اَلْحَمْدُ لِلهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
মদীনায় বসে স্বপ্নে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক প্রাপ্ত নির্দেশনা (!) অনুযায়ী ১৯২১ সালে ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের ‘মেওয়াত’ এলাকায় ‘ফিরোযপুর নিমক’ গ্রামে তাবলীগ জামা‘আতের সূচনা হয় দিল্লির মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াস ইবনে মুহাম্মাদ ইসমাঈল কান্ধালভী (১৮৮৫-১৯৪৪ খৃ.)-এর হাতে। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠাতাপুত্র ইউসুফ কান্দালভী (১৯১৭-১৯৬৫ খৃ.), প্রতিষ্ঠাতার জামাই ‘তাবলীগী নেছাব’ কিতাবের লেখক মাওলানা যাকারিয়া (১৮৯৮-১৯৮২ খৃ.)-এর জামাই মাওলানা ইন‘আমুল হাসান কান্ধালভী (১৯১৮-১৯৯৫ খৃ.) দায়িত্ব পালন করেন। বংশপরম্পরায় বিভিন্ন ব্যক্তির নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় বর্তমান আমীরের দায়িত্বে আছেন মাওলানা সা‘দ। দিল্লির নিযামুদ্দীনে অবস্থিত বেঙ্গলওয়ালি মসজিদ এর মারকায বা মূল কেন্দ্র। ঢাকার কাকরাইল ও লাহোরের রাইবেন্ডের মারকায হলো এর প্রধান দু’টি শাখা। বাগেরহাট যেলার মাওলানা আব্দুল আযীমের মাধ্যমে বাংলাদেশে এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৪৪ সালে। আর এদেশে কাকরাইল মসজিদে তাবলীগ জামা‘আতের বার্ষিক ইজতেমার সূচনা হয় ১৯৪৬ সালে। এরপর ১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের হাজী ক্যাম্পে, ১৯৫৮ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে, ১৯৬৬ সালে টঙ্গীর পাগাড় গ্রামে তাদের বার্ষিক ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৬৭ সাল থেকে অদ্যাবধি তুরাগ নদীর তীরে ‘বিশ্ব ইজতেমা’ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। স্বপ্নে প্রাপ্ত (!) সংগঠনটি প্রায় শত বছর ধরে তাদের কার্যক্রম চালাতে থাকলেও এতদিন নিজেদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোন দ্বন্দ্ব প্রকাশ পায়নি। কিন্তু সম্প্রতি দিল্লি ও লাহোরের নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্বের জের ধরে বিভক্ত হয়ে পড়ে সংগঠনটি, যার ঢেউ অন্য অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। জানা যায়, তাবলীগের বর্তমান আমীর মাওলানা সা‘দ কান্ধালভী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দ্বন্দ্বের সূচনা হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বরে লাহোরের রাইবেন্ডে ইজতেমা চলার সময় সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৩ সদস্যের একটি ‘শূরা’ বোর্ড গঠনের প্রস্তাব আসে। সা‘দ ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এতদসত্ত্বেও ইজতেমা শেষে রাইবেন্ড থেকে শূরা বোর্ড গঠনের একটি চিঠি বিভিন্ন দেশে তাবলীগের দায়িত্বশীলদের কাছে পাঠানো হয়। এরপর এক পক্ষ সা‘দের সিদ্ধান্তের পক্ষে এবং আরেক পক্ষ শূরা গঠনের পক্ষে অবস্থান নেয়। মূলতঃ উভয় পক্ষ এখন হার্ডলাইনে