কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

শিক্ষাসফর জুড়ে থাক শিক্ষা

اَلْحَمْدُ لِلهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ

শীতের বিদায় লগনে চারিদিকে ঋতুরাজ বসন্তের আনাগোনা, ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’। ঠিক এমন সময়ে আমাদের দেশে ‘শিক্ষাসফর’, ‘বনভোজন’, ‘আনন্দ ভ্রমণ’ প্রভৃতি নামে ভ্রমণের ধুম পড়ে যায়। দেশের সর্বস্তরের লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ এসব সফরে অংশ নেয়। সফরকারীদের মধ্যে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বোধ করি সবচেয়ে বেশী থাকে। জিরো লেভেল থেকে শুরু করে শিক্ষার সর্বোচ্চ লেভেল পর্যন্ত অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী বের হয় শিক্ষাসফরে। স্কুল-মাদরাসা নির্বিশেষে সবাই একাকার হয়ে যায় ভ্রমণের এই মিছিলে। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি পিকনিক স্পট ও রিসোর্টে হুমড়ি খেয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। প্রসিদ্ধ পিকনিক স্পটগুলোতে তো রীতিমত উপচে পড়া ভিড় হয়, কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। কিন্তু এসব শিক্ষাসফর থেকে কি আমাদের শিক্ষার্থীরা সত্যিকার অর্থে শিক্ষা নিতে পারছে? নাকি শিক্ষাসফরের নামে চর্চা হচ্ছে কুশিক্ষা আর অপসংস্কৃতি? সত্যি বলতে আমাদের প্রায় প্রতিটা শিক্ষাসফর জুড়ে থাকে নানা অন্যায়-অনাচার, ছোট-বড় মিলে রাশি রাশি পাপ; গান-বাজনা, ঢোল-তবলা, নাচানাচি, মেয়েদের বেপর্দা, উগ্র চলাফেরা, বিনা মাহরামে সফর, ছেলে-মেয়েদের অবাধ মেলামেশা, নির্জনে একত্রিত হওয়া, হাসি-ঠাট্টা আরো কত কি! সমুদ্র সৈকতগুলোতে নগ্নতা ও বেহায়াপনার কথা তুললে তো লজ্জায় মাথা নুয়ে পড়ে। কেউ কেউ বিভিন্ন মাযার যিয়ারতে গিয়ে শিরক-বিদ‘আতের মত জঘন্য গোনাহ কামিয়ে ফিরে। বিড়ি-সিগারেট সহ নানা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের বিষয়টিতো কোন কোন শিক্ষাসফরে খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু সফর নিয়ে ইসলাম কী বলে? মহান আল্লাহ মানুষকে যমীনে ভ্রমণ করে শিক্ষা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন (দ্রষ্টব্য: আল-আন‘আম, ১১; আন-নামল, ৬৯; আল-আনকাবূত, ২০; আর-রূম, ৪২)। আল্লাহ্র নানা সৃষ্টির মধ্যে বুদ্ধিমান ও বিশ্বাসীদের জন্য নিদর্শাবলী রয়েছে বলে পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে (আল-বাক্বারাহ, ১৬৪, আলে ইমরান, ১৯০)। যারা আল্লাহ্র সৃষ্টি নিয়ে ভাবে এবং আল্লাহকে ডাকে, আল্লাহ তাদের ডাকে সাড়া দেন এবং তাদের কর্ম নিষ্ফল করেন না মর্মে তিনি ঘোষণা করেছেন (আলে ইমরান, ১৯১)। যারা আল্লাহ্র অনুগ্রহ তালাশের নিমিত্তে যমীনে ভ্রমণ করে, তাদের প্রশংসা করা হয়েছে (আল-মুযযাম্মিল, ২০)। শিক্ষাক্ষা সফরের মানে হচ্ছে, সফরের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করা। যে শিক্ষা আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন কল্যাণ বয়ে আনবে। সেকারণে ইসলামে সফর কয়েক ধরনের: বৈধ কোন কাজের জন্য সফর। যেমন: হালাল রূযী অন্বেষণ, মানসিক এক ঘেয়েমি কাটিয়ে মনের আনন্দের খোরাক যোগানোর উদ্দেশ্যে সফর ইত্যাদি। অথবা এমন কোন উদ্দেশ্যে সফর, যার প্রতি ইসলাম উৎসাহিত করেছে। যেমন: পূর্বে হজ্জ ও ওমরা সম্পন্নকারীর পুনরায় হজ্জ ও ওমরার সফরে যাওয়া। অথবা এমন কোন উদ্দেশ্যে সফর করা, যা ইসলাম ফরয করেছে। যেমন: যাদের উপর হজ্জ ও ওমরা ফরয, তাদের জীবনে অন্তত একবার হজ্জ ও ওমরার উদ্দেশ্যে সফর, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার উদ্দেশ্যে সফর ইত্যাদি। এসব সফরে আছে নানাবিধ কল্যাণ। আবার সফর কখনো হারামও হতে পারে। যেমন: চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, যেনা-ব্যভিচার ইত্যাদি নানা পাপ ও গর্হিত কাজের উদ্দেশ্যে সফর। এ প্রকার সফরে আছে শুধু পাপ আর অকল্যাণ।

