্কে ধারবাহিকভাবে আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

মসজিদে হৈ চৈ না করা :

মসজিদ হচ্ছে শান্ত নিরিবিলি স্থান, মহান আল্লাহ্র রহমত ও শান্তি এখানে বর্ষণ হতে থাকে। এখানে দুনিয়াবী, এমনকি পরকালীন বিষয়েও হৈ চৈ করা যাবে না। এটি হচ্ছে ইবাদতের জায়গা, এখানে ইবাদত ছাড়া অন্য কিছু করা উচিত নয়। আর হৈ চৈ করা তো ইবাদত নয়। বাজারে যেমন ভাল-মন্দ উভয় বিষয়েই হৈ চৈ হয়, মসজিদ ঠিক তার বিপরীত। মসজিদে সে রকম চিৎকার, চেঁচামেচি করা যাবে না। এসম্পর্কে হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ عَبْدِ اللهِ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لِيَلِيَنِىْ مِنْكُمْ أُوْلُو الْأَحْلاَمِ وَالنُّهَى ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ وَلَا تَخْتَلِفُوْا فَتَخْتَلِفَ قُلُوْبُكُمْ وَإِيَّاكُمْ وَهَيْشَاتِ الأَسْوَاقِ.

আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা বয়স্ক ও বুদ্ধিমান, তারা যেন (ছালাতে) আমার নিকটে দাঁড়ায়, অতঃপর যারা তাদের পরবর্তী স্তরের, অতঃপর যারা তাদের পরবর্তী স্তরের। আঁকাবাঁকা (কাতারে) দাঁড়াবে না! তাতে তোমাদের অন্তরসমূহ আলাদা হয়ে যাবে। সাবধান! মসজিদকে (হৈ চৈ করে) বাজারে পরিণত কর না’।[2]

অন্য হাদীছে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনু কা‘ব ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি ইবনু আবী হাদরাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তার দেয়া ঋণ ফেরত দেয়ার জন্য মসজিদের মধ্যে তাগাদা দিলেন। এতে তাদের উভয়ের কণ্ঠস্বর চরমে উঠে (হৈ চৈ হয়) এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘর থেকে (হৈ চৈ) শুনতে পান। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের নিকট বের হয়ে এসে কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডাকলেন, কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি উপস্থিত হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমার পাওনা থেকে এই পরিমাণ ছেড়ে দাও’ এবং নিজের হাত দিয়ে ইশারা করে অর্ধেক ছেড়ে দিতে বলেন। কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি তাই করলাম। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (হাদরাদকে) বলেন, ‘উঠে যাও এবং ঋণ পরিশোধ কর’।[3]

উক্ত হাদীছ দু’টি ও আরো অন্যান্য হাদীছ হতে প্রতীয়মান হয় যে, মসজিদে হৈ চৈ করা যাবে না, তা যে কোন বিষয়েই হোক না কেন, চাই সেটা সামাজিক বিষয়েই হোক অথবা ধর্মীয় বিষয়েই হোক। অর্থাৎ কোন বিষয়েই মসজিদে হৈ চৈ করা যাবে না। এরকম কাজ হতে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

মসজিদে থুথু না ফেলা :

মানুষের মুখ থেকে থুথু বের হওয়ার পর সেটি সবার কাছে অরুচিকর মনে হয়। কফ ও থুথু যেখানে সেখানে ফেলা উচিত নয়। কিন্তু সমাজে কিছু মানুষ আছে, যারা যেখানে সেখানে কফ ও থুথু ফেলে থাকে, এমনকি দুনিয়ার উত্তম স্থান মসজিদেও অনেকেই থুথু ফেলে থাকে, যা উচিত নয়। তবে শয়তান হতে বাঁচতে বামদিকে হালকা করে থুথু নিক্ষেপ করা যাবে, কিন্তু কিবলার দিকে থুথু ফেলা যাবে না। এ সম্পর্কে হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَى نُخَامَةً فِىْ قِبْلَةِ الْمَسْجِدِ فَغَضِبَ حَتَّى احْمَرَّ وَجْهُهُ فَجَاءَتْهُ امْرَأَةٌ مِنَ الأَنْصَارِ فَحَكَّتْهَا وَجَعَلَتْ مَكَانَهَا خَلُوْقًا فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا أَحْسَنَ هَذَا.

