কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

‘জামা‘আত’ কী ও কেন?

اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপন ইসলামের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মূলনীতি। ইসলাম এর উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। আক্বীদার সাথে জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপনের রয়েছে সরাসরি সম্পর্ক। বরং উম্মতে মুহাম্মাদীর অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপন। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপনের আলোচনা; যেখানে ইসলাম বিভিন্নভাবে জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপনের তাকীদ দিয়েছে। কোথাও সকলে মিলে অবিচ্ছিন্নভাবে আল্লাহ্র রজ্জুকে ধারণ করতে বলা হয়েছে (আলে ইমরান, ৩/১০৩)। কোথাও ইয়াহূদী-খৃষ্টানদের মত বিভক্ত না হয়ে বরং একত্রিত থাকতে বলা হয়েছে (ঐ, ৩/১০৫)। জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপনের প্রতি উৎসাহ প্রদানের বিপরীতে ‘জামা‘আত’ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ব্যাপারেও ইসলাম অত্যন্ত কঠোরতা আরোপ করেছে। হাদীছে জামা‘আতবিচ্ছিন্ন অবস্থায় মারা গেলে জাহিলী মরণ হবে বলে সতর্কবার্তা এসেছে (বুখারী, হা/৭০৫৪; মুসলিম, হা/১৮৪৯)। কোথাও জামা‘আত ত্যাগ করলে ব্যক্তি তার গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলে বলেও হুশিয়ারী এসেছে (আবুদাঊদ, হা/৪৭৫৮; তিরমিযী, হা/২৮৬৩ ‘ছহীহ’)। কোথাও মুসলিম জামা‘আতের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টিকারীকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে (মুসলিম, হা/১৮৫২)। কুরআন-হাদীছে এ জাতীয় বক্তব্য কম নেই।

এ পর্যন্ত কারো কোনো দ্বিমত নেই; বরং সবাই জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপনের আহবানই জানায়। কিন্তু ‘জামা‘আত’ বলতে কোন্ পথ, কোন্ মত, কোন্ দল, মাযহাব বা সংগঠনের কথা বলা হয়েছে, তা নিয়ে যত সমস্যা। জামা‘আতের সঠিক ব্যাখ্যা নিয়ে রয়ে গেছে ধোঁয়াশা। অনুরূপভাবে হাদীছে ‘ইমারত’ ও ‘আমীর’ বলতে কোন্ ইমারত ও কোন্ আমীরকে বুঝানো হয়েছে, তাও রয়ে গেছে অস্পষ্ট। কারণ আরবী ভাষায় এ বিষয়ে নানা প্রামাণ্য লেখনী, বক্তব্য থাকলেও বাংলা ভাষায় বিষয়টি নিতান্তই অবহেলিত ও উপেক্ষিত। সবাই জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপনের বুলি আওড়ান, কিন্তু ‘জামা‘আত’ দ্বারা কাদেরকে বুঝানো হয়েছে, তার স্পষ্ট ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা তেমন কেউ দেন না। বরং প্রত্যেকে নিজের মত করে ‘জামা‘আত’-এর ব্যাখ্যা করেন। যে যে গণ্ডি ও বলয়ে রয়েছেন, তার কাছে সেটাই হচ্ছে ‘জামা‘আত’। সেটাকে ঘিরেই তার যত জল্পনা-কল্পনা। সেদিকে আহবানই তার একমাত্র মিশন। সেখানকার মানুষের জন্যই তার যত ভালোবাসা। এর বাইরে যেন তার দৃষ্টিসীমা অতিক্রম করে না। বরং তার সেই গণ্ডির বাইরের সব মত, পথ, দল বা সংগঠনই তার চোখে বিভক্তি আর বিশৃঙ্খলা। বাইরের সবাই তার কাছে জামা‘আতত্যাগী।