সফরে জ্ঞানার্জন ও কল্যাণ সাধন এবং একে ফলপ্রসূ করতে হলে সফরকে ইসলামের ফ্রেমে বাঁধতে হবে। এক্ষেত্রে করণীয় হলো: (১) পাহাড়-পর্বত, গাছ-গাছালি, পশু-পাখি, নদী-নালা, ঝর্ণাধারা, সমুদ্র আল্লাহ্র এসব সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে হবে এবং তার প্রভূত্ব ও দাসত্ব স্বীকার করে নিতে হবে। (২) সফরের সময় ভাবতে হবে, আজ যেমন সে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছে, তেমনি তাকে একদিন দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে। সেই দিনটার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। (৩) সফরে আল্লাহ্র কিছু বিধিবিধান বাস্তবায়ন করা যায়, যেগুলো সফর ছাড়া বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। যেমন: হজ্জ-ওমরা করা, ছালাত কছর করা, ফরয ছিয়াম না রাখার সুযোগ গ্রহণ করা, তিন দিন তিন রাত মোজার উপর মাসাহ করা, জুম‘আ না আদায়ের সুযোগ গ্রহণ করা এবং তদস্থলে যোহর পড়া, যানবাহনে নফল ছালাত আদায় করা এবং কিবলা ঠিক রাখার শর্ত বলবৎ না রাখা। সফরের দো‘আ পড়া, কোথাও অবস্থান করলে বিশেষ দো‘আ পড়া, সফর থেকে ফেরার দো‘আ পড়া, মুসাফির ও মুক্বীম পরস্পরের জন্য দো‘আ করা ইত্যাদি। (৪) সফরে একজন আমীর থাকতে হবে, যিনি সবকিছু দেখভাল করবেন। সফরসঙ্গীরা তার নির্দেশনা মেনে চলবেন, যতক্ষণ তিনি ইসলামের অনুকূলে নির্দেশনা দিবেন। (৫) সফরে শরী‘আত অননুমোদিত কোন ধরনের কর্মসূচী হাতে নেয়া চলবে না। (৬) সফরে শিক্ষামূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নানা কর্মসূচী থাকতে হবে; তাহলে যথার্থই তা শিক্ষাসফর হিসাবে পরিগণিত হবে। (৭) সফরে বিনোদন, আনন্দ-ফূর্তি থাকতেই পারে, তবে অবশ্যই তাতে অতিরঞ্জন বর্জনীয় এবং তা হবে শারঈ সীমারেখায় সীমায়িত। বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে ফেটে পড়া যাবে না।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে সর্বদা উপকারী শিক্ষা অর্জন এবং তদনুযায়ী আমল করার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

Magazine