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে কিবলার দিকে থুথু দেখতে পেয়ে খুবই রাগান্বিত হন, এমনকি তাঁর চেহারা রক্তিমবর্ণ ধারণ করে। এক আনছারী মহিলা এসে তা (থুথু) মুছে ফেলেন এবং সেই স্থানে সুগন্ধি লাগিয়ে দেন। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এটা (সুগন্ধি) কতই না উত্তম’।[4] অন্য হাদীছে এসেছে, আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মসজিদে থুথু ফেলা গুনাহের কাজ, এর জরিমানা হল তা (থুথু) মাটিতে পুতে ফেলা’।[5] অপর হাদীছে পাওয়া যায়, আবু যার রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার উম্মতের ভালো ও মন্দ কার্যাবলী আমার সামনে পেশ করা হলে আমি তাদের ভালো কার্যাবলীর মধ্যে যাতায়াতের পথ থেকে তাদের কষ্টদায়ক বস্তু সরানোও অন্তর্ভুক্ত দেখতে পেলাম এবং তাদের নিকৃষ্ট কার্যাবলীর মধ্যে মসজিদে থুথু ফেলাও অন্তর্ভুক্ত পেলাম, যা (মাটি দিয়ে) ঢেকে দেয়া হয়নি’।[6]

উক্ত হাদীছগুলো হতে বুঝা যায় যে, মসজিদে থুথু ফেলা যাবে না। এমনকি কেউ যদি মসজিদের কোথাও থুথু দেখতে পায়, তাহলে সে তা মুছে দিবে এবং সেখানে সুগন্ধি লাগিয়ে দিবে। হাদীছে মসজিদে থুথু ফেলাকে নিকৃষ্ট কার্যাবলীর মধ্যে গণ্য করা হয়েছে এবং গুনাহের কাজ বলেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে থুথু ফেলা অপসন্দ মনে করেছেন। তাই আমাদেরকেও একাজ থেকে বিরত থাকা যরূরী। এমনকি মসজিদে থুথু ফেলার পর তা মুছে না দিলে পাপ হবে। মসজিদে থুথু ফেলা গুনাহের কাজ, এর জরিমানা হল তা (থুথু) মাটিতে পুতে ফেলা। অতঃপর মসজিদে থুথু ফেলা আমাদের জন্য উচিত নয়। তাছাড়া নিজ ঘরে যদি থুথু ফেলা অসভ্যতা হয়, তাহলে স্বয়ং মহান আল্লাহ্র ঘরে থুথু ফেলা কী করে সভ্যতা হবে? তাই আমাদের মসজিদে থুথু ফেলা থেকে বেঁচে থাকা একান্ত যরূরী।

হারানো জিনিসের ঘোষণা না দেয়া :

মানুষের জীবন পরিক্রমায় অনেক সময় অনেক জিনিস হারিয়ে যায়, কেউ তা পায় আবার কেউ তা পায় না। তবে কম-বেশি সবাই খোঁজ করে থাকে। অনেকেই অনেক পদ্ধতিতে হারানো জিনিস খোঁজেন, কিন্তু কিছু লোক আছে যারা হারানো জিনিস খোঁজার জন্য মসজিদ ব্যবহার করে থাকে, কেউ জামা‘আতে ছালাত আদায়ের পর, আবার কেউ মসজিদের মাইকে, যা পরিহার করা আবশ্যক। এ সম্পর্কে হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ سُلَيْمَانَ بْنِ بُرَيْدَةَ عَنْ أَبِيْهِ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمَّا صَلَّى قَامَ رَجُلٌ فَقَالَ مَنْ دَعَا إِلَى الْجَمَلِ الأَحْمَرِ فَقَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا وَجَدْتَ إِنَّمَا بُنِيَتِ الْمَسَاجِدُ لِمَا بُنِيَتْ لَهُ.

