| |||
প্রশ্ন (১) : শা‘বান মাসে কয়টি ছিয়াম রাখতে হবে? এর ফযীলত কী?
-আবু হমাইদ সাঈদী
পার্বতীপুর, দিনাজপুর।
উত্তর : শা‘বান মাসে কয়টি ছিয়াম রাখতে হবে তা নির্দিষ্টভাবে হাদীছে বর্ণিত হয়নি। তবে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাযান মাস ব্যতীত বাকি এগারো মাসের মধ্যে শা‘বান মাসে বেশি বেশি ছিয়াম রাখতেন। উসামা ইবনু যায়দ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি আপনাকে তো শা‘বান মাসে যে পরিমাণ ছিয়াম পালন করতে দেখি বছরের অন্য কোন মাসে সে পরিমাণ ছিয়াম পালন করতে দেখি না। তিনি বললেন, ‘শা‘বান মাস রজব এবং রামাযানের মধ্যবর্তী এমন একটি মাস যে মাসের (গুরুত্ব সম্পর্কে) মানুষ খবর রাখে না। অথচ এ মাসে আমলনামা সমূহ আল্লাহ্র নিকটে উত্তোলন করা হয়। তাই আমি পসন্দ করি যে, আমার ছিয়াম পালনরত অবস্থায় আমার আমলনামা আল্লাহ তা’আলার নিকটে উত্তোলন করা হবে (নাসাঈ, হা/২৩৫৯)।
তবে কয়দিন ছিয়াম রাখতে হবে এই মর্মে একটি বর্ণনায় প্রথম থেকে পনের শা‘বান পর্যন্ত ছিয়াম রাখার কথা পাওয়া যায়। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন শা‘বান মাস অর্ধেক হয়ে যায়, তখন তোমরা আর (নফল) ছিয়াম রেখ না (আবুদাঊদ, হা/২৩৩৭)। তবে পনের শা‘বানের পরেও রাখা যায়
কিন্তু শর্ত হচ্ছে রামাযানের সাথে যেন মিলে না যায়। বরং রামাযানের আগে এক দুই দিন ছিয়াম ছেড়ে দিতে হবে।
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (কয়েক দিন ব্যতীত) পূর্ণ শা‘বান মাস ছিয়াম রাখতেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৭০; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৬; মিশকাত, হা/২০৩৬)।
প্রশ্ন (২) : যাকাত প্রদানকারীদের অধিকাংশকেই শুধু রামাযান মাসে যাকাত বের করতে দেখা যায়। এর কারণ কী? অন্য মাসের চেয়ে রামাযান মাসে যাকাত বের করার গুরুত্ব ও ফযীলত কি বেশী?
-আবুল বাশার
তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ।
উত্তর : যাকাত প্রদানের ক্ষেত্রে রামাযান মাসকে প্রাধান্য না দিয়ে নির্ধারিত সময়ে যাকাত দেওয়াই শারঈ বিধান। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘সম্পদের উপর বছর পূর্ণ হলেই তার যাকাত দিতে হবে’ (আবুদাঊদ, হা/১৫৭৩; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৯৯)।
সুতরাং প্রত্যেক যাকাত প্রদানকারীর জন্য যরূরী হল, যখন তার সম্পদের নিছাব পূর্ণ হওয়ার পর এক বছর অতিবাহিত হবে তখনই সে যাকাত আদায় করবে। যদি তার বছর রজব মাসে শেষ হয় তাহলে সে রজব মাসে যাকাত আদায় করবে। অনুরূপভাবে যে মাসে তার বছর পূর্ণ হবে সে মাসেই তাকে যাকাত আদায় করতে হবে। শুধু রামাযান মাসে যাকাত আদায় করব এমন নিয়তে বিলম্ব করা মোটেও উচিত নয়। যাকাত যেহেতু গরীবের হক্ব, তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তার হক্ব তার নিকটে পৌঁছে দেয়া যরূরী। যদি মানুষের উপর যাকাত ফরয হওয়ার সাথে সাথে তারা তা আদায় করে তাহলে পুরা বছর গরীব-মিসকীনদের জীবিকা নির্বাহ সুবিধাজনক হবে (মাজমুঊ ফাতাওয়া ইবনে উছায়মীন, ১৮/১৯১ পৃঃ)।
প্রশ্ন (৩) : স্বেচ্ছায় ঈদের ছালাত আদায় না করলে পাপ হবে কি?
-যুবায়ের রহমান
শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : কোন কারণ ছাড়া স্বেচ্ছায় ঈদের ছালাত পরিত্যাগ করলে অবশ্যই গুনাহ হবে। রাসুল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী-পুরুষ, সুস্থ-অসুস্থ সর্বোপরি সকল মানুষকে ঈদের জামা‘আতে উপস্থিত হওয়ার জোর তাগিদ দিয়েছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩২৫)। এমনকি মেয়েদের চাদর না থাকলে চাদর ধার করে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন (মুসলিম, হা/৮৯০)। এছাড়া সূরা কাউসারের ২ নং আয়াতে মহান আল্লাহ্র নির্দেশ, ‘আপনি ছালাত আদায় করুন ও কুরবানী করুন’ বিষয়ে প্রসিদ্ধ তাফসীর হচ্ছে এখানে ছালাত দ্বারা ঈদের ছালাত উদ্দেশ্য (মুগনী, ২/২৭২)।
প্রশ্ন (৪) : জুম‘আর দিন ঈদ হলে স্বেচ্ছায় জুম‘আর ছালাত আদায় না করলে পাপ হবে কি?
-আফীফ
ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।
উত্তর : না, এতে কোন পাপ হবে না। তবে কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে। যেমন: (ক) সে যেন ঈদের ছালাত আদায় করে, যদি ঈদের ছালাত আদায় না করে, তাহলে অবশ্যই তাকে জুম‘আর ছালাত আদায় করতে হবে। (খ) জুম‘আর ছালাত মাফ হলেও বাসায় যোহরের ছালাত আদায় করতে হবে। (গ) মসজিদগুলোতে জুম‘আ অনুষ্ঠিত হতে হবে। ইমাম ছাহেব খুৎবা দিবেন এবং ছালাত পড়াবেন। মানুষদের মধ্যে যাদের ইচ্ছা উপস্থিত হবে যাদের ইচ্ছা হবে না। কিন্তু মসজিদে জুম‘আর খুৎবাই অনুষ্ঠিত হবে না এমনটা যেন না হয়।
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুম‘আর দিন ঈদ হলে জুম‘আর ছালাত আদায় করার ব্যাপারে স্বাধীনতা দিয়েছেন। কেউ চাইলে তা আদায় করতে পারে। আবার নাও করতে পারে। এতে কোন পাপ হবে না। আইয়াস ইবনে আবু রামলা আশ-শামী রাহিমাহুল্লাহ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা মু‘আবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু যায়েদ ইবনে আরকাম রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কিছু জিজ্ঞেস করার সময় আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তিনি (মু‘আবিয়া) বলেন, আপনি কি রাসুল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে তার সাথে ঈদ ও জুম‘আ একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে দেখেছেন? তিনি (যায়েদ ইবনে আরকাম) উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, কীভাবে তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা আদায় করেছিলেন? তিনি বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে ঈদের ছালাত আদায় করেন। অতঃপর জুম‘আর ছালাত আদায়ের ব্যাপারে অবকাশ প্রদান করে বলেন, ‘যে ব্যক্তি তা আদায় করতে চায়, সে তা আদায় করতে পারে’ (আবুদাঊদ, হা/১০৭০)।
প্রশ্ন (৫) : কোন অসুস্থ ব্যক্তি বাড়ীতে একাকী ঈদের ছালাত আদায় করতে পারে কি?
-রিমন মন্ডল
গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা।
উত্তর : হ্যাঁ, এমতাবস্থায় অসুস্থ ব্যক্তি বাড়ীতে একাকী দু’রাক‘আত ঈদের ছালাত আদায় করবে (ছহীহ বুখারী, ‘কারো ঈদের ছালাত ছুটে গেলে সে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে, অনুরূপ মহিলারাও এবং যারা বাড়ীতে কিংবা গ্রামে থাকে’ অনুচ্ছেদ-২৫; ‘ঈদায়েন’ অধ্যায়-১৩)।
প্রশ্ন (৬) : সন্তান মৃত মাতা-পিতার নামে ইফতারির ব্যবস্থা করলে তা কি খাওয়া যাবে?
-সুলাইমান
ডিমলা, নীলফামারী।
উত্তর : মৃত পিতা-মাতার নামে ইফতারির ব্যবস্থা করা যাবে না। বরং তা দান করতে হবে। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘জনৈক ব্যক্তি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, আমার মা হঠাৎ মারা গেছেন। আমার ধারণা যে, তিনি কথা বলার সুযোগ পেলে দান করে যেতেন। আমি যদি তার পক্ষ থেকে দান করি, তবে কি তিনি নেকী পাবেন? নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৩৮৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১০০৪; মিশকাত, হা/১৯৫০)। তবে কেউ যদি মৃত পিতা-মাতার নামে ইফতারির ব্যবস্থা করতেই চান তাহলে তা করবে অসহায় ফকীর-মিসকীনদের জন্য। কেননা মৃত ব্যক্তির নামে যেটা প্রদান করা হয়, তা ছাদাক্বাহ। আর ছাদাক্বাহ সবাই খেতে পারে না (ছহীহ বুখারী, হা/১৪৯৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯; মিশকাত, হা/১৭৭২)।
প্রশ্ন (৭) : ২.৫০ ভরি ব্যবহৃত স্বর্ণ থাকলে তার যাকাত দিতে হবে কি?
