সর্বজন সুবিদিত যে, বিতর ছালাতের সময় হচ্ছে, এশার ছালাতের পর থেকে ছুবহে ছাদিকের আগ পর্যন্ত অর্থাৎ এশার ছালাত এবং ফজর ছালাতের মধ্যবর্তী সময় হচ্ছে বিতর ছালাতের সময়। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার ছালাত ও ফজরের ছালাতের মধ্যবর্তী সময়ে ১১ রাকআত ছালাত আদায় করতেন। এর মধ্যে এক রাকআত বিতর আদায় করতেন এবং প্রতি দুই রাকআতে সালাম ফিরাতেন।[1]
১. ক্বিয়ামুল লায়লের জন্য সর্বোত্তম সময়: ক্বিয়ামুল লায়লের জন্য সর্বোত্তম সময় হচ্ছে মধ্যরাতের পরে শেষ-তৃতীয়াংশ। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছেন, ‘আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় ছালাত হলো দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর ছালাত আর আল্লাহ তাআলার নিকট সর্বাধিক প্রিয় ছিয়াম হলো দাঊদ আলাইহিস সালাম-এর ছিয়াম। দাঊদ আলাইহিস সালাম অর্ধরাত পর্যন্ত ঘুমাতেন, এক-তৃতীয়াংশ তাহাজ্জুদের ছালাত আদায় করতেন এবং রাতের এক-ষষ্ঠাংশ ঘুমাতেন। তিনি একদিন ছিয়াম পালন করতেন, একদিন ছিয়ামবিহীন অবস্থায় থাকতেন’।[2]
২. মানুষ যদি এই সুন্নাত পালন করতে চায়, তাহলে রাতের হিসাব যেভাবে করবে: রাতের হিসাব করতে হবে সূর্যাস্ত থেকে ছুবহে ছাদিক পর্যন্ত। এই সময়টাকে ছয় ভাগে ভাগ করতে হবে। প্রথম তিন ভাগ হচ্ছে, রাতের প্রথমার্ধ। ৪র্থ ও ৫ম ভাগে ছালাত আদায় করবে আর এটাই এক-তৃতীয়াংশ। ৬ষ্ঠ ভাগে ঘুমাবে। এ কারণে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন,مَا أَلْفَاهُ السَّحَرُ عِنْدِيْ إِلاَّ نَائِمًا تَعْنِي النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় সাহরীর সময় উপস্থিত হতো’।[3]
৩. ক্বিয়ামুল লায়ল তথা তাহাজ্জুদের ছালাত ১১ রাকআত আদায় করা সুন্নাত: এই পূর্ণতা আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর হাদীছের কারণেই। তিনি বলেছেন,مَا كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَزِيْدُ فِيْ رَمَضَانَ وَلاَ فِيْ غَيْرِهِ عَلٰى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً ‘আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাযান মাসে এবং অন্যান্য সময় (রাতে) ১১ রাকআতের অধিক ছালাত আদায় করতেন না’।[4] ছহীহ মুসলিমে আরেকটি হাদীছ রয়েছে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১৩ রাকআত ছালাত আদায় করতেন। এটা বিতরের ভিন্নতা। অধিকাংশ সময় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ১১ রাকআত আদায় করতেন। আবার কখনো ১৩ রাকআত আদায় করতেন। এভাবেই আমরা হাদীছদ্বয়ের মাঝে জমা করব।
৪. ক্বিয়াম, রুকূ ও সিজদা দীর্ঘায়িত করা সুন্নাত; যাতে উক্ত রুকনগুলো সমানভাবে আদায় হয়।
৫. ছালাতে কুরআন তেলাওয়াতের সুন্নাতগুলো যথাযথভাবে আদায় করবে।
৬. দুই রাকআত পরপর সালাম ফিরানো সুন্নাত: আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! রাতের বেলা ছালাতের পদ্ধতি কী? তিনি বললেন, ‘দুই দুই রাকআত করে আর ফজর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করলে এক রাকআত মিলিয়ে বিতর পড়ে নিবে’।[5]
দুই দুই রাকআত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুই রাকআত করে ছালাত আদায় করবে এবং প্রত্যেক দুই রাকআত পর সালাম ফিরাবে। এক সালামে চার রাকআত ছালাত আদায় করবে না।
৭. শেষ তিন রাকআতে সূরা পাঠ করা সুন্নাত: প্রথম রাকআতে (سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى), দ্বিতীয় রাকআতে (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرونَ) এবং তৃতীয় রাকআতে (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ) পাঠ করা। উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের প্রথম রাকআতে (سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى), দ্বিতীয় রাকআতে (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرونَ) এবং তৃতীয় রাকআতে (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ) পাঠ করতেন।[6]
৮. বিতর ছালাতে দু‘আ কুনূত পড়া সুন্নাত: কুনূত দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে দূ‘আ। কুনূত পাঠ করবে বিতর ছালাতের তৃতীয় রাকআতে বা শেষ রাকআতে; যে রাকআতে সূরা ইখলাছ পাঠ করা হয়। কুনূত পড়া সুন্নাত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো কুনূত পড়তেন, কখনো ছেড়ে দিতেন। শায়খুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ এটাই পছন্দ করেছেন; তবে সর্বোত্তম হচ্ছে, অধিকাংশ সময় ছেড়ে দেওয়া।