সুলায়মান ইবনে বুরায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাত পড়লেন, এক ব্যক্তি (দাঁড়িয়ে) বললেন, কে (আমাকে) লাল উটের খোঁজ দিতে পারে? (অর্থাৎ উটটি হারিয়ে গেছে) নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি যেন তা (উটটি) না পাও। মসজিদ যে উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হয়েছে, তা সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হবে’।[7] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ مَنْ سَمِعَ رَجُلًا يَنْشُدُ ضَالَّةً فِى الْمَسْجِدِ فَلْيَقُلْ لَا رَدَّهَا اللهُ عَلَيْكَ فَإِنَّ الْمَسَاجِدَ لَمْ تُبْنَ لِهَذَا.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে মসজিদের হারানো জিনিস খোঁজার ঘোষণা দিতে শুনলে সে যেন বলে ‘আল্লাহ তোমাকে যেন তা ফিরিয়ে না দেন’; কারণ এজন্য মসজিদ নির্মাণ করা হয়নি’।[8] অপর হাদীছে পাওয়া যায়, আমর ইবনে শু‘আইব রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা, তিনি তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে হারানো জিনিস খোঁজার ঘোষণা দিতে নিষেধ করেছেন’।[9]

উক্ত হাদীছগুলোর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, মসজিদে হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া যাবে না। তেমনি মসজিদের সরঞ্জামাদি এবং মসজিদ শুধু দ্বীনি কাজেই ব্যবহার হবে, অন্য কোন কাজের জন্য নয়। আরো প্রতীয়মান হয়, মসজিদে হারানো জিনিসের ঘোষণা, ভোটের প্রচারসহ দুনিয়াবী কোন প্রচারণা চলবে না। কেননা মসজিদ শুধু আল্লাহ্র ইবাদত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে। তবে দ্বীনি আলোচনা ও দ্বীনি ঘোষণা প্রদান করা যাবে।

মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ :

মানব জীবনে ক্রয়-বিক্রয়ের প্রয়োজন আছে, মানুষ ক্রয়-বিক্রয় করবে, এটাই স্বাভাবিক বিষয়। আর এজন্যই বহুকাল পূর্ব থেকেই হাট-বাজারের প্রচলন আছে। এ কাজে ইসলামে কোন নিষেধ নেই, কিন্তু মসজিদে একাজ করা হতে নিষেধ করা হয়েছে। বর্তমানে কিছু মানুষ তাদের ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান হিসাবে মসজিদকে নির্ধারণ করেছে, যা অবশ্যই পরিহার করতে হবে। এসম্পর্কে হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيْهِ عَنْ جَدِّهِ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ نَهَى عَنْ تَنَاشُدِ الْأَشْعَارِ فِى الْمَسْجِدِ.

আমর ইবনে শু‘আইব রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা হতে, তার পিতা তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদসমূহে ক্রয়-বিক্রয় করতে এবং কবিতা আবৃতি করতে নিষেধ করেছেন।[10] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا رَأَيْتُمْ مَنْ يَبِيْعُ أَوْ يَبْتَاعُ فِي الْمَسْجِدِ فَقُوْلُوْا لَا أَرْبَحَ اللهُ تِجَارَتَكَ وَإِذَا رَأَيْتُمْ مَنْ يَنْشُدُ فِيْهِ ضَالَّةً فَقُولُوا لَا رَدَّ اللهُ عَلَيْكَ.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মসজিদের ভিতরে তোমরা কোন লোককে বেচা-কেনা করতে দেখলে বলবে, ‘আল্লাহ যেন তোমার ব্যবসায় কোন লাভ প্রদান না করেন’ মসজিদের মধ্যে তোমরা কোন লোককে হারানো জিনিসের ঘোষণা দিতে দেখলে বলবে, ‘তোমার হারানো জিনিসকে যেন আল্লাহ ফিরিয়ে না দেন’।[11]