-উম্মু রুকাইয়া
তালা, সাতক্ষীরা।
উত্তর : ২.৫০ ভরি স্বর্ণের যাকাত দিতে হবে না। কেননা স্বর্ণের যাকাতের নিছাব হচ্ছে বিশ মিছক্বাল বা সাড়ে সাত ভরি যা ৮৫ গ্রাম সমপরিমাণ (দারাকুৎনী, ইরওয়াউল গালীল, হা/৮১৫)। তবে ব্যবহৃত স্বর্ণ যদি নিছাব পরিমাণ হয় তাহলে অবশ্যই যাকাত আদায় করতে হবে। আম্র ইবনু শু‘আইব তাঁর পিতার মাধ্যমে তাঁর দাদা হতে বর্ণনা করেন, দু’জন স্ত্রী লোক রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসল। তখন তাদের হাতে দু’টি স্বর্ণের বালা ছিল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি যাকাত আদায় কর? তারা বলল, ‘জ্বি’-না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমরা কি ভালবাস যে আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন তোমাদেরকে দু’টি আগুনের বালা পরাবেন? তারা বলল, কখনও না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাহলে তোমরা এর যাকাত আদায় কর’ (তিরমিযী, হা/৬৩৭; নাসাঈ, হা/২৪৭৯, সনদ হাসান; মিশকাত, হা/১৮০৯)।
প্রশ্ন (৮) : সাহারীর পূর্বে জাগতে পারেনি। এমতাবস্থায় না খেয়েই ছিয়াম রাখতে হবে? না-কি তার ক্বাযা আদায় করতে হবে?
-আদনান বিন দেলোয়ার
নওগাঁ সদর, নওগাঁ।
উত্তর : এমতবস্থায় না খেয়েই ছিয়াম থাকবে। পরবর্তীতে তাকে সে ছিয়ামের ক্বাযা ও কাফফারা আদায় করতে হবে না। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, একদা নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এসে বললেন, তোমাদের নিকট কিছু আছে কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেন, তবে আমি ছিয়াম রাখলাম। অতঃপর আরেক দিন তিনি আমাদের নিকট আসলেন, আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাদেরকে ‘হায়স’ হাদিয়া দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন, তা আমাকে দাও! আমি তো ছিয়ামের নিয়ত করেছি। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, অতঃপর তিনি তা খেলেন (ছহীহ বুখারী, হা/; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৪; মিশকাত, হা/২০)।
তবে সাহরীতে জাগার চেষ্টা করতে হবে। কেননা সাহারী খাওয়া সুন্নাত। সকলের উচিত সাহারী খাওয়ার প্রতি যত্নবান হওয়া। কেননা সাহারীর মধ্যে রয়েছে বিশেষ বরকত। আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা সাহরী খাও, কেননা সাহারীতে বরকত রয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/১৯২৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৯৫; মিশকাত, হা/১৯৮২)।
প্রশ্ন (৯) : ছিয়াম অবস্থায় দিনের বেলা স্বপ্নদোষ হলে ছিয়াম ভঙ্গ হবে কি?
-আবু বকর ছিদ্দীক
চিচিরবন্দর, দিনাজপুর।
উত্তর : ছিয়াম অবস্থায় দিনের বেলায় স্বপ্নদোষ হলে ছিয়াম ভঙ্গ হবে না। কেননা যে সকল কারণে ছিয়াম ভঙ্গ হয় স্বপ্নদোষ তার অন্তর্ভুক্ত নয়। তাছাড়া এটি মানুষের সাধ্যের বাইরে অনিচ্ছায় হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যাতীত কোন কাজের ভার দেন না’ (বাক্বারাহ, ২৮৬)। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রামাযান মাসে অপবিত্র অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফজর হয়ে যেত। অথচ সে অপবিত্রতা স্বপ্নদোষের কারণে ছিল না। অতঃপর তিনি গোসল করতেন ও ছিয়াম রাখতেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৩০; ছহীহ মুসলিম, হা/১১০৯; মিশকাত, হা/২০০১)।
প্রশ্ন (১০) : ইমামের পিছনে জামা‘আতে কিংবা একাকী নফল ছালাত আদায়কালে তাসবীহ, তাহলীল, দু‘আ বা যিকিরসমূহ ফিস ফিস শব্দ করে পড়বে? না-কি চুপেচুপে বা মনে মনে পড়বে?
-মোঃ আবু বকর ছিদ্দিক
শ্রীপুর, গাজীপুর।
উত্তর : চুপেচুপে, মনে মনে কিংবা ফিস ফিস শব্দ করে নয়; বরং ছালাতে তাসবীহ-তাহলীল, দু‘আ ও যিকিরসমূহ এমনভাবে পড়বে যাতে করে ঠোট বা দাড়ির নড়াচড়া প্রকাশ পায়। আবু মা‘মার রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা খাববাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি যোহর ও আছরের ছালাতে ক্বিরআত পড়তেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমরা বললাম, আপনারা কী করে বুঝতে পারতেন? তিনি বললেন, তাঁর দাড়ির নড়াচড়া দেখে (ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৬)।
প্রশ্ন (১১) : ঈদের দিনের সকালের সুন্নাতী আমলসমূহ কী কী?
-রবিউল ইসলাম
কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ।
উত্তর : ঈদের দিনের সকালের কতিপয় সুন্নাতী আমল নিম্নরূপ। প্রথমত, ঈদুল ফিতরের দিনে সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পরে বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে ঈদের মাঠে যাবে। পক্ষান্তরে ঈদুল আযহার দিনে না খেয়ে যাবে এবং ছালাতের পর নিজ কুরবানীর গোশত বা কলিজা বা অন্য কিছু দিয়ে নাস্তা করবে। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ঈদুল ফিতরের দিন একটি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে (ঈদগাহে) বের হতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৩; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৪৩৩)। বুরায়দাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন কিছু না খেয়ে বের হতেন না এবং ঈদুল আযহার দিন ছালাত আদায় না করা পর্যন্ত কিছু খেতেন না (ছহীহ তিরমিযী, হা/৫৪২; ইবনু মাজাহ, হা/১৭৫৪: তাহক্বীক মিশকাত, হা/১৪৪০)। দ্বিতীয়ত, ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে বের হওয়ার পর থেকে ছালাত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করবে। আর ঈদুল আযহার ৯ যিলহজ্জ আরাফার দিন ফজর হতে ১৩ যিলহজ্জ আছর ছালাতের পর পর্যন্ত নারী-পুরুষ তাকবীর পাঠ করবে। তবে নারীরা নিম্নস্বরে তাকবীর পাঠ করবে (মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, ২/৭১-৭২; ইরওয়া, ৩/১২১ পৃঃ, সনদ ছহীহ, ইরওয়া, ৩/১২৫ পৃঃ)। তৃতীয়ত, রাস্তা পরিবর্তন করবে অর্থাৎ ঈদগাহে যে রাস্তায় যাবে তার ভিন্ন রাস্তায় প্রত্যাবর্তন করবে (বুখারী, হা/৯৮৬; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৪৩৪-১৪৪৭)। চতুর্থত, মহিলাদেরকেও ঈদের মাঠে গিয়ে জামা‘আতে শরীক হতে হবে। উম্মু আতিয়া বর্ণিত হাদীছ দু’ঈদের দিনে ঋতুবর্তী ও পর্দানশীল সকল নারীকে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের মাঠে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৩৫১; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯০; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৪৩১)।
প্রশ্ন (১২) : মহিলাদের জন্য কি ঈদের মাঠে যাওয়া যরূরী?
