اَلْحَمْدُ لِلهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
যখন এই সম্পাদকীয় লিখতে বসেছি, তখন ঘূর্ণিঝড় ‘ফণি’ প্রায় বিদায়ের পথে, যা বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন উপকূলনীয় অঞ্চলে আঘাত হানে এবং এর মাধ্যমে জান-মালের বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়। গ্রীষ্ম-বর্ষায় আমাদের দেশে এ ধরনের ঝড়ঝঞ্ঝা, বন্যা অপরিচিত নয়। মূলত ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে, ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস সম্বলিত আবহাওয়ার একটি নিমণচাপ প্রক্রিয়া, যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এজাতীয় ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে একে ঘূর্ণিঝড় বলে। ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানলে যদিও দুর্যোগের সৃষ্টি হয়, কিন্তু এটি আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। পৃথিবীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০ টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে, তা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতি সাধন করে। বাতাসের তীব্রতা এবং ধ্বংসক্ষমতা অনুযায়ী বাংলাদেশ ও ভারতে ঘূর্ণিঝড়কে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়: (১) ঘূর্ণিঝড়ের ফলে সৃষ্ট বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২-৮৮ কি.মি. হলে তাকে ঘূর্ণিঝড় বা ট্রপিক্যাল সাইক্লোন বলে। (২) গতিবেগ ৮৯-১১৭ কি.মি. হলে তাকে তীব্র ঘূর্ণিঝড় বা ‘সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বলে। (৩) বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৮-২১৯ কি.মি. হলে হ্যারিকেন গতিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় বা ‘ভেরি সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম’ বলে। (৪) আর গতিবেগ ২২০ কি.মি. বা তার বেশি হলে তাকে ‘সুপার সাইক্লোন’ বলে।
বাংলাদেশের সরকারী হিসাব অনুযায়ী, ১৯৬০-২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩টি বড় ঘূর্ণিঝড়ের ঘটনা ঘটে। ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু হয় ২০০৪ বা ২০০৭ সাল থেকে, তার আগে এর নামকরণ হত না। এসব ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ১৯৬০, ১৯৬৩ ও ১৯৬৫ সালের ঘূর্ণিঝড়, ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন, ১৯৮৮ সালের ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়, ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৮ সালের নার্গিস ও রেশমি, ২০০৯ সালের আইলা, ২০১৩ সালের মহাসেন, ২০১৭ সালের মোরা এবং সর্বশেষ ২০১৯ ফণি অন্যতম। এগুলোর মধ্যে ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় ছিল সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, যাতে যথাক্রমে ৫ লাখ ও ১ লাখ ৩৮ হাযার মানুষ মারা যায়। এর বহু আগে ১৮৭৬ সালে গ্রেট বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) সাইক্লোনের কথা না বললেই নয়, যাতে ২ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
