কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

মসজিদে গমন ও অবস্থানের সুন্নাতসমূহ

post title will place here

প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত আদায়ের জন্য মানুষ মসজিদে গমন করে। মসজিদে গমন করার কতক বিষয় রয়েছে, যা পালন করা সুন্নাত। তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ:

১. মসজিদে আগেভাগে যাওয়া সুন্নাত: আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যদি লোকেরা জানত যে, আযান ও প্রথম কাতারে ছালাত আদায়ে কি নেকী নিহিত রয়েছে, তাহলে তারা পরস্পরে প্রতিযোগিতা করত। তেমনি আগেভাগে জামাআতে শরীক হওয়ার নেকী যদি তারা জানত, তাহলে তারা সেদিকে ছুটে যেত। অনুরূপভাবে যদি তারা জানত এশা ও ফজরের ছালাতে কী নেকী রয়েছে, তবে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ঐ দুই ছালাতে আসত’।[1]

২. ওযূ করে বাড়ি থেকে বের হওয়া, এতে প্রতিটা কদমে ছওয়াব লেখা হয়: আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি ঘরে ও বাজারে (একাকী) ছালাত আদায় অপেক্ষা জামাআতে ছালাত আদায় করলে ২৫ গুণ বেশি ছওয়াব পাবে। কেননা তোমাদের কেউ যখন উত্তমরূপে ওযূ করে শুধু ছালাতের উদ্দেশ্যেই মসজিদে যায় এবং একমাত্র ছালাতই তাকে (ঘর থেকে) বের করে, তাহলে মসজিদে পৌঁছা পর্যন্ত তার প্রতিটি পদক্ষেপে একটি করে মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং একটি করে গুনাহ ক্ষমা হয়। মসজিদে প্রবেশের করার পর সেখানে যতক্ষণ পর্যন্ত সে ছালাতের জন্য অবস্থান করবে, ততক্ষণ তাকে ছালাতের মধ্যে গণ্য করা হবে। সে যতক্ষণ পর্যন্ত তার ছালাত আদায়ের স্থানে অবস্থান করে, ফেরেশতাগণ তার জন্য এই বলে দু‘আ করতে থাকে, হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ! তার প্রতি রহম করুন। হে আল্লাহ! তার তওবা কবুল করুন। যতক্ষণ পর্যন্ত সে কাউকে কষ্ট না দেয় অথবা তার ওযূ না ভাঙে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তার জন্য এরূপ দু‘আ করতে থাকে’।[2]

৩. ছালাতের উদ্দেশ্যে ধীরস্থির ও শান্তভাবে মসজিদে গমন করা: আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমরা ইক্বামত শুনতে পাবে, তখন ছালাতের দিকে চলে আসবে। তোমাদের উচিত ধীরস্থিরতা ও গাম্ভীর্য অবলম্বন করা, তাড়াহুড়া করবে না। ইমামের সাথে যতটুকু পাও, তা আদায় করবে আর যা ছুটে যায়, তা পূর্ণ করবে’।[3]

ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদীছে বর্ণিত ‘সাকিনাহ’র সম্পর্ক নড়াচড়ার সাথে অর্থাৎ চলাচল করার ক্ষেত্রে ধীরস্থিরতা ও অনর্থক কথা-কর্ম থেকে বিরত থাকা। হাদীছে বর্ণিত ‘ওয়াক্বর’ এর সম্পর্ক অবস্থার সাথে। যেমন- দৃষ্টি অবনত রাখা, আওয়াজ নিচু রাখা ও এদিক-সেদিক না তাকানো।[4]

৪. মসজিদে প্রবেশ করার সময় ডান পা আগে ঢুকানো এবং বের হওয়ার সময় বাম পা আগে বের করা: আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সুন্নাত হচ্ছে যখন মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন ডান পা আগে ঢুকাবে আর যখন বের হবে, তখন বাম পা আগে বের করবে।[5]

৫. মসজিদে প্রবেশ করার সময় এবং বের হওয়ার সময় দু‘আ পাঠ করা: আবূ হুমাইদ বা আবূ উসাইদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে সে যেন বলে,

اللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ

অর্থ: হে আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন। আর বের হওয়ার সময় যেন বলে,

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِك

 অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করি’।[6]

৬. মসজিদে প্রবেশ করার পর বসার পূর্বে দুই রাকআত ছালাত আদায় করা: কেউ ছালাতের জন্য আগেভাগে মসজিদে আসলে বসার পূর্বে দুই রাকআত ছালাত আদায় করবে। আবূ ক্বাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করলে, সে যেন দুই রাকআত ছালাত (তাহিয়্যাতুল মসজিদ) আদায় করার পূর্বে না বসে’।[7]

