তথ্য সন্ত্রাস এমন এক বিষক্রিয়া, যা দ্বারা ইয়াহূদী-খ্রীস্টানসহ ইসলাম বিদ্বেষীরা ইসলাম, মুসলিম ব্যক্তি, দেশ-জাতিসহ ইসলাম ধর্মগ্রন্থগুলোকেও কলুষিত করার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এ ব্যাপারে তারা শতভাগ সফলতা লাভ করতে না পারলেও একথা দিবালোকের ন্যায় সত্য যে, তারা ইসলামী ধর্মগ্রন্থের বিরুদ্ধে তথ্য সন্ত্রাস করে মুসলিম দেশ ও জাতিকে শতধাবিভক্ত করেছে। মুসলিম জাতি বিভিন্ন দল-উপদলে খণ্ড-বিখণ্ড হয়েছে। অবশ্য ঐ চক্র এক্ষেত্রে পুরোপুরি সফল। এই চক্র ইসলামী শরী‘আতের অন্যতম ভিত্তি ‘আল-হাদীছ’-এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সচেতনতার সাথে তাদের ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে। কখনো হাদীছ জালকরণের মাধ্যমে, কখনো উছূলে ফিক্বহের নামে বিষাক্ত ধারালো অস্ত্র দ্বারা ক্ষত-বিক্ষত করেছে। কখনো হাদীছের শাব্দিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। হাদীছের কোন অংশে সামান্য যোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে ছহীহ হাদীছের বিরুদ্ধে তথ্য সন্ত্রাস করে মুসলিম ঐক্যে ফাটলের পথকে চির উন্মুক্ত করেছে। কারণ তাদের একথা খুব ভালভাবেই জানা আছে যে, সারা পৃথিবীর মুসলিম জাতি একই কুরআন ও একই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর হাদীছ থেকেই শিক্ষা নিয়ে তাদের সার্বিক জীবন পরিচালনা করে থাকে। আর পৃথিবীর সকল মুসলিম যদি একই আদর্শ বা নীতিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জীবন যাপন করে, তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তি তাদেরকে অবদমিত করতে পারবে না। এক্ষেত্রে তারা মুসলিম ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে গ্রহণ করে ছহীহ হাদীছের বিরুদ্ধে তথ্য সন্ত্রাস। এই চক্র নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অর্থ, ক্ষমতা, চাকুরী সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী মৌলভীকে ব্যবহার করে থাকে। যাদের মাধ্যমে হাদীছের নিত্য-নতুন, কল্পিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন মাসআলার উদ্ভব হয়ে থাকে। ফলশ্রুতিতে মুসলিম জাতি দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তারা নিজেদের মাযহাব, দল, মত ও মতবাদের অনুকূলে হাদীছ জাল থেকে শুরু করে ইচ্ছামত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করে না। সতর্ক দৃষ্টিতে হাদীছ গ্রন্থগুলোর দিকে খেয়াল রাখলে এর অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, প্রবন্ধের কলেবরের দিকে নযর রেখে কয়েকটি দৃষ্টান্ত পাঠকদের খেদমতে পেশ করা হল।
প্রথমেই জাল হাদীছ প্রসঙ্গে বলা যায়। হাদীছে জালকরণ কাজে সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান ভূমিকা পালন করে মুসলিম সমাজে ঘাপটি মেরে থাকা ঈর্ষাকাতর ইয়াহূদী, খ্রীস্টান, মুনাফিক্ব, মুরতাদ ও নিরশ্বরবাদীরা। এজাতীয় অন্তর্ঘাতী দুশমনকে হাদীছ সমালোচনা বিজ্ঞানে সাধারণভাবে ‘যিন্দীক্ব’(الزنديق) নামে অভিহিত করা হয়। যিন্দীক্ব শব্দের অর্থ হল মূল বিকৃতিকারী, সুযোগসন্ধানী, বস্ত্তবাদী, নাস্তিক, স্বেচ্ছাচারভাবুক দ্বিত্ববাদে বিশ্বাসী, আত্মপরিচয় গোপনকারী মুসলিম, ছদ্মবেশী ভ-।[1] এককথায় যিন্দীক্ব বলতে বুঝায় এমন ধর্মবিরোধী ব্যক্তি, যার আচরিত কর্ম বা প্রচারণার ফলেই ইসলামী রাষ্ট্র বা উম্মাহ বিপন্ন হয়।[2] তারা বিভিন্ন শহর-নগরে ঘুরে ঘুরে নিজেদের হাদীছ বিশারদ হিসাবে যাহির করে এবং নির্ভরযোগ্য আলেমগণের নামে জাল হাদীছ প্রস্ত্তত করে সমাজে ছড়িয়ে দেয়। তাদের জালকৃত কয়েকটি হাদীছ এরূপ-
