উপস্থাপনা :
সাম্য, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব রক্ষার লক্ষ্যে ইসলাম প্রতিবেশীর সাথে এমন আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে, যাতে এক প্রতিবেশী আরেক প্রতিবেশীর সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহারের কারণে গোটা সমাজ একটি ভ্রাতৃপ্রতিম ও শান্তিপূর্ণ আদর্শ সমাজে পরিণত হবে। এভাবে রাষ্ট্র পর্যন্ত হয়ে যাবে দৃষ্টান্তমূলক রাষ্ট্র। শুধু প্রতিবেশীর মধ্যে শান্তি-সম্প্রীতি কায়েমের কারণে পৃথিবীর মানুষ নিরাপদে তাদের সকল কর্মকাণ্ড চালাতে পারবে। তাই মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে প্রতিবেশীর সাথে উত্তম আচরণ করার কথা ঘোষণা করে বলেন,
وَاعْبُدُوا اللهَ وَلَا تُشْرِكُوْا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِيْنِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ.
‘তোমরা আল্লাহ্র ইবাদত করো আর তার সাথে কাউকে শরীক কর না। আর পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকটাত্মীয় প্রতিবেশীর ও প্রতিবেশীর সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর’ (নিসা, ৩৬)।
প্রতিবেশী চাই নিকটবর্তী হোক অথবা দূরবর্তী হোক অথবা অনাত্মীয় মুসলিম হোক অথবা অমুসলিম, যে কোন অবস্থায় সাধ্যানুযায়ী তাদের সাহায্য-সহায়তা করা ও তাদের খবরাখবর নেয়া কর্তব্য। অবশ্য প্রতিবেশী হওয়া ছাড়াও যার অন্যান্য হক্ব রয়েছে, তাকে অন্যান্য প্রতিবেশীর তুলনায় মর্যাদাগত অগ্রাধিকার দিতে হবে।
প্রতিবেশীর হক্বের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ ও নছীহত :
প্রতিবেশীর সাথে কীরূপ ব্যবহার করতে হবে এবং প্রতিবশেীর হক্বের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
عَنْ أَبِى ذَرٍّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ أَوْصَانِيْ خَلِيْلِيْ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِثَلَاثٍ أسمَعُ وأُطِيع وَلَوْ لِعَبْدٍ مجدَّع الْأَطْرَافِ وَإِذَا صنعتَ مَرقةً فَأَكْثِرْ ماءَهَا ثُمَّ انْظُرْ أَهْلَ بَيْتٍ مِنْ جِيْرَانِكَ فأصِبْهم مِنْهُ بِمَعْرُوْفٍ وفي رواية بلفظ يَا أَبَا ذَرٍّ إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً فَأَكْثِرْ مَاءَ المرقةِ وَتَعَاهَدْ جِيْرَانَكَ أَوِ اقْسِمْ فِيْ جِيْرَانِكَ.
আবু যার রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তিনটি উপদেশ দিয়েছেন, ‘নেতা নাক-কান কাটা দাস হলেও তার আদেশ শুনবে ও মানবে। তরকারী রান্না করলে তাতে পানি দিয়ে ঝোল বেশী করবে। অতঃপর প্রতিবেশীর দিকে দেখবে এবং সদিচ্ছার সাথে তা পৌছে দিবে’। অন্য বর্ণনায় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হে আবু যার! তুমি তরকারী রান্না করলে তাতে পানি দিয়ে ঝোল বেশি করবে এবং প্রতিবেশীর মাঝে তা বিতরণ করবে’।[1]
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا زَالَ جِبْرِيْلُ يُوصِيْنِىْ بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ.
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জিবরীল আলাইহিস সালাম আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে এতো বেশী নছীহত করতে থাকেন যে, আমি ধারণা করলাম তিনি হয়তো প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ বানিয়ে দিবেন’।[2]
عَنْ أَبِىْ شُرَيْحٍ الْخُزَاعِىِّ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلْيُحْسِنْ إِلَى جَارِهِ.
আবু শুরাইহ আল-খুযায়ী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন প্রতিবেশীর প্রতি সদয় আচরণ করে’।[3]
عَنْ عَمْرِو بْنِ مُعَاذٍ الْأَشْهَلِيِّ عَنْ جَدَّتِهِ أَنَّهَا قَالَتْ قَالَ لِيْ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا نِسَاءَ الْمُؤْمِنَاتِ لَا تَحْقِرَنَّ امْرَأَةٌ مِنْكُنَّ لِجَارَتِهَا ولو كراع شاة محرق.
