কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

হাম: লক্ষণ, জটিলতা ও প্রতিরোধে করণীয়

post title will place here

দেশে আবারও ভাইরাসজনিত রোগ হাম (Measles)-এর প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, ফলে শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালে মাত্র তিন মাসেই ২৫০-এর বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে, যাদের বড় অংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বব্যাপীও হাম একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয় এবং এক লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অপুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এর ঝুঁকি আরও বেশি। এমন পরিস্থিতিতে হাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা, এর লক্ষণ ও জটিলতা সম্পর্কে সচেতনতা এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরী।

হামের ধরন:

হাম সাধারণত তিন ধরনের হয়ে থাকে।

সাধারণ হাম: জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে ফুসকুড়ি দেখা যায়। অধিকাংশ রোগী সঠিক পরিচর্যায় সুস্থ হয়ে ওঠে।

জটিল হাম: দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, তীব্র দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে এ ধরনের ঝুঁকি বেশি।

অপ্রচলিত হাম: উচ্চমাত্রার জ্বর, অস্বাভাবিক র‍্যাশ ও শরীরে তীব্র অস্বস্তি এর বৈশিষ্ট্য।

লক্ষণ:

হামের লক্ষণ সাধারণত ধাপে ধাপে প্রকাশ পায়। প্রথমে উচ্চ জ্বর, শুকনো কাশি ও নাক দিয়ে পানি পড়া শুরু হয়। এরপর চোখ লাল হয়ে যায় এবং আলোতে অস্বস্তি দেখা দেয়। পরবর্তী পর্যায়ে মুখে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

সম্ভাব্য জটিলতা:

হামকে সাধারণ রোগ মনে করে অবহেলা করা উচিত নয়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে— নিউমোনিয়া বা ফুসফুসে সংক্রমণ, এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কে প্রদাহ, ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা, অপুষ্টির মাত্রা বৃদ্ধি।

গবেষণায় দেখা গেছে, গুরুতর আক্রান্তদের একটি অংশ এসব জটিলতায় ভোগে এবং সময়মতো চিকিৎসা না পেলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।

শিশু সুরক্ষায় করণীয়:

হামে আক্রান্ত শিশুকে অন্তত ৮ থেকে ১০ দিন আইসোলেশনে রাখতে হবে। পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে নিয়মিত হাত ধোয়া, কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার মেনে চলা এবং ব্যবহার্য জিনিসপত্র পরিষ্কার রাখা জরুরী। শিশুকে ফলমূল, শাকসবজি, প্রোটিনসমৃদ্ধ ও সহজপাচ্য খাবার দিতে হবে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পানিশূন্যতা না হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রামও রোগমুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। চোখ পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে হবে এবং ফুসকুড়িযুক্ত স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?

নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে— শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খেতে বা পান করতে না পারা, তীব্র ডায়রিয়া।

যেসব শিশু বেশি ঝুঁকিতে: পাঁচ বছরের নিচের শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশু।

উপসংহার:

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে সচেতনতা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, যথাযথ পরিচর্যা এবং সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। হামের লক্ষণ, জটিলতা ও প্রতিরোধ সম্পর্কে অভিভাবকদের সঠিক ধারণা থাকলে একটি শিশুর জীবন রক্ষা করা সহজ হবে। তাই আতঙ্ক নয়; প্রয়োজন সচেতনতা, সতর্কতা এবং সময়োপযোগী ব্যবস্থা।

চিকিৎসক, কলাম লেখক ও গবেষক; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।

Magazine