কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত বনাম প্রচলিত ছালাত (পর্ব-২৪)

عَنْ أَبِى مَسْعُودٍ الْبَدْرِىِّ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لاَ تُجْزِئُ صَلاَةُ الرَّجُلِ حَتَّى يُقِيمَ ظَهْرَهُ فِى الرُّكُوعِ وَالسُّجُودِ».

আবু মাসঊদ আনছারী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কারো ছালাত সঠিক হয় না, যে পর্যন্ত সে রুকূ এবং সিজদায় তার পিঠ সোজা না করবে’।[1] এই হাদীছ প্রমাণ করে রুকূ এবং সিজদা ধীরস্থিরভাবে করতে হবে এবং একটা পরিমাণ মত সময় অবস্থান করতে হবে।

عَن شَقِيق قَالَ: إِنَّ حُذَيْفَةَ رَأَى رَجُلًا لَا يُتِمُّ رُكُوعَهُ وَلَا سُجُودَهُ فَلَمَّا قَضَى صَلَاتَهُ دَعَاهُ فَقَالَ لَهُ حُذَيْفَةُ: مَا صَلَّيْتَ. قَالَ: وَأَحْسَبُهُ قَالَ: وَلَوْ مِتَّ مِتَّ عَلَى غَيْرِ الْفِطْرَةِ الَّتِي فطر الله مُحَمَّدًا صلى الله عَلَيْهِ وَسلم.

শাক্বীক্ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হুযায়ফা রাযিয়াল্লাহু আনহু এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে তার রুকূ এবং সিজদা পূর্ণ করছে না। যখন সে তার ছালাত শেষ করল, তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, তুমি ছালাত আদায় করনি। শাক্বীক্ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি মনে করি তিনি তাকে এটাও বলেছেন যে, যদি তুমি এ অবস্থায় মারা যাও, তাহলে তোমার মরণ হবে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যে ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করা হয়েছে তার বাইরে অর্থাৎ আল্লাহ্র একত্বের উপর মরণ হবে না।[2] এই হাদীছ প্রমাণ করে যারা ছালাতে রুকূ এবং সিজদা ধীরস্থিরভাবে আদায় করে না, তাদের মরণ তাওহীদের উপর হবে না। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নিশ্চয় কোন মুছল্লী ৬০ বছর যাবৎ ছালাত আদায় করছে। কিন্তু তার ছালাত কবুল করা হচ্ছে না। সম্ভবত পূর্ণভাবে রুকূ করে কিন্তু সিজদা পূর্ণভাবে করে না অথবা সিজদা পূর্ণভাবে করে কিন্তু রুকূ পূর্ণভাবে করে না।[3]

বেলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি একজন লোককে দেখলেন, সে তার রুকূ এবং সিজদা পূর্ণভাবে করছে না। তখন তিনি বললেন, সে যদি এ অবস্থায় মারা যায়, তাহলে মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ধর্মের বাইরে মারা যাবে।[4] এই হাদীছে কঠোরভাবে বলা হয়েছে যে, রুকূ এবং সিজদা ধীরস্থিরভাবে করতে হবে। তাছাড়া তার মরণ ইসলামের উপর হবে না। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রুকূতে কুরআন পড়তে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘হে আলী! যে ব্যক্তি তার ছালাতে পিঠ সোজা করল না, সে হচ্ছে গর্ভবতী মহিলার মত, সে গর্ভবতী হল। অতঃপর যখন তার বাচ্চা প্রসবের সময় আসল, তখন বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেল। তখন সে গর্ভবতীও নয় আর বাচ্চার মাও নয়’।[5] এই হাদীছ প্রমাণ করে যারা রুকূ এবং সিজদা ধীরস্থিরভাবে করে না, তারা ছালাত আদায় করে কোন ফল পাবে না। আম্মার ইবনে ইয়াসের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘মানুষ ছালাত আদায় করে ফিরে যায় কিন্তু তার কোন নেকী লিখা হয় না। তবে তার ছালাতের নেকীর দশ ভাগের এক ভাগ অথবা নয় ভাগের এক ভাগ, আট ভাগের এক ভাগ, সাত ভাগের এক ভাগ, ছয় ভাগের এক ভাগ, পাঁচ ভাগের এক ভাগ, চার ভাগের এক ভাগ, তিন ভাগের এক ভাগ, অথবা দুই ভাগের এক ভাগ’।[6]

