اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ড ছাড়া যেমন একজন মানুষ সুস্থ-সবল ও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, ঠিক তেমনি শিক্ষা ছাড়া জাতিও সুঠাম হয়ে দাঁড়াতে পারে না। কিন্তু সব শিক্ষাই কি ‘শিক্ষা’ এবং সব শিক্ষাই কি জাতির মেরুদণ্ড? শিক্ষাকে (১) সুশিক্ষা বা উপকারী শিক্ষা এবং (২) কুশিক্ষা বা অপকারী ও ক্ষতিকর শিক্ষা- এই দুইভাগে ভাগ করা যায়। রাসূল (ছাঃ)-এর বাণী থেকে শিক্ষার এই শ্রেণীবিন্যাস প্রতিভাত হয়। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এমন শিক্ষা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি, যা উপকার করতে পারে না’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৭২২)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর কাছে উপকারী শিক্ষা চাও এবং অপকারী শিক্ষা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা কর’ (ইবনে মাজাহ, হা/৩৮৪৩, ‘হাসান’)। সুশিক্ষা বা উপকারী শিক্ষাকে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়: (ক) শারঈ জ্ঞান ও (খ) দুনিয়াবী জ্ঞান। ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞানই হচ্ছে শারঈ জ্ঞান। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছে জ্ঞানার্জনের ফযীলত-মর্যাদা ও এর প্রতি উৎসাহ ব্যঞ্জক যত বক্তব্য এসেছে, সবগুলোই শারঈ জ্ঞানকে ঘিরে। তবে, চিকিৎসা, কৃষি, ব্যবসা ইত্যাদি দুনিয়াবী উপকারী জ্ঞানার্জনের প্রতি ইসলাম কখনই নিরুৎসাহিত করে না; বরং উৎসাহিত করে। রাসূল (ছাঃ) এরশাদ করেন, ‘যা তোমার ফায়দা দিবে, তার প্রতি তুমি যত্নবান হও’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৪)। শিক্ষার নামে কুশিক্ষাকে ইসলাম কোনক্রমেই সমর্থন করে না। ইসলামী নির্দেশনা পরিপন্থী শিক্ষাই হচ্ছে কুশিক্ষা। যে শিক্ষা আল্লাহর আনুগত্যের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে বা আল্লাহর অবাধ্যতাকে সুশোভিত করে বা শরী‘আত নির্দেশিত মন্দকে ভালোয় আর ভালোকে মন্দে পরিণত করে বা কুরআন-সুন্নাহ্র বক্তব্য দ্বারা প্রমাণিত বিষয়ে সন্দেহের ধূম্রজাল সৃষ্টি করে বা মুমিনদের পথের পরিপন্থী হয়, তা-ই কুশিক্ষা। অশিক্ষা জাতিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে রাখে বটে, তবে তাতে হয়তো কুশিক্ষার ক্ষতির মত ক্ষতির আশঙ্কা থাকে না। কুশিক্ষার বিস্তার জাতির ভাগ্যাকাশে সর্বনাশী প্রলয় ডেকে আনে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির শিক্ষাব্যবস্থায় ঈমান, আক্বীদা, চরিত্র গঠন, আমল সংশোধন এবং মৃত্যু, কবর, পরকাল, জান্নাত, জাহান্নাম সম্পর্কে সতর্ক করার কোন সিলেবাস নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত মোট সাত বার জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে। কিন্তু কোন শিক্ষানীতিতেই দেশের মানুষের চাহিদার প্রতিফলন ঘটেনি। এসব শিক্ষানীতিতে সুশিক্ষার চেয়ে কুশিক্ষার প্রভাবই বেশী। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় যতটুকু ধর্মের কথা আছে, তাও ভেজালে ভরা। কুরআন ও ছহীহ হাদীছ নিংড়ানো বিশুদ্ধ ঈমান, আক্বীদা ও আমলের কথা সেখানে স্থান পায়নি। বরং আক্বীদা শিক্ষার নামে অনেক ক্ষেত্রে আশ‘আরী-মাতুরীদী আক্বীদা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে, শিক্ষিতের হার যতই বাড়ছে, দেশ-জাতি ততই দুর্নীতি, অবনতি ও অবক্ষয়ের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। আমাদের দেশে সব ধরনের অপরাধের সাথে আজ শিক্ষিত লোকেরাই বেশী জড়িত। সূদ-ঘুষ, যেনা-ব্যভিচার, যৌন কেলেংকারী, ইভটিজিং, পরকীয় প্রেম, পর্ণোগ্রাফী, নারী পাচার, শিশু পাচার, কিডন্যাফ, মওজূদদারী, চোরাচালানী, কালোবাজারী, টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজী, মুনাফাখোরী, জালিয়াতী, স্বজনপ্রীতি, শেয়ার বাজার কেলেংকারী, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, পণ্যদ্রব্যে ভেজাল মিশ্রণ, পরিমাপে কারসাজি, ট্যাক্স ফাঁকি, মাদক ব্যবসা, হারাম পানীয় উৎপাদন ও বিপণন, দলীয় কারণে বা টাকার বিনিময়ে অযোগ্য লোককে নিয়োগদান, ফাইল আটকিয়ে চাঁদাবাজী, তথ্যসন্ত্রাস, অর্থ আত্মসাৎ, পরীক্ষায় অসদুপায়, প্রশ্নপত্র ফাঁস ইত্যাদি অপরাধ কর্মের সিংহভাগ শিক্ষিত লোকদের দ্বারাই সংঘটিত হয়ে থাকে। এদিকে ২০০১-২০০৫ সাল পর্যন্ত পরপর পাঁচবার বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে বাংলাদেশের শীর্ষস্থান দখলের গর্ব তো আমাদের রয়েছেই! আর এসবই ঘটছে কুশিক্ষার কারণে; ইসলামী নির্দেশনা, আদর্শ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষার অভাবে।
ধর্মীয় মূল্যবোধ বিবর্জিত নৈতিকতাহীন শিক্ষা ব্যবস্থা জাতিকে কস্মিনকালেও শান্তির মুখ দেখাতে পারে না। পক্ষান্তরে, ঈমানী চেতনা ও পরকালীন জবাবদিহিতার ভয় সম্বলিত শিক্ষাই কেবল মানুষকে অপরাধমুক্ত রাখতে পারে- ঠিক যেমনটি অপরাধমুক্ত করেছিল রাসূল (ছাঃ) পূর্ববর্তী জাহিলী সমাজকে। অতএব, দেশের জনগণের ধর্মীয় মূল্যবোধ, বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদা, চিন্তা-চেতনা, চাহিদা, আশা-আকাঙক্ষা, কৃষ্টি-সভ্যতা ইত্যাদির প্রতি বিশেষ লক্ষ্য রেখে যুগোপযোগী আধুনিক ও বিজ্ঞান ভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আমরা সরকারের প্রতি উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন- আমীন!