আমর ইবনু মু‘আয আশহালী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে তার দাদীর সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, ‘হে মুমিন নারীগণ! তোমাদের মধ্যেকার কোন নারী যেন তার প্রতিবেশীকে যৎসামান্য দান করাকেও তুচ্ছ মনে না করে, যদিও তা রান্না করা বকরীর বাহুর সামান্য গোশতও হয়’।[4]
উপর্যুক্ত হাদীছগুলো প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে এবং প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেশীর সীমা :
কে আমাদের প্রতিবেশী? প্রতিবেশীর সীমা কতদূর? তা আমরা এখন জানবো। প্রতিবেশীর আওতা সবার এক সমান হয় না। কারো আওতা বেশী, কারো আওতা কম। যেমন কেউ যদি কোন গ্রাম্য প্রধান হন এবং ধনী ব্যক্তি হন, তবে তার পার্শ্ববর্তী গ্রামবাসীরা তার প্রতিবেশী বলে গণ্য হবে। এরূপ যত যে ক্ষমতাবান বা এলাকা প্রধান হবেন, তার আওতা তত বৃদ্ধি পাবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চল্লিশ বাড়ী পর্যন্ত প্রতিবেশীর সীমানা নির্ধারণ করেছেন। এটাই হল প্রতিবেশীর প্রকৃত আওতা।
عَنِ الْحَسَنِ أَنَّهُ سُئِلَ عَنِ الْجَارِ فَقَالَ أَرْبَعِيْنَ دَارًا أَمَامَهُ وَأَرْبَعِيْنَ خَلْفَهُ وَأَرْبَعِيْنَ عَنْ يَمِيْنِهِ وأربعين عن يساره.
হাসান থেকে বর্ণিত, তাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, নিজের ঘর থেকে সামনের চল্লিশ ঘর, পিছনের চল্লিশ ঘর, ডানের চল্লিশ ঘর এবং বামের চল্লিশ ঘর তোমার প্রতিবেশী।[5] এই হাদীছটি থেকে বুঝা যায় যে, প্রত্যেকের বাড়ীর চারপাশের চল্লিশ ঘর নিজের প্রতিবেশী হিসাবে গণ্য হবে।
প্রতিবেশীর প্রকারভেদ :
প্রতিবেশীর সম্মান ও অধিকার কে কতটুকু পাবে, কার প্রাপ্য কতটুকু তার ফয়ছালা নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়ে গেছেন। নিম্নে তার বর্ণনা দেয়া হল-
عَنْ جَابِرِ بنِ عَبْدِ الله قَالَ قَالَ رسوْلُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الجِيْرانُ ثَلاثَةٌ جَارٌ لهُ حَقٌ وَاحِدٌ وَهُوَ أَدْنَى الجيرانِ حقًّا وجار له حقَّان وجَارٌ له ثلاثةُ حُقُوْقٍ وَهُوَ أفضلُ الجيرانِ حقا فأما الذي له حق واحد فجار مُشْرِكٌ لا رَحمَ لَهُ، لَهُ حق الجَوار وأمَّا الَّذِي لَهُ حقانِ فَجَارٌ مُسْلِمٌ له حق الإسلام وحق الْجِوارِ وأَمَّا الَّذِي لَهُ ثَلاثةُ حُقُوْقٍ فَجَارٌ مُسْلِمٌ ذُو رَحِمٍ لَهُ حق الجوار وحق الإسلام وحَقُّ الرحِمِ .