যে যত সুন্দর করে রুকূ-সিজদা করে ভয়-ভীতি নিয়ে ধীরস্থিরভাবে ছালাত আদায় করে তার তত বেশী নেকী হয়। যে যত কম বিনয়ী হয় তার তত কম নেকী হয়। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘ছালাত তিন ভাগে বিভক্ত। ওযূ তিন ভাগের এক ভাগ, রুকূ তিন ভাগের এক ভাগ, সিজদা তিন ভাগের এক ভাগ। যে ব্যক্তি সুন্দর করে ওযূ করবে, ধীরস্থিরভাবে রুকূ-সিজদা করবে তার ছালাত কবুল করা হবে এবং তার সমস্ত আমল কবুল করা হবে। আর যার ছালাত কবুল করা হবে না তার কোন আমলই কবুল করা হবে না’।[7] এই হাদীছ প্রমাণ করে যার রুকূ এবং সিজদা ঠিকমত হয় না তার ছালাত কবুল হয় না। আবু দারফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এ উম্মতের মধ্যে থেকে সর্বপ্রথম যেটা উঠানো হবে তা হচ্ছে বিনয়। এমন কি উম্মতের কোন বিনয়ী মানুষ থাকবে না’।[8] এই হাদীছ প্রমাণ করে মানুষের মধ্যে বিনয়ী হয়ে ছালাত আদায় করা কাজটি থাকবে না। মানুষ ধীরস্থিরভাবে রুকূ-সিজদা করবে না।

মুতাররিফ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তার পিতা বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ছালাত আদায় করতে দেখেছি তখন তার বুকের মধ্যে চাকা ঘুরার শব্দের ন্যায় কান্নার শব্দ হচ্ছিল।[9] এটা হচ্ছে ছালাতে বিনয়। আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, বদরের দিন মিক্বদাদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন পারস্যের লোক। সেদিন তুমি আমাদের সবাইকেই ঘুমাতে দেখেছো। তবে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকাল পর্যন্ত ছালাত আদায় করতে থাকেন এবং কাঁদতে থাকেন।[10] এই হাদীছ প্রমাণ করে ছালাতে বিনয়ী হচ্ছে কান্নাকাটি করা। উক্ববা ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে কোন মুসলিম সুন্দর করে ওযূ করে অতঃপর ছালাতে দাঁড়ায় অতঃপর ছালাতে যা বলে তা বুঝতে পারে; তাহলে সে ছালাত হতে ফিরে আসে সেই দিনের মত হয়ে যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছে’। এই হাদীছ প্রমাণ করে রুকূ-সিজদা ঠিক করে বিনয়ের সাথে ছালাত আদায় করলে অতীতের সব পাপ ক্ষমা হয়ে যায়।

সালামের বৈঠকে নিতম্বের উপর বসতে হবে :

প্রত্যেক যে বৈঠকে সালাম রয়েছে সেখানে নিতম্বের উপর বসা সুন্নত। আর এ বৈঠকে ডান পা খাড়া করে রাখতে হবে এবং বাম পা ডান পায়ের নীচ দিয়ে বের করে দিয়ে নিতম্বের উপর বসতে হবে। অনেকেই মনে করে দুই বৈঠকের শেষ বৈঠকে এভাবে বসতে হবে। আর অনেকেই মনে করে নিতম্বের উপর বসতে হবে না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালামের বৈঠকে নিতম্বের উপর বসতেন।[11]

عَن أبي حميد السَّاعِدِيّ قَالَ: فِي نَفَرٍ مِنْ أَصْحَابِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنَا أَحْفَظُكُمْ لِصَلَاةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَأَيْتُهُ إِذَا كَبَّرَ جَعَلَ يَدَيْهِ حِذَاءَ مَنْكِبَيْهِ وَإِذَا رَكَعَ أَمْكَنَ يَدَيْهِ مِنْ رُكْبَتَيْهِ ثُمَّ هَصَرَ ظَهْرَهُ فَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ اسْتَوَى حَتَّى يَعُودَ كُلُّ فَقَارٍ مَكَانَهُ فَإِذَا سَجَدَ وَضَعَ يَدَيْهِ غَيْرَ مُفْتَرِشٍ وَلَا قَابِضِهِمَا وَاسْتَقْبَلَ بِأَطْرَافِ أَصَابِعِ رِجْلَيْهِ الْقِبْلَةَ فَإِذَا جَلَسَ فِي الرَّكْعَتَيْنِ جَلَسَ على رجله الْيُسْرَى وَنصب الْيُمْنَى وَإِذا جَلَسَ فِي الرَّكْعَةِ الْآخِرَةِ قَدَّمَ رِجْلَهُ الْيُسْرَى وَنَصَبَ الْأُخْرَى وَقَعَدَ عَلَى مَقْعَدَتِهِ.

