প্রখর গ্রীষ্ম মানেই শুধু অস্বস্তি নয়; এটি নানা রোগেরও বাহক। এ সময় ডায়রিয়া, হজমের গোলযোগের পাশাপাশি নীরবে বাড়তে থাকে জন্ডিসের ঝুঁকি। দূষিত পানি, রাস্তার শরবত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বর্ষা বা বন্যার সময় পানি দূষণ বেড়ে গেলে এই আশঙ্কা আরও গভীর হয়। তাই জন্ডিসকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই; অবহেলা করলে তা গুরুতর জটিলতায় রূপ নিতে পারে।
জন্ডিস: একটি লক্ষণ, একটি সতর্কবার্তা
জন্ডিস মূলত কোনো স্বতন্ত্র রোগ নয়; বরং শরীরের ভেতরের সমস্যার একটি প্রকাশ। রক্তে বিলিরুবিন নামক রঞ্জকের মাত্রা বেড়ে গেলে ত্বক, চোখ ও প্রস্রাব হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
এই অবস্থা তৈরি হয় বিভিন্ন কারণে—রক্তকণিকার অস্বাভাবিক ভাঙন, লিভারের প্রদাহ, অথবা পিত্তনালীর বাধা—সবই জন্ডিসের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
কেন বাড়ে ঝুঁকি?
গরমের সময় পানিবাহিত ভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’ ভাইরাস দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটায়। এছাড়া—
- লিভারের দীর্ঘমেয়াদি রোগ।
- কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।
- রক্তজনিত অসুখ।
- ক্যানসার বা জেনেটিক সমস্যা এসব কারণেও জন্ডিস দেখা দিতে পারে।
লক্ষণগুলো চিনে নিন:
জন্ডিস শরীরকে আগে থেকেই সংকেত দেয়—
- চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া।
- প্রস্রাবের রং গাঢ় হওয়া।
- অরুচি, বমি ভাব।
- দুর্বলতা ও জ্বর।
- পেটব্যথা বা চুলকানি।
- পায়খানার রং পরিবর্তন।
কখনো কখনো মারাত্মক লক্ষণও দেখা দিতে পারে, যা অবহেলা করা বিপজ্জনক।
নবজাতকের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা:
জন্মের পর অনেক শিশুরই সাময়িক জন্ডিস হতে পারে, যা সাধারণত স্বাভাবিক। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরী—
- খুব দ্রুত জন্ডিস দেখা দেওয়া।
- দীর্ঘদিন স্থায়ী হওয়া।
- শিশুর খাওয়ার অনীহা বা জ্বর।
এই সময়ে মায়ের দুধই শিশুর জন্য সর্বোত্তম ও অপরিহার্য।
প্রতিরোধ: পরিচ্ছন্নতা ও সংযম
- বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান করা।
- রাস্তার খোলা খাবার ও শরবত পরিহার করা।
- হাত পরিষ্কার রাখা।
- নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন নিশ্চিত করা।
- অবৈধ ও অনিরাপদ সম্পর্ক থেকে বিরত থাকা।
- শরীরের ওজন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা।
জন্ডিসে খাদ্যাভ্যাস:
রোগাক্রান্ত অবস্থায় খাদ্য হতে হবে সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর—
- শস্যজাত খাবার, ডাল, মাছ ও মুরগি।
- তাজা শাকসবজি ও ফল।
- লেবু বা ডাবের পানি।
- পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি।
অন্যদিকে এড়িয়ে চলতে হবে— অতিরিক্ত তেল-মসলা, মিষ্টি, লাল মাংস ও ক্ষতিকর চর্বিযুক্ত খাবার।
শেষকথা:
স্বাস্থ্য আল্লাহর এক মহান নেয়ামত। এর যত্ন নেওয়া আমাদের দায়িত্ব। জন্ডিসের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরী। নিজের মনগড়া চিকিৎসা নয়, বরং সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা ও সঠিক জীবনযাপনই হতে পারে সুস্থতার পথ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুস্থতা ও নিরাপত্তা দান করুন।
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।