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রতিবেশী তিন প্রকার: প্রথমত, কোন প্রতিবেশী রয়েছে যার একটিমাত্র হক্ব আর এটাই সর্বনিম্ন। দ্বিতীয়ত, কোন প্রতিবেশী রয়েছে যার দু’টি হক্ব রয়েছে। তৃতীয়ত, কোন প্রতিবেশী রয়েছে যার তিনটি হক্ব রয়েছে। আর এটাই সর্বোত্তম প্রতিবেশীর হক্ব । প্রথম প্রকার, এক হক্ব বিশিষ্ট প্রতিবেশী হল, অমুসলিম প্রতিবেশী যার সাথে আত্মীয়তা নেই। তার শুধু প্রতিবেশীর হক্ব। দ্বিতীয় প্রকার, দুই হক্ব বিশিষ্ট প্রতিবেশী হল মুসলিম প্রতিবেশী। তার জন্য মুসলিম হওয়ার হক্ব ও প্রতিবেশীর হক্ব। তৃতীয় প্রকার, তিন হক্ব বিশিষ্ট প্রতিবেশী হল মুসলিম আত্মীয় প্রতিবেশী তার জন্য মুসলিম হওয়ার হক্ব, আত্মীয়তার হক্ব ও প্রতিবেশী হওয়ার হক্ব রয়েছে’।[6]
সৎ ও উত্তম প্রতিবেশী :
প্রতিবেশীর আচরণে প্রতিবেশী জানতে পারে প্রতিবেশীর ভাল-মন্দ। বিধায় আচরণেই প্রমাণিত হয়ে যায় মন্দ বা উত্তম ব্যক্তিত্বের কথা। এর প্রমাণ নিম্নোক্ত হাদীছের মধ্যেই রয়েছে। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَيْرُ الأَصْحَابِ عِنْدَ اللهِ خَيْرُهُمْ لِصَاحِبِهِ وَخَيْرُ الْجِيرَانِ عِنْدَ اللهِ خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ.
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ্র নিকট সেই সাথী উত্তম যে নিজ সাথীদের নিকট উত্তম। আল্লাহ্র নিকট সেই প্রতিবেশী উত্তম যে নিজ প্রতিবেশীর কাছে উত্তম’।[7]
عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ قَالَ رَجُلٌ لِرَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَيْفَ لِى أَنْ أَعْلَمَ إِذَا أَحْسَنْتُ وَإِذَا أَسَأْتُ قَالَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا سَمِعْتَ جِيْرَانَكَ يَقُوْلُوْنَ قَدْ أَحْسَنْتَ فَقَدْ أَحْسَنْتَ وَإِذَا سَمِعْتَهُمْ يَقُوْلُوْنَ قَدْ أَسَأْتَ فَقَدْ أَسَأْتَ.
আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি ভালো করছি না মন্দ করছি, তা কী করে জানবো? নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যখন তোমার প্রতিবেশীদের বলতে শুনবে যে, তুমি ভালো করছো, তবে প্রকৃতই ভালো করছো। আর যখন প্রতিবেশীরা বলবে, তুমি মন্দ করছো, তবে মনে করবে ঠিকই তুমি মন্দ করছো’।[8]
عَنْ نَافِعِ بْنِ عَبْدِ الْحَارِثِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ سَعَادَةِ الْمَرْءِ الْمُسْلِمِ الْمَسْكَنُ الْوَاسِعُ وَالْجَارُ الصَّالِحُ وَالْمَرْكَبُ الْهَنِيءُ.
নাফে‘ ইবনে আব্দুল হারিছ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘একজন মুসলিমের জন্য প্রশস্ত বাসভবন, সৎ প্রতিবেশী ও আরামদায়ক বাহন সৌভাগ্যের নিদর্শন’।[9]
নিকৃষ্ট প্রতিবেশী :
প্রতিবেশী যেহেতু সুখ-দুঃখের সাথী, তাই প্রতিবেশী খারাপ হলে তার জন্য বড়ই দুর্ভাগ্য। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্দ প্রতিবেশীর পরিচয় দিয়েছেন এবং তাদের থেকে আল্লাহ্র নিকট আশ্রয় চেয়েছেন, নিমেণর হাদীছ তার স্পষ্ট প্রমাণ:
عَنْ أَبِيْ مُوْسَى قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى يَقْتُلَ الرَّجُلُ جَارَهُ وَأَخَاهُ وَأَبَاهُ.
আবু মূসা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কোন ব্যক্তি তার প্রতিবেশী, তার ভাই এবং তার পিতাকে হত্যা না করা পর্যন্ত ক্বিয়ামত হবে না’।[10]
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُوْلُ فِيْ دُعَائِهِ «اللَّهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ جَارِ السُّوْءِ فِيْ دَارِ الْمُقَامَةِ فَإِنَّ جَارَ الْبَادِيَةِ يَتَحَوَّلُ».
