আল্লাহর জ্ঞান অসীম। কিন্তু মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ। আল্লাহ তাআলার অপার অনুগ্রহে প্রাপ্ত সামান্য জ্ঞান দিয়ে মানুষ আজ বিজ্ঞানের বিপ্লব সাধনের মাধ্যমে সর্বদা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে আমরা আজকে জ্ঞানবিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগে বসবাস করছি। যুগে যুগে বিজ্ঞানীগণ জ্ঞানসমুদ্রের বেলাভূমিতে পদচারণ করে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে থিওরি প্রদান করে, যার মধ্যে কতিপয় বিশুদ্ধ ও কতিপয় ত্রুটিযুক্ত থিওরি পাওয়া যায়। আর এটা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। আজকে যেটা বিজ্ঞান কালকে সেটা বিজ্ঞান নয়। কেননা মানুষের স্বতঃলদ্ধ জ্ঞান অপরিপূর্ণ আর আল্লাহর জ্ঞান পরিপূর্ণ। ইসলামের ভিত্তি যুক্তি বা বিজ্ঞান নয়, বরং ভিত্তি হলো বিশ্বাস তথা ঈমান। হ্যাঁ! প্রিয় পাঠক! আপনি হয়তো চমকে উঠলেন ‘আজকে যেটা বিজ্ঞান কালকে সেটা বিজ্ঞান নয়’ এটা শুনে। এই তো এ্যারিস্টেটল যখন বললেন, ‘সূর্য পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরে’ তখন তার এই থিওরি বিনা বাক্যে মানুষ মেনে নিয়েছিল। অতঃপর যখন বিজ্ঞানী কোপার্নিকাস বললেন, ‘পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে’ তখন সকলেই এই মতের বিরোধিতা করল ও আপত্তি পেশ করল। শুধু তাই নয় বিজ্ঞানী পিথাগোরাস যখন বললেন, ‘পৃথিবী ঘোরে, কিন্তু সূর্য স্থির’। অপর দিকে মিশরীয় বিজ্ঞানী টলেমী বলেন, ‘সূর্য ঘুরে, পৃথিবী স্থির’। তাহলে দেখুন বিজ্ঞানীদের একটি থিওরি যেমন আজকে বিজ্ঞান, ঠিক আরেক সময় ঐ থিওরি বিজ্ঞান নয়। আমি নিজেই এই কথার বিপক্ষে অবস্থান করেছি। যখন বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করলাম এবং বিভিন্ন বিজ্ঞানভিত্তিক বই, প্রবন্ধ পড়ে থিওরির সাথে তুলনা করলাম তখন বিষয়টি স্পষ্ট ও অনুমেয় হয়েছে এবং সেই সাথে একমত পোষণ করলাম ‘বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল’। এটা সত্য যে, বিজ্ঞান সত্যের অনুসন্ধান করে কিন্তু সত্যের মানদণ্ড নির্ধারণ করে না। বিজ্ঞান শুধু অনুমানের উপর নির্ভর করে গবেষণার দ্বারকে উন্মুক্ত করে। পুরোপুরি সত্যের সন্ধান দিতে পারে না। বিজ্ঞানীগণ বলেন, Science gives us but a partial knowledge of reality. অর্থাৎ ‘বিজ্ঞান আমাদেরকে কেবল আংশিক সত্যের সন্ধান দেয়’।
এক্ষণে প্রশ্ন হতে পারে বিজ্ঞানের বিশুদ্ধ তথ্য ও অনুসন্ধানের জন্য অপরিবর্তনশীল জ্ঞানের উৎস কী?