-মুনতাসির বিল্লাহ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : মহিলাদের জন্যও ঈদের মাঠে যাওয়া যরূরী। কেননা তাদেরকে ঈদের মাঠে যাওয়ার জন্য রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোরালোভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি ঈদের দিনে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছালাতে উপস্থিত ছিলাম। দেখলাম, তিনি খুৎবার পূর্বে ছালাত আরম্ভ করলেন আযান ও ইক্বামত ছাড়া এবং যখন ছালাত শেষ করলেন বিলালের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। অতঃপর আল্লাহ্র মহিমা ও তাঁর প্রশন্তি বর্ণনা করলেন। তৎপর লোকদেরকে উপদেশ দিলেন। তাদেরকে (পরকালের কথা) স্মরণ করালেন এবং আল্লাহ্র আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করলেন। অতঃপর মহিলাদের দিকে অগ্রসর হলেন আর তখন তাঁর সাথে ছিলেন বিলাল, তাদেরকে তিনি আল্লাহভীতির উপদেশ দিলেন। কিছু নছীহত করলেন এবং (আখেরাতের কথা) স্মরণ করালেন (ছহীহ নাসাঈ, হা/১৫৭৫; ইবনু খুযায়মাহ, হা/১৪৬০; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৪৪৬)। উম্মে আতিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমাদের নির্দেশ দেওয়া হল, আমরা যেন ঋতুবর্তী ও পর্দানশীল মহিলাদেরও দুই ঈদের দিনে (ঈদগাহে) বের করি, যাতে তারা মুসলিমদের জামা‘আতে এবং তাদের দো‘আয় শামিল হতে পারে; কিন্তু ঋতুবর্তীগণ যেন তাদের ছালাতের স্থান হতে একদিকে সরে বসে। তখন এক মহিলা প্রশ্ন করল, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের কারও (শরীর ঢাকবার) বড় চাদর নেই। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার সাথী তাকে আপন চাদর পরাবে (বুখারী, হা/৩৫১; মুসলিম, হা/৮৯০; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৪৩১)।
উপরিউক্ত হাদীছদ্বয় দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মহিলারা ঈদের মাঠে গিয়েই ঈদের ছালাতে অংশগ্রহণ করবে এবং ঋতুবতী মহিলাগণ ছালাত আদায় করবে না। বরং খুৎবা ও তাকবীরে শরীক হবে। তবে সমস্য থাকলে বাড়ীতে একাকী কিংবা একজন পুরুষ ইমামের ইমামতিতে ঈদের ছালাত পড়ে নিবে (ছহীহ বুখারী, ‘কারো ঈদের ছালাত ছুটে গেলে সে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে, অনুরূপ মহিলারাও এবং যারা বাড়ীতে কিংবা গ্রামে থাকে’ অনুচ্ছেদ-২৫; ‘ঈদায়েন’ অধ্যায়-১৩)। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদে পুরুষের ইমামতিতে মেয়েদের ঈদের ছালাত পড়ার কোন বিধান শরী‘আতে নাই।
প্রশ্ন (১৩) : ঈদের ছালাত আদায়ের পদ্ধতি কী?
-রিশাদ আহমাদ
গুরুদাসপুর, নাটোর।
উত্তর : ছালাতুল ঈদায়েনে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্বিরাআতের পূর্বে প্রথম রাক‘আতে সাত ও দ্বিতীয় রাক‘আতে পাঁচ সহ মোট বারো তাকবীর দিতেন। প্রথম রাক‘আতে সাত তাক্ববীরের পর সানা ও আঊযুবিল্লাহ-বিসমিল্লাহ সহ সূরা ফাতিহা ও সূরা আলা এবং দ্বিতীয় রাক‘আতে পাঁচ তাকবীর দেওয়ার পর শুধু বিসমিল্লাহ বলে সূরা ফাতিহা ও গাশিয়া পড়তেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৮৭৮; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/৮৪০)। কাসীর তার দাদার সূত্রে বর্ণনা করে বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’ঈদের ছালাতের প্রথম রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে সাত ও দ্বিতীয় রাক‘আতে ক্বিরাআতের পূর্বে পাঁচ তাকবীর দিতেন (ছহীহ তিরমিযী, হা/৫৩৬; ইবনু মাজাহ, হা/১২৭৯; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৪৪১-১৪৪৬)। ছালাত শেষে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলালের গায়ে ভর দিয়ে খুৎবা প্রদান করতেন। অতঃপর মহিলাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে দান-খায়রাতের নছীহত করতেন এবং বিলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু তার চাদরে মহিলাদের দান গ্রহণ করতেন (ছহীহ নাসাঈ, হা/১৫৭৫; আহমাদ, হা/১৪৪২০; ইবনু খুযায়মাহ, হা/১৪৬০; সুনানুল কুবরা বায়হাক্বী, হা/৬১৯৮; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৪৪৬)। ওয়েল ইবনু হুজরের হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ছালাতে প্রত্যেক তাকবীরে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত উত্তোলন করতেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৪০১; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/৭৯৭)।
প্রশ্ন (১৪) : ঈদের ছালাত আদায় করার জন্য কি ঈদগাহের জমি ওয়াক্বফ হতে হবে?
-আহমাদ যুবাইর
নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : ঈদের ছালাত আদায়ের জন্য ঈদের মাঠ ওয়াক্বফ হওয়া যরূরী। যেমন মসজিদের জন্য জমি ওয়াক্বফ হওয়া যরূরী (ছহীহ বুখারী, হা/৪২৮)। তবে যখন ঈদের ছালাত আদায়ের জন্য নির্ধারিত কোন জায়গা থাকবে না, তখন যেকোন স্থানে ঈদের ছালাত আদায় করতে পারে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সমগ্র যমীনকে আমাদের জন্য সিজদার স্থান এবং মাটিকে পবিত্র করে দেয়া হয়েছে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/৫২২; মিশকাত, হা/৫২৬; ছহীহ আবুদাঊদ, হা/৪৮৯)।
প্রশ্ন (১৫) : শহরাঞ্চলে অনেক জায়গা ফাঁকা থাকা সত্ত্বেও বড় মসজিদগুলোতে ঈদের ছালাত আদায় করা জায়েয হবে কি?
-আবু সাঈদ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : মুছলস্নীরা মসজিদ ছাড়াই খোলা মাঠে গিয়ে ঈদের ছালাত আদায় করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। কেননা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীর মত স্থানকে ত্যাগ করে তার উপর দিয়ে হেঁটে প্রায় ৫০০ গজ দূরে গিয়ে খোলা ময়দানে ঈদের ছালাত আদায় করতেন (যাদুল মা‘আদ, ১/৪২৫ পৃঃ; ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬; ‘মিম্বার না নিয়ে ঈদের মাঠে গমন’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ নং-৬)। অতএব, বৃষ্টি বা কোন দুর্ঘটনা ছাড়া ঈদের ছালাত মসজিদে আদায় করা যাবে না (যাদুল মা‘আদ, ১/৪২৫ পৃঃ)। মসজিদে ঈদের ছালাত আদায় করার প্রমাণে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে তা যঈফ (যঈফ আবুদাঊদ, হা/১১৬০; মিশকাত, হা/১৪৪৮)।
প্রশ্ন (১৬) : ছিয়াম অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী উভয়ে উভয়ের শরীর স্পর্শ করলে লজ্জাস্থান দিয়ে তরল জাতীয় পদার্থ বের হয়। এতে কি ছিয়াম নষ্ট হবে?
-রাযিয়া ও রাজু
ধুনট, বগুড়া।
উত্তর : এমতাবস্থায় ছিয়াম নষ্ট হবে না। কেননা ছিয়াম অবস্থায় স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে চুমো দেওয়া ও বাহ্যিক মেলামেশা করা জায়েয। তবে বীর্যপাতের আশঙ্ক থাকলে এ ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকা ভালো। সাধারণ মানুষের চেয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অধিক সংযমী ছিলেন এবং মিলন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখতেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ছিয়াম অবস্থায় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুম্বন ও দেহের সাথে দেহ মিলাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের চেয়ে বেশী সংযমশীল ছিলেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯২৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১১০৬; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/২০০০)। অতএব ছিয়াম অবস্থায় আমাদের জন্য এসব কিছু থেকে বিরত থাকা ভালো।
প্রশ্ন (১৭) : ঈদের ছালাত শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর প্রচণ্ড বৃষ্টি আরম্ভ হলে করণীয় কী?
-বদিউয্যামান
সাপাহার, নওগাঁ।
উত্তর : এমতাবস্থায় ছালাত আদায় করবে। তবে দ্রুত আদায় করে নিবে। কেননা যেসব কারণে ছালাত ছেড়ে দেওয়া যায় বৃষ্টি তার অন্তর্ভুক্ত নয়। যেমন সাপ, বিচ্ছু বা বিষাক্ত কোন প্রাণী সামনে আসলে ছালাত ছেড়ে দেয়া যায়। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা কৃষ্ণবর্ণের দু’টি বিষাক্ত প্রাণীকে ছালাতের মধ্যেও মারতে পার। আর তাহল, সাপ ও বিচ্ছু’ (আবুদাঊদ, হা/৯২১; মিশকাত, হা/১০০৪)। তবে বৃষ্টিতে ভিজে কারো রোগ-ব্যাধি বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলে ছালাত ছেড়ে চলে যেতে পারে এবং বাড়ীতে গিয়ে দু’রাক‘আত ঈদের ছালাত আদায় করে নিবে (ছহীহ বুখারী, ১৩/২৫, ‘কারো ঈদের ছালাত ছুটে গেলে সে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে’ অধ্যায়)।
প্রশ্ন (১৮) : অতিবৃষ্টি বা তাপের কারণে ঈদগাহে ত্রিপল বা শামিয়ানা টাঙ্গানো যাবে কি?