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি দু‘আ হল, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আমার আবাসস্থলে (পরকালে) দুষ্ট প্রতিবেশী থেকে আশ্রয় চাই। কেননা দুনিয়ার প্রতিবেশী তো পরিবর্তন হতে থাকে’।[11]
উপর্যুক্ত হাদীছগুলো থেকে আমরা স্পষ্ট হতে পারি যে, মানুষ পরিবারে বসবাস করে। আর এই পরিবারে বসবাস করার ক্ষেত্রে মানুষ নিকৃষ্ট প্রতিবেশীর খপ্পরে পড়তে পারে, যা নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষায় খুবই দুঃখের বিষয়। তাই আমাদের উচিত আল্লাহ্র কাছে ভালো প্রতিবেশী চাওয়া এবং খারাপ প্রতিবেশীর অনিষ্ট হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য দু‘আ করা।
প্রতিবেশীর নির্দিষ্ট হক্ব ও অধিকার :
প্রতিবেশীর অধিকার সংরক্ষণ করতে হলে ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে এবং সকল দিক দিয়ে তাকে সহায়তা করতে হবে। পাশাপাশি উভয়ের ঘর থাকলে একজন অপরজনকে ছাড় দিতে হবে। এমনকি একজনের প্রাচীরে যদি অন্যজনের খুঁটি গাঁড়তে হয়, তবুও তা দিতে হবে। কেননা খুঁটি গাঁড়তে না দিতে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন,
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا يَمْنَعُ جَارٌ جَارَهُ أَنْ يَغْرِزَ خَشَبَهُ فِىْ جِدَارِهِ ثُمَّ يَقُوْلُ أَبُوْ هُرَيْرَةَ مَا لِىْ أَرَاكُمْ عَنْهَا مُعْرِضِيْنَ وَاللهِ لأَرْمِيَنَّ بِهَا بَيْنَ أَكْتَافِكُمْ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এক প্রতিবেশী যেন নিজের দেয়ালের সাথে অপর প্রতিবেশীকে খুঁটি গাঁড়তে নিষেধ না করে’। অতঃপর আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি তোমাদেরকে এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখেছি। আল্লাহ্র শপথ! আমি এটা দ্বারা তোমাদের ঘাড়ে আঘাত করব।[12]
বর্তমানে অনেক লোকই প্রতিবেশীর হক্বগুলোকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যত্নবান হন না। এমনকি তাদের প্রতিবেশীগণ তাদের অন্যায় আচরণের কারণে শান্তিতে বসবাস করতে পারছে না। ফলে তারা সব সময়ই ঝগড়া-ফাসাদে লিপ্ত রয়েছে এবং প্রতিবেশীকে কথা ও কাজে আঘাত দিচ্ছে। আর এরূপ আচরণ নিঃসন্দেহে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশের পরিপন্থী। মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছেদ, অন্তরের দূরত্ব এবং একে অন্যের সম্মান বিনষ্টকরণের এটাই হচ্ছে বড় কারণ।
প্রতিবেশীকে খাদ্য দান :
একজন প্রতিবেশীর উপর তার অপর প্রতিবেশীর হক্ব হচ্ছে, উক্ত প্রতিবেশী যেন তার সাধ্যানুসারে তার ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা, কল্যাণকামিতা ও খাদ্য প্রদানের মাধ্যমে তার সাথে সদ্ব্যবহার করে। না পারলে একটু ঝোল দিয়ে হলেও যেন সে প্রতিবেশীকে খাদ্যে শরীক করে।
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَا نِسَاءَ الْمُسْلِمَاتِ لَا تَحْقِرَنَّ جَارَةٌ لِجَارَتِهَا وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘হে মুসলিম নারীগণ! কোন মহিলা প্রতিবেশি যেন তার অপর মহিলা প্রতিবেশির হাদিয়া তুচ্ছ মনে না করে, এমনকি তা ছাগলের সামান্য গোশতযুক্ত হাড় হলেও’।[13]
عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّ لِىْ جَارَيْنِ فَإِلَى أَيِّهِمَا أُهْدِى قَالَ إِلَى أَقْرَبِهِمَا مِنْكِ بَابًا .