إن الله تبارك وتعالى إذا غضب انتضخ على العرش حتى يثقل على حملته
‘আল্লাহ ক্রোধান্বিত হলে আরশের উপর ফেঁপে-ফুলে স্ফীত হয়ে ওঠেন, তখন তাকে বহন করা আরশের দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে’।[3] ইবনে হিববান বলেছেন, এই মিথ্যা হাদীছটির রচয়িতা আইয়ূব ইবনু আব্দুস সালাম। সে একজন যিন্দীক্ব ও চরম পথভ্রষ্ট।[4]
النَّظَرُ إِلَى وَجْهِ الْمَرْأَةِ الْحَسْنَاءِ وَالْخُضْرَةِ يَزِيْدَانِ فِي الْبَصَرِ
‘সুন্দর চেহারার অধিকারিণী নারী এবং সবুজ ঘাসের দিকে তাকানো দৃষ্টিশক্তিকে বৃদ্ধি করে’। শায়খ নাছিরুদ্দীন আলবানী হাদীছেটিকে জাল বলেছেন।[5] একজন সচেতন পাঠক হাদীছটির প্রতি দৃষ্টি দিলেই বুঝতে পারবেন যে, হাদীছটি ঠিক নয়। কারণ যেখানে পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে ও ছহীহ হাদীছের বহু স্থানে বেগানা নারীর দিকে দৃষ্টি দেয়া মহাপাপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার এই হাদীছে সুন্দরী নারীদের দিকে দৃষ্টিপাতকে সুকৌশলে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। বিধায় এটি কী করে ঠিক হতে পারে, এ জাতীয় আরো কিছু জাল হাদীছ পাওয়া যায়। এসব জাল হাদীছ তৈরির মাধ্যমে ইসলাম বিদ্বেষীরা মুসলিম জাতির চরিত্র ধ্বংস করতে চায়, সাথে সাথে মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথায় স্ববিরোধিতার প্রশ্ন তুলে পানি ঘোলা করে মাছ শিকার করতে চায়।
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقِيْهٌ وَاحِدٌ أَشَدُّ عَلَى الشَّيْطَانِ مِنْ أَلْفِ عَابِدٍ.
আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘একজন ফক্বীহ শয়তানের কাছে এক হাযার আবেদ অপেক্ষাও মারাত্মক’।[6] হাদীছটি জাল।[7] আমরা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখতে পাই, ইসলাম থেকে বেরিয়ে চরমপন্থী খারেজী সম্প্রদায়, শী‘আ সম্প্রদায়, কাদারিয়া, মু‘তাযিলা সহ বিভিন্ন সম্প্রদায় স্বীয় মাযহাবকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিজেদের মতবাদের পক্ষে হাদীছ জাল করে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। শী‘আদের রচিত ও প্রচারিত একটি জাল হাদীছ এরূপ- নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বললেন,
هذا وصيي و موضع سري وخير من اترك بعدي
‘ইনি হচ্ছেন আমার স্থলাভিষিক্ত রূপে মনোনীত (ওয়াছী) আমার গোপনীয় বিষয়ের উৎসমূল এবং আমি আমার পরে যাদের ছেড়ে যাচ্ছি তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ’।[8] এই হাদীছটির মূল হোতা খালিদ ইবনু উবাইদ আল আতীক। ইবনু হিববান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, তিনি আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নামে এ জাল হাদীছ বর্ণনা করেন। কখনো বা হাদীছের কোন অংশের শাব্দিক পরিবর্তন করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ স্বীয় উদ্দেশ্য হাছিল করতে চেয়েছেন। যেমন-
الْأَسْوَدِ الْعَامِرِيِّ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْفَجْرَ فَلَمَّا سَلَّمَ انْحَرَفَ ورفع يديه ودعا.