৯. রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশে দু‘আ করা: রাতের শেষ প্রহরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হচ্ছে দু‘আ। যদি রাতের শেষ প্রহরে বিতরের কুনূতে দু‘আ করে, তাহলে এতেই যথেষ্ট হবে। যদি বিতরে দু‘আ না করে, তাহলে সুন্নাত হচ্ছে এই সময়ে স্বাভাবিকভাবে দু‘আ করা। কেননা এই সময়টা হচ্ছে দু‘আ কবুলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন। ছহীহ বুখারী ও মুসলিমে আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ-তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকতে আমাদের রব আমাদের নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, আমার নিকট দু‘আ করবে কে? আমি তার দু‘আ কবুল করব। আমার নিকট কে চাইবে? আমি তাকে তা প্রদান করব। আমার কাছে কে তার গুনাহ ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করে দেব’।[7]
১০. বিতরে সালাম ফিরানোর পর ‘সুবহানাল মালিকিল ক্বুদ্দূস’তিনবার পাঠ করা এবং তৃতীয়বার উচ্চৈঃস্বরে বলা সুন্নাত: উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিতরের ছালাতে প্রথম রাকআতে (سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الأَعْلَى), দ্বিতীয় রাকআতে (قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرونَ) এবং তৃতীয় রাকআতে (قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ) পাঠ করতেন। যখন সালাম ফিরাতেন, তখন তিনবার سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْقُدُّوسِ ‘সুবহানাল মালিকিল ক্বুদ্দূস’ অর্থ: ‘আমি পবিত্রতম বাদশাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি’ বলতেন।[8] আব্দুর রহমান ইবনু আবযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীছে বর্ণিত আছে, যখন সালাম ফিরাতেন, তখন سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْقُدُّوسِ ‘সুবহানাল মালিকিল ক্বুদ্দূস’ বলতেন এবং তৃতীয়বার উচ্চৈঃস্বরে বলতেন।[9]
১১. তাহাজ্জুদের ছালাতের জন্য পরিবারকে ঘুম থেকে জাগ্রত করা সুন্নাত: স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের জন্য সুন্নাত হচ্ছে, তাহাজ্জুদ ছালাতের জন্য একে অপরকে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে ঘুম থেকে জাগ্রত করা। এটা সৎকাজে পারস্পরিক সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রাতে ছালাত আদায় করতেন। আমি তাঁর ও ক্বেবলার মাঝে আড়াআড়িভাবে শুয়ে থাকতাম। তিনি যখন বিতর ছালাত আদায় করার ইচ্ছা পোষণ করতেন, তখন আমাকে জাগাতেন। অতঃপর আমিও বিতর ছালাত আদায় করে নিতাম।[10] উম্মু সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক রাতে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিদ্রা হতে জেগে বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! এ রাতে কতই না বিপদাপদ নেমে আসছে এবং কতই না ভাণ্ডার উন্মুক্ত করা হচ্ছে! অন্য সব ঘরের নারীদেরকেও জাগিয়ে দাও। বহু মহিলা যারা দুনিয়ায় পোশাক পরিহিতা, তারা আখেরাতে হবে বিবস্ত্রা’।[11]
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২০৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৩৬।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪২০; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৯।
[3]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৩৩; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৪২।
[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮১; ছহীহ মুসলিম, হা/৭২১।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৯০; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৪৯।
[6]. আবূ দাঊদ, হা/১৪২৩; নাসাঈ, হা/১৭৩৩; ইবনু মাজাহ, হা/১১৭১। ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন (নাসাঈ, ১/২৭৩)।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৪৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৭৫৮।
[8]. নাসাঈ, হা/১৭০২। ইমাম নববী ও ইমাম আলবানী রাহিমাহুমাল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন।
[9]. নাসাঈ, হা/১৭৩৪। ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন (মিশকাত, ১/৩৯৮)।
[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৫১২; ছহীহ মুসলিম, হা/৫১২।
[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৬২১৮।