অবস্থান করছে। সা‘দ বিরোধীরা বলছে, মাওলানা সা‘দ তাবলীগের ‘আকাবির’দের মূলনীতি বিরোধী মন্তব্য করেছেন। ফলে, তওবা না করা পর্যন্ত সা‘দপন্থীদের সাথে বিয়ে বন্ধনও জায়েয নেই। সা‘দকে হত্যা করতে হবে। সা‘দপন্থীরা বলছে, তিনি বিশ্ব আমীর, তার আনুগত্য ফরয। যে তার আনুগত্য থেকে বের হয়ে যাবে, তাকে হত্যা করতে হবে। তাবলীগের এই দ্বন্দ্ব প্রথম প্রকাশ্য রূপ নেয় ও মারামারিতে পরিণত হয় ২০১৬ সালের ১৯ জুন দিলিস্নতে সংগঠনটির মূল কেন্দ্রে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এই বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নেয় যুক্তরাজ্যেও। মাওলানা সা‘দকে নিয়ে বাংলাদেশে বিভেদ প্রকাশ্যভাবে দেখা দেয় জানুয়ারি ২০১৮-এর বিশ্ব ইজতেমা থেকে। ১৪ নভেম্বর ২০১৮ মঙ্গলবার দুপুরে ঐ সংঘর্ষ রূপ নেয় ভাঙচুরে। ১ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে তাবলীগ জামা‘আতের দুই পক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষে একজন নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হয়। দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের কারণে বিমানবন্দর সড়ক এবং আশপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হলে সাধারণ জনগণ চরম ভোগান্তিতে পড়েন। দ্বন্দ্ব আর বিভক্তি কোন সময় ভাল ফল বয়ে আনে না। তবে, এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে ‘সংশোধন ও সংস্কার’-এর একটা দাবী অনেকের মুখে শোনা যাচ্ছে, যে দাবী সালাফী আলেমগণ তাবলীগ জামা‘আতের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই করে আসছেন।
আমরা মনে করি, সাধারণ তাবলীগীদের মধ্যে খালেছ নিয়তের ঘাটতি নেই। তবে, সমস্যা এই জামা‘আতের জন্ম, আক্বীদা-আমল ও মানহাজে। ভাল উদ্দেশ্য থাকা সত্ত্বেও তাদের আক্বীদা, আমল ও মানহাজে এমন কিছু সমস্যা রয়ে গেছে, যেগুলো কুরআন, হাদীছ ও সালাফে ছালেহীনের মূলনীতি পরিপন্থী। তাদের কিছু ভাল দিক থাকলেও শিরক-বিদ‘আত মিশ্রিত আক্বীদা ও আমলের বিপরীতে সেগুলো ম্রিয়মাণ। যেমন- (১) এর প্রতিষ্ঠাই স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশনা এবং কথিত ‘ইলহাম’ ও ‘কাশফ’-এর মাধ্যমে। (২) এর প্রতিষ্ঠাতা, আমীর ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গ আশ‘আরী ও মাতুরীদী আক্বীদায় বিশ্বাসী। আর মানহাজ ও মাসলাকের দিক দিয়ে তারা ছিলেন ছূফী। (৩) তাবলীগ জামা‘আত ইমাম আবু হানীফার আক্বীদা তথা আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের আক্বীদা ধারণ করে না। তাদের মূল কিতাব ‘তাবলীগী নিছাব’ ছূফীদের বিভিন্ন থিউরী, উদ্ভট কল্পকাহিনী, স্বপ্নের নানা কেচ্ছা-কাহিনী, দুর্বল ও জাল হাদীছে ভরপুর। তাতে আছে শিরক-বিদ‘আতের বহু দৃষ্টান্ত। (৪) তারা মানুষ সৃষ্টির মৌলিক উদ্দেশ্য এবং নবী-রাসূলগণের দা‘ওয়াতের প্রথম বিষয় ‘তাওহীদে উলূহিয়্যাহ’-এর ব্যাপারে মুখই খুলে না। বরং এর অপব্যাখ্যা করে ‘তাওহীদে রুবূবিয়্যাহ’ বানিয়ে ফেলে। (৫) তারা