আসওয়াদ আল-আমেরী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, আমি একদা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ফজরের ছালাত আদায় করলাম। অতঃপর তিনি সালাম ফিরিয়ে ঘুরে বসলেন এবং তার দু’হাত উঠালেন ও দো‘আ করলেন।[9] হাদীছটি জাল।[10] সবচেয়ে মারাত্মক যে বিভ্রান্তি তা হল মূল হাদীছের সাথে অন্য কারো অতিরিক্ত কথা যোগ করা। উক্ত হাদীছের শেষের অংশ ورفع يديه ودعا ‘অতঃপর তিনি দু’হাত তুললেন এবং দো‘আ করলেন’ মূল কিতাবে নেই। হাদীছটি নাযির হুসাইন মুহাদ্দিছ দেহলভী (১৮০৫-১৯০২খৃঃ) তার ‘ফাতাওয়া নাযীরিয়া’তে উল্লেখ করেছেন এভাবেই। অতঃপর আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (১৮৬৫-১৯৩৫খৃঃ) তার গ্রন্থ তুহফাতুল আহওয়াযীতে হুবহু ঐভাবে উল্লেখ করেছেন এবং তারা উভয়েই মুছান্নাফ ইবনু আবি শায়বার বরাত দিয়েছেন। কিন্তু মুছান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ মূল কিতাবে শেষের ঐ অংশটুকু নেই।[11] শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, এতে মিথ্যা ও ত্রুটি উভয়ই সংযুক্ত হয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন, মিথ্যা হওয়ার কারণ হল, উক্ত বাড়তি অংশ। আর মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাতে এই অতিরিক্ত অংশের অস্তিত্ব নেই। এটা মূলত প্রবৃত্তির তাড়নায় কেউ সংযোগ করেছে। এর থেকে আমরা আল্লাহ্র কাছে পবিত্রতা চাচ্ছি।[12] আবুদাঊদে বর্ণিত একটি হাদীছে বিশ রাক‘আত তারাবীহ-এর ছালাত প্রমাণ করতে গিয়ে এরূপ বিকৃতি করা হয়েছে। হাদীছটি নিমেণ তুলে ধরা হল। উল্লেখ্য বিদ্বানগণের নিকট হাদীছটি যঈফ। হাদীছটি হল-
عَنِ الْحَسَنِ أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ جَمَعَ النَّاسَ عَلَى أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ فَكَانَ يُصَلِّى لَهُمْ عِشْرِينَ لَيْلَةً
হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উবাই ইবনু কা‘বের মাধ্যমে লোকদের একত্রিত করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে ২০ (বিশ) রাত্রি ছালাত আদায় করান।[13] হাদীছটি যঈফ।[14] দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসার প্রধান শিক্ষক শায়খুল হিন্দ নামে খ্যাত মাওলানা মাহমূদুল হাসান (১২৩৮-১৩৩৮ হিঃ) সুনানে আবুদাঊদের টীকা লিখেন। এই হাদীছের টীকায় তিনি নিজের পক্ষ থেকে শব্দ তৈরি করে বলেছেন, অন্য বর্ণনায় আছে, عِشْرِينَ ركعةবা বিশ রাক‘আত। এই বিকৃত শব্দেই দিল্লীতে ‘মুজতবাঈ প্রেস’ আবুদাঊদ ছাপায়। অতঃপর মাওলানা খায়রুল হাসান আবুদাঊদ এর টীকা লিখতে গিয়ে عِشْرِينَ ركعة বা বিশ রাক‘আত মিথ্যা কথাটুকু মূল হাদীছের সাথে যোগ করেন এবং হাদীছের মূল শব্দ عِشْرِينَ لَيْلَةً ‘বিশ রাত’ টীকায় যোগ করেন। যা দিল্লীর ‘মাজীদী প্রেস’ থেকে ছাপা হয়।[15]