জবাব হলো মহাগ্ৰন্থ আল-কুরআন। ইসলামের এই শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার যার মধ্যে রয়েছে সকল জ্ঞানের উৎস ও সমাহার। এই সেই কুরআন যার মাধ্যমে জ্ঞানে মুসলিমগণ দীর্ঘ ১ হাজার বছর যাবৎ বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়। উইলিয়াম ড্রেপার রচিত ‘Intellectual development of Europe’ বইয়ে বলেন, বড়ই আফসোসের বিষয় পাশ্চাত্যের পণ্ডিতগণ বিজ্ঞানে মুসলিমদের অবদান ও অগ্ৰগতিকে ত্রুমাগতভাবে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে কিন্তু তাদের এই বিদ্বেষ বেশিদিন চাপা থাকেনি। এটা নিশ্চিতভাবে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আরবদের অবদান যা আকাশের নক্ষত্রের ন্যায় উজ্জ্বল।
পাশ্চাত্যের পণ্ডিত ইমানুয়েল ডাস বলেন, A book by the aid of which Arabs conquered a world greater than that of Alexander the Great, greater than that of Rome. অর্থাৎ ‘এই কুরআন, যার দ্বারা আরবরা জয় করেছিল পৃথিবীর বিস্তৃত দেশ যা আলেকজান্ডার এর চেয়েও বড়, রোম (ইতালি) সাম্রাজ্যের চেয়েও বড়’।
আর এটা চরম সত্য যে, যুগে যুগে বিজ্ঞানীগণ কুরআনের নির্ভেজাল তথ্যের উপর নির্ভর করে মানবকল্যাণের জন্য বিভিন্ন জিনিস আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। এই যে দেখুন, গ্যারি মিলার (কানাডার খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক) কুরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে সূরা আন-নিসার ৮২ নম্বর আয়াত পড়তে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হন। যেহেতু স্বতঃলব্ধ জ্ঞান মানসিকতার সাথে পরিবর্তনশীল, তাই বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীলতা চলমান। কিন্তু যিনি সকল জিনিসের সৃষ্টিকর্তা তার জ্ঞান পরিপূর্ণ ও সর্বদা অপরিবর্তনশীল। অথচ আমরা লক্ষ করলে দেখতে পাই নাস্তিক এবং এক শ্রেণির কপট বিজ্ঞানী বিদ্বেষবশত ইসলাম ও আল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান করে খোঁড়া যুক্তি পেশ করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুখ্যাতি অর্জন করতে চায়। অথচ ঐ সকল বিজ্ঞানীদের গুরু বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের (১৯৭৯-১৯৫৫) এই কথা মনে রাখা উচিত, তিনি বলেন, Religion without science is blind and science without religion is lame. অর্থাৎ ‘বিজ্ঞান ছাড়া ধর্ম অন্ধ এবং ধর্ম ছাড়া বিজ্ঞান পঙ্গু’। এক্ষেত্রে ইসমাঈল আল-রাজীর কথাটি প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করছি। তিনি বলেন, God (Allah) is not against science, God (Allah) is the condition of science, not an enemy of science. অর্থাৎ ‘আল্লাহ বিজ্ঞানের বিরোধী নন, আল্লাহ হচ্ছেন বিজ্ঞানের শর্ত, তিনি বিজ্ঞানের শত্রু নন’।
আজ সারা বিশ্বে অমুসলিমগণ জ্ঞানবিজ্ঞানের নেতৃত্ব দিচ্ছে এজন্য হয়তোবা আমরা মনে করছি অমুসলিমগণ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে বিশাল অবদান রাখছে! এরকম শত অজুহাত ও অযাচিত যুক্তি উপস্থাপন করে আমরা বিজ্ঞান থেকে বিমুখ হচ্ছি। আসলে সত্য কথা হলো বিজ্ঞান তেমন কোনো আহামরি বিষয় নয়! বিশেষ করে মুসলিমদের জন্য। কেননা সকল জ্ঞানের উৎস আল-কুরআন তাদের প্রতিদিনের পড়ার সিলেবাস। যে কুরআন নিয়ে বেশি গবেষণা করবে সে তত বেশি জ্ঞানবিজ্ঞান ছাড়াও অন্যান্য জ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখা-প্রশাখায় পদচারণ করে বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে পারবে। আসলে আমরা ইতিহাস বিস্মৃত হয়ে জেগে জেগে ঘুমাচ্ছি। আমরা অতীতের ইতিহাস একটুও পড়ি না।
অথচ জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রত্যেক শাখায় মুসলিমগণ নেতৃত্ব দিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়-
(১) গণিতশাস্ত্রের মধ্যে বীজগণিতের জনক বলা হয় মূসা আল-খাওয়ারিজমীকে। অপর দিকে উমার খৈয়াম ছিলেন প্রথম শ্রেণির এক অন্যতম গণিতবিদ। আল-বিরুনী গণিতশাস্ত্রে বিশ্বখ্যাত ছিলেন। এছাড়াও অনেক মনীষী গণিতশাস্ত্রের উন্নতি সাধন করেন এবং অমূল্য জ্ঞানের খোরাক হিসেবে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন, যা আজও পাশ্চাত্য সমাজ গবেষণা করে নতুন নতুন থিওরি আবিষ্কার করছে।