যে সকল ফরয ছালাতের পূর্বে সুন্নাত রয়েছে, সে সুন্নাতগুলো আদায় করলে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় হয়ে যাবে। যেমন- ফজর, যোহর বা ইশরাকের সুন্নাত। কেউ যদি মসজিদে প্রবেশ করে ছালাতুল ইশরাক, বিতর বা ফরয ছালাত আদায় করে, তাহলে তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় হয়ে যাবে। কেননা তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় করা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে ছালাত না পড়ে কেউ বসবে না। এটার রহস্য হচ্ছে, মসজিদ আবাদ হবে ছালাত দিয়ে। ছালাতের উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ মসজিদে গমন করবে না।

৭. প্রথম কাতারে শামিল হওয়ার জন্য আগেভাগে গমন করা পুরুষের জন্য সুন্নাতপুরুষের জন্য প্রথম কাতার সর্বোত্তমআর নারীদের জন্য শেষের কাতার সর্বোত্তম: আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পুরুষদের জন্য প্রথম কাতার উত্তম এবং শেষের কাতার মন্দ আর মহিলাদের জন্য শেষের কাতার উত্তম এবং প্রথম কাতার মন্দ’।[8]

উত্তম কাতার বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে, ছওয়াব ও মর্যাদার দিক থেকে বেশি এবং মন্দ কাতার বলতে উদ্দেশ্য হচ্ছে, ছওয়াব ও মর্যাদার দিক থেকে কম।

এই হাদীছটি সে সময় প্রযোজ্য, যখন নারী ও পুরুষ একই জামাআতে ছালাত আদায় করে; অথচ উভয়ের মাঝে কোনো প্রাচীর বা পর্দা থাকে না, এমন পরিস্থিতিতে মহিলাদের জন্য শেষের কাতার উত্তম। কারণ এটা তাদেরকে পুরুষের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে।

যখন উভয়ের মাঝে কোনো বেড়া থাকে, যেমন- প্রাচীর বা পর্দা অথবা অধিকাংশ মসজিদে যেমনটি দেখা যায় যে, নারীদের জন্য আলাদা ছালাতের জায়গা, এমন পরিস্থিতিতে মহিলাদের জন্য প্রথম কাতার উত্তম। এটাই শায়খ ইবনু বায রাহিমাহুল্লাহ ও শায়খ ইবনু উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ-এর অভিমত। কারণ তখন নারীদের পুরুষের নিকটবর্তী হওয়ার সম্ভাবনার কোনো কারণ নেই। আর হুকুম পরিবর্তন হওয়া কারণের উপর নির্ভরশীল। অসংখ্য হাদীছে ব্যাপকার্থে প্রথম কাতারের ফযীলত প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে, তন্মধ্যে অন্যতম—

আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যদি লোকেরা জানত যে, আযান ও প্রথম কাতারে ছালাত আদায়ে কি নেকী নিহিত রয়েছে, তাহলে তারা পরস্পরে প্রতিযোগিতা করত। তেমনি আগেভাগে জামাআতে শরীক হওয়ার নেকী যদি তারা জানত, তাহলে তারা সেদিকে ছুটে যেত। অনুরূপভাবে যদি তারা জানত এশা ও ফজরের ছালাতে কী নেকী রয়েছে, তবে তারা হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ঐ দুই ছালাতে আসত’।[9]

৮. মুক্তাদীর জন্য ইমামের কাছাকাছি দাঁড়ানো সুন্নাত: মুক্তাদীর জন্য ছালাতে প্রথম কাতারে দাঁড়ানো সর্বোত্তম। সুতরাং সর্বাত্মক চেষ্টা করবে ইমামের কাছাকাছি দাঁড়ানোর। ডান পার্শ্ব বা বাম পার্শ্ব, যেটাই ইমামের নিকটস্থ হবে, সেটাই সর্বোত্তম। আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ ও জ্ঞানী লোকেরা আমার নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়াবে...’।[10] আলোচ্য হাদীছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা ‘আমার নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়াবে’ এটাই প্রমাণ করে যে, ডান বা বাম পার্শ্ব, যেটাই হোক না কেন ইমামের নিকটবর্তী হওয়াই উদ্দেশ্য।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩৭।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৪৯।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৬০২।

[4]. শারহে মুসলিম লিন নববী, হা/৬০২।

[5]. মুসতাদরাকে হাকেম, ১/৩৩৮, হাদীছটি মুসলিমের শর্তানুযায়ী ছহীহ।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৩।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৬৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৭১৪।

[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৪০।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩৭।

[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩২।

Magazine