-শাহাদাত হোসেন
গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।
উত্তর : রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীর মত বিশাল স্থান থাকা সত্ত্বেও মসজিদের সামনে খোলা মাঠে ঈদের ছালাত আদায় করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬)। বাংলাদেশ অপেক্ষা সঊদী আরবের তাপমাত্রা অধিক থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ছালাত আদায় করেননি। এমনকি ছাহাবী, তাবেঈ ও তাবে-তাবেঈন রোদ-বৃষ্টি হতে রক্ষার জন্য ঈদের মাঠে শামিয়ানা বা কোন ধরনের ছায়ার ব্যবস্থা করেননি। এর পক্ষে কোন প্রমাণও পাওয়া যায় না। অতএব রোদ-বৃষ্টির কারণে ত্রিপাল বা শামিয়ানা ঈদের মাঠে টাঙ্গানো যাবে না। এটি একটি নব আবিষ্কৃত বিষয় বা বিদ‘আত (ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮; তাহক্বীক্ব মিশকাত, হা/১৪০)।
প্রশ্ন (১৯) : ঈদের দিনে পঠিতব্য ছহীহ তাকবীর কোনটি? ‘আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল-হামদুলিল্লাহি কাছীরা ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও ওয়া আছিলা’ তাকবীর পড়া যাবে কি?
-আবু হমাইদ সাঈদী
পার্বতীপুর, দিনাজপুর।
উত্তর : ঈদের দিনে পঠিতব্য ছহীহ দু‘আ যা ছাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ সহ অন্যান্য ছাহাবীগণ পড়তেন তা হল,
أَللهُ أَكْبَرُ أَللهُ أَكْبَرُ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ أَللهُ أَكْبَرُ وَلِلهِ الْحَمْدُ
উচ্চারণ : আল্লা-হু আক্বার আল্লা-হু আক্বার লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াল্লা-হু আক্বার আল্লা-হু আক্বার ওয়া লিল্লাহিল হাম্দ। অর্থ : আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, আল্লাহ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই। আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্র জন্য (দারাকুৎনী হা/১৭৫৬; মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৫৬৯৭, সনদ ছহীহ; ইরওয়াউল গালীল, ৩/১২৫ পৃঃ; যাদুল মা‘আদ, ১/৪৩৩ পৃঃ; মিরআত, ৫/৭০ পৃঃ)। উক্ত দু‘আর সাথে ‘আল্লাহু আকবার কাবীরা, আল-হামদুলিল্লাহি কাছীরা ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও ওয়া আছিলা’ দু‘আটি যুক্ত করে পড়ার কোন ছহীহ সূত্র পাওয়া যায় না।
প্রশ্ন (২০) : ছিয়াম অবস্থায় ওযূ করার কতক্ষণ পর থেকে থুথু গিলে খাওয়া যায়?
-আফীফ
ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।
উত্তর : ওযূর পরে যেকোন সময় মুখের থুথু গিলে খাওয়া যায়। এতে ছিয়াম ভঙ্গ হবে না। কারণ থুথু ভিতরের বস্ত্ত। আর ছিয়াম অবস্থায় বাহির থেকে খাওয়া বা পান করা নিষিদ্ধ। তাছাড়া ছিয়াম ভঙ্গের যে সকল কারণ রয়েছে উহা তার অন্তর্ভুক্ত নয়। ছিয়াম ভঙ্গের উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ হল, ইচ্ছাকৃত খানা-পিনা করা, ইচ্ছাকৃত বমি করা, সূর্যোস্তের পূর্বেই হায়েয-নিফাস আরম্ভ হওয়া, স্ত্রী মিলন করা, হস্তমৈথুন করা ইত্যাদি (ছহীহ মুসলিম, হা/১১২১; ইরওয়া, হা/৯১২)।
প্রশ্ন (২১) : ছিয়াম অবস্থায় কোন রোগীকে রক্ত দেওয়া যাবে কি?
-যুবায়ের রহমান
শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : হ্যাঁ, ছিয়াম অবস্থায় রোগীকে রক্ত দেওয়া যায়। এতে ছিয়াম নষ্ট হবে না। কেননা শরীর থেকে রক্ত বের হওয়া ছিয়াম ভঙ্গের কারণ নয়। ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের ইহরামের অবস্থায় এবং ছিয়াম অবস্থায় শিঙ্গা লাগাতেন (অর্থাৎ শরীরের দূষিত রক্তক্ষরণ বিশেষ উপায়ে করাতেন) (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৩৮; মিশকাত, হা/২০০২)। তবে রক্ত দেওয়ার কারণে কারো যদি এতটুকু দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে যে, সে ছিয়াম পূর্ণ করতে পারবে না তাহলে তার জন্য রক্ত দেওয়া উচিত নয়।
প্রশ্ন (২২) : রামাযানের পূর্ব থেকে অসুস্থ। সুস্থ হয়ে উঠতে প্রায় দুই মাস সময় লাগবে। এমতাবস্থায় ছিয়াম ক্বাযা করে পরবর্তীতে রাখতে পারে কি?
-আবুল বাশার
তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ।
উত্তর : হ্যাঁ পারবে। তবে রামাযান মাসে সক্ষম মুমিন নারী-পুরুষের উপর ছিয়াম পালন করা ফরয। কিন্তু যারা ছিয়াম পালনে সক্ষম নয়, তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ ছাড়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘ছিয়াম নির্দিষ্ট কয়েকদিন (এক মাস) মাত্র। তবে তোমাদের মধ্যে যারা পীড়িত থাকবে বা ভ্রমনে থাকবে, তারা অন্য সময়ে তা এর সমপরিমাণ সংখ্যায় পূর্ণ করবে’ (বাক্বারাহ, ১৮৫)। তবে যারা বৃদ্ধ, ছিয়াম রাখতে সক্ষম নয়, তারা এবং যারা কোন ভাবেই সুস্থতা লাভ করতে পারবে না তারা অন্যকে খাওয়াবে। অথবা অর্ধ ছা‘ খাদ্য ফকীর-মিসকীনকে প্রদান করবে (বাক্বারাহ, ১৮৪; ছহীহ বুখারী, হা/৪৫০৭)।
প্রশ্ন (২৩) : বিড়ি বা সিগারেট খেলে ছিয়াম নষ্ট হবে কি?
-রিমন মন্ডল
গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা।
উত্তর : হ্যাঁ, নষ্ট হবে। কেননা এগুলো মাদকের অন্তর্ভুক্ত এবং হারাম বস্ত্ত। জাবের ইবনু আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مَا أَسْكَرَ كَثِيْرُهُ فَقَلِيْلُهُ حَرَامٌ ‘যার বেশীতে মাদকতা আনে, তার অল্পটাও হারাম’ (আবুদাঊদ, হা/৩৬৮১; তিরমিযী, হা/১৮৬৫; ইবনু মাজাহ, হা/৩৩৯৩; মিশকাত, হা/৩৬৪৫)। এই হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যে বস্ত্ত বেশী খেলে বিবেকের ক্ষতি হয় তার কমও হারাম। এ অবস্থায় বিড়ি, সিগারেট, তামাক, গুল, জর্দা ইত্যাদি যারা খেতে অভ্যস্ত তাদেরকে বেশী পরিমাণ খাওয়ালে বিবেক নষ্ট হবে। অতএব শরী‘আতে এগুলো স্পষ্ট হারাম। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র বস্ত্ত তাদের জন্য হালাল করা হয়েছে এবং অপবিত্র বস্ত্ত হারাম করা হয়েছে’ (আ‘রাফ, ১৫৭)। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ পবিত্র। তিনি পবিত্র বস্ত্ত ভিন্ন কবুল করেন না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১০১৫; মিশকাত, হা/২৭৬০)। অতএব এসব অপবিত্র বস্ত্ত খেলে ছিয়াম ভেঙ্গে যাবে।
প্রশ্ন (২৪) : ছিয়াম অবস্থায় স্বামীকে গালি-গালাজ করলে বা তাকে মিথ্যা অপবাদ দিলে কি ছিয়াম নষ্ট হবে?
-সুলাইমান
ডিমলা, নীলফামারী।
উত্তর : এসব কারণে ছিয়াম ভঙ্গ হবে না। তবে নেকী কম হবে। সুতরাং কোন অবস্থায় স্বামী বা অন্যকে গালি দেওয়া যাবে না। কেননা গালি দেওয়া ফাসেকী। আর ছিয়ামের উদ্দেশ্য হল, তাক্বওয়া অর্জন করা (বাক্বারাহ, ১৮৩)। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও তদানুযায়ী আমল পরিহার করতে পারল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহ্র কোনই প্রয়োজন নেই’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৩; মিশকাত, হা/১৯৯৯)। উক্ত হাদীছ থেকে বুঝা যায় ছিয়াম ভঙ্গ হবে না। তবে নিঃসন্দেহে তার নেকী কমে যাবে।
প্রশ্ন (২৫) : কেউ প্রথম রাতে তারাবীহ পড়ে শেষ রাতে আবার তাহাজ্জুদ পড়তে পারে কি?