উচিৎ ছিল, কুরআন-সুন্নায় বর্ণিত ‘জামা‘আত’-এ সবার প্রবেশ করা, কিন্তু তা না হয়ে চলছে ঐ ‘জামা‘আত’কে নিয়েই সবার টানাটানি এবং সেটাকে নিজের দল হিসাবে আখ্যা দেওয়ার অপচেষ্টা। চলছে জামা‘আত ও ইমারত সম্পর্কিত বক্তব্যগুলোর অপব্যাখ্যার হিড়িক এবং সেগুলোকে শুধু নিজেদের ক্ষেত্রে প্রয়োগের ভয়ানক অপপ্রয়াস। ঘরে ঘরে আজ গঠিত হচ্ছে ইমারত এবং নিযুক্ত হচ্ছে আমীর। সবাই বলছে, আমার ইমারতই কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক বিশুদ্ধ এবং আমীর হিসাবে আমার অনুসরণই শিরোধার্য। তাইতো ‘ফিরাক্ব মু‘আছেরাহ’ গ্রন্থের প্রখ্যাত লেখক ড. গালেব ইবনে আলী আল-আওয়াজী দুঃখ করে বলেন, ‘মুসলিমরা আজ কত সভা-সমিতি, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে সমবেত হচ্ছে এবং তাদের শেস্নাগান থাকছে এই আয়াত: ‘আর তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং বিভক্ত হয়ো না’ (আলে ইমরান, ৩/১০৩)। কিন্তু প্রোগ্রাম থেকে যখনই বের হচ্ছে, তখনই তারা সবচেয়ে বিভক্ত জাতি হয়ে বের হচ্ছে! তারা নিম্নবর্ণিত আয়াতটি কতইনা পড়ছে: ‘আর তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতবিরোধ করেছে তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর’ (আলে ইমরান, ৩/১০৫)। এ জাতীয় আরো কত আয়াতই না তারা পড়ছে, কিন্তু কেন তারা কোনো ফায়দা পাচ্ছে না?! এর উত্তর সরাসরি দুঃখভারাক্রান্ত লেখকের যবানীতেই শুনুন, ‘এর জবাব হচ্ছে, তারা যখন সমবেত হয়, তখন প্রত্যেকটি গ্রুপ ও দল এই ভেবে গোঁ করে বসে থাকে, আল্লাহর যে রজ্জুকে আঁকড়ে ধরা আবশ্যক, তা শুধু সে এবং তার দলের মধ্যেই রয়েছে। ফলে, অন্যদের জন্য আবশ্যক হচ্ছে, তাদের পতাকাতলে সমবেত হওয়া এবং তাদের পথে চলা। প্রত্যেকে ঠিক এমন চিন্তাটাই করে। সেকারণে তাদের সমবেত হওয়ার অর্থই হয় এই বিভেদকে আরো গভীর করা। ফলে এসব আয়াত তেলাওয়াত করা সত্ত্বেও তারা কোনো ফায়দা পায় না। এর পেছনে আরো কারণ হচ্ছে, তারা তাদের চাহিদা ও প্রবৃত্তিকে এসব আয়াতের ফায়ছালার কাছে অবনত করতে পারে না। তাছাড়া এই উম্মতের সালাফে ছালেহীনকে আল্লাহ যে হক্বের পথ প্রদর্শন করেছিলেন এবং যে হক্বের কারণে তাদের সবকিছু সংশোধিত হয়ে গিয়েছিল, তার দিকে ফিরে যাওয়ার প্রতি তারা সন্তুষ্ট হতে পারে না। আর প্রতিটি দল ও ফেরক্বা যতক্ষণ এসব আয়াত দিয়ে এই দলীল নিবে যে, অন্যরা হক্বচ্যুত এবং হক্ব কেবল নিজেদের সাথেই রয়েছে, ততক্ষণ ইসলামী ঐক্য ফিরে আসার আশা করা যায় না’ (ফিরাক্ব মু‘আছেরাহ, ১/১৪৮)

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের অধিকাংশ আলেম-উলামাও ঐ একই নৌকার মাঝি। সবাই ঐক্যের আহবান জানাচ্ছেন, কুরআন-হাদীছের দলীল পেশ করছেন, কিন্তু নিজের মত করে; যার কুপ্রভাব পড়ছে সাধারণ জনগণের উপর। এমনকি একই আক্বীদা-বিশ্বাসের হওয়া সত্ত্বেও জামা‘আত থেকে বের হওয়ার দুনিয়াবী কুফল ও পরকালীন আযাব সম্বলিত দলীলগুলোকে স্বদল ও সংগঠনের বাইরের লোকদের উপর প্রয়োগ করতেও অনেকের বুক কাঁপছে না। এটা কিন্তু যেনতেন বিষয় নয়; বরং অত্যন্ত মারাত্মক ও ভয়াবহ বিষয়। কারণ, আমি যখন কোনো দল বা সংগঠন ও এর সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের স্বরূপ, গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে গিয়ে এ হাদীছ ‘যে ব্যক্তি জামা‘আত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেলো, সে ইসলামের রজ্জু তার গর্দান হতে খুলে ফেললো’ পেশ করছি, তখন কিন্তু আমি প্রকারান্তরে আমার জামা‘আত, দল বা সংগঠনের বাইরের সবাইকে ‘ইসলামের বাইরের’ গণ্য করছি! -নাঊযুবিল্লাহ- সেটা আমি বুঝি বা না বুঝি, মুখে বলি বা না বলি, স্বীকার করি বা না করি।

