আজ সমগ্র বাংলাদেশ দুঃখভারাক্রান্ত। সকলের মনে এক ধরনের অদৃশ্য আতঙ্ক ও ভয় বিরাজ করছে। গত ১২ ডিসেম্বর আততায়ীর হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে গত ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন জুলাই বীর বিপ্লবী উসমান হাদি। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পর নিকট অতীতে আর কোনো রাজনৈতিক নেতার মৃত্যুতে দেশের মানুষকে এভাবে শোকাহত ও কান্নারত দেখা যায়নি। অথচ শরিফ উসমান হাদি বাংলাদেশে চলমান কোনো বড় রাজনৈতিক দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতা ছিলেন না, জুলাই আন্দোলনেরও কোনো পরিচিত সমন্বয়ক ছিলেন না। তাহলে কেন তাকে টার্গেট করা হলো? তিনি কার বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছেন? উসমান হাদির জীবন-মৃত্যুর শঙ্কা কেন সমগ্র বাংলাদেশের জনগণকে ঝাঁকুনি দিয়ে গেল? সবার মনে তিনি কীভাবে এমন জায়গা করে নিলেন?
উসমান হাদির সব বক্তব্য, কার্যক্রম ও চিন্তা-চেতনা বিশ্লেষণ করলে এসব প্রশ্নের উত্তর খুব সহজে পাওয়া যায়। সাধারণত মানুষ নির্দিষ্ট কোনো দল, মত কিংবা সংগঠনের প্রতি বায়াসড হয়ে থাকে। প্রত্যেক মানুষেরই কোনো না কোনো পিছুটান থাকে, অন্তরে শক্তিশালীদের প্রতি এক ধরনের ভয় কাজ করে। এসব কারণে অধিকাংশ মানুষ চাইলেও শতভাগ সত্য কথা বলতে পারেন না।
উসমান হাদি বাংলাদেশের ইতিহাসে সেই ব্যতিক্রমী যুবক, যিনি সব ধরনের পিছুটান, ভয়-ভীতি ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এবং সব দলের নিজস্ব স্বার্থের বাইরে দাঁড়িয়ে নির্দলীয় জায়গা থেকে সত্য কথাই বলে গেছেন। হয়তো আরও অনেকেই তার মতো সাহসী ও সত্যবাদী হতে পারেন; কিন্তু তার মতো পাণ্ডিত্য, পড়ালেখায় গভীর জ্ঞান এবং শক্তিশালী উপস্থিত বিতর্ক করার মতো মানুষ খুব কমই দেখা যায়। অন্তত বর্তমান বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় তরুণ সমাজের মধ্যে মেধা, উপস্থিত বুদ্ধি, বিতর্ক দক্ষতা, সততা ও সাহস— এ সবকিছুর সম্মিলনে তিনি সবার থেকে আলাদা। পাশাপাশি তার ছিল শাহাদাতের তামান্না, ছিল পূর্ণাঙ্গ বিপ্লবের অদম্য বাসনা।
আমরা সবাই জানি, জুলাই বিপ্লব কোনো সুসংহত আদর্শিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে সংঘটিত হয়নি। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই জুলাইয়ের ঘটনাবলি আবর্তিত হয়। আর যার কোনো সুস্পষ্ট আদর্শ থাকে না, তার কোনো স্থায়িত্বও থাকে না।
ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তি মনে করেছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে মানুষ আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে, পুরোনো ধাঁচের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি ফিরে আসবে, নির্বাচন হবে, আসন ভাগাভাগি হবে, সবাই লিয়াজোঁ করে নিজের আখের গুছাবে এবং পুনরায় তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রভাব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। বাস্তবেও তাই হচ্ছিল। ভারতের চাহিদামতো আবারও মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার নামের বিভেদের রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশে। এ অবস্থায় একমাত্র উসমান হাদিই ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি জুলাই বিপ্লবের একটি আদর্শিক ভিত্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করছিলেন। ‘ইনকিলাব মঞ্চ’, ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে তিনি স্বাধীন মুসলিম বাংলার রাজনীতির একটি আদর্শিক ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। আর এ কারণেই তিনি ভারতীয় আধিপত্যের চক্ষুশূলে পরিণত হন।