নেককার মানুষ এবং তাদের বড় বড় ব্যক্তিদের ব্যাপারে ভক্তির নামে অতিভক্তি দেখায় এবং চরম বাড়াবাড়ি করে। অথচ খোদ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিজের ব্যাপারেও বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন (বুখারী, হা/৩৪৪৫)। (৬) তারা কবরকেন্দ্রিক বহু ভ্রান্ত আক্বীদা ও আমলে বিশ্বাসী, যেগুলো সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থী। (৭) তারা দ্বীনী ইলম চর্চার প্রতি মোটেও গুরুত্বারোপ করে না। বরং অজ্ঞতাপূর্ণ তাবলীগী কার্যক্রম নিয়েই তারা ব্যস্ত। (৮) তাদের তাবলীগে বের হওয়ার ‘বিশেষ পদ্ধতি’কে তারা ইবাদত মনে করে এবং এর পক্ষে কুরআন থেকে দলীল গ্রহণের দুঃসাহস দেখায়। (৯) ফেতনা ও বিভক্তি হতে পারে এই ধারণায় শুধুমাত্র সৎকাজের আদেশ দেয়; কিন্তু অসৎকাজ থেকে বাধা প্রদানের নীতি তারা গ্রহণ করে না। (১০) তাবলীগে বের হওয়াকে জিহাদ, দ্বীনী ইলম অর্জন ইত্যাদি অনেক ইবাদত থেকে উত্তম গণ্য করে। এমনকি জিহাদ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীছকে শুধুমাত্র এখানেই সেট করে। (১১) তাদের কেউ কেউ স্ত্রী-কন্যা-পরিবারের খোঁজ-খবর নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম উদাসীনতা প্রকাশ করে।
সংক্ষিপ্তাকারে তাদের কিছু ত্রুটি উল্লেখ করে আমরা কাউকে খুশী করতে বা কাউকে আঘাত করতে চাইনি। চাইনি বিভক্তি ও ফেতনা সৃষ্টি করতে। তাদেরকে বয়কট করা এবং তাদের কাছ থেকে মানুষকে সরিয়ে দেওয়াও আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং তারা যেন তাদের আক্বীদা, মানহাজ বিশুদ্ধ করে নেয় এবং ভুলত্রুটিগুলো শুধরিয়ে নেয়- এটাই আমাদের লক্ষ্য; যাতে তাদের দা‘ওয়াতী প্রচেষ্টা কুরআন-হাদীছ অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে- (১) সালাফে ছালেহীনের বুঝ অনুযায়ী পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহভিত্তিক জ্ঞানার্জন এবং অজ্ঞতাপূর্ণ প্রচলিত তাবলীগী কার্যক্রম সংশোধন করতঃ উদ্ভূত সংকট নিরসন করতে হবে, বিভক্তির অবসান ঘটাতে হবে। (২) সালাফে ছালেহীনের মানহাজ অনুযায়ী পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অধ্যয়নে মনোনিবেশ করতে হবে এবং তদনুযায়ী আমল করতে হবে। (৩) তাওহীদ ও শিরক এবং সুন্নাত ও বিদ‘আত সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা অর্জন করতে হবে। (৪) শিরক-বিদ‘আত ও উদ্ভট কাহিনীপূর্ণ ‘তাবলীগী নিছাব’ বইটিকে সরিয়ে সেখানে আক্বীদা ও সমাজ সংস্কারের উপযোগী উপকারী বই সংযোজন করতে হবে। পবিত্র কুরআনের বঙ্গানুবাদ, তাফসীর এবং বঙ্গানুবাদ হাদীছ পঠনপাঠনের সুযোগ করে দিতে হবে। ‘তাবলীগী নিছাব’-এর জায়গায় ইমাম নববী প্রণীত ‘রিয়াযুছ ছালেহীন’ বইটি সংযোজন করা যেতে পারে।
মহান আল্লাহ গোটা মুসলিম উম্মাহকে বিশুদ্ধ আক্বীদা-আমল ও মানহাজের দিকে দা‘ওয়াত দানের, এর উপর ঐক্য প্রতিষ্ঠার এবং নিজেদের এর উপর আমরণ টিকে থাকার তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!