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার দু’জন প্রতিবেশী রয়েছে, তাই আমি এদের মধ্যে থেকে কাকে হাদিয়া দিব? নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যার ঘরের দরজা তোমার অধিক নিকটবর্তী’।[14]
ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেয়া :
প্রতিবেশীকে যেরূপ বিপদে-আপদে প্রথমেই সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। অনুরূপ কোন কিছু ক্রয়-বিক্রয় হলে তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদি প্রতিবেশী দ্রব্যের দাম কম দেয় তবুও তার নিকটেই তা বিক্রয় করতে হবে। কারণ সে এটার অধিকার বেশী রাখে। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে এই শিক্ষাই দিয়েছেন।
عَمْرَو بْنَ الشَّرِيدِ قَالَ جَاءَ الْمِسْوَرُ بْنُ مَخْرَمَةَ فَوَضَعَ يَدَهُ عَلَى مَنْكِبِى فَانْطَلَقْتُ مَعَهُ إِلَى سَعْدٍ فَقَالَ أَبُوْ رَافِعٍ لِلْمِسْوَرِ أَلاَ تَأْمُرُ هَذَا أَنْ يَشْتَرِىَ مِنِّى بَيْتِى الَّذِى فِىْ دَارِى فَقَالَ لَا أَزِيدُهُ عَلَى أَرْبَعِمِائَةٍ إِمَّا مُقَطَّعَةٍ وَإِمَّا مُنَجَّمَةٍ قَالَ أُعْطِيْتُ خَمْسَمِائَةٍ نَقْدًا فَمَنَعْتُهُ وَلَوْلَا أَنِّىْ سَمِعْتُ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ الْجَارُ أَحَقُّ بِصَقَبِهِ مَا بِعْتُكَهُ أَوْ قَالَ مَا أَعْطَيْتُكَهُ.
আমর ইবনু শারীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মিসওয়ার ইবনু মাখরামাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। আমি তার সাথে তাদের কাছে গেলাম তখন আবু রাফি মিসওয়ারকে বলল, আমার বাড়ীতে যে ঘরটি রয়েছে তা ক্রয়ের জন্য সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কেন বলছো না? সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলল, আমি চারশ’র বেশী দেব না, আর তাও কিস্তিতে কিস্তিতে পরিশোধ করব। আবু রাফি বলল, আমাকে তো নগদ পাঁচশ’র প্রস্তাব করা হয়েছে কিন্তু আমি দেইনি। যদি আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে না শুনতাম যে, প্রতিবেশী তার সংলগ্ন সম্পত্তি ক্রয়ের ব্যাপারে অধিক হক্বদার, তাহলে আমি তোমার কাছে বিক্রয় করতাম না অথবা বলেছেন, আমি তোমাকে তা দিতাম না।[15]
অমুসলিম প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ :
অনেকের ধারণা তার প্রতিবেশী অভাবগ্রস্ত হলেও দ্বীনদার নয়, তাই তারা তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে আপত্তি করে। এটা মোটেও ঠিক নয়। কারণ প্রতিবেশী দ্বীনদার না হলে তাকে আল্লাহ্র কাছে জবাবদিহি করতে হবে। কেননা কাকে কখন আল্লাহ হেদায়াত দান করবেন, তা বলা যাবে না। হয়তোবা সে তওবা করে আল্লাহ্র নিকট আপনার থেকে প্রিয় বান্দা বলে গণ্য হবে। অথবা তার এমন একটি ভাল কাজ গোপন থাকতে পারে যেটা তার জান্নাতে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিধায় সকল প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ করতে হবে। কারণ এতে করে সে ঈমান আনতে পারে। তাইতো আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতি গুরুত্ব দিতেন।
عَنْ مُجَاهِدٍ قَالَ كُنْتُ عِنْدَ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو وَغُلَامُهُ يَسْلُخُ شَاةً فَقَالَ يَا غُلَامُ إِذَا فَرَغْتَ فَابْدَأْ بِجَارِنَا الْيَهُودِيِّ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْقَوْمِ الْيَهُودِيُّ أَصْلَحَكَ اللهُ قَالَ إِنِّيْ سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوْصِي بِالْجَارِ حَتَّى خَشِيْنَا أَوْ رؤينا أنه سيورثه.
মুজাহিদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট ছিলাম। তখন তার গোলাম ছাগলের চামড়া ছাড়াচ্ছিল। তিনি বললেন, হে বালক! অবসর হয়েই তুমি প্রথমে আমাদের ইয়াহূদী প্রতিবেশীকে গোশত দিবে। এক ব্যক্তি বলল, ইয়াহুদীকে? আল্লাহ আপনাকে সংশোধন করুন। তিনি বললেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে আমি প্রতিবেশী সম্পর্কে উপদেশ দিতে শুনেছি। এমনকি আমাদের আশঙ্কা হল যে, তিনি অচিরেই প্রতিবেশীকে ওয়ারিছ বানিয়ে দিবেন।[16]
প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া বড় অপরাধ :
সুখে-দুঃখে যারা সবসময় নিকটে থাকতে পারে তারা হল প্রতিবেশী। ক্ষুধার্ত থাকলে তারা খাদ্য দিতে পারে, বস্ত্রহীন থাকলে তারা বস্ত্র দিতে পারে, বিপদে পড়লে তারা সাহায্য করতে পারে, অসুখে পড়লে তারা চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে পারে, এমনকি মৃত্যু হলে তারাই সর্বপ্রথম দাফন কাজে এগিয়ে আসতে পারে। সেই হিতাকাঙ্ক্ষী প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া বড় অপরাধ হওয়াই স্বাভাবিক। এ কারণেই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَلَا يُؤْذِى جَارَهُ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়’।[17] প্রতিবেশীর অধিকার যেমন বেশি, তদ্রূপ তাদের সাথে মন্দ ব্যবহার করলে তার অপরাধও বেশী। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পাপের দৃষ্টান্ত দিয়ে উম্মতে মুহাম্মাদীতে সতর্ক করে বলেছেন,
عَنِ الْمِقْدَادِ بْنِ الْأَسْوَدِ قَالَ سَأَلَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أصحابه عن الزنى قَالُوْا حرامٌ حَرَّمَهُ اللهُ وَرَسُوْلُهُ. فَقَالَ لِأَنْ يَزْنِيَ الرَّجُلُ بِعَشْرِ نِسْوَةٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَزْنِيَ بِامْرَأَةِ جَارِهِ وَسَأَلَهُمْ عَنِ السرقة قالوا حرام حرمه اللهُ عَزَّ وَجَلَّ وَرَسُوْلُهُ فَقَالَ لِأَنْ يَسْرِقَ مِنْ عَشَرَةِ أَهْلِ أبياتٍ أَيْسَرُ عَلَيْهِ مِنْ أَنْ يَسْرِقَ مِنْ بَيْتِ جَارِهِ.
মিক্বদাদ ইবনুল আসওয়াদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ছাহাবীগণকে যেনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তারা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা হারাম করেছেন। তিনি বললেন, ‘কোন ব্যক্তি দশটি নারীর সাথে যেনায় লিপ্ত হওয়া তার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে তার যেনা করার চেয়ে হালকা অপরাধ’। পুনরায় তিনি তাদেরকে চুরি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। তারা বললেন, হারাম, মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা হারাম করেছেন। তিনি বললেন, ‘কোন ব্যক্তির দশ পরিবার থেকে চুরি করা তার প্রতিবেশীর ঘরে চুরি করার চেয়ে হালকা অপরাধ’।[18]
প্রতিবেশীর সাথে অসদাচরণের পরিণাম :
যারা প্রতিবেশীর কষ্ট দেয়, তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কসম করে বলেছেন, যারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় তারা মুমিন নয়। যেসব কারণে মানুষ জান্নাতে যেতে পারবে না, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া তার মধ্যে অন্যতম।
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ.
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নিশ্চয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যার অনিষ্ট হতে প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[19]
عَنْ أَبِىْ شُرَيْحٍ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ وَاللهِ لَا يُؤْمِنُ قِيْلَ وَمَنْ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ الَّذِىْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَايِقَهُ.