উক্ত হাদীছগুলো প্রমাণ করছে যে, মসজিদে কোন প্রকারের ক্রয়-বিক্রয় চলবে না। কিন্তু বর্তমানে মসজিদে জিনিস বিক্রয় ও বিক্রয়ের ঘোষণা উভয়ই হতে দেখা যায়। যেমন- কোন ব্যক্তির পুরাতন ঘর-বাড়ী, মসজিদের অতিরিক্ত জিনিস, গাছের ফল সহ মসজিদের ধান ও মসজিদের অন্যান্য জিনিস বিক্রয়ের ঘোষণা। আলেমদের বই, কবিরাজির তৈল, তাবিজ সহ আরো অন্যান্য জিনিস। এগুলো ছাড়াও আরো অনেক জিনিস মসজিদে ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে, যা ইসলামী শরী‘আতে নেই অর্থাৎ মসজিদে কেনা-বেচা করা নিষিদ্ধ। এমনকি হাদীছেও এর বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। তাই সকলকে এ কাজ থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

দুই খুঁটির মাঝখানে কাতার না করা :

জামা‘আতে ছালাত আদায় করার জন্য মসজিদ একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজনের তাগিদে গ্রামে-গঞ্জে ও শহরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মসজিদ। আর বড় বড় মসজিদগুলোর মাঝে রয়েছে প্রয়োজনীয় খুঁটি। বড় মসজিদগুলোতে খুঁটি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগেও মসজিদের মাঝে খুঁটি ছিল। কিন্তু সে যুগে দুই খুঁটির মাঝখানে কাতার করা হত না, যা বর্তমানে অনেক মসজিদে দেখা যায়। যা পরিত্যাগ করা আবশ্যক। এ সম্পর্কে হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ عَبْدِ الْحَمِيْدِ بْنِ مَحْمُودٍ قَالَ صَلَّيْنَا خَلْفَ أَمِيْرٍ مِنَ الْأُمَرَاءِ فَاضْطُرَّ النَّاسُ فَصَلَّيْنَا مَا بَيْنَ سَارِيَتَيْنِ فَلَمَّا صَلَّيْنَا قَالَ أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ كُنَّا نَتَّقِي هَذَا عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

আব্দুল হামীদ ইবনে মাহমূদ রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা জনৈক আমীরের পিছনে ছালাত আদায় করলাম। লোকের এত ভীড় হল যে, আমরা বাধ্য হয়ে দুই খুঁটির মাঝখানে ছালাতে দাঁড়ালাম, যখন ছালাত শেষ করলাম, আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময়ে (এভাবে দাঁড়ানো) এড়িয়ে যেতাম।[12] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ قُرَّةَ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ كُنَّا نُنْهَى أَنْ نَصُفَّ بَيْنَ السَّوَارِى عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَنُطْرَدُ عَنْهَا طَرْدًا.

মু‘আবিয়া ইবনে কুররাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যামানায় আমাদেরকে দুই খুঁটির মাঝখানে কাতারবন্দী হতে নিষেধ করা হত এবং আমাদেরকে (এটি হতে) কঠোরভাবে বিরত রাখা হত।[13] এখানে দুই খুঁটির মাঝে কাতার অর্থাৎ কাতারের মাঝে দুই বা ততোধিক খুঁটি থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। হাদীছদ্বয় হতে বুঝা যায়, যে কাতারের মাঝে খুঁটি থাকবে সেই কাতারে জামা‘আতে ছালাত আদায় করা যাবে না। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি হতে ছাহাবীদেরকে বিরত রাখতেন। আর এজন্যই মসজিদ তৈরির সময় যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্বে প্রয়োজন অনুযায়ী যাতে মসজিদের কাতার, মেহরাব, মিম্বার ইত্যাদি যথাযথভাবে প্রস্ত্তত হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অনেকেই আবার মুছল্লী বেশির দোহাই দিয়ে খুঁটির মাঝে কাতার করা বৈধ বলেন, কিন্তু হাদীছ তা হতে বিরত থাকার নির্দেশ প্রদান করে। অতএব যেখানে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, সেখানে কোন ব্যক্তি বা বুজুর্গের কথা চলবে না। একমাত্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাকেই প্রাধান্য দিয়ে খুঁটির মাঝে কাতার করা হতে বিরত থাকতে হবে।