কিন্তু এসব ঝড়-তুফান, প্রবল বায়ুর মালিক কে? কে এগুলোকে প্রবাহিত ও নিয়ন্ত্রণ করেন? তিনি আর কেউ নন, তিনি হচ্ছেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহ। এগুলো তার নিদর্শন ও সৈন্য। এরশাদ হচ্ছে, ‘...আর বায়ুরাশির প্রবাহের মধ্যে এবং আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী মেঘের মধ্যে জ্ঞানী লোকদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে (আল-বাক্বারাহ, ২/১৬৪)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘আসমান ও যমীনের যাবতীয় বাহিনী আল্লাহ্র কর্তৃত্বের অধীন’ (আল-ফাত্হ, ৪৮/৭)। স্বাভাবিক বায়ুর যেমন নানা উপকারিতা রয়েছে, তেমনি ঝড়ঝঞ্ঝার রয়েছে ব্যাপক ধ্বংসক্ষমতা। স্বাভাবিক ও হালকা গতিসম্পন্ন বায়ু দিয়ে আল্লাহ পৃথিবীবাসীর অনেক উপকার সাধন করেন। এর মাধ্যমে তিনি মেঘ সৃষ্টি করে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং মৃত যমীনকে পুনর্জীবন দান করেন (আল-আ‘রাফ, ৭/৫৭; আস-সাজদাহ, ৩২/২৭; আর-রূম, ৩০/৪৮-৫০)। এর দ্বারা ফুল-ফল, শস্য-ফসল ও যাবতীয় উদ্ভিদের বায়ুবাহিত পরাগায়ন সম্পন্ন হয় (আল-হিজর, ১৫/২২)। ফলে, ফুল-ফল, শস্য-ফসল ভালো হয় এবং উদ্ভিদের বংশ বিস্তার লাভ করে। এই বায়ু জলযানকে বিভিন্ন গন্তব্যে সহজে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে (আশ-শূরা, ৪২/৩২-৩৩; আর-রূম, ৩০/৪৬)। এর দ্বারা মানবহৃদয় প্রশান্তি পায় (আল-ফুরক্বান, ২৫/৪৮; আন-নামল, ২৭/৬৩)। এককথায় বায়ু প্রবাহিত না হলে যমীন ও যমীনবাসী মারা যেত। পক্ষান্তরে, ঝড়ঝঞ্ঝা দিয়ে আল্লাহ একদিকে যেমন কখনও কখনও তার অলী-আউলিয়াকে সম্মানিত করেন, তেমনি যালেমদের সাবধান ও ধ্বংস করেন। মহান আল্লাহ এর দ্বারা সুলায়মান আলাইহিস সালাম (আল-আম্বিয়া, ২১/৮১; সাবা, ৩৪/১২), হূদ আলাইহিস সালাম (ফুছছিলাত, ৪১/১৬) ও মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (আল-আহযান, ৩৩/৯; বুখারী, হা/১০৩৫; মুসলিম, হা/৯০০) কে সম্মানিত ও সাহায্য করেন। আবার ঝঞ্ঝাবায়ু দিয়ে আল্লাহ আদ জাতি (আল-হাক্কাহ, ৬৯/৬-৭; বুখারী, হা/ঐ; মুসলিম, হা/ঐ) সহ অনেককে সমূলে ধ্বংস করে দেন। এর দ্বারা আল্লাহ কাফের ও বেঈমানদের ভয় দেখিয়ে থাকেন (আল-মুলক, ৬৭/১৬-১৮), যার মোকাবিলা করার সাধ্য কারো নেই। সেজন্য প্রবল বাতাস হলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব চিন্তিত ও বিচলিত হয়ে পড়তেন, এমনকি তার চেহারা পরিবর্তন হয়ে যেত এবং আল্লাহ্র কাছে এর কল্যাণ প্রার্থনা করতেন ও অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইতেন (মুসলিম, হা/৮৯৯)। পাশাপাশি তিনি একে গালি ও অভিশাপ দিতে নিষেধ করতেন, কারণ তা আল্লাহ্র নির্দেশেই প্রবাহিত হয় (তিরমিযী, হা/২২৫২ ও ১৯৭৮; ইবনু মাজাহ, হা/৩৭২৭, ছহীহ)।
এসব ইলাহী গযবের মৌলিক কারণ হচ্ছে, বনু আদমের পাপ ও সীমালঙ্ঘন (আর-রূম, ৩০/৪১; আশ-শূরা, ৪২/৩০; ইবনু মাজাহ, হা/৪০১৯, হাসান)। অতএব, মহান আল্লাহ আমাদেরকে তার যাবতীয় আদেশ-নিষেধ মেনে ও সকল পাপ বর্জন করে তার কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করার এবং ঝড়-তুফানের সময় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশিত করণীয় ও বর্জনীয় মেনে চলার তাওফীক্ব দান করুন। সাথে সাথে ঝড়ঝঞ্ঝা, বন্যা, ভূমিকম্প সহ তার অন্যান্য সব গযব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমীন!