উক্ত সংস্করণটি ১৯৮৫ সালে দেওবন্দেও আছাহহুল মাতাবে প্রেস কর্তৃক ছাপা হয়, যা আজ পর্যন্ত সমগ্র ভারত উপমহাদেশে পড়ানো হচ্ছে।[16] মধ্যপ্রাচ্য তথা মিশর, সিরিয়া, লেবানন, কুয়েত, সঊদী আরব প্রভৃতি রাষ্ট্রে প্রকাশিত আবুদাঊদের কোন একটিতেও মিথ্যা শব্দ নেই।
সুধী পাঠক! হাদীছের বিরুদ্ধে তথ্য সন্ত্রাসের এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে। মাযহাবী গোঁড়ামিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ইসলামের দ্বিতীয় উৎসও তাদের কবল থেকে রক্ষা পায়নি। বলতে হয় একটি যঈফ হাদীছের উপর চালানো হয়েছে অপারেশন বা অস্ত্রোপচার। হাদীছে বর্ণিত শব্দ عِشْرِينَ لَيْلَةً ‘বিশ রাত্রি’কে পরিবর্তন করা হয়েছে عِشْرِينَ ركعة বিশ রাক‘আত দিয়ে। প্রথম শব্দ عِشْرِينَ আছে কিন্তু দ্বিতীয় শব্দ لَيْلَةً কে ركعة বানানো হয়েছে। বিষয়টি কত সাংঘাতিক তা বিবেকবান মানুষের জন্য খুব সহজেই অনুমেয়। দিল্লী হতে প্রকাশিত আবুদাঊদে শাব্দিক পরিবর্তন করা হলেও পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্র হতে প্রকাশিত আবুদাঊদে পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। তা আজও অপরিবর্তনীয়ই রয়ে গেছে।
অনুরূপভাবে আরো একটি হাদীছ উল্লেখ করা যায়, মামূন ইবনে আহমাদ আল-হারাভীকে লক্ষ্য করে একজন লোক বলল, শাফেঈ ও তার খুরাসানী অনুসরণকারীদের সম্পর্কে তোমার কী ধারণা? নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত হয়েছে,
يَكُونُ فِي أُمَّتِي رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ مُحَمَّدُ بْنُ إِدْرِيسَ أَضَرَّ عَلَى أُمَّتِي مِنْ إِبْلِيسَ وَيَكُونُ فِي أُمَّتِي رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ أَبُو حَنِيفَةَ هُوَ سِرَاجُ أُمَّتِي
‘আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক ব্যক্তি হবে, যার নামে হবে মুহাম্মাদ ইবনে ইদরীস। সে আমার উম্মতের জন্য ইবলীস অপেক্ষা ক্ষতিকর। অপরপক্ষে, আমার উম্মতের মধ্যে আর এক ব্যক্তি হবে, যার নাম আবু হানীফা, সে আমার উম্মতের জন্য প্রদীপ স্বরূপ’। স্বার্থ ও হিংসাপরায়ণ হয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যা কথাকে হাদীছ বলে চালিয়ে দিয়েছে তা বুঝতে একটুও কষ্ট হবে না।[17] এ হাদীছটি উল্লেখ করার পর আবু নু‘আইম আল-ইস্পাহানী (মৃত্যু: ৪৩০ হি.) বলেন, বর্ণনাকারী মামূন এবং তার মত যারা আছে, তারা আল্লাহ, তার রাসূল এবং সমস্ত মানুষের পক্ষ থেকে অভিশাপ পাওয়ার যোগ্য।