ছালাতের ক্বিয়াম অবস্থায় যেসব সুন্নাত রয়েছে, নিম্নে এ বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।
১. তাকবীরে তাহরীমার সময় রফউল ইয়াদাইন করা: আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছালাত শুরু করতেন, যখন রুকূ করতেন এবং যখন রুকূ থেকে মাথা উঠাতেন, তখন কাঁধ বরাবর দুই হাত উত্তোলন করতেন আর রুকূ থেকে মাথা উঠানোর সময় বলতেন, سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ অর্থ: ‘যে ব্যক্তি তাঁর প্রশংসা করে তিনি তা শুনেন। হে আমাদের প্রতিপালক! সকল প্রশংসা একমাত্র তোমারই’। কিন্তু সিজদায় দুই হাত উত্তোলন করতেন না’।[1]
চার স্থানে রফউল ইয়াদাইন করার দলীল রয়েছে— (১) তাকবীরে তাহরীমার সময়। (২) রুকূতে যাওয়ার সময়। (৩) রুকূ থেকে উঠার সময়; এই তিনটি স্থান ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। (৪) প্রথম তাশাহহুদ থেকে উঠার সময়। এটাও ছহীহ বুখারীতে ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত হয়েছে।
২. রফউল ইয়াদাইন করার সময় হাতের আঙুলগুলো প্রসারিত রাখা সুন্নাত: আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাত আরম্ভকালে দুই হাত উপরের দিকে প্রসারিত করে উঠাতেন’।[2]
৩. মুস্তাহাব জায়গা পর্যন্ত রফউল ইয়াদাইন করা সুন্নাত: রফউল ইয়াদাইন করার সীমারেখার ক্ষেত্রে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দুটি পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে:
(ক) ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রফউল ইয়াদাইন কাঁধ বরাবর হবে।[3]
(খ) ছহীহ মুসলিমে মালেক ইবনু হুওয়াইরিছ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রফউল ইয়াদাইন কানের লতি বরাবর হবে।[4] যেহেতু উভয় পদ্ধতিই হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, কাজেই একজন মুছল্লী কখনো কাঁধ বরাবর, আবার কখনো কানের লতি বরাবর রফউল ইয়াদাইন করতে পারবে।
৪. তাকবীরে তাহরীমার পর বাম হাতের উপর ডান হাত রাখা সুন্নাত: এ বিষয়ে উলামায়ে কেরাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন। যেমনটি ইবনু হুবায়রা রাহিমাহুল্লাহ বর্ণনা করেছেন।[5]
৫. ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরা সুন্নাত: বাম হাতের উপর ডান হাত রাখার দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একজন মুছল্লীর জন্য উভয় পদ্ধতির উপর আমল করা মুস্তাহাব।
প্রথম পদ্ধতি: বাম হাতের উপর ডান হাত রাখবে। ওয়ায়েল ইবনু হুজর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছালাতে দাঁড়াতেন, তখন আমি তাকে ডান হাত দিয়ে বাম হাত ধরে রাখতে দেখেছি।[6]
দ্বিতীয় পদ্ধতি: ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখবে। সাহল ইবনু সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকদের নির্দেশ দেওয়া হতো যে, প্রত্যেকে ছালাতে ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখবে।[7] সুন্নাত বাস্তবায়নে আমলে ভিন্নতা আনয়নের নিমিত্তে একজন ব্যক্তি একবার বাম হাতের উপর ডান হাত রাখবে, আরেকবার ডান হাত বাম হাতের বাহুর উপর রাখবে।
৬. দু‘আয়ে ইসতিফতাহ (ছানা) পাঠ করা সুন্নাত: শরীআতে একাধিক দু‘আয়ে ইসতিফতাহ (ছানা) বর্ণিত হয়েছে। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দু‘আ নিচে উল্লেখ করা হলো-
اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ،كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ المَشْرِقِ وَالمَغْرِبِ، اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنَ الخَطَايَا، كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، اللَّهُمَّ اغْسِلْ خَطَايَايَ بِالْمَاءِ، وَالثَّلْجِ، وَالبَرَدِ.