আবু শুরাইহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ্র কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহ্র কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহ্র কসম! সে ব্যক্তি মুমিন নয়। বলা হল, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সে কে? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তির অনিষ্ট হতে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়’।[20]
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের মধ্যে যেভাবে জীবিকা বণ্টন করেছেন, সেভাবে তোমাদের মধ্যে তোমাদের গুণাবলীও বণ্টন করেছেন। আল্লাহ দুনিয়ার সুখ ও সম্পদ যাকে ভালোবাসেন তাকেও দেন, যাকে ভালোবাসেন না তাকেও দেন। কিন্তু আখিরাতের সুখ-শান্তি কেবল তাকেই দেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন। সুতরাং যাকে তিনি দ্বীনদারসুলভ জ্ঞান ও চরিত্র দিয়েছেন, তাকে নিশ্চয়ই তিনি ভালোবাসেন। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম! কোন বান্দার মন ও জিহবা যতক্ষণ ইসলামের অনুসারী না হয়, ততক্ষণ সে মুমিন হতে পারবে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম অনিষ্ট অর্থ কী? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যুলুম ও বাড়াবাড়ি, কোন ব্যক্তি যদি অবৈধ উপায়ে কোন সম্পদ উপার্জন করে, অতঃপর তা ব্যয় করে, তবে তাতে কোন বরকত বা কল্যাণ লাভ করবে না, সেই সম্পদ ছাদাক্বাহ করলেও কবুল হবে না। আর সেই সম্পদ উত্তরাধিকার হিসাবে রেখে গেলে তা তার জন্য জাহান্নামের সম্বল হবে। আল্লাহ অন্যায়কে অন্যায় দ্বারা প্রতিহত করেন না। তিনি অন্যায়কে ভালো কাজ দ্বারা প্রতিহত করেন। নোংরা জিনিস নোংরা জিনিসকে দূর করে না।[21]
আবু আমির হিমছী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ছাওবান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন,
وَمَا مِنْ جارٍ يَظْلِمُ جَارَهُ وَيَقْهَرُهُ حَتَّى يَحْمِلَهُ ذَلِكَ عَلَى أَنْ يَخْرُجَ مِنْ مَنْزِلِهِ إِلَّا هَلَكَ.
‘যে প্রতিবেশী তার অপর প্রতিবেশীকে নির্যাতন করে বা তার সাথে হীন আচরণ করে ফলে সে নিজ বাড়ী ত্যাগ করতে বাধ্য হয়, সে ধ্বংস হল’।[22]
আবু হুরায়ারা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হল, হে আল্লাহ্র রাসূল! অমুক নারী সারারাত ছালাত পড়ে, সারাদিন ছিয়াম রাখে, ভাল কাজ করে, দান-খয়রাত করে এবং নিজ প্রতিবেশীদেরকে মুখের কথায় কষ্ট দেয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তার মধ্যে কোন কল্যাণ নেই, সে জাহান্নামী’। পুনরায় ছাহাবীগণ বললেন, অমুক নারী ফরয ছালাত পড়ে, বস্ত্র দান করে কম এবং কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘সে জান্নাতী নারী’।[23]
উপসংহার :
উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতিবেশীর অধিকার ও হক্ব এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে জানা গেল। তাই সর্বাবস্থায় তাদের অধিকারের প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে কুরআন ও হাদীছের উপর আমল করে এই বিষয়ের প্রতি যথাযথ আমল করার তাওফীক্ব দান করেন- আমীন!
[1]. আল-আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১১২, ১১৩।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬২৫।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৮; আল-আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১০২।
[4]. আল-আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১২২।
[5]. আল-আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১০৯, ‘হাসান’।
[6]. মুসনাদে বাযযার, তাফসীর ইবনে কাছীর, ২/৩০০।
[7]. তিরমিযী, হা/২১৯৪৪; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১০৩০; মিশকাত, হা/৪৯৮৭।
[8]. ইবনে মজাহ, হা/৪২২৩; মিশকাত, হা/৪৯৮৮।
[9]. আল-আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১১৬।
[10]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১১৮; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩১৮৫।
[11]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১১৭; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩৯৪৩।
[12]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৬৩।
[13]. ছহীহ বুখারী, হা/২৫৬৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৩০।
[14]. ছহীহ বুখারী, হা/২২৫৯; মিশকাত, হা/১৯৩৬।
[15]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৭৭।
[16]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১২৮।
[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৫১৮৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৭।
[18]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১০৩।
[19]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১২১; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৬।
[20]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৬১।
[21]. আহমাদ, হা/৩৬৭২; আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, হা/১৩০০।
[22]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১২৭।
[23]. আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/১১৯।