কুরআন-হাদীছ বুঝা ও মানার ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হচ্ছে, ‘কুরআন ও হাদীছ সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী বুঝা ও মেনে চলা ওয়াজিব’। সেকারণে অন্যান্য বিষয়ের মত জামা‘আতের ব্যাখ্যায়ও সালাফে ছালেহীনের উপলব্ধি জানা ও মানা যরূরী। উলামায়ে কেরাম জামা‘আতবদ্ধ জীবনযাপন সম্পর্কিত সবগুলো দলীল বিশেস্নষণ করে ‘জামা‘আত’-এর দু’টি অর্থ নির্ণয় করেছেন: এক. রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীবর্গের গৃহীত ও অনুসৃত পথ ও পদ্ধতি। অতএব, উক্ত পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী যে বা যারা চলবে, সে বা তারাই হচ্ছে ‘জামা‘আত (আবু দাঊদ, হা/৪৫৯৭, সনদ ‘হাসান’)। এই জামা‘আতের লোকদের মধ্যে ঈমানী বন্ধন হবে লৌহসম মযবূত, যা কিছুতেই ভাঙবার নয়। তাদের মধ্যকার পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও আন্তরিকতা হবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে, কোন সম্পর্কই এর ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে না। এই অর্থে জামা‘আত ছিল, আছে এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত থাকবে; কখনই এর বিদ্যমানতা হারিয়ে যাবে না। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকতে পারে; তাদের এক জায়গায় সমবেত থাকা যরূরী নয়। দুই. মুসলিমরা যখন একজন শাসকের অধীনে একমত হবে, তাকে শাসক হিসাবে মেনে নিবে, তখন তারা ‘জামা‘আত’ হিসাবে গণ্য হবে। তখন এই জামা‘আতের সাথে থাকা এবং তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া ওয়াজিব হয়ে যাবে। জামা‘আতের সাথে থাকার ব্যাপারে শরী‘আতের বহু বক্তব্য এই প্রয়োগকেই বুঝায়; বিশেষ করে যেসব বক্তব্যে শাসক ও বায়‘আতের কথা এসেছে, সেসব। যেখানেই আমীর বা শাসক ও আনুগত্যের কথা এসেছে, সেখানেই জামা‘আতের এই প্রায়োগিক অর্থ প্রযোজ্য। জামা‘আতবদ্ধ থাকার ও বিভক্ত না হওয়ার ব্যাপারে ইসলামের সব বক্তব্য এ দু’টি অর্থকেই বুঝায় আর এ উভয় অর্থেই জামা‘আতের সাথে থাকা ওয়াজিব। প্রথম অর্থে কেউ জামা‘আতের সাথে না থাকলে সে তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুসলিমই থাকতে পারবে না। আর দ্বিতীয় অর্থে জামা‘আতের সাথে না থাকলে জিহাদ, ক্বিছাছ, হুদূদ সহ শরী‘আতের নানা বিধান বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে যাবে এবং দুনিয়াবী জীবনে নেমে আসবে বিশৃঙ্খলা আর অশান্ত্রি। অতএব, উভয় অর্থে জামা‘আতের সাথে থাকতেই হবে। তবে এর বাইরে যে কোন সৎকাজের উদ্দেশ্যে নামে-বেনামে ইসলামসমর্থিত যে কোনো ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাকেও ইসলাম নিরুৎসাহিত করে না। এমনকি দুই-একজন মিলেও যদি ইসলামের কোন কাজ করে বা অন্য কোন ভাল কাজ করে, তথাপিও তাদের এই একতা নষ্ট করা ঠিক নয়। কারণ সঙ্ঘবদ্ধ জীবনযাপনের মধ্যেই সার্বিক কল্যাণ নিহিত। দাওয়াতী ময়দানে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা এ অর্থের আওতায় আসতে পারে। তবে, জাহিলী মৃত্যু হওয়া, গর্দান থেকে ইসলামের রজ্জু খুলে ফেলা ইত্যাকার বক্তব্যগুলো কখনই এক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে ‘জামা‘আত’-এর প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করা এবং এর অধীনে থাকার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

Magazine