কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ঈমান ও নিরাপত্তা লাভ: পবিত্র জীবনের ভিত্তি

post title will place here

[২১ যুলক্বা‘দাহ, ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ৮ মে, ২০২৬ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খআলী ইবনু আব্দুর রহমান আল-হুযায়ফী হাফিযাহুল্লাহউক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ড. আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথম খুৎবা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যাবতীয় প্রশংসা সেই পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল, প্রজ্ঞাময় ও কৃতজ্ঞতাপরায়ণ আল্লাহর জন্য। আমি আমার প্রতিপালকের দানকৃত জানা-অজানা সকল নেয়ামতের প্রশংসা করি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার ইলাহ নেই; তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি অন্তরের গোপন বিষয়সমূহ সম্পর্কে সর্বজ্ঞ। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী ও নেতা মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল, যিনি সকল নেক ও কবুলযোগ্য আমলের দিকে আহ্বানকারী ও পথপ্রদর্শক। হে আল্লাহ! আপনার বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সেই ছাহাবীদের উপর রহমত, শান্তি ও বরকত নাযিল করুন, যারা হেদায়াত ও নূরের অনুসরণ করেছেন।

অতঃপর, আপনারা আল্লাহকে ভয় করে চলুন। আনুগত্যপূর্ণ কাজ সম্পাদনের মাধ্যমে, প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এবং হারাম বিষয়সমূহ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে আল্লাহকে ভয় করুন; যাতে আপনারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করতে পারেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত অর্জনে সফল হতে পারেন।

হে মুসলিমগণ! পৃথিবীতে ইসলাম এসেছে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত প্রতিষ্ঠা করার জন্য এবং ইবাদতের মূলনীতি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করার জন্য। এছাড়াও, সৃষ্টির উপর আল্লাহর হক্ব, তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হক্ব এবং বান্দাদের একে অপরের প্রতি আবশ্যকীয় হক্বসমূহ স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য।

যাতে একজন মুসলিম প্রকৃত অর্থে আল্লাহর বান্দা হতে পারে এবং মহান আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, ছিদ্দীক্ব, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসেবে তারা হবে উত্তম’ (আন-নিসা, /৬৯)। আলেমগণ বলেন, সৎকর্মশীল সেই ব্যক্তি হলো, যে আল্লাহর হক্ব এবং বান্দাদের হক্ব যথাযথভাবে আদায় করে। ফলে সে তাশাহহুদে মুছল্লীদের এই দু‘আর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে, ‘হে আল্লাহ! আমাদের উপর এবং আল্লাহর সৎ বান্দাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক’।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকটাত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকটাত্মীয় প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে, যারা দাম্ভিক ও অহংকারী’ (আন-নিসা, /৩৬)। উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে বলেন, এ সকল আয়াতকে আয়াতুল হুকূক্ব তথা অধিকারসমূহের আয়াত বলা হয়’। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়ে ঘনিষ্ঠতর’ (আল-আহযাব,৩৩/৬)। মহান আল্লাহ অন্যত্র আরও বলেন, ‘মদীনার অধিবাসী ও তার আশপাশের মরুবাসীদের জন্য সংগত নয় যে, তারা রাসূলুল্লাহ থেকে পেছনে থেকে যাবে এবং রাসূলের জীবন অপেক্ষা নিজেদের জীবনকে অধিক প্রিয় মনে করবে’ (আত-তাওবা, /১২০)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাক, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো’ (আল-আনফাল, /১)

পৃথিবীতে ইসলামের বার্তা এসেছে নিরাপত্তা, শান্তি ও রহমত প্রতিষ্ঠা করার জন্য। এ দ্বীন সর্বপ্রথম মুসলিমের নিরাপত্তার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে এবং ঈমানের ভিত্তিসমূহ সুদৃঢ় করেছে। মহান আল্লাহ বরেন, ‘যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত’ (আল-আনআম, /৮২)

সুতরাং যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান অর্জন করে আল্লাহ তাকে যুলম থেকে রক্ষা করেন আর সবচেয়ে বড় যুলম হলো বিভিন্ন প্রকার শিরক। আল্লাহ তাকে গুনাহের মাধ্যমে নিজের উপর যুলম করা ও মানুষের উপর অত্যাচার করা থেকেও রক্ষা করেন আর তার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে পূর্ণ নিরাপত্তা রয়েছে। এটি আল্লাহ তাআলার এমন প্রতিশ্রুতি, যা কখনো ব্যর্থ হয় না। আর যার ঈমানে ঘাটতি থাকে এবং যে নিজের উপর বা অন্যের উপর কোনো যুলম করে, তার তাওহীদ ও সঠিক পথের উপর অবিচল থাকার ঘাটতির অনুপাতে দুনিয়া ও আখেরাতের নিরাপত্তা ও সুখ-শান্তি কমে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রেখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়। যারা ঈমান আনে এবং নেক আমল করে, তাদের জন্য রয়েছে সুখময় জীবন ও সুন্দর প্রত্যাবর্তনস্থল’ (আর-রা, ১৩/২৮-২৯)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘মুমিন পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে-ই সৎকাজ করবে, তাকে আমি অবশ্যই পবিত্র ও আনন্দময় জীবন দান করব এবং তাদেরকে তাদের কর্মের শ্রেষ্ঠ প্রতিদান প্রদান করব’ (আন-নাহল, ১৬/৯৭)

আর যখন মহান আল্লাহ কোনো দেশকে নিরাপত্তা ও শান্তির নেয়ামত দান করেন, তখন সেখানে দ্বীন প্রকাশ্য, শক্তিশালী ও সম্মানিত হয়ে ওঠে। ছালাত, জুমআ ও জামাআত যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের প্রয়োজন, ব্যবসা-বাণিজ্য, উপকার ও কল্যাণমূলক কার্যাবলি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হতে থাকে। মানুষ তাদের জীবন, সম্মান ও সম্পদের ব্যাপারে নিরাপত্তা অনুভব করে। তখন জনপদ উন্নত হয়, রাস্তাঘাট নিরাপদ হয়, শহরগুলোর মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা সুদৃঢ় হয় এবং বিভিন্ন দেশ মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আদান-প্রদান করতে সক্ষম হয়। জীবন-জীবিকা সহজ হয়ে যায়, সর্বত্র সমৃদ্ধি ছড়িয়ে পড়ে, সম্পদ বৃদ্ধি পায়, অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয় এবং প্রত্যেকে তার প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করতে পারে। সুতরাং নিরাপত্তার মধ্যেই সকল কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

আর যখন নিরাপত্তা বিনষ্ট হয়ে যায়, তখন সেখানে অকল্যাণ ও বিপর্যয় নেমে আসে। আল্লাহর কাছে আমরা নিরাপত্তা ও সুস্থতা কামনা করি। নিরাপত্তা লাভ ইসলাম পূর্ণতা পাওয়ার অন্যতম নিদর্শন।

খাব্বাব ইবনু আরাত রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কোনো বিষয়ে অভিযোগ করলাম। তখন তিনি কা‘বা ঘরের ছায়ায় তাঁর চাদরকে বালিশ বানিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। আমরা বললাম, (আমাদের জন্য কি) সাহায্য কামনা করবেন না? আমাদের জন্য কি দু‘আ করবেন না? তিনি বললেন, ‘তোমাদের পূর্বের লোকদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও ছিল যাকে ধরে নিয়ে তার জন্য যমিনে গর্ত করা হতো, তারপর করাত এনে মাথায় আঘাত হেনে দুই টুকরা করে ফেলা হতো। লোহার শলাকা দিয়ে তার গোশত ও হাড্