বড় কোনো দল নেই, বড় কোনো সংগঠন নেই, হাজার হাজার নেতাকর্মীও নেই; তবু তাকেই টার্গেট করা হয়েছে। হত্যাকারীরা তিন মাস ধরে তাকে অনুসরণ করেছে। চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে চলন্ত রিকশায় থাকা উসমান হাদিকে নিখুঁত নিশানায় গুলি করা হয়েছে, যা উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ ছাড়া সম্ভব নয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের এত গোয়েন্দা সংস্থা, এত বাহিনী থাকতেও এখন পর্যন্ত হত্যাকারীদের গ্রেফতার করা যায়নি। ঢাকার মতো জনবহুল শহর থেকে পালিয়ে সীমান্তে পৌঁছে যাওয়া— এটাও বিদেশি সংশ্লিষ্টতার শক্ত প্রমাণ বহন করে।
উসমান হাদিকে হামলার আগেই হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। হাদি থানায় জিডিও করেছিলেন, ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমেও জানিয়েছিলেন। তারপরও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা এবং হত্যার পর আসামি গ্রেফতারে গড়িমসি— এসবই প্রমাণ করে, সরকারের ভেতরে এখনও বিদেশি তাবেদারদের অনুগত কৃতদাসদের অস্তিত্ব রয়েছে।
উসমান হাদি তার প্রতিটি বক্তব্যে শহীদী মৃত্যুর জন্য তার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। তিনি শুধু চেয়েছেন তার মৃত্যু হলে যেন হত্যাকারীর বিচার হয়। কেননা বিচার না হলে আর উসমান হাদি জন্মাবে না। তিনি আরো বলেছেন, এই ধরনের ঘটনায় শুধু হত্যাকারীরা হত্যার জন্য দায়ী নয়, বরং যারা সাংস্কৃতিকভাবে এই হত্যাকে জায়েয করে তুলেছেন তারাও সমান দায়ী। তার ভাষায় কালচারাল ফ্যাসিস্ট যারা শাহবাগে বসে অসংখ্য খুন, গুম ও বিচারিক হত্যাকে জায়েয করে তুলেছিল। উসমান হাদির হত্যার বিচার তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন কালচারাল ফ্যাসিস্টদেরও বিচার হবে। এদিকে প্রকৃত হত্যাকারী যেভাবে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে তাতে বাংলাদেশের মাটি ভারতের জন্য আইনের জবাবদিহিতার বাইরে গিয়ে খুনের উন্মুক্ত মঞ্চে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। তাই সরকারের উচিত অনতিবিলম্বে ভারত থেকে খুনিকে ফেরত নিয়ে আসা। অন্যথায় ভারতের সাথে করা বাংলাদেশের সকল অন্যায্য চুক্তিকে বাতিল করতে হবে।
পাশাপাশি আমাদের এই ঘটনাটি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভারতীয় আধিপত্যবাদ কখনোই বাংলাদেশে স্বাধীনচেতা, আদর্শিক রাজনৈতিক ধারা চায় না। তারা চায় স্বার্থপর, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ। তারা চায় মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার— এই বিভক্তির রাজনীতি। আওয়ামী লীগ না থাকলেও, এখানে টিকে থাকুক ভারতীয় বয়ান— এটিই তাদের মূল লক্ষ্য। আর এই কারণেই সামনে আরো গুপ্তহত্যা হতে পারে। স্বাধীনচেতা জুলাই বিপ্লবীরা টার্গেটে আছেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের গণতান্ত্রিক সিস্টেমও এমনভাবে সাজানো আছে যে, এই ব্যবস্থার ভেতর দিয়ে শতভাগ সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ, আদর্শিক মানুষের উঠে আসা অত্যন্ত কঠিন।
এ জন্যই বাংলাদেশের স্বার্থে, এই বাংলার মুসলিমদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কল্যাণে একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শিক বিপ্লবের বিকল্প নেই। আর সেই বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন উসমান হাদির মতো কয়েক হাজার শিক্ষিত, মেধাবী, সাহসী, সৎ ও যোগ্য তরুণ, যারা বিভিন্ন সেক্টরে নিজ নিজ যোগ্যতায় নেতৃত্বের আসনে থাকবে। সেই সাথে প্রয়োজন ঈমান বিল গায়েবের উপর অটল ইয়াক্বীন এবং সৎ আমলের মাধ্যমে মহান আল্লাহর আসমানী মদদ। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায়, ইন-শা-আল্লাহ!