কাঁচা রসুন ও পেঁয়াজ খেয়ে মসজিদে অবস্থান না করা :

মানুষের জীবন ধারণের জন্য খাদ্যের অতীব প্রয়োজন। কিন্তু কিছু কিছু খাদ্য আছে, যেগুলো খেতে হলে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, কাঁচা রসুন ও পেঁয়াজ। এগুলো খেলে মুখে এক ধরনের দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়, যার ফলে আশেপাশের সকলেই কষ্ট পায় এমনকি ফেরেশতারাও কষ্ট পান। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দু’টি খাদ্য খেয়ে মসজিদে যেতে নিষেধ করেছেন। আমাদের দেশের অনেক মানুষ কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন খেতে অভ্যস্ত। যার ফলে তারা যখন মসজিদে আসে, তখন মুখে পেঁয়াজ ও রসুনের দুর্গন্ধ পাওয়া যায়, যা আসলেই কষ্টদায়ক। এ সম্পর্কে হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ شَيْئًا فَلاَ يَأْتِيَنَّ الْمَسْجِدَ.

ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এই (পেঁয়াজ, রসুন) গাছের কিছু খায়, সে যেন মসজিদে না আসে’।[14] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ مَعْدَانَ بْنِ أَبِىْ طَلْحَةَ الْيَعْمُرِىِّ أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ قَامَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ خَطِيْبًا أَوْ خَطَبَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ فَحَمِدَ اللهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ ثُمَّ قَالَ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تَأْكُلُوْنَ شَجَرَتَيْنِ لَا أُرَاهُمَا إِلَّا خَبِيْثَتَيْنِ هَذَا الثُّوْمُ وَهَذَا الْبَصَلُ وَلَقَدْ كُنْتُ أَرَى الرَّجُلَ عَلَى عَهْدِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوْجَدُ رِيْحُهُ مِنْهُ فَيُؤْخَذُ بِيَدِهِ حَتَّى يُخْرَجَ إِلَى الْبَقِيْعِ فَمَنْ كَانَ آكِلَهَا لَا بُدَّ فَلْيُمِتْهَا طَبْخًا.

মা‘দান ইবনে আবু ত্বালহা আল ইয়া‘মুরী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু জুম‘আর খুৎবা দিতে দাঁড়ালেন অথবা তিনি জুম‘আর খুৎবা দিলেন। তিনি আল্লাহ্র প্রশংসা ও গুণগান করার পর বললেন, হে লোক সকল! তোমরা দু’টি গাছ খেয়ে থাক, আমার দৃষ্টিতে তা নিকৃষ্ট: এই রসুন ও এই পেঁয়াজ। আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে দেখতাম, যার মুখ থেকে এর (পেঁয়াজ ও রসুনের) দুর্গন্ধ পাওয়া যেত, তার হাত ধরে (মসজিদ হতে) তাকে আল-বাক্বী নামক স্থানের দিকে বের করে দেয়া হত। অতএব যে ব্যক্তি তা (পেঁয়াজ ও রসুন) খেতে চায়, সে যেন তা রান্না করে খায়।[15] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ الشَّجَرَةِ الثُّوْمِ فَلَا يُؤْذِيْنَا بِهَا فِىْ مَسْجِدِنَا هَذَا.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এই গাছ অর্থাৎ রসুন খায়, সে যেন তার দ্বারা এই মসজিদে (এসে) আমাদেরকে কষ্ট না দেয়’।[16] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ جَابِرٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ أَكَلَ مِنْ هَذِهِ قَالَ أَوَّلَ مَرَّةٍ الثُّوْمِ ثُمَّ قَالَ الثُّوْمِ وَالْبَصَلِ وَالْكُرَّاثِ فَلَا يَقْرَبْنَا فِىْ مَسَاجِدِنَا.

জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে এটা খেল, তিনি প্রথমবার রসুনের কথা বলেছেন, অতঃপর বলেছেন, রসুন, পেঁয়াজ ও এই রকম দুর্গন্ধ যুক্ত জিনিস খেল, সে আমাদের মসজিদের নিকেটও যেন না আসে’।[17] আমাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে যে, মসজিদে অবস্থানরত অবস্থায় আমাদের মুখ থেকে যেন পেঁয়াজ ও রসুনের গন্ধ না বের হয়। এজন্য ছালাতের পূর্বে কাঁচা পেঁয়াজ বা রসুন খেয়ে মসজিদে যাওয়া যাবে না। প্রয়োজনে যদি এটি কাউকে খেতেই হয়, তাহলে আগুনে রান্না করে খাবে। আর যদি কাঁচা অবস্থায় খায়, তাহলে ছালাতে যাবার পূর্বেই ভালোভাবে ব্রাশ করে মুখ পরিষ্কার করতে হবে, যাতে করে মুখে পেঁয়াজ বা রসুনের দুর্গন্ধ না পাওয়া যায়। সর্বোপরি কাঁচা পেঁয়াজ ও রসুন থেকে বেঁচে থাকা প্রয়োজন। যারা পেঁয়াজ ও রসুন খাওয়ার ফলে মুখে গন্ধ নিয়েই মসজিদে আসত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে মসজিদ থেকে বের করে দিতেন। তাছাড়া পেঁয়াজ ও রসুনের গন্ধের চাইতেও আরো বেশি দুর্গন্ধযুক্ত অনেক কিছু খেয়ে বা সাথে নিয়ে অনেকেই মসজিদে আসে যা একেবারেই উচিত নয়। যেমন বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দা ইত্যাদি। এ রকম সকল প্রকার দুর্গন্ধযুক্ত জিনিস পরিহার করে সুগন্ধি লাগিয়ে মসজিদে যেতে হবে।

ছালাতরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম না করা :

কোন ব্যক্তি ছালাত আদায়রত অবস্থায় থাকলে তার সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা যাবে না। আর ছালাতের সামনে দিয়ে যাওয়ার অপরাধটি মসজিদেই বেশি হয়ে থাকে। অনেক ব্যক্তি আছেন, যারা সময়কে অত্যধিক মূল্য দিতে গিয়ে এই কাজটি করে ফেলেন। আবার অনেকেই আছেন, যারা মুছল্লীর সামনে দিয়ে যাওয়াকে অপরাধ মনে করেন না, যা অবশ্যই ভ্রান্ত ধারণা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতের সামনে দিয়ে যেতে নিষেধ করেছেন। এ সম্পর্কে হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ بُسْرِ بْنِ سَعِيْدٍ قَالَ أَرْسَلُوْنِىْ إِلَى زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ أَسْأَلُهُ عَنِ الْمُرُورِ بَيْنَ يَدَىِ الْمُصَلِّى فَأَخْبَرَنِىْ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لأَنْ يَقُوْمَ أَرْبَعِيْنَ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمُرَّ بَيْنَ يَدَيْهِ. قَالَ سُفْيَانُ فَلاَ أَدْرِىْ أَرْبَعِيْنَ سَنَةً أَوْ شَهْرًا أَوْ صَبَاحًا أَوْ سَاعَةً.