-আদনান বিন দেলোয়ার
নওগাঁ সদর, নওগাঁ।
উত্তর : না, পারে না। কেননা রাত্রির বিশেষ নফল ছালাত একটিই যা ‘তারাবীহ’ ও ‘তাহাজ্জুদ’ নামে পরিচিত। রামাযানে এশার পর প্রথম রাতে পড়লে তাকে ‘তারাবীহ’ এবং রামাযানে ও অন্যান্য সময়ে শেষ রাতে পড়লে তাকে ‘তাহাজ্জুদ’ বলা হয় (ফায়যুল বারী, ২/৪২০ পৃঃ)। মূলত ‘তারাবীহ’ ও ‘তাহাজ্জুদ’ একই ছালাত। এ জন্য মুহাদ্দিছগণ একই হাদীছ ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়েও বর্ণনা করেছেন, ‘তারাবীহ’ অধ্যায়েও বর্ণনা করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/২০১৩, ৩৫৬৯, ১১৪৭; ১/২৬৯, ১৫৪, ৫০৪ পৃঃ)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একই রাতে তারাবীহ ও তাহাজ্জুদ পড়েননি। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার ছালাত শেষ করার পর হতে ফজর পর্যন্ত মাত্র ১১ রাক‘আত ছালাত আদায় করতেন’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)। অন্য হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় দিন ২৭-এর রাতে সাহারীর সময় পর্যন্ত তারাবীহর ছালাত দীর্ঘ করেছিলেন, যাতে ছাহাবায়ে কেরাম সাহারী খাওয়া ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। যেমন হাদীছে এসেছে, فَقَامَ بِنَا حَتَّى خَشِيْنَا أَنْ تَفُوْتَنَا الْفَلَاحُ ‘আমাদের নিয়ে তিনি এত দীর্ঘ সময় ধরে ছালাত পড়লেন, যাতে আমরা সাহারী খাওয়া ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলাম’ (আবুদাঊদ, হা/১৩৭৫; তিরমিযী, হা/৮০৬, সনদ ছহীহ; মিশকাত, হা/১২৯৮)। তাহলে এই রাতে তাহাজ্জুদ কখন পড়লেন? সুতরাং উক্ত হাদীছ থেকে স্পষ্ট হল যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এশার ছালাতের পর থেকে ফজর পর্যন্ত ১১ রাক‘আতের বেশী ছালাত কখনো পড়তেন না।
উল্লেখ্য যে, ‘তাহাজ্জুদ’ শব্দটি কুরআনে আছে, হাদীছেও আছে। ‘ক্বিয়াম’ শব্দটি কুরআনে আছে, হাদীছেও আছে। পক্ষান্তরে ‘তারাবীহ’ শব্দটি কুরআনেও নেই এবং হাদীছেও নেই। এটা পরবর্তী বিদ্বানদের পরিভাষা। অতএব যারা বলছে যে, আল্লাহ্র নবী রামাযান মাসে তারাবীহ পড়েছেন তাহাজ্জুদ পড়েননি। তাদের এ কথাটি নিতান্তই ভুল ও কুরআন হাদীছ বিরোধী মন্তব্য। তাছাড়া তারাবীহ বিশ রাক‘আত আর তাহাজ্জুদ আট রাক‘আত মর্মে সমাজে প্রচলিত কথাটি আদৌ ঠিক নয়।
প্রশ্ন (২৬) : মহিলারা ঋতু বন্ধ করে ছিয়াম রাখতে পারে কি?
-আবু বকর ছিদ্দীক
চিচিরবন্দর, দিনাজপুর।
উত্তর : ঋতুবতী হলে ছিয়াম ছেড়ে দিবে এবং তা পরবর্তীতে পূরণ করে নিবে। এটাই আল্লাহ প্রদত্ত বিধান। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহিলাদেরকে ঋতুবতী অবস্থায় ছিয়াম পালন করতে নিষেধ করেছেন। তাবেঈ মু্‘আযা আদভিয়া হতে বর্ণিত, তিনি একবার আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে হায়েযগ্রস্থা মহিলা ছিয়াম ক্বাযা করে আর ছালাত ক্বাযা করে না। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন, যখন আমাদের এমন অবস্থা হত তখন আমাদেরকে ছিয়াম ক্বাযা করতে বলেন এবং ছালাত ছেড়ে দিতে বলেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৫; মিশকাত, হা/২০৩২)। তবে ছিয়ামের ফযীলতের দিকে লক্ষ করে অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে ঋতু বন্ধ করে ছিয়াম পালন করতে পারে (হায়আতু কিবারিল ওলামা, ১/৪৪৭ পৃঃ)।
প্রশ্ন (২৭) : ঢাকা বিমান বন্দরের আকাশে বিমানের উপরে থাকতে দেখলাম সূর্য ডুবেনি। অথচ বিমান বন্দরে নামতেই শুনছি ইফতারির সময় হয়েছে। এক্ষেত্রে করণীয় কী?
-রবিউল ইসলাম
কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ।
উত্তর : এমতাবস্থায় ইফতার করবে। কেননা সূর্য ডোবার ব্যাপারে মানুষ যখন যেখানে থাকবে তখন সেখানকার সময়ই তার জন্য প্রযোজ্য হবে। আব্দুল্লাহ ইবনু আবু আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন এক সফরে আমরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম। আর তিনি ছিলেন ছওমের অবস্থায়। যখন সূর্য ডুবে গেল তখন তিনি দলের কাউকে বললেন, হে অমুক! উঠ। আমাদের জন্য ছাতুগুলো আনো। সে বলল, সন্ধ্যা হলে ভালো হত। তিনি বললেন, নেমে যাও এবং আমাদের জন্য ছাতুগুলো আনো। সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল! সন্ধ্যা হলে ভালো হত। তিনি বললেন, নেমে যাও এবং আমাদের জন্য ছাতুগুলো আনো। সে বলল, দিন তো এখনো রয়ে গেছে। তিনি বললেন, তুমি নামো এবং আমাদের জন্য ছাতুগুলো আনো। অতঃপর সে নামল এবং তাদের জন্য ছাতুগুলো আনল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পান করলেন। অতঃপর বললেন, ‘যখন রাত্রি এইদিক তথা পূর্বদিক হতে আগমন করবে আর দিন এইদিক তথা পশ্চিমদিক হতে প্রস্থান করবে। আর সূর্য অস্ত যাবে, তখনই ছিয়াম পালনকারী ইফতার করবে’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৫৫-৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১১০১)।
প্রশ্ন (২৮) : সূর্য ডোবার সন্দেহ দূর হওয়ার জন্য বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ইফতারীর ক্যালেন্ডারে ২/৩ মিনিট পরে ইফতারী করার সময় নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। এটা কি ঠিক?
-মুনতাসির বিল্লাহ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : সূর্য অস্ত গেছে কি-না তা নিশ্চিত হতে হবে। তবে এর জন্য কিছু সময় দেরি করা জায়েয নয়। কেননা সূর্য ডোবার পরেও সতর্কতামূলক ২/৩ মিনিট দেরী করাই ইয়াহূদী-খ্রীস্টানদের সাদৃশ্য। বরং সূর্যাস্তের সাথে সাথে তাড়াতাড়ি ইফতার করলে অধিক কল্যাণ অর্জিত হবে। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দ্বীন ততদিন বিজয়ী থাকবে, যতদিন লোকেরা ইফতার তাড়াতাড়ি করবে। কারণ ইয়াহূদী-খ্রীস্টানরা ইফতার দেরীতে করে’ (আবুদাউদ, হা/২৩৫৩; মিশকাত, হা/১৯৯৫)।
প্রশ্ন (২৯) :ঈদের ছালাত আদায়ের পূর্বেই ফিতরার জমাকৃত চাউল গরীবদের মাঝে বণ্টন করা যাবে কি?