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমার ও আমার পাপসমূহের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি করে দাও, যেরূপ তুমি দূরত্ব সৃষ্টি করেছ পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার পাপসমূহ হতে পরিচ্ছন্ন করো, যেরূপ পরিচ্ছন্ন করা হয় ময়লা থেকে সাদা কাপড়কে। হে আল্লাহ! তুমি আমার পাপসমূহ ধুয়ে ফেল পানি, বরফ, ও শিশির দ্বারা’।[8]
৭. ‘ইস্তিআযা’ তথা শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া: ‘ইস্তিআযা’ তথা শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া সুন্নাত। ইস্তিআযার একাধিক পদ্ধতি রয়েছে। একবার এক পদ্ধতিতে, আরেকবার অন্য পদ্ধতিতে ইস্তিআযা করা সুন্নাত। নিম্নে দুটি পদ্ধতি উল্লেখিত হলো—
(ক)
أَعُوذُ بِاللَّهِ مِن الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
অর্থ: ‘আমি আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি’। এই পদ্ধতিতে আশ্রয় চাওয়া অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম পছন্দ করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন, فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ ‘যখন আপনি কুরআন তেলাওয়াত করবেন, তখন আল্লাহর কাছে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাইবেন’ (আন-নাহল, ১৬/৯৮)।
(খ)
أَعُوذُ بِاللَّهِ السَّمِيعِ الْعَلِيمِ مِن الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
অর্থ: ‘আমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ আল্লার নিকট বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি’। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ‘যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা আপনাকে প্ররোচিত করে, তবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (আল-আ‘রাফ, ৭/২০০)।
৮. বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলা: أَعُوذُ بِاللَّهِ مِن الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ বলার পর بِسْمِ اللَّـهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ বলা সুন্নাত। নুআইম আল-মুজমির রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছনে ছালাত আদায় করেছি, তিনি ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ পড়লেন, অতঃপর সূরা আল-ফাতিহা পড়লেন...। অতঃপর আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! আমি তোমাদের সবার তুলনায় অধিক পরিমাণে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুরূপ ছালাত আদায় করতে পারি।[9]
৯. ইমামের সাথে আমীন বলা: যেসব ছালাতে সশব্দে ক্বেরাআত পড়া হয়, সেসব ছালাতে ইমাম যখন সশব্দে সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করে আমীন বলেন, তখন মুক্তাদীর জন্য আমীন বলা সুন্নাত। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ইমাম যখন আমীন বলে, তখন তোমরাও আমীন বলো। কেননা যার আমীন (বলা) ও ফেরেশতাদের আমীন (বলা) মিলে যায়, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়’।[10] আমীন শব্দের অর্থ হচ্ছে, কবুল করুন!
১০. সূরা আল-ফাতিহার পর অন্য সূরা পড়া: প্রথম দুই রাকআতে সূরা আল-ফাতিহার পর অন্য যে কোনো সূরা পাঠ করা সুন্নাত। এটাই অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমত। আবূ ক্বাতাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের প্রথম দুই রাকআতে সূরা আল-ফাতিহার সঙ্গে আরও দুটি সূরা পাঠ করতেন। প্রথম রাকআত দীর্ঘ করতেন এবং দ্বিতীয় রাকআত সংক্ষেপ করতেন...।[11]
যেসব ছালাতে সশব্দে ক্বেরাআত পড়া হয়, সেসব ছালাতে মুক্তাদী সূরা আল-ফাতিহার পর অন্য কোনো সূরা পাঠ করবেন না। বরং ইমামের ক্বেরাআত শুনবেন। ইবনু কুদামা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, প্রত্যেক ছালাতে প্রথম দুই রাকআতে সূরা আল-ফাতিহার পর অন্য সূরা পাঠ করা সুন্নাত। এব্যাপারে কোনো আলেম মতানৈক্য করেছেন বলে আমাদের জানা নেই।[12]
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯০।
[2]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৮৭৫; আবূ দাঊদ, হা/৭৫৩; তিরমিযী, হা/২৪০। ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯০।
[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৯১।
[5]. আল-ইফছাহ, ১/১২৪।
[6]. নাসাঈ, হা/৮৮৭, হাদীছ ছহীহ বলেছেন।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪০।
[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬০০।
[9]. নাসাঈ, হা/৯০৬; ইবনু খুযায়মা রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, ইবনু খুযায়মা, ১/২৫১। দারাকুত্বনী বলেন, এ হাদীছটি ছহীহ, তার সকল বর্ণনাকারী শক্তিশালী, আস-সুনান, ২/৪৬।
[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৮০; ছহীহ মুসলিম, হা/৪১০।
[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৫১।
[12]. আল-মুগনী, ১/৫৬৮।