আবু হুমায়েদ সা‘য়েদী একদল ছাহাবীর মাঝে বললেন, আমি আপনাদের চেয়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত অধিক স্মরণ রেখেছি, আমি তাঁকে দেখেছি তিনি যখন তাকবীর বলতেন, তখন দু’হাত দু’কাঁধ বরাবর উঠাতেন এবং যখন রুকূ করতেন, তখন দু’হাত দ্বারা দু’হাঁটু শক্ত করে ধরতেন এবং পিঠকে নত করে নিতম্ব ঘাড় বরাবর সোজা রাখতেন আর যখন মাথা উঠাতেন, ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়াতেন যাতে প্রত্যেক জোড়ের মাথা স্বস্থানে আসতে পারে। অতঃপর যখন সিজদা করতেন, তখন দু’হাত (কুকুরের মত) মাটিতে বিছাতেন না এবং দু’হাত পেটের সাথে লাগাতেন না। আর আঙ্গুলের মাথা কিবলামুখী করতেন। অতঃপর যখন দুই রাক‘আতে বসতেন, তখন বাম পায়ের পাতার উপর বসতেন এবং ডান পা খাড়া করে রাখতেন আর যখন যে রাক‘আতে বসতেন, তখন নিতম্বের উপর বসতেন।[12] এই হাদীছ দু’টি প্রমাণ করে প্রত্যেক যে রাক‘আতে সালাম আছে তাতে নিতম্বের উপর বসা সুন্নত।

কেউ কেউ মনে করে, যেসব ছালাতে দু’টি বৈঠক আছে তার শেষ বৈঠকে নিতম্বের উপর বসতে হবে। আবু ক্বাতাদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যখন দুই রাক‘আত পড়ে বসবে, তখন বাম পায়ের পাতার উপর বসবে আর যখন শেষ বৈঠকে বসবে তখন নিতম্বের উপর বসবে।[13] মুহাম্মাদ ইবনে আমর আমেরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বৈঠকে ছিলাম, বৈঠকে তিনি বললেন, যখন দুই রাক‘আতে বসবে তখন বাম পায়ের পেটের উপর বসবে আর ডান পা খাড়া করে রাখবে। আর যখন চতুর্থ রাক‘আতে বসবে তখন বাম নিতম্ব মাটিতে বিছিয়ে দিবে আর একদিকে দুই পা বের করে দিবে।[14]

সাহো সিজদার জন্য ডানে একবার সালাম ফিরানোর পর তাশাহহুদ পড়ে দুইটি সিজদা দিয়ে সালাম ফিরানো এক অভিনব পদ্ধতি যা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেননি, ছাহাবীগণ করেননি, তাবেঈগণ করেননি এমনকি তাবে-তাবেঈগণও করেননি। একদিকে সালাম ফিরানোর পর দু’টি সাহো সিজদা দেয়ার কোন জাল, যঈফ, ভুয়া হাদীছও নযরে পড়ে না। সন্দেহ হলে সাহো সিজদা করবে।[15] সন্দেহ হলে দৃঢ়তার উপর নির্ভর করে রাক‘আত পূর্ণ করে সাহো সিজদা দিবে।[16] ছালাত বেশী হলে অথবা কমে গেলে সাহো সিজদা করতে হয়।[17] তাশাহহুদ ছুটে গেলে সাহো সিজদা দিতে হয়।[18]

ভুল সংশোধন করে দু’টি সাহো সিজদা দিয়ে সালাম ফিরাতে হবে।[19] ক্বিরাআতে ভুল হলে কোন সাহো সিজদা নেই। কারণ এর কোন প্রমাণ নেই।

তাশাহহুদে বসে শাহাদাত আঙ্গুল সর্বদা নাড়াতে হবে :