[18] একথা পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়, স্রেফ মাযহাবী সংকীর্ণতাবোধের কারণে এ হাদীছের অবতারণা করা হয়েছে। স্বীয় মাযহাবকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসানোর মানসে হাদীছ জাল করে নিজেদের জিদের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জন্ম দিয়েছে মাযহাবী কোন্দলের। হাদীছে যার পাণ্ডিত্ব নেই সেও বুঝে হাদীছটি জাল।[19] যেসব কারণে হাদীছ জাল করা হয়েছে, তন্মধ্যে মাযহাব একটি কারণ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যান্য মাযহাবের উপর স্বীয় মাযহাবকে প্রতিষ্ঠিত করাই মূল লক্ষ্য। সে লক্ষ্য পূরণে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী হাদীছ জাল করা হয়েছে। অনুরূপ একটি হাদীছ-
خلق الله الفرس فأخراها فعرقت فخلق نفسه منها
‘আল্লাহ অশ্ব (ঘোড়া) সৃষ্টি করলেন। তাকে চালালেন। ফলে তার থেকে খুব ঘাম বের হল। অতঃপর ঐ ঘাম হতে তিনি নিজেকে সৃষ্টি করলেন’ (নাঊযুবিল্লাহ), হাদীছটি জাল।[20]
আরো একটি জাল হাদীছ, الباذنجان شفاء من كل داء ‘বেগুন সকল প্রকার রোগের ঔষধ’। এটিও বানোয়াট।[21] কোন সুস্থ বুদ্ধির মানুষ কি এরূপ হাস্যকর কথা বলতে পারে? হয়তোবা কোন বেগুন ব্যবসায়ী এরূপ হীন কর্ম করে থাকতে পারে, স্বীয় উৎপাদিত বেগুন বেশী বিক্রির মানসিকতায় তা করেছে। কেননা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুখ থেকে এমন বাণী উচ্চারিত হলে তার জমজমাট ব্যবসা হবে এটাই স্বাভাবিক। শায়খ ফাল্লাতাহ বহু যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে সাব্যস্ত করেছেন যে, সুনির্দিষ্টভাবে হাদীছ জালকরণ শুরু হয় হিজরী প্রথম শতাব্দীর শেষ তৃতীয়াংশে।[22] আল-মুখতার আছ-ছাক্বাফী নামক এক ভণ্ড হাদীছ জালিয়াতকারী এই ঘৃণ্য তৎপরতার সূচনা করে।[23] সে প্রথমে ছিল খাওয়ারিজ দলভুক্ত, পরে আব্দুল্লাহ ইবনু আল-যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সমর্থক এবং সর্বশেষে শী‘আ মতবাদের নেতৃস্থানীয় প্রচারক। সে বিভিন্ন জনকে তার পক্ষে হাদীছ জাল করার প্রস্তাব দেয়।[24]
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
[1]. মুহাম্মাদ আস-সাখাভী, ফাতহুল মুগীছ, (মিশর : মাতবাআতুল আসিমা, ১৩৮৮ হিঃ), ১/২৩৯ পৃঃ।
[2]. সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, (ঢাকা : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ), ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৯৮-২৯৫।
[3]. ইবনে আববাস, তানযীহুশ শরী‘আহ, তাহক্বীক্ব আব্দুল ওয়াহাব, আব্দুল লতীফ ও আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ আস-ছিদ্দীক, (বৈরূত, লেবানন : দারুল কুতুব আল-ইসলামিয়াহ, ১৪০১ হিঃ-১৯৮১ খ্রীঃ), ১/১৩৯ পৃঃ।
