কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ওযূর সুন্নাতসমূহ

post title will place here

ওযূর সুন্নাতগুলো সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো—

১. মিসওয়াক করা: ওযূর পূর্বে বা কুলি করার পূর্বে মিসওয়াক করা। যেসব জায়গায় মিসওয়াক করা সুন্নাত, এটি তার দ্বিতীয় স্থান। যে ব্যক্তি ওযূ করতে চায়, তার জন্য ওযূর পূর্বে মিসওয়াক করা সুন্নাত। যেমন- আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যদি আমার উম্মতের জন্য কঠিন মনে না করতাম, তাহলে প্রত্যেক ওযূর সাথে তাদেরকে মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতাম’।[1]

২. বিসমিল্লাহ বলা: আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ঐ ব্যক্তির ওযূ হয় না, যে শুরুতে বিসমিল্লাহ বলে না’।[2] ওযূর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নাত। এটা অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মত।

৩. দুই হাত কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করা: উছমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি ওযূর পানি চাইলেন। এরপর তিনি ওযূ করতে আরম্ভ করলেন, অতঃপর তিনি তিনবার তার হাতের কব্জি ধৌত করলেন...। অতঃপর তিনি বললেন, আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমার এই ওযূর মতোই ওযূ করতে দেখেছি।[3]

৪. দুই পা ও দুই হাত ধৌত করার সময় ডান দিক হতে শুরু করা: আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুতা পরিধান করা, চুল আঁচড়ানো এবং পবিত্রতা অর্জন করা তথা প্রত্যেক কাজই ডান দিক হতে আরম্ভ করতে পছন্দ করতেন।[4]

৫. কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়া: নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ওযূর পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে উছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, অতঃপর তিনি কুলি করলেন এবং নাকে পানি দিয়ে নাক ঝাড়লেন। তারপর মুখমণ্ডল তিনবার ধৌত করলেন।[5]

বি.দ্র. মুখমণ্ডল ধৌত করার পরও কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়া বৈধ।

৬. ছিয়ামরত অবস্থা ছাড়া ভালোভাবে কুলি করা এবং যথাযথভাবে নাকে পানি দিয়ে নাক ঝেড়ে পরিষ্কার করা: লাক্বীত্ব ইবনু সাবরাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ...আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে ওযূ সম্পর্কে অবহিত করুন। তিনি বললেন, ‘পরিপূর্ণরূপে ওযূ করবে, আঙুলসমূহ ভালোভাবে খিলাল করবে এবং নাকে উত্তমরূপে পানি পৌঁছাবে; তবে ছিয়ামরত অবস্থায় নয়’।[6] ‘পরিপূর্ণরূপে ওযূ করবে’ এই বাক্যের মাঝেই ‘ভালোভাবে কুলি করার’ প্রমাণ নিহিত রয়েছে।

৭. এক অঞ্জলি পানি দিয়ে কুলি করা ও নাকে দেওয়া: আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ...অতঃপর তিনি পাত্রে হাত ঢুকিয়ে পানি বের করে এক অঞ্জলি পানি দিয়ে কুলি করলেন ও নাকে পানি ‍দিলেন। এরূপ তিনবার করলেন...।[7]

৮. মাথা মাসাহ করার সুন্নাতী পদ্ধতি: দুই হাত দিয়ে মাথার সম্মুখ ভাগ থেকে পেছন ভাগ পর্যন্ত মাসাহ করা। এরপর হাতদ্বয়কে পেছন থেকে টেনে যে স্থান থেকে শুরু করেছে সে স্থানে ফিরিয়ে আনা। পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য এই পদ্ধতিতে মাসাহ করা সুন্নাত। তবে নারীদের ঘাড়ের ঝুলন্ত চুল মাসাহ করতে হবে না। আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মাসাহ করার জন্য) নিজের দুই হাতকে সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে নিয়ে গেলেন। আবার পেছনের দিক থেকে সামনের দিকে নিয়ে এলেন। অর্থাৎ মাথার সামনের অংশ হতে ‘মাসাহ’ শুরু করে দুই হাত পিছন পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। তারপর আবার পিছন থেকে শুরু করে হাত সেখানে নিয়ে এলেন যেখান থেকে শুরু করেছিলেন।[8]

৯. ওযূর অঙ্গগুলো তিনবার করে ধৌত করা: প্রথমবার ধৌত করা ওয়াজিব, দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার ধৌত করা মুস্তাহাব। তিনবারের বেশি ধৌত করা যাবে না। আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযূতে অঙ্গগুলো একবার করে ধৌত করেছেন।[9] আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযূতে অঙ্গগুলো দুইবার করে ধৌত করেছেন।[10] উছমান ইবনু আফফান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযূতে অঙ্গগুলো তিনবার করে ধৌত করেছেন।[11]

সর্বোত্তম হলো আমলের মধ্যে ভিন্নতা নিয়ে আসা। অর্থাৎ ওযূতে অঙ্গগুলো কখনো একবার করে, কখনো দুইবার করে, কখনো তিনবার করে ধৌত করবে। আবার কখনো সংখ্যায় ভিন্নতা নিয়ে আসবে। যেমন- মুখমণ্ডল তিনবার, হাতদ্বয় দুইবার, দুই পা একবার করে ধৌত করবে। যেমনটি ছহীহ বুখারী ও ছহীহ মুসলিমে আব্দুল্লাহ ইবনু যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে অন্য একটি বর্ণনা রয়েছে।[12] তবে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিকাংশ সময় ওযূতে অঙ্গগুলো তিনবার করে ধৌত করতেন।

১০. ওযূর পরে বর্ণিত দু‘আ পাঠ করা: উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে ওযূ করবে, এরপর বলবে,

أَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلهَ اِلَّا اللّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ

অর্থ: ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল’| অন্য বর্ণনায় রয়েছে,

أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلهَ اِلَّا اللّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَه وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ

অর্থ: ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মা‘বূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল’। তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে যাবে। এসব দরজার যেটি দিয়ে খুশি সেই দরজা দিয়ে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে।[13] আবূ সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরেকটি হাদীছ মারফূ‘সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ওযূ শেষে এই দু‘আ পড়বে,

سُبحانَكَ اللَّهمَّ وبحمدِكَ ، أشهدُ أن لا إلَهَ إلَّا أنتَ أستغفرُكَ وأتوبُ إليكَ

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার প্রশংসা সহকারে পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ছাড়া কোনো মা‘বূদ নেই। তোমার নিকট ক্ষমা চাচ্ছি এবং তোমার নিকটেই ফিরে যাব’। তার ছওয়াব কাগজে লেখার পর আল্লাহ তাআলা তার উপর সিলমোহর করে দিবেন, অতঃপর সেটিকে আরশের নিচে রেখে দেওয়া হবে, যা ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত অক্ষত থাকবে।[14]


[1]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৯৯২৮।

[2]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১১৩৭১।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১৬৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৬৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৫।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৯; ছহীহ মুসলিম, হা/২২৬।

[6]. আবূ দাঊদ, হা/১৪২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৮৪৬।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৫।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৫।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫৭।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫৮।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫৯।

[12]. যাদুল মাআদ, ১/১৯২।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৪।

[14]. মুসতাদরাকে হাকেম, ১/৭৫২। ইবনু হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটির সনদকে ছহীহ বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, এটা মারফূ‘ নয়; বরং মাওকূফ। আর এটা হাদীছ ছহীহ হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা করে না। কেননা তা মারফূ‘র হুকুমে।

Magazine