তাশাহহুদ বা সালামের বৈঠকে বসে একবার আঙ্গুল উঠানোর কোন হাদীছ নেই। এ ব্যাপারে কোন জাল-যঈফ এমনকি ভুয়া হাদীছও নেই। ‘লা-ইলাহা’ বলার সময় অথবা ‘ইল্লাল্লাহ’ বলার সময় আঙ্গুল উঠানোর মতামত পেশ করে থাকেন। বৈঠকের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আঙ্গুল নাড়াতে হবে- এটাই সুন্নাত। ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাশাহহুদ পড়ার জন্য বসতেন তখন বাম হাতকে বাম হাঁটুর উপর এবং ডান হাতকে ডান হাঁটুর উপর রাখতেন। এসময় তেপ্পান্ন বন্ধের ন্যায় আঙ্গুল বন্ধ করতেন আর শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করতেন। ওয়ায়েল ইবনে হুজর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাম পা বিছিয়ে দিলেন এবং বাম হাতকে বাম উরুর উপর রাখলেন, এভাবে তিনি ডান কনুইকে ডান উরুর উপর বিছিয়ে রাখলেন এবং কনিষ্ঠা ও অনামিকা বন্ধ করলেন এবং মধ্যমা ও বৃদ্ধা দ্বারা একটি বৃত্ত করলেন এবং তর্জনী উঠালেন। এসময় আমি তাকে দেখলাম তিনি আঙ্গুল উঠাচ্ছেন এবং নাড়াচ্ছেন এবং দু‘আ করছেন। আবযা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতে তার শাহাদাত আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করতেন।[20] এই হাদীছ প্রমাণ করে শাহাদাত আঙ্গুল অবিরাম নাড়াতে থাকবে। আঙ্গুল নাড়ানো যাবে না মর্মে হাদীছটি যঈফ।[21]

২য় সালামের শেষে ‘ওয়া বারাকাতুহু’ যোগ করা যাবে না :

সালাম ফিরানোর সময় শুধু ডান দিকের সালামের সাথে ‘ওয়া বারাকাতুহু’ যোগ করা যাবে। বাম দিকে যোগ করা যাবে না।

عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلٍ عَنْ أَبِيهِ قَالَ صَلَّيْتُ مَعَ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم فَكَانَ يُسَلِّمُ عَنْ يَمِينِهِ السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ. وَعَنْ شِمَالِهِ السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَةُ اللَّهِ.

আলক্বামা ইবনে ওয়ায়েল রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তার পিতা বলেন, আমি নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছালাত আদায় করেছি তিনি তার ডান দিকে সালাম ফিরালেন ‘আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’ আর তিনি তার বাম দিকে সালাম ফিরালেন ‘আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলে।[22] এই হাদীছ দ্বারা প্রমাণ হয় বাম দিকে ‘ওয়া বারাকাতুহু’ যোগ করা যাবে না।

সুধী পাঠক! আপনাদের জেনে রাখা ভাল হবে যে, বুলূগুল মারামে আবুদাঊদের বরাত দিয়ে দুই দিকেই ‘ওয়া বারাকাতুহু’ বলা যাবে বলে যে হাদীছ পেশ করা হয়েছে তা ভুল হয়ে আছে। মূল আবুদাঊদে তা নেই। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে এমনভাবে সালাম ফিরাতেন এবং বলতেন, ‘আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ যাতে তার বাম গালের শুভ্রতা দেখা যেত।[23] এই হাদীছ প্রমাণ করে ‘ওয়া বারাকাতুহু’ বাদ দিয়ে দুই দিকে একই রকম বলা উত্তম। অর্থাৎ দুই দিকে হবে ‘আস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’।

সালাম ফিরানোর পর ইমামকে ডানে অথবা বামে ঘুরে বসতে হবে:

সালাম ফিরানোর পর ইমাম কিবলামুখী হয়ে বসে থাকতে পারবেন না। ডানে বা বামে ঘুরে বসতে হবে। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালামের পর ডান দিকে ফিরে বসতেন।[24] এই হাদীছ প্রমাণ করে সালাম ফিরানোর পর ডান দিকে মুখ করে বসা সুন্নাত। বারা ইবনে আযেব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা যখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে ছালাত আদায় করতাম তখন তাঁর ডান দিকে থাকতে ভালোবাসতাম যাতে তিনি আমাদের দিকে মুখ করে বসেন।[25] এই হাদীছ প্রমাণ করে সালাম ফিরানোর পর ডান দিকে ফিরে বসতে হবে। সবসময় মুখোমুখি বসতে হবে এ মন্তব্য ঠিক নয়। তবে কথা বলার প্রয়োজন হলে সালাম ফিরানোর পর মুখোমুখি বসতে হবে।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাত আদায় করালেন, অতঃপর যখন সালাম ফিরালেন তখন কেউ তাকে বলল, হে আল্লাহ্র রাসূল! ছালাতের মধ্যে কিছু ঘটেছে কি? তিনি বললেন, কী হয়েছে? ছাহাবীগণ বললেন, আপনি এত এত রাক‘আত ছালাত আদায় করলেন, তখন তিনি পা ঘুরিয়ে বসলেন এবং ক্বিবলামুখী হলেন, অতঃপর দুই সিজদা দিলেন, সালাম ফিরালেন এবং বললেন ছালাতে কিছু ঘটলে আমি তোমাদের বলে দিতাম। তবে আমি তোমাদের মত মানুষ। আমার ভুল হয়, যেমন তোমাদের ভুল হয়। আমার ভুল হলে তোমরা আমাকে স্মরণ করে দিও। তোমাদের কারো ছালাতে সন্দেহ হলে সঠিক খুঁজবে অতঃপর তা পূর্ণ করবে। অতঃপর সালাম ফিরাবে এবং দুইটি সিজদা দিবে।[26] এই হাদীছ প্রমাণ করে কথা বলার প্রয়োজন হলে মুক্তাদীর দিকে মুখ করে বসবে। হুমায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি আংটি তৈরি করেছিলেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর তিনি এশার ছালাত অর্ধরাত পর্যন্ত দেরী করলেন। তারপর তিনি আমাদেরকে ছালাত আদায় করালেন এবং আমাদের দিকে মুখ করে বসলেন। তিনি বললেন, ‘মানুষ ছালাত আদায় করে ঘুমিয়ে গেছে আর তোমরা ছালাতের জন্য অপেক্ষা করছো’। তখন আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আংটির সাদাটা দেখছিলাম।[27] এই হাদীছ প্রমাণ করে কথা বলার প্রয়োজন হলে সালাম ফিরানোর পর মুক্তাদীর দিকে মুখ করে বসতে হবে।

عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِىِّ أَنَّهُ قَالَ صَلَّى لَنَا رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَلاَةَ الصُّبْحِ بِالْحُدَيْبِيَةِ عَلَى إِثْرِ سَمَاءٍ كَانَتْ مِنَ اللَّيْلَةِ ، فَلَمَّا انْصَرَفَ أَقْبَلَ عَلَى النَّاسِ فَقَالَ «هَلْ تَدْرُونَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ». قَالُوا اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ «أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِى مُؤْمِنٌ بِى وَكَافِرٌ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللَّهِ وَرَحْمَتِهِ فَذَلِكَ مُؤْمِنٌ بِى وَكَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا فَذَلِكَ كَافِرٌ بِى وَمُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ».

যায়েদ ইবনু খালিদ জুহানী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে বৃষ্টি হবার পর হুদায়বিয়াতে আমাদের নিয়ে ফজরের ছালাত আদায় করলেন। ছালাত শেষ করে তিনি লোকদের দিকে ফিরে বললেন, তোমরা কি জানো, তোমাদের পরাক্রমশালী ও মহিমাময় প্রতিপালক কি বলেছেন? তাঁরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই বেশি জানেন। আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (রব) বলেন, আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি মুমিন হয়ে গেল এবং কেউ কাফির। যে বলেছে, অল্লাহ্র করুণা ও রহমতে আমরা বৃষ্টি লাভ করেছি, সে হল আমার প্রতি বিশ্বাসী এবং নক্ষত্রের প্রতি অবিশ্বাসী। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে আমাদের উপর বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমার প্রতি অবিশ্বাসী হয়েছে এবং নক্ষত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়েছে।[28]