[4]. ইবনু হিববান, আল-মাজরূহীন, তাহক্বীক : মাহমূদ ইবরাহীম যাঈদ, (সিরিয়া : দারুল ওয়াঈ, ১৩৯৬ হিঃ), ১/১৬৫ পৃঃ।
[5]. মূল: আল্লামা মুহাম্মাদ নাছীরুদ্দীন আলবানী, যঈফ ও জাল হাদীছ সিরিজ, (ঢাকা : ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি ইসস্টিটিউট, প্রথম প্রকাশ : মার্চ, ২০০৪ ইং), ১/১৬৮ পৃঃ।
[6]. তিরমিযী, হা/২৬৮১; ইবনে মাজাহ, হা/২০২।
[7]. যঈফুল জামে‘, হা/৩৯৮৭; সিলসিলা যঈফাহ, হা/২৬৫১।
[8]. হাশিম মা‘রূফ, আল মাওযূ‘আত ফিল আছার ওয়াল আখবার, পৃঃ ৯৫ দ্রঃ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ গবেষণা পত্রিকা, অক্টোবর-ডিসেম্বর-২০০২, পৃঃ ৩৮।
[9]. শাইখুল কুল ফিল কুল সাইয়িদ নাযীর হুসাইন মুহাদ্দিছ দেহলভী (১৮০৫-১৯০২), ফাতওয়া নাযীরিয়াহ (দিল্লী : ইদারাহ নূরুল ঈমান, ৩য় প্রকাশ : ১৪০৯/১৯৮৮), ২/৫৬৫ পৃঃ, আব্দুর রহমান মুবারকপুরী, তুহফাতুল আহওয়াযী (বৈরুত : দারুল কুতুব আল-ইলমিয়াহ, ১৪১০/১৯৯০), ২/১৭১ পৃঃ, হা/২৯৯ -এর ব্যাখ্যা দ্রঃ ‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘সালামের পর কী বলা হয়’ অনুচ্ছেদ।
[10]. তাহযীবুত তাহযীব, ২/৪২ পৃঃ।
[11]. আব্দুল্লাহ ইবনু আবী শায়বাহ, আল-মুছান্নাফ, (বৈরুত : দারুল ফিকর, প্রথম প্রকাশ : ১৪০৯ হিঃ/১৯৮৯ খৃীঃ), ১/৩৩৭ পৃঃ।
[12]. সিলসিলাহ যঈফাহ, ১২/৪৫৩ পৃঃ।
[13]. আবুদাঊদ, হা/১৪২৯।
[14]. যঈফ আবুদাঊদ, হা/১২১৭।
[15]. ইবনে আহমাদ সালাফী, আহলেহাদীছের প্রকৃত পরিচয়, (কলিকাতা : সালাফী প্রকাশনী, ১ নং মারকুইস লেন, ২য় সংস্করণ: ১৯৯৭ ইং), পৃঃ ৬৬-৬৭।
[16]. আবুদাঊদ, পৃঃ ২০২, ‘ছালাত অধ্যায়’, ‘বিতর ছালাতে কুনূত’ অনুচ্ছেদ; আহলেহাদীছের প্রকৃত পরিচয়, পৃঃ ৬৭-৬৮।
[17]. মাওলানা আব্দুর রহীম, হাদীছ সংকলনের ইতিহাস, (ঢাকা : খাইরুন প্রকাশনী, ৬ষ্ঠ প্রকাশ : আগস্ট, ১৯৯৭), পৃঃ ৪৩০।
[18]. আবু নু‘আইম আল-ইস্পাহানী (মৃত্যু: ৪৩০ হি.), আল-মুসনাদুল মুস্তাখরাজ আলা ছহীহিল ইমাম মুসলিম, (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়্যাহ, ১ম প্রকাশ : ১৪১৭ হি./১৯৯৭ খৃ.), ১/৮৩।
[19]. ইবনু হিববান, আল মাজরূহীন, তাহক্বীক্ব : মাহমূদ ইবরাহীম সাঈদ, (সিরিয়া : দারুল ওয়াঈ, ১৩৯৬ হিঃ), ১/২৭৯ পৃঃ।
[20]. মোল্লা আলী ক্বারী, আল-মাওযূ‘আতুল কাবীর, পৃঃ ১৫৫; দ্রঃ হাদীছ সংকলনের ইতিহাস, পৃঃ ৪৩২।
[21]. প্রাগুক্ত।
[22]. ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ গবেষণা পত্রিকা, পৃঃ ৩৬।
[23]. ইবনে হাজার আল-আসক্বালানী, মীযানুল ই‘তিদাল, (দারুল ফিকর আল-আরাবী, তাবি), ৫/২০৫ পৃঃ।
[24]. ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ গবেষণা পত্রিকা, পৃঃ ৩৬-৩৭।