বুসর ইবনে সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ছালাত আদায়কারীর সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য ছাহাবীগণ আমাকে যায়েদ ইবনে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট পাঠালেন। তিনি আমাকে অবহিত করলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুছল্লীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করার চাইতে ‘চল্লিশ’ (৪০) পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম’। সুফইয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ৪০ দ্বারা তিনি ৪০ বছর না মাস, না দিন, না ঘণ্টা বুঝিয়েছেন তা আমি অবগত নই।[18] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ بُسْرِ بْنِ سَعِيْدٍ أَنَّ زَيْدَ بْنَ خَالِدٍ أَرْسَلَ إِلَى أَبِيْ جُهَيْمٍ الْأَنْصَارِيِّ يَسْأَلُهُ مَا سَمِعْتَ مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الرَّجُلِ يَمُرُّ بَيْنَ يَدَيْ الرَّجُلِ وَهُوَ يُصَلِّي فَقَالَ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ لَوْ يَعْلَمُ أَحَدُكُمْ مَا لَهُ أَنْ يَمُرَّ بَيْنَ يَدَيْ أَخِيْهِ وَهُوَ يُصَلِّي كَانَ لَأَنْ يَقِفَ أَرْبَعِيْنَ قَالَ لَا أَدْرِيْ أَرْبَعِينَ عَامًا أَوْ أَرْبَعِيْنَ شَهْرًا أَوْ أَرْبَعِيْنَ يَوْمًا خَيْرٌ لَهُ مِنْ ذَلِكَ.

বুসর ইবনে সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যায়েদ ইবনে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আবু জুহাইম আল আনছারী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট জিজ্ঞেস করতে পাঠান ছালাতরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী সম্পর্কে আপনি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কী বলতে শুনেছেন? তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের যে কেউ তার ছালাতরত ভাইয়ের সামনে দিয়ে অতিক্রম করার পরিণতি সম্পর্কে যদি জানত, তাহলে অবশ্যই সে ‘চলিস্নশ’ (৪০) পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম মনে করত’। রাবী বলেন, তিনি কি চল্লিশ বছর অথবা ৪০ মাস বা ৪০ দিন বলেছেন তা আমি অবগত নই।[19] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ يُصَلِّي فَلَا يَدَعْ أَحَدًا يَمُرُّ بَيْنَ يَدَيْهِ فَإِنْ أَبَى فَلْيُقَاتِلْهُ فَإِنَّ مَعَهُ الْقَرِيْنَ و قَالَ الْمُنْكَدِرِيُّ فَإِنَّ مَعَهُ الْعُزَّى.

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন ছালাত আদায় করে, তখন সে যেন তার সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে না দেয়। যদি সে অস্বীকার করে (তবুও ছালাতের সামনে দিয়ে যায়) তবে সে (ছালাতরত ব্যক্তি) যেন তার সাথে লড়াই করে। কেননা তার সাথে তার সহযোগীও (শয়তান) রয়েছে’। আর মুনকাদিরী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নিশ্চয় তার সাথে উযযা (প্রতীমা) রয়েছে।[20] অপর হাদীছে পাওয়া যায়,

عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِىْ سَعِيْدٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا صَلَّى أَحَدُكُمْ فَلْيُصَلِّ إِلَى سُتْرَةٍ وَلْيَدْنُ مِنْهَا وَلَا يَدَعْ أَحَدًا يَمُرُّ بَيْنَ يَدَيْهِ فَإِنْ جَاءَ أَحَدٌ يَمُرَّ فَلْيُقَاتِلْهُ فَإِنَّهُ شَيْطَانٌ.

আব্দুর রহমান ইবনে আবু সাঈদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ছালাত আদায় করতে চাইলে যেন সুতরা সামনে রেখে ছালাত আদায় করে এবং সুতরার নিকটবর্তী হয়। তার সামনে দিয়ে কাউকে অতিক্রম করতে না দেয়। অতএব যদি কেউ তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করে, তাহলে সে যেন তার সাথে লড়াই করে। কারণ সে (অতিক্রমকারী) একটা শয়তান’।[21]

অতএব, কোন স্থানেই ছালাতরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রম করা যাবে না। মসজিদের প্রথম দিকের কাতারে যারা থাকবে, তাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে পিছনের কাতারগুলোর ছালাত আদায়কারীদের সামনে দিয়ে অতিক্রম না করে। কেননা মসজিদে এই ভুল বেশি হয়ে থাকে। মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাজ করতে নিষেধ করেছেন, এমনকি ছালাতের সামনে দিয়ে অতিক্রমকারীকে শয়তান বলেছেন। তাই আমাদেরকে উক্ত কাজ হতে বেঁচে থাকতে হবে।