عَنِ الْبَرَاءِ قَالَ خَرَجَ النَّبِىُّ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ أَضْحًى إِلَى الْبَقِيعِ فَصَلَّى رَكْعَتَيْنِ، ثُمَّ أَقْبَلَ عَلَيْنَا بِوَجْهِهِ وَقَالَ «إِنَّ أَوَّلَ نُسُكِنَا فِى يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نَبْدَأَ بِالصَّلاَةِ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَقَدْ وَافَقَ سُنَّتَنَا، وَمَنْ ذَبَحَ قَبْلَ ذَلِكَ فَإِنَّمَا هُوَ شَىْءٌ عَجَّلَهُ لأَهْلِهِ، لَيْسَ مِنَ النُّسُكِ فِى شَىْءٍ». فَقَامَ رَجُلٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنِّى ذَبَحْتُ وَعِنْدِى جَذَعَةٌ خَيْرٌ مِنْ مُسِنَّةٍ. قَالَ «اذْبَحْهَا، وَلاَ تَفِى عَنْ أَحَدٍ بَعْدَكَ».

বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ঈদুল আযহার দিন বাকী‘তে (নামক কবরস্থানে) যান। অতঃপর তিনি দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করে আমাদের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং তিনি বললেন, আজকের দিনের প্রথম ‘ইবাদত হল ছালাত আদায় করা। অতঃপর ফিরে গিয়ে কুরবানী করা। যে ব্যক্তি এরূপ করবে সে আমাদের নীতি অনুযায়ী কাজ করবে। আর যে এর পূর্বেই যবেহ করবে তা হলে তার যবেহ হবে এমন একটি কাজ, যা সে নিজের পরিবারবর্গের জন্যই তাড়াতাড়ি করে ফেলেছে, এর সাথে কুরবানীর কোন সম্পর্ক নেই। তখন এক ব্যক্তি (আবু বুরদাহ ইবনু নিয়ার রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি (পূর্বেই) যবেহ করে ফেলেছি। এখন আমার নিকট এমন একটি মেষশাবক আছে যা পূর্ণবয়স্ক মেষের চেয়ে উত্তম। (এটা কুরবানী করব কি?) তিনি বললেন, এটাই যবেহ কর। তবে তোমার পর আর কারো জন্য তা যথেষ্ট হবে না।[29]


[1]. আবুদাঊদ, হা/৮৫৫; মিশকাত, হা/৮৭৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৮১৮।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৮৯; মিশকাত, হা/৮৮৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৮২৪।

[3]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বাহ, হা/২৯৬৩; তারগীব, হা/৫২৯।

[4]. তাবারানী, তাগরীব, হা/৭১৪।

[5]. আবু ঈয়ালা, তারগীব, হা/৭১৭।

[6]. আবুদাঊদ, নাসাঈ, তারগীব, হা/৭২৩।

[7]. মুসনাদে বাযযার, তারগীব, হা/৭২৫।

[8]. তাবারানী, তারগীব, হা/৭৩২।

[9]. আবুদাঊদ, তারগীব, হা/৭৩৪।

[10]. ইবনে খুযায়মা, তারগীব, হা/৭৩৫।

[11]. আবুদাঊদ, হা/৯৬৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৭৪৫।

[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৮২৮; মিশকাত, হা/৭৯২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৭৩৬।

[13]. আবুদাঊদ, হা/৯৬৪।

[14]. আবুদাঊদ, হা/৯৬৫।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৩২; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৯; মিশকাত, হা/১০১৪।

[16]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭১; মিশকাত, হা/১০১৫।

[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৪০১; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭২; মিশকাত, হা/১০১৬।

[18]. ছহীহ বুখারী, হা/৮২৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৭০; মিশকাত, হা/১০১৮।

[19]. ছহীহ মুসলিম, মিশকাত, হা/১০২২।

[20]. আহমাদ, হা/১৫৪০৫, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩১৮১।

[21]. আবুদাঊদ, হা/৯৮৯।

[22]. আবুদাঊদ, হা/৯৯৭।

[23]. আবুদাঊদ, হা/৯৯৬; মিশকাত, হা/৯৫০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৮৮৯।

[24]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫৮২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৮৮৪।

[25]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭০৮; মিশকাত, হা/৯৪৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৮৮৬।

[26]. ছহীহ বুখারী, হা/৪০১।

[27]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬১।

[28]. ছহীহ বুখারী, হা/৮৪৬।

[29]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৭৬।

Magazine