-রিশাদ আহমাদ
গুরুদাসপুর, নাটোর।
উত্তর :
ছাদাক্বাতুল ফিতর ঈদের পূর্বে জমা করতে হবে এবং ঈদের ছালাতের পরে বণ্টন করতে হবে। এটাই সুন্নাতী তরীকা (বিস্তারিত দ্রঃ ফাৎহুল বারী, হা/১৫১১ ‘যাকাত’ অধ্যায়, ৭৭ অনুচ্ছেদ, ৩/৪৩৯-৪০ পৃঃ)।
ছহীহ বুখারীতে নাফে‘-এর সূত্রে আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে ঈদের ছালাতের পূর্বে ছাদাকাতুল ফিতর আদায় করার কথা এসেছে (বুখারী, হা/১৫১১ ‘যাকাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ৭৭)। কিন্তু পরবর্তী অনুচ্ছেদে নাফে‘ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে ছাদাক্বাতুল ফিতর সংক্রান্ত আরেকটি হাদীছ বর্ণনার পর বলেন, وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ يُعْطِيْهَا الَّذِيْنَ يَقْبِلُوْنَهَا- ‘ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাদাক্বাতুল ফিতর জমাকারীদের নিকট ফিতরা প্রদান করতেন’ (ঐ, হা/১৫১২; ইবনু হাজার আসক্বালানী, ফাৎহুল বারী, ৩/৪৭৯ পৃঃ)। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كَانُوْا يُعْطُوْنَ لِلْجَمْعِ لاَ لِلْفُقَرَاءِ ‘তাঁরা জমা করার জন্য দিতেন, ফকীরদের জন্য নয়’। ছহীহ ইবনু খুযায়মাতে আব্দুল ওয়ারেছের সূত্রে আইয়ূব থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাকে জিজ্ঞেস করা হল ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছাদাক্বাতুল ফিতর কখন প্রদান করতেন? তিনি বললেন, আদায়কারী বসলে। তিনি আবার বললেন, আদায়কারী কখন বসতেন? তিনি বললেন, ঈদের ছালাতের একদিন বা দু’দিন পূর্বে (ফাৎহুল বারী, ৩/৪৮০ পৃঃ)। ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ নাফে‘ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, أَنَّ عَبْدَ اللهِ ابْنِ عُمَرَ كَانَ يَبْعَثُ بِزَكَاةِ الْفِطْرِ إِلَى الَّذِيْ تُجْمَعُ عِنْدَهُ قَبْلَ الْفِطْرِ بِيَوْمَيْنِ أَوْ ثَلاَثَةٍ- ‘আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঈদুল ফিতরের দু’দিন বা তিনদিন পূর্বে যাদের নিকট ছাদাক্বাতুল ফিতর জমা করা হয় তাদের নিকট ফিতরা প্রেরণ করতেন’ (মুওয়াত্ত্বা মালিক, ১/২৮৫ পৃঃ ‘যাকাত’ অধ্যায় ‘যাকাতুল ফিতর প্রেরণ’ অনুচ্ছেদ)। তেমনি আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, وَكَّلَنِيْ رَسُوْلُ اللهِ بِحِفْظِ زَكَاةِ رَمَضَانَ ‘রাসূলুল্লাহ আমাকে রামাযানের যাকাত রক্ষার বা হেফাযতের দায়িত্ব প্রদান করেন’(ফাৎহুল বারী, ৩/৪৮০ পৃঃ)। যা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি জমাকৃত ছাদাক্বাতুল ফিতর পাহারা দিচ্ছিলেন। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে, ঈদের পূর্বে ছাদাক্বাতুল ফিতর জমা করা সুন্নাত। তাছাড়া ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ঈদের ছালাতের পূর্বে ছাদাক্বাতুল ফিতর বের করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা তা ছালাতের পূর্বে বের করতাম এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাত শেষে তা বণ্টন করতেন’ (ইরওয়াউল গালীল, ৩/৩৩২-৩৩ পৃঃ)।
প্রশ্ন (৩০) : রামাযান মাসে ছিয়াম অবস্থায় ইনজেকশন নেয়া যাবে কি?
-আহমাদ যুবাইর
নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : যেসব ইনজেকশন খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় না, সেগুলো ছিয়াম অবস্থায় রোগমুক্তির জন্য গ্রহণ করা যাবে। ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিয়াম অবস্থায় (রোগমুক্তির জন্য) শিঙ্গা লাগাতেন (ছহীহ বুখারী, হা/১৯৩৮; ইরওয়াউল গালীল, হা/৯৩২)। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে ছিয়াম অবস্থায় শিঙ্গা লাগাতে নিষেধ করতেন। কিন্তু পরে আবার অনুমতি প্রদান করেছেন (দারাকুৎনী, হা/৭; বায়হাক্বী-সুনানুল কুবরা, হা/৮০৮৬, সনদ ছহীহ)। তবে যেসব ইনজেকশন খাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় বা শরীরে শক্তি জোগায় তা গ্রহণ করলে ছিয়াম নষ্ট হয়ে যাবে।
প্রশ্ন (৩১) : ঈদগাহ দূরে হওয়ায় এবং সেখানে মহিলাদের ছালাতের কোন সুব্যবস্থা না থাকায় মহিলাদেরকে গ্রামের মসজিদে পুরুষ ইমাম দ্বারা ছালাত পড়ানো যাবে কি?
-আল-আমিন
কাকনহাট, রাজশাহী।
উত্তর : না, মহিলাদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামের মসজিদে পুরুষ ইমাম দ্বারা ছালাত পড়ানো যাবে না। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রামে পুরুষ ইমাম দ্বারা ছালাত পড়ানোর যে প্রথা শুরু হয়েছে তা বিদ‘আত। প্রতি ঈদগাহে যরূরী ভিত্তিতে মেয়েদের ছালাতের ব্যবস্থা করতে হবে। ঈদগাহ দূরে হলেও মেয়েদেরকে সেখানে গিয়েই ঈদের ছালাত আদায় করতে হবে। যদি কারণবশতঃ কোন পরিবারের লোকজন ঈদগাহে যেতে না পারেন তাহলে একজন পুরুষ ইমামের ইমামতিতে বাড়ীতেই দুই রাক‘আত ছালাত আদায় করে নিবে। যেমন, আনাস বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু তার দাস ইবনু আবী উতবাকে আদেশ করেছিলেন (ছহীহ বুখারী, ‘কারো ঈদের ছালাত ছুটে গেলে সে দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করবে, অনুরূপ মহিলারাও এবং যারা বাড়িতে কিংবা গ্রামে থাকে’ অনুচ্ছেদ-২৫; ‘ঈদায়েন’ অধ্যায়-১৩)।
প্রশ্ন (৩২) : মহিলা ইমামের পিছনে মহিলারা ঈদের ছালাত আদায় করতে পারবে কি?
-আকীমুল ইসলাম
জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।
উত্তর : না, মহিলার ইমামতিতে ঈদ ও জুম‘আর ছালাত আদায় করা ঠিক নয়। কারণ ঈদের ছালাতে খুৎবা আছে। আর মহিলাদের জন্য খুৎবা দেয়া জায়েয নয়। কারণ শরী‘আতে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে কেউ এমন কোন আমল করল, যার ব্যাপারে আমাদের কোন নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)।
প্রশ্ন (৩৩) : ঈদের দিন ফজরের পূর্বে ঈদগাহে উপস্থিত হয়ে জামা‘আতবদ্ধভাবে ফজরের ছালাত আদায় করা যাবে কি?
-বদীউয্যামান
সাপাহার, নওগাঁ।
উত্তর : না, এ ধরনের আমলের কোন প্রমাণ নেই। বরং তা বিদ‘আত ও প্রত্যাখ্যাত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে কেউ এমন কোন আমল করল, যার ব্যাপারে আমাদের কোন নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’ (ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮)। বরং মসজিদে জামা‘আতের সাথে ফজরের ছালাত আদায় করে বাড়ীতে ফিরে বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেয়ে ঈদের মাঠে গিয়ে ঈদের ছালাত আদায় করবে।
প্রশ্ন (৩৪) : ঈদের ছালাতের ফযীলত কী?
-নাঈম ইসলাম
দারুশা, পবা, রাজশাহী।
উত্তর : ঈদের ছালাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের ছালাতে সকলকে উপস্থিত হওয়ার জন্য তাকীদ দিয়েছেন। এমনকি ঋতুবতী মহিলাদেরও ঈদের ছালাতের জন্য বের হতে বলা হয়েছে। পরনের চাদর না থাকলে অন্যের কাছ থেকে ধার করে হলেও যাওয়ার কথা বলা হয়েছে (ছহীহ বুখারী, হা/৯৭৪; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯০)। আর মহান আল্লাহ ও তার রাসূলের নির্দেশ বাস্তবায়নের ফযীলত অপরিসীম। তবে নির্দিষ্টভাবে ঈদের ছালাতের ফযীলত সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না।
প্রশ্ন (৩৫) : ঈদের ছালাতের পূর্বে কোন বক্তব্য দেয়া যাবে কি?
-আকীমুল ইসলাম
জোতপাড়া, ঠাকুরগাঁও।
উত্তর : না, ঈদের ছালাতের পূর্বে কোন বক্তব্য দেয়া যাবে না। বরং প্রথমে ছালাত আদায় করতে হবে। অতঃপর খুৎবা দিতে হবে। আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে ঈদগাহের দিকে বের হতেন এবং সেখানে প্রথমে যা করতেন তা হল ছালাত। অতঃপর ফিরে জনতার দিকে মুখ করে দাঁড়াতেন আর জনতা তখন নিজেদের কাতারে বসা থাকত। তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন, নছীহত করতেন এবং নির্দেশ দিতেন। আর যদি কোথাও সৈন্য প্রেরণের ইচ্ছা করতেন তাদেরকে বাছাই করতেন অথবা যদি কাউকে কোন নির্দেশ দেওয়ার থাকত, নির্দেশ দিতেন। অতঃপর বাড়ী ফিরতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৯৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/৮৯৪; মিশকাত, হা/১৪২৬)। উল্লেখ্য যে, ঈদের ছালাতের পূর্বে খুৎবা দেওয়ার প্রচলন শুরু করেন মারওয়ান ইবনু হাকাম (ছহীহ মুসলিম, হা/৪৯)। অথচ প্রখ্যাত ছাহাবী আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু তার সেই কাজের প্রতিবাদ করেছিলেন (ছহীহ মুসলিম, হা/৯৫৬)। সুতরাং খুৎবার পূর্বেই ঈদায়নের ছালাত আদায় করতে হবে।
প্রশ্ন (৩৬) : ঈদের ছালাতে তাকবীর কম বেশি হলে করণীয় কী?