এক নযরে মসজিদে নিষিদ্ধ ও অপসন্দনীয় কাজসমূহ :

কোন কারণ ছাড়াই মাঠ না থাকার দোহাই দিয়ে মসজিদে ঈদের ছালাত আদায় করা। রামাযানের রাতে লোক জাগানোর নামে মসজিদের মাইকে ক্বিরাআত, জাগরণী ইত্যাদি বলা ও বাজানো। পুরুষেরা সামনের কাতারগুলো ফাঁকা রেখেই পিছনের কাতারে ফরয, সুন্নাতসহ অন্যান্য ছালাত আদায় করা। মহিলাদের জন্য সামনের কাতারে ছালাতের ব্যবস্থা করা। ছালাতের কাতার সঠিকভাবে সোজা না করা। বৃষ্টিমুখর রাতে মসজিদে আযানে صَلُّوْا فِيْ رِحَالِكُمْ বা এ জাতীয় বাক্য না বলা। মসজিদের মাঝে ছালাতের জন্য কোন ব্যক্তির স্থান নির্দিষ্ট করে নেয়া। জুম‘আর দিনে খুৎবা চলাকালে কথাবার্তা বলা। ইক্বামত হচ্ছে তবুও সুন্নাত ছালাত আদায় করতে থাকা। কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেয়া। ‘সুন্নাত ছালাত পড়ার সময় নেই’ মর্মে মসজিদে লাল বাতি জ্বালানো। মসজিদের যে কোন স্থানে একপার্শ্বে আল্লাহ, অপর পার্শ্বে মুহাম্মাদ লেখা। মসজিদে অত্যধিক নকশা, কারুকার্য ও চাকচিক্য করা। মুছল্লীদের চাইতে ইমামের ছালাত আদায়ের স্থান উঁচু করা। শারঈ শাস্তি মসজিদের ভিতরে প্রয়োগ করা। সাক্ষাৎ করতে, সফরে বা কোন কারণে অন্যত্র গেলে তাদের ইমামতি করা। মসজিদে বসা কোন ব্যক্তিকে সে স্থানে হতে উঠিয়ে দিয়ে সেখানে নিজে বা অন্যকে বসানো ইত্যাদি।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে মসজিদের আদব ও হক্ব রক্ষা করার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!


[1]. জাওয়ামিঊল আখবার, পৃঃ ৭।

[2]. তিরমিযী, হা/২২৮।

[3]. ইবনু মাজাহ, হা/২৪২৯।

[4]. ইবনু মাজাহ, হা/৭৬২।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৪১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫২।

[6]. ইবনু মাজাহ, হা/৩৬৮৩।

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৬৯।

[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৬৮; মিশকাত, হা/৭০৬।

[9]. ইবনে মাজাহ, হা/৭৬৬।

[10]. তিরমিযী, হা/৩২২; নাসাঈ, হা/৭১৫; মিশকাত, হা/৭৩২।

[11]. তিরমিযী, হা/১৩২১; মিশকাত হা/৭৩৩।

[12]. মুস্তাদরাক হাকেম, হা/৭৬২।

[13]. ইবনু মাজাহ, হা/১০০২।

[14]. ইবনু মাজাহ, হা/১০১৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২৯৬০।

[15]. ইবনে মাজাহ, হা/১০১৪।

[16]. ইবনু মাজাহ হা/১০১৫।

[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৫৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১২৭৬; তিরমিযী, হা/১৯১৯।

[18]. ইবনু মাজাহ, হা/৯৪৪।

[19]. ইবনু মাজাহ, হা/৯৪৫।

[20]. ইবনু মাজাহ, হা/৯৫৫।

[21]. ইবনু মাজাহ, হা/৯৫৪।

Magazine