(২) জাবির ইবনে হাইয়ানকে আধুনিক রসায়নের জনক বলা হয়। তিনি রসায়নের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করে প্রায় ৫০০টি আর্টিকেল রচনা করেন। তার রচিত বিশ্বখ্যাত গ্রন্থ ‘বুক অব দ্য সেভেন্টি’ গবেষণা করে পরবর্তীতে অনেক মুসলিম পণ্ডিত রসায়নের বিভিন্ন শাখায় উন্নতি সাধন করেন।
(৩) পদার্থবিজ্ঞানে আল-কিন্দী, আল-বিরুনী, হাসান ইবনে হায়সাম, ইবনে সিনা প্রমুখ অনেক অবদান রাখেন।
(৪) উদ্ভিদ ও প্রাণিবিজ্ঞানে ইবনে বাজা, মুহাম্মাদ আদ-দামেরী উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।
(৫) চিকিৎসাবিজ্ঞানে আল-রাজী, ইবনে সিনা প্রমুখ অনেক অবদান রাখেন। এছাড়াও জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রত্যেক শাখা-প্রশাখায় মুসলিমদের অবদান অসামান্য। কিন্তু আজকে মুসলিমদের সেই অবিস্মরণীয় অবদানকে পাশ্চাত্যের জ্ঞানপাপী সমাজ আমাদের দৃশ্যপট থেকে আড়াল করে রেখেছে এবং নিজেদেরকে এমনভাবে প্রকাশ করছে যেন মনে হয় তারাই সব কিছু করেছে। পাশ্চাত্য সমাজ আমাদেরকে মুসলিমদের জ্ঞানবিজ্ঞানে অবদান কোনোমতেই জানতে দিবে না বলেই মুসলিমদের নাম বিকৃত করে আমাদের সামনে পেশ করেছে, যেমন-
(১) আল-রাজীর নাম বিকৃত নাম করে বলে রাজম।
(২) ইবনে সিনার বিকৃত নাম ইভান সিনা (হিব্রুতে) এভি সিনা (ল্যাটিন)।
(৩) আল-খাওয়ারিজমীর বিকৃত নাম আল-গরিটাস, আল-গরিজম, আল-গরিদম ইত্যাদি।
(৪) ইবনে হায়সামের বিকৃত নাম আল-হাজেন।
(৫) জাবির ইবনে হাইয়ান এর বিকৃত নাম জিবার।
(৬) আল-কিন্দীর বিকৃত নাম আল-কিন্দাস।
সুধী পাঠক! আপনি যদি বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগী হন তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে অভ্রান্ত নির্ভেজাল মেসেজ আল-কুরআন বেশি করে স্টাডি করুন। তাহলে আপনার সামনে বিজ্ঞানের নিগূঢ় তত্ত্ব ও রহস্য ভেসে উঠবে। এই যে দেখুন জিএম রাওউর বলেন, আল-কুরআন হচ্ছে জ্ঞান ও অনুপ্রেরণার উৎস। ডক্টর মরিস বুকাইলি একটি বিশ্বস্বীকৃত নাম, তিনি বলেন, আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের আবিষ্কার কুরআনের সত্যকে নতুন করে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করছে।
কুরআনের বৈজ্ঞানিক তথ্য সূক্ষ্মভাবে গবেষণা করলে এটা স্পষ্ট হয় যে, কুরআনের প্রত্যেকটি বর্ণ, শব্দ, সূরা, পারা, রুকূ, সিজদা বিজ্ঞানময় এবং কুরআনে আজ থেকে প্রায় ১৪০০ বছর পূর্বে সকল বিষয়ের বিজ্ঞানময় সমাধান পেশ করা হয়েছে, যা আমরা আজকের যুগে গবেষণার মাধ্যমে জানতে পারছি। তন্মধ্যে আমরা এখানে কিছু উদাহরণ পেশ করলাম। যেমন-
(১) চাঁদের নিজস্ব আলো নেই। এই থিওরি সূরা আল-ফুরক্বানের ৬১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে।
(২) বিগ ব্যাং থিওরি সম্পর্কে বলা হয়েছে সূরা আল-আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতে।
(৩) রাত-দিনের হ্রাস-বৃদ্ধির ব্যাপারে বলা হয়েছে সূরা লুক্বমানের ২৯ নম্বর আয়াতে।
(৪) ফিঙ্গারপ্রিন্ট তথা আঙুলের ছাপ দিয়ে মানুষকে চিহ্নিত করার রহস্য সম্পর্কে বলা হয়েছে সূরা আল-ক্বিয়ামাহ এর ৩৩ ও ৩৪ নম্বর আয়াতে।
(৫) চাঁদ ও সূর্যের নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণের রহস্য সম্পর্কে আলোচিত হয়েছে সূরা আল-আম্বিয়ার ৩৩ নম্বর আয়াতে।
পরিশেষে বলতে চাই, সভ্যতা বিনির্মাণে বিজ্ঞানের অবদান অসামান্য। এজন্য বিজ্ঞান দিয়ে ধর্ম মানার যৌক্তিকতা বোকামি বৈ কিছুই নয়; বরং ধর্ম দিয়ে বিজ্ঞান মানাই হলো কল্যাণকর এবং বুদ্ধিমানের কাজ। তাই বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষে বিজ্ঞানের কিংবদন্তি অবদান সঠিকভাবে বুঝে তার ব্যবহারে সচেষ্ট হওয়া একান্ত কাম্য।
তথ্যসূত্র :
১. উইকিপিডিয়া।
২. মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান- জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।
৩. বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান- ড. মরিস বুকাইলি।
৪. বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান- মুহাম্মদ নুরুল আমিন।
মাযহারুল ইসলাম
অধ্যয়নরত, দাওরায়ে হাদীছ, মাদরাসা দারুস সুন্নাহ, মিরপুর, ঢাকা।