اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
সাগর যেমন একটি দেশের জন্য মহান আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত, তেমনি অনেক বড় চ্যালেঞ্জও। মাহানের (Mahan's Theory) তত্ত্ব অনুযায়ী একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়ন অনেকাংশেই তার সমুদ্রশক্তির ওপর নির্ভর করে। আর এই কথার বাস্তব জ্বলন্ত প্রমাণ আমাদের চোখের সামনেই আছে। শুধু সমুদ্রবন্দরের সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুবাই ও সিঙ্গাপুর আজ বিশ্বের ব্যবসায়িক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্তান, নেপাল ও ভুটানের মতো দেশগুলো শুধু সমুদ্র না থাকার কারণে অন্য দেশের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল। বাংলাদেশের জন্যও বঙ্গোপসাগর মহান আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত। তবে এটি চ্যালেঞ্জও। কেননা বাংলাদেশ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। আর বর্তমানে আমেরিকা ও চীনের স্নায়ুযুদ্ধ এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করেই চলমান।
ইন্দো-প্যাসিফিক (Indo-Pacific) হলো একটি ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত ধারণা, যা ভারত মহাসাগর (Indian Ocean) এবং প্রশান্ত মহাসাগর (Pacific Ocean) কেন্দ্রিক একটি সংযুক্ত কৌশলগত অঞ্চল। এই অঞ্চলের মধ্যেই মালাক্কা প্রণালি অবস্থিত। এই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হচ্ছে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
এই অঞ্চলের প্রায় সব দেশই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী ও উন্নয়নশীল। আর এই অঞ্চলেই পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি জনগণ বসবাস করে, যাদের অধিকাংশই তরুণ। থুসিডাইডিস থিউরি অনুযায়ী রাইজিং পাওয়ার (Rising Power) ও ডিক্লাইনিং পাওয়ার (Declining Power)-এর মধ্যে সংঘাত অবশ্যম্ভাবী। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় যে শক্তির উত্থান ঘটছে, তার নাম চীন। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজের শক্তি ক্ষয় করা সুপার পাওয়ার আমেরিকা। চীনের এই উত্থান আমেরিকার জন্য হুমকি। তাই আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য থেকে তার অধিকাংশ মিশন গুটিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মনোনিবেশ করছে। আমেরিকা আফগানিস্তান ও সিরিয়া থেকে ইতোমধ্যেই সেনা প্রত্যাহার করেছে। এখন তার মনোযোগ শুধু রাশিয়া ও চীনের দিকে। ন্যাটোর মাধ্যমে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়াকে ব্যস্ত রাখা হয়েছে। এখন বাকি আছে শুধু চীন। সেই লক্ষ্যে এই অঞ্চলের সকল দেশের সঙ্গে আমেরিকা সুসম্পর্ক গড়ে তুলছে। আর এমনিতেই এই অঞ্চলের অসংখ্য দ্বীপ নিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক দুর্বল রয়েছে। যেমন তাইওয়ানের সঙ্গে যেকোনো সময় যুদ্ধ লেগে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। ফলে আমেরিকা চারদিক থেকে এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি বাড়াতে পারলে চীনকে চাপে রাখতে পারবে। প্রয়োজনে মালাক্কা প্রণালিও বন্ধ করে দিতে পারবে। আর এখানেই চলে আসে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রয়োজন।
মালাক্কা প্রণালি বন্ধ হলে চীন যেন তার সকল ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারে, সেই উদ্দেশ্য নিয়ে চীনের অন্যতম একটি প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)। অতীতের সিল্ক রুটের ঐতিহ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে চীন এই প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে ইতোমধ্যে পাকিস্তানের গওয়াদার বন্দরে সিপেক (CPEC) প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যেখান থেকে সরাসরি আরব সাগর হয়ে পণ্য চীনে যাবে। তেমনি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর ও মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ (Kyaukphyu) বন্দরে চীনের বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। মিয়ানমারের এই বন্দরটি বাংলাদেশ থেকে মাত্র ২৫০ কিলোমিটার দূরে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে চীন বাংলাদেশকে যে ইকোনমিক করিডোরের প্রস্তাব দিয়েছে, তা চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমার হয়ে কুনমিং পর্যন্ত যাবে। এই করিডোরে সংযুক্ত হওয়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে মাত্র ২৫০ কিলোমিটার দূরের কিয়াউকফিউ বন্দর পর্যন্ত যুক্ত হলেই হবে। এই প্রকল্প সফল হলে বাংলাদেশের ভারতনির্ভরতা অনেক কমবে। পাশাপাশি ভারত মহাসাগরে চীনের উপস্থিতিও বাড়বে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ আমেরিকার সঙ্গে যে বাণিজ্যচুক্তি করেছে, সেখানে পরিপূর্ণরূপে আমেরিকার স্বার্থ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। যদিও আমেরিকার সঙ্গে এই চুক্তিটি ছিল রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ থেকে বাঁচার জন্য। আমেরিকা পাল্টা ৩৭% শুল্ক আরোপ করেছিল। চূড়ান্ত চুক্তির পর সেটি ১৯%-এ নেমে এসেছে। বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য এটি অনিবার্য ছিল। কেননা আমাদের রপ্তানি খাতের ৮৬ শতাংশই পোশাক রপ্তানি। আর এই পোশাকের বড় অংশই রপ্তানি হয় আমেরিকায়। প্রতিবছর প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমেরিকায় রপ্তানি হয়।
তবে পোশাক খাত বাঁচাতে গিয়ে এই চুক্তিতে এমন অনেক বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য হুমকিস্বরূপ। যেমন, পারমাণবিক ক্ষেত্রে এবং সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য হুমকি—এমন কোনো দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারবে না। আর আমেরিকার নিরাপত্তার হুমকির তালিকায় চীন ও রাশিয়া স্বাভাবিকভাবেই চলে আসে।
এই যে বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব, এর বলি হচ্ছে রোহিঙ্গা সংকট ও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম। একদিকে জান্তা সরকার ও বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর গৃহযুদ্ধে রক্তাক্ত মিয়ানমার। তন্মধ্যে আরাকান আর্মি, আরএসও (RSO) ইত্যাদি সশস্ত্র গোষ্ঠীর বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে যাতায়াত রয়েছে। পাশাপাশি কুকি-চিন ও ইউপিডিএফের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রায় ১১টি নৃগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের অধিকাংশই অতি দ্রুততার সঙ্গে খ্রিষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে এবং হচ্ছে। ভারতের কিছু রাজ্য ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলাগুলো মিলিয়ে একটি খ্রিষ্টান রাষ্ট্র তৈরির পরিকল্পনার কথাও অনেক আলোচিত ও সমালোচিত। ফলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগ বহুমুখী সংঘাতের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হচ্ছে। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী, জান্তা সরকার, বিতাড়িত রোহিঙ্গা, পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইন্দো-প্যাসিফিককে কেন্দ্র করে চীন ও আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধ—সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব উভয়ই হুমকির মুখে।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত বিভিন্ন ইসলামী ফাউন্ডেশন ও সংস্থাগুলোকে ব্যাপকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে দাওয়াতী কাজ ও সেবামূলক কাজ করার সুযোগ দেওয়া। দাওয়াতের মাধ্যমে, সেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অবশ্যই তাদের মুসলিম বানানো সম্ভব। তারা যদি নিজেদের ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান হতে পারে, তাহলে ইনশা-আল্লাহ মুসলিমও হতে পারবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের ইসলামের সঙ্গে ব্যাপকভাবে পরিচিত করা ছাড়া বাংলাদেশের অখণ্ডতা ধরে রাখার আর দ্বিতীয় কোনো কার্যকর রাস্তা নেই।
পাশাপাশি রাখাইন রাজ্যে মুসলিম অধ্যুষিত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য যেকোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হবে। তাহলে বাংলাদেশের সীমান্তসংলগ্ন রাখাইনেও মুসলিম-প্রধান অঞ্চল থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি অনেকাংশে কমে যাবে, ইনশা-আল্লাহ। Top of Form(প্র. স.)
