اَلْحَمْدُ لِلهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
গত ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ সঙ্ঘটিত হয়ে গেলো তথাকথিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঘটে গেলো বহু হতাহতের ঘটনা, নষ্ট হয়ে গেলো হাযার হাযার কোটি টাকা। সত্যি বলতে প্রত্যেকটা নির্বাচনেই আমাদের দেশে এমন ঘটনা স্বাভাবিক। দিন যত গড়াচ্ছে, নির্বাচনে খরচ তত বাড়ছে। আর মানুষের ইযযত-সম্মানের হানি ও জান-মালের ক্ষয়ক্ষতিও আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে হাযার হাযার কোটি টাকা নষ্ট হয়েছে। অন্তত ২০ জন প্রাণ হারিয়েছে। আর আহতদের সংখ্যা তো বেমালূম। উল্লেখ্য, গত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনে মোট ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ২৬৪ কোটি ৬৭ লাখ ৪৯ হাযার ৪৬৯ টাকা। নবম সংসদ নির্বাচনে ১৬৫ কোটি ৫০ হাযার ৬৮৭ টাকা; অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৭২ কোটি ৭১ লাখ ৩২ হাযার ২২০ টাকা; সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ১১ কোটি ৪৭ লাখ ২২ হাযার ৩৪৭ টাকা, ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে মোট ৩৭ কোটি ৪ লাখ ৪৬ হাযার ৩০ টাকা, পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ২৪ কোটি ৩৭ লাখ ৮৩ হাযার ১৫৭ টাকা, চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা, তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা, দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা এবং ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ প্রথম সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী ব্যয় ছিল ৮১ লাখ ৩৬ হাযার টাকা।
কিন্তু ইসলামী পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচনে এ ধরনের কোন আশঙ্কা নেই। নির্বাচনের নামে একটা পয়সাও নষ্ট হয় না, হতাহতের শিকার হয় না কেউ, মান-সম্মানের হানি হয় না কারো। এখানে ভোট চাওয়া তো দূরের কথা, কেউ নিজে থেকে প্রার্থীও হয় না। বরং সৎ, যোগ্য ও গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ কর্তৃক সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিগণ নির্বাচিত হয়ে দেশের উন্নতি, অগ্রগতি, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। ইসলামী রাষ্ট্রের খলীফা বা রাষ্ট্রপ্রধান তিনটি পদ্ধতির যে কোন একটির মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন: (১) ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’ বা গণ্যমান্য, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিগণের পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে; যেমনটি আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খলীফা হওয়ার ক্ষেত্রে ঘটেছিল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের অনুপস্থিতিতে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ছালাতে ইমামতির দায়িত্ব প্রদানের মাধ্যমে তার খলীফা হওয়ার প্রতি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন (বুখারী, হা/৬৬৪; মুসলিম, হা/৪১৮)। তার খিলাফত সাক্বীফা বানু সা‘এদাতে ‘আহলুল হাল্লি ওয়াল আক্বদ’-এর মনোনয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর সমস্ত ছাহাবী তার খিলাফতের পক্ষে ঐকমত্য পোষণ করেন ও তার হাতে বায়‘আত করেন। অনুরূপভাবে ওছমান ও আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-এর খিলাফতও একইভাবে সাব্যস্ত হয়েছিল। (২) পূর্ববর্তী খলীফার দেয়া প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়া। অর্থাৎ পূর্ববর্তী খলিফা সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে তাঁর পরবর্তী খলীফা হিসাবে প্রতিশ্রুতি দিবেন। এ পদ্ধতিতে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফত সাব্যস্ত হয়। পূর্ববর্তী বিদায়ী খলীফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু মৃত্যুর সময় গণ্যমান্য ছাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে আওফ, ওছমান ইবনে আফফান, উসাইদ ইবনে হুযাইর রাযিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখের সাথে পরামর্শ করে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে পরবর্তী খলীফা হিসাবে নির্বাচন করেন। পরবর্তীতে সকলে তাতে সম্মতি জ্ঞাপন করেন (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: তারীখে ত্ববারী, ৩/৪২৮; আল-মুনতাযাম, ৪/১২৫; সুয়ূত্বী, তারীখুল খুলাফা/৬৬)। (৩) শক্তি ও আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে। অর্থাৎ কেউ যদি তার অস্ত্র ও ক্ষমতা বলে তাকে মেনে নিতে মানুষকে বাধ্য করে এবং স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হয়, সেক্ষেত্রে ভালকাজে তার আনুগত্য করা অপরিহার্য (দ্রষ্টব্য: উছাইমীন, শারহুল আক্বীদাতিস সাফফারীনিয়্যাহ/৬৮৪)। উমাইয়া ও আববাসীয় কতিপয় খলীফা এবং তাদের পরবর্তীতে কিছু কিছু খলীফা এভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। এটা শরী‘আত বিরোধী ও বেআইনী পদ্ধতি। তথাপিও এই খলীফার আনুগত্যের পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, তার সাথে ক্ষমতা নিয়ে টানাটানি করলে ফিতনা-ফাসাদ ও রক্তপাত ঘটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেমনটি ঘটেছে বানী উমাইয়ার শাসনামলে।
লক্ষ্য করুন, ইসলামে খলীফা নির্বাচনের পদ্ধতি দু’টি কত চমৎকার, কত শান্তিপূর্ণ- যার মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন জগদ্বিখ্যাত চার খলীফা, যাদের মধ্যে দুনিয়াবী কোন স্বার্থ ছিল না, ছিল না কোন প্রকার ক্ষমতালিপ্সা। বরং তাদের একমাত্র লক্ষ্যই ছিল ইহকালীন ও পরকালীন শান্তি। তাদের কেউ নেতৃত্ব চেয়ে নেননি, বরং মুসলিম উম্মাহ্র শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিবর্গের পরামর্শেই তারা খিলাফতের গুরু দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। কোন প্রকার অপ্রীতিকর কিছু সেখানে ঘটেনি, দুইটা পয়সাও অপচয় হয়নি। সত্যি বলতে, প্রচলিত গণতান্ত্রিক নির্বাচন ব্যবস্থায় অধিকাংশ জনগণের রায়ই চূড়ান্ত হয়; সৎ, যোগ্যতা ও পরহেযগারিতার কানাকড়ি মূল্যও এখানে থাকে না। এ পদ্ধতিতে নেতাকে পদপ্রার্থী হতে হয়; নিজের যোগ্যতা ও গুণাবলীর ঘোষণা দিয়ে তাকে পদের উপযুক্ত প্রমাণ দিতে হয়। অপরপক্ষে ইসলামে কেউ পদ চাইলেই তিনি নেতৃত্বদানের অযোগ্য বিবেচিত হন। প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতির অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রার্থী নিজের সুনাম করে এবং অন্যের বদনাম করে। এ নির্বাচন মানুষকে দলে দলে বিভক্ত করে ফেলে। এ পদ্ধতিতে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকার। পক্ষান্তরে ইসলামে মানুষ হিসাবে সকলে সাধারণভাবে মৌলিক অধিকার ভোগ করলেও যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও তাক্বওয়ার ভিত্তিতে গুণীজনেরা বিশেষভাবে মূল্যায়িত হন। সুতরাং এখনকার এ নির্বাচন পদ্ধতির সাথে ইসলামী খিলাফতের মনোনয়ন পদ্ধতির দূরতম কোন সম্পর্কও নেই।
মহান আল্লাহ রাজনীতিসহ আমাদের সার্বিক জীবনে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
