কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

বর্ষায় বাড়ছে শিশুদের ডায়রিয়ার প্রকোপ: প্রয়োজন সচেতনতা

post title will place here

বাংলা দিনপঞ্জির দ্বিতীয় ঋতু বর্ষা। আষাঢ় ও শ্রাবণজুড়ে প্রকৃতিতে নেমে আসে বৃষ্টির সজীবতা। কিন্তু এই বর্ষাকাল শুধু প্রশান্তিই বয়ে আনে না, সঙ্গে নিয়ে আসে নানা রোগব্যাধির ঝুঁকিও। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ এ সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গৃহবন্দি মানুষ থেকে শুরু করে কর্মজীবী, শিশু কিংবা বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষই বর্ষাকালে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়ে। তবে চলতি বছর সময়ের আগেই দেশের নানা অঞ্চলে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। ডায়রিয়ার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো পর্যাপ্ত স্যালাইন ও তরলজাতীয় খাবার খাওয়ানো। কারণ স্যালাইন ডায়রিয়া বন্ধ না করলেও শরীরের পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করে পানিশূন্যতা রোধ করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে স্যালাইন তৈরির সঠিক নিয়ম না জানার কারণে শিশুদের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। কখনো কখনো এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এমনকি মৃত্যুও ঘটতে পারে।

গ্রাম কিংবা শহর, ঝুঁকিতে সবাই:

বর্ষাকালে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট দেখা দেয়। নদী-নালা, খাল-বিল উপচে পড়ে এবং টিউবওয়েলসহ বিশুদ্ধ পানির উৎসগুলো ডুবে যায়। শহরাঞ্চলেও বৃষ্টির পানি ড্রেনের নোংরা পানির সঙ্গে মিশে পরিবেশ দূষিত করে তোলে। রাস্তাঘাট ও বাজারগুলো নোংরা পানিতে সয়লাব হয়ে পড়ে।

বিশেষ করে কাঁচাবাজারের মাছ, মাংস, শাক-সবজি ও ফলমূল দূষিত পানির সংস্পর্শে এসে জীবাণুযুক্ত হয়ে ওঠে। এসব খাবার যথাযথভাবে পরিষ্কার না করে খেলে পেটের নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। মূলত হেপাটাইটিস এ, রোটা ভাইরাস, কলেরা, স্যালমোনেলা ও ই-কোলাই জাতীয় জীবাণু শিশুদের ডায়রিয়ার জন্য দায়ী। আর বর্ষাকাল এসব জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

ভাইরাসজনিত ডায়রিয়া:

হেপাটাইটিস এ: দূষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ায়। এটি যকৃৎ আক্রান্ত করে এবং শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এতে জ্বর, বমি, দুর্বলতা ও পেটব্যথাসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়।

রোটা ভাইরাস: রোটা ভাইরাস সাধারণত নবজাতক ও ছোট শিশুদের আক্রান্ত করে। প্রথমে পরিপাকতন্ত্রে সংক্রমণ হয়, পরে তা ডায়রিয়ায় রূপ নেয়।

অ্যাডিনো ভাইরাস: এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শিশুদের জ্বর, সর্দি-কাশির পাশাপাশি পেটের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

ব্যাকটেরিয়াজনিত ডায়রিয়া:

স্যালমোনেলা: দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে এ ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়। সালাদ, অপর্যাপ্ত রান্না করা খাবার ও দুগ্ধজাতীয় খাবারে এর উপস্থিতি বেশি থাকে। যেসব শিশু মুখে আঙুল দেয়, তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

ই-কোলাই: এটি অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে থাকলেও খাদ্য বা পানিদূষণের কারণে অতিরিক্ত সংক্রমণ ঘটিয়ে ডায়রিয়ার কারণ হতে পারে।

শিশুর ডায়রিয়ার লক্ষণ:

শিশুরা সাধারণত ঘন ঘন মলত্যাগ করে থাকে। তাই বারবার পায়খানা করলেই ডায়রিয়া হয়েছে, এমনটি ভাবা ঠিক নয়। তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে সতর্ক হতে হবে—

  • পানির মতো পাতলা পায়খানা হওয়া।
  • মলের দুর্গন্ধ বেড়ে যাওয়া।
  • পেটে ব্যথা ও মোচড়ানো।
  • মলের সঙ্গে রক্ত আসা।
  • বমি হওয়া।
  • হজমশক্তি কমে যাওয়া।
  • খাবারে অনীহা দেখা দেওয়া।
  • প্রস্রাব কমে যাওয়া।
  • জ্বর বা কাঁপুনি আসা।
  • শিশুর ওজন কমে যাওয়া।
  • অতিরিক্ত কান্নাকাটি ও খিটখিটে আচরণ।

শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে করণীয়:

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরী। বিশেষ করে পানিশূন্যতা যেন না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

  • ছয় মাসের কম বয়সী শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্যালাইন, ডাবের পানি ও ভাতের মাড় খাওয়ানো যেতে পারে।
  • পাকা কলা শিশুর জন্য উপকারী।
  • চাল, মুরগি ও কাঁচকলা দিয়ে তৈরি খিচুড়ি খাওয়ানো যেতে পারে।
  • গ্যাস বা অ্যালার্জি বাড়ায় এমন খাবার যেমন গরুর দুধ, বিস্কুট ও ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলা উচিত।
  • টকদই, পনির ও কলার মতো প্রোবায়োটিক খাবার উপকারী হতে পারে।

সচেতনতাই হতে পারে সুরক্ষা:

বর্ষাকালে শিশুদের সুস্থ রাখতে পরিচ্ছন্নতার বিকল্প নেই। বাইরে থেকে ঘরে ফিরেই শিশুদের সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত-মুখ ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। বাইরের অপরিষ্কার হাতে যেন খাবার না খায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। খাওয়ার আগে অবশ্যই হাত পরিষ্কার করার অভ্যাস করাতে হবে।

এ ছাড়া নিয়মিত অ্যান্টিসেপটিক সাবান দিয়ে গোসল করালে জীবাণুর সংক্রমণ অনেকাংশে কমে যায়। মনে রাখতে হবে, সামান্য সচেতনতা ও পরিচ্ছন্ন জীবনযাপনই শিশুদের ডায়রিয়াসহ নানা রোগব্যাধি থেকে নিরাপদ রাখতে পারে। তাই এ বিষয়ে পরিবার ও সমাজের সবাইকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

* চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

Magazine