-হাশমত বিন আব্দুল মুমিন
চারঘাট, রাজশাহী।
উত্তর : ঈদের ছালাতে তাকবীর দেয়া সুন্নাত। তাই ভুলবশত তাকবীরে কম-বেশি হয়ে গেলে কোন সমস্যা নেই। এর জন্য কোন সাহু সিজদা দেওয়া লাগবে না এবং নতুন করে পুনরায় ছালাতও আদায় করতে হবে না।
প্রশ্ন (৩৭) : মোবাইলে সূর্যাস্তের সময় দেখে ইফতার করা যাবে কি?
-বদীউয্যামান
সাপাহার, নওগাঁ।
উত্তর : মোবাইলের সফটওয়্যারের টাইম যদি নির্ভরযোগ্য হয় এবং জাতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের সময়ের সাথে মিল থাকে, তাহলে তা দেখে ইফতার করা যায়।
প্রশ্ন (৩৮) : পাশাপাশি দু’টি দেশের একটির বিভিন্ন মসজিদে মাইকে ঘোষণা দেয়া হচ্ছে যে, শাওয়ালের চাঁদ দেখা গিয়েছে। আর তার পাশের দেশের বর্ডার এলাকার লোকজন শুনতে পাচ্ছে। কিন্তু সে দেশের বেতারে চাঁদ দেখার ঘোষণা দেয়া হয়নি। এ অবস্থায় করণীয় কী?
-আবু হুমাঈদ সাঈদী
পার্বতীপুর, দিনাজপুর।
উত্তর : রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘চাঁদ দেখে ছিয়াম রাখ এবং চাঁদ দেখে ছিয়াম শেষ কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/১৯০৯)। তাই ছিয়াম শুরু কিংবা শেষ করার জন্য চাঁদ দেখা শর্ত। চাঁদ যেহেতু সারাবিশ্বে একই সাথে উদিত হয় না, বরং উদয়াস্থলের ভিন্নতার দরুন একেক দেশে একেক সময় উদিত হয়। তাই যদি কোন মুসলিম দেশে চাঁদ উঠার ঘোষণা না দেয়া হয়, তাহলে সে দেশের জনগণ ছিয়াম রাখবে না। বরং দেশের সকল মানুষ যেদিন ছিয়াম রাখবে বা ঈদ করবে, সেদিন সকলের সাথে ছিয়াম কিংবা ঈদ পালন করবে। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ঈদুল ফিতর হল সেই দিন, যে দিন লোকেরা ছিয়াম শেষ করে। ঈদুল আযহা হল সেই দিন, যেই দিন লোকেরা কুরবানী করে’ (তিরমিযী, হা/৮০২, সনদ ছহীহ)। তিরমিযীর অপর বর্ণনায় আছে, ছিয়াম হল সেই দিন, যে দিন তোমরা ছিয়াম রাখ। (তিরমিযী, হা/৬৯৭, সনদ ছহীহ)। ইমাম তিরমিযী বলেন, কোন কোন আহলে ইলম এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, ছিয়াম এবং ঈদ সকল মানুষের সাথে জামা‘আতের সাথে সকল মানুষকে নিয়ে হবে’ (তিরমিযী, হা/৬৯৭, সনদ ছহীহ)।
প্রশ্ন (৩৯) : ছিয়াম অবস্থায় তরকারির স্বাদ কীভাবে ও কতটুকু নেয়া যেতে পারে?
-শাহাদাত হোসেন
গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা।
উত্তর : ছিয়াম অবস্থায় তরকারির স্বাদ চাখার সময় যাতে কণ্ঠনালী পর্যন্ত তা না পৌঁছে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। তাহলে ছিয়াম নষ্ট হবে না। ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ঝোল বা কোন বস্ত্তর স্বাদ চাখার সময় কণ্ঠনালী পর্যন্ত না পৌঁছলে কোন ক্ষতি নেই (ইরওয়াউল গালীল, ৪/৮৬ পৃঃ)। অন্যত্র তিনি বলেন, বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ঝোল বা কোন বস্ত্তর স্বাদ চেখে দেখলে ছিয়াম নষ্ট হবে না (মুছান্নাফ ইবনু আবী শায়বা, হা/৯৩৬৯; ইরওয়াউল গালীল, হা/৯৩৭, ৪/৮৫ পৃঃ)।
প্রশ্ন (৪০) : তারাবীহর ছালাত ৮ রাক‘আত। কিন্তু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বিশ রাক‘আত তারাবীহ চালু করেছিলেন এবং মক্কা ও মদীনায় বিশ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হয়। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানাবেন।
-নাজমুন্নাহার
রশিদপুর, কুমিল্লা।
উত্তর : রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে কখনো বিশ রাক‘আত তারাবীহ পড়েননি এবং কাউকে পড়ার নির্দেশও দেননি। অনুরূপ ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও বিশ রাক‘আত তারাবীহ পড়েননি এবং কাউকে পড়ার নির্দেশও দেননি বরং ১১ রাক‘আত পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন (মুওয়াত্ত্বা মালেক; মিশকাত, হা/১৩০২)। ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর যামানায় ২০ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হ’ত বলে যে বর্ণনা এসেছে, তা নিতান্তই ‘যঈফ’ এবং ২০ রাক‘আত তারাবীহ সম্পর্কে ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে ‘মারফূ’ সূত্রে যে বর্ণনা এসেছে তা মওযূ বা জাল (আলবানী, হাশিয়া মিশকাত, হা/১৩০২, ১/৪০৮ পৃঃ; ইরওয়া, ২/১৯৩ পৃঃ, হা/৪৪৬ ও ৪৪৫-এর ব্যাখ্যা দ্রঃ)। এতদ্ব্যতীত ২০ রাক‘আত তারাবীহ সম্পর্কে আরো যে সমস্ত বর্ণনা এসেছে, তার সবগুলিই জাল কিংবা যঈফ (মির‘আত, ২/২২৯, ২৩৩ পৃঃ, হা/১৩০৮ ও ১২)। উল্লেখ্য যে, সঊদী আরবের প্রায় সব মসজিদেই ১১ রাক‘আত তারাবীহ পড়া হয়। মক্কা ও মদীনায় ২ ইমামের মাধ্যমে ২০ রাক‘আত পড়ানো হয়। এটা সরকারী ব্যাপার হতে পারে। মক্কা ও মদীনার আমল কোন শারঈ বিধান নয়।
প্রশ্ন (৪১) : এশার ছালাতের ওয়াক্ত হলেই অনেক মসজিদে তারাবীহর ছালাত শুরু করতে দেখা যায়। এভাবে তারাবীহ পড়া যাবে কি?
-আবুল বাশার
তাড়াশ, সিরাজগঞ্জ।
উত্তর : রাতের ছালাত বা তাহাজ্জুদ ছালাতের সময় শুরু হয় এশার ছালাতের পরেই। অতএব কোন মসজিদে এশার ছালাত আদায় হয়ে গেলে রাতের ছালাত তথা তাহাজ্জুদ বা তারাবীহর ছালাত শুরু করতে পারে। তাতে কোন বাধা-নিষেধ নেই। কেননা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তিন দিন জামা‘আতে তারাবীহর ছালাত আদায় করেছিলেন, তার শুরুটা ছিল এশার ছালাতের পর থেকে (মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৩৫০, ৬/২৬৭ পৃঃ, সনদ ছহীহ)।
প্রশ্ন (৪২) : ইফতারের কিছুক্ষণ পূর্বে একজন ছিয়াম পালনকারী বিমানে ঢাকা থেকে সৌদির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলে পথিমধ্যে কীভাবে ইফতারী করবে?
-যুবায়ের রহমান
শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : এমতাবস্থায় পাইলট বা কেবিন ক্রু-র মাধ্যমে সূর্য ডোবার সময় অবগত হয়ে ইফতার করবে। কেননা সূর্য ডোবার সাথে সাথে ছিয়ামপালনকারীকে ইফতার করতে হয়। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘দ্বীন ততদিন বিজয়ী থাকবে, যতদিন লোকেরা ইফতার তাড়াতাড়ি করবে। কারণ ইহুদী-খ্রীস্টানরা ইফতার দেরীতে করে’ (আবুদাউদ, হা/২৩৫৩; মিশকাত, হা/১৯৯৫)।
প্রশ্ন (৪৩) : ছিয়াম রাখলে বাচ্চার দুধের ঘাটতি পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মহিলা কি ছিয়াম না রেখে ফিদইয়া দিতে পারে?
-আফিফ
ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট।
উত্তর : এমতাবস্থায় ফিদইয়া দিতে হবে না। বরং ছিয়ামের ক্বাযা আদায় করবে। ফিদইয়া শুধু তাদের জন্য যারা সুস্থতা লাভের আশা করে না এবং যারা অতি বৃদ্ধ ছিয়াম পালন করতে সক্ষম নয়। গর্ভবতী ও দুগ্ধপানকারীনীগণ পরবর্তীতে ছিয়ামের কাযা আদায় করবে। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা মুসাফিরকে ছিয়াম পালনের ব্যাপারে ছাড় দিয়েছেন এবং ছালাত অর্ধেক করে দিয়েছেন। আর গর্ভবতী ও বাচ্চাকে দুধ পানকারীনী মহিলাকে ছিয়াম পালন করার ব্যাপারে ছাড় দিয়েছেন (নাসাঈ, হা/২২৭৪, ২২৭৫)।
প্রশ্ন (৪৪) : পরীক্ষার কারণে উক্ত দিনে ছিয়াম না রেখে তার ক্বাযা আদায় করা যাবে কি?
-রিমন মণ্ডল
গাইবান্ধা সদর, গাইবান্ধা।
উত্তর : এমতাবস্থায় ছিয়াম ভঙ্গ করতে পারবে না। বরং কেউ যদি এরূপ করে তাহলে সে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে এবং সেই ছিয়ামের বিনিময়ে একটি ক্বাযা ছিয়াম পালন করবে।
প্রশ্ন (৪৫) : কুরআন পড়তে পারে না এমন ব্যক্তি রামাযান মাসে রেকর্ডকৃত তেলাওয়াত শুনলে নেকী পাবে কি?
-সুলাইমান
ডিমলা, নীলফামারী।
উত্তর : হ্যাঁ, তেলাওয়াত শ্রবণকারীও নেকী পাবে। মহান আল্লাহ বলেন, وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوْا لَهُ وَأَنْصِتُوْا لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ অর্থাৎ ‘যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগের সাথে তা শ্রবণ করবে এবং নীরব, নিশ্চুপ হয়ে থাকবে, হয়তো তোমাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ করা হবে (আ‘রাফ, ২০৪)। অত্র আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যারা কুরআন তেলাওয়াত শুনবে তারাও নেকী পাবে এবং তাদের প্রতি দয়া করা হবে। কেননা মহান আল্লাহ চুপ থেকে মনোযোগ সহকারে কুরআন তেলাওয়াত শোনার আদেশ করছেন।
প্রশ্ন (৪৬) : নিফাসের সময় শেষ হয়নি। এমতাবস্থায় কোন মহিলা ছিয়াম পালন করতে পারে কি?
-আদনান বিন দেলোয়ার
নওগাঁ সদর, নওগাঁ।
উত্তর : নিফাসের অবস্থায় কোন মহিলা ছিয়াম পালন করতে পারে না। কেননা নিফাসও হায়েয। আর হায়েয অবস্থায় ছিয়াম রাখা নিষেধ। নিফাসের কোন সর্বনিম্ন সময়সীমা নেই। সুতরাং নিফাস যখনই ভালো হবে তখনই গোসল করে পাক-পবিত্র হয়ে ছালাত আদায় করবে এবং ছিয়াম পালন করবে। আর নিফাসের সর্বোচ্চ সময়সীমা হল চলিস্নশ দিন (তিরমিযী, হা/১৩৯)।
প্রশ্ন (৪৭) : ফিতরার চাল বিক্রয় করে তার অর্থ হক্বদারদের মাঝে বন্টন করা ও টাকা দিয়ে ফিতরা দেওয়া যাবে কি?
-আহমাদ যুবাইর বিন ইজাবুল হক্ব
নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।
উত্তর : যাদের নিকট ফিতরা জমা করা হয় তারা যদি সমাজ বা গ্রামের দায়িত্বশীল হন তাহলে দায়িত্বের ভিত্তিতে ফিতরা বিক্রয় করে মূল্য বিতরণ করতে পারে। এছাড়া যারা ফিতরার হক্বদার তারাও ফিতরা নেওয়ার পরে বিক্রয় করতে পারে। কিন্তু আদায়কারী কোন অবস্থাতেই ফিতরার মূল্য আদায় করতে পারেন না। তাকে খাদ্যদ্রব্যই আদায় করতে হবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মুদ্রার প্রচলন ছিল। তবুও তিনি ফিতরা হিসাবে মুদ্রা প্রদানের কথা বলেননি বরং খাদ্যশস্যের কথা বলেছেন। আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ঈদুল ফিতরের পূর্বে এক সা‘ খাদ্য ফিতরা দিতাম। তখন আমাদের খাদ্য ছিল ঘি, কিশমিশ, পনীর ও খেজুর (ছহীহ বুখারী, হা/২০৪ পৃঃ)। সুতরাং খাদ্যশস্য দ্বারাই ফিতরা আদায় করতে হবে।
প্রশ্ন (৪৮) :ইফতারির পূর্ব মূহুর্তে জামা‘আতবদ্ধভাবে হাত তুলে দু‘আ করা যায় কি?
-মুহাম্মাদ আফজাল
চিরির বন্দর, দিনাজপুর।
উত্তর : ইফতারের পূর্বে সম্মিলিতভাবে হাত তুলে দু‘আ করার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং তা বিদ‘আত। নির্দিষ্টভাবে ইফতারের সময় দু‘আ কবুল হয় মর্মে যে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে তা যঈফ (যঈফ ইবনু মাজাহ, হা/১৭৫৩; মিশকাত, হা/২২৪৯)। তাছাড়া ইফতারির সময় দু‘আ কবুল হয় মনে করে খাছভাবে দু‘আ করলে রামাযানের রহমতকে খাটো করা হয়। তবে ছিয়াম পালনকারীর দু‘আ কবুল করা হয় মর্মে বর্ণিত হাদীছটি ছহীহ (ছহীহ ইবনু মাজাহ, হা/১৭৫২)। সুতরাং কেবলমাত্র ইফতারের সময়ই নয়, বরং ছিয়াম অবস্থায় যে কোন সময় দু‘আ করার বিষয়টিই প্রমাণিত হয়।
প্রশ্ন (৪৯) : ছহীহ হাদীছ থেকে বুঝা যায় যে, ‘লাইলাতুল ক্বদর’ এক রাত্রিতেই সংঘঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু দেখা যায় যে, পশ্চিমের দেশগুলোতে আগে ও পূর্বের দেশগুলোতে পরে এমনভাবে চাঁদ উঠে যে, তাতে উভয় অঞ্চলে রামাযানের মাঝে দু-একদিন আগে-পিছে থাকে। এমতাবস্থায় উভয় অঞ্চলে একই রাত্রিতে কীভাবে লাইলাতুল ক্বদর পাওয়া সম্ভব?
-মুহাম্মাদ আফজাল
চিরির বন্দর, দিনাজপুর।
উত্তর : ক্বদরের রাত্রিটি পৃথিবীর যখন যে স্থান দিয়ে চলে তখন সেখানেই ‘লাইলাতুল ক্বদর’ ঘটে। এটিকে নিজের হিসাবে রাখা ঠিক নয়। কেননা মানুষের দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির যেমন সীমা রয়েছে তেমনি মানুষের চিন্তাশক্তির সীমা রয়েছে। আর গায়েবের এই বিষয়গুলো মানুষের চিন্তাশক্তির বাইরে। এটি মহান আল্লাহ তা‘আলা নিজেই পরিচালনা করেন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল ক্বদর রামাযানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রিগুলোতে অন্বেষণ করতে বলেছেন। তাছাড়া কোন তারিখে লাইলাতুল ক্বদর হবে সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দিষ্ট করে কিছু বলে যাননি। বরং তিনি একাধিক হাদীছে বলেছেন, ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকের প্রত্যেক বেজোড় রাত্রিতে ক্বদর রাত্রি তালাশ কর’ (ছহীহ বুখারী, হা/২০১৭; মিশকাত, হা/২০৮৩)। সুতরাং এই শেষ দশকে অন্বেষণ করলেই আশা করা যায় লাইলাতুল ক্বদর পেয়ে যাবে। আর মহান আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
প্রশ্ন (৫০) : নির্ধারিতভাবে ২৭ শে রামাযানের রাত্রিতে লাইলাতুল ক্বদর উদযাপন করা যাবে কি?
উত্তর : প্রথমত, আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্যের মাধ্যমে এবং খানা-পিনার মাধ্যমে লাইলাতুল ক্বদর উদযাপন করা যাবে না। দ্বিতীয়ত, ২৭শে রামাযানের রাত্রিকে নির্ধারণ করে ইবাদত করা যাবে না। কেননা রামাযানের শেষের দশকের ব্যাপারে যেমন হাদীছ এসেছে তেমনি শেষ পাঁচ বিজোড় রাতের ব্যাপারেও হাদীছ এসেছে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদীছে বলেছেন,اِلْتَمِسُوْهَا فِى الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ فِىْ كُلِّ وِتْرٍ ‘তোমরা রামাযানের শেষ দশকের প্রত্যেক বেজোড় রাত্রিতে ক্বদর রাত্রি তালাশ কর’ (তিরমিযী, হা/৭৯২, সনদ ছহীহ)। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ছাহাবায়ে কেরাম কোনো রাতকে নির্ধারণ করে লাইলাতুল ক্বদর উদযাপন করেননি। বরং লাইলাতুল ক্বদরকে খাছ করে ইবাদত করা আল্লাহর রহমতকে খাটো করার শামিল। উল্লেখ্য, মুসলিমে বর্ণিত যে হাদীছে ২৭ রামাযানের কথা এসেছে, তা একজন ছাহাবীর দাবী ও বিশেস্নষণ (ছহীহ মুসলিম, হা/৭২৬, ১১৬৯; মিশকাত, হা/২০৮৮)। তাই রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে বর্ণিত একাধিক স্পষ্ট হাদীছের প্রতি আমল করা কর্তব্য, যেগুলোতে কেবল বেজোড় রাত্রির কথা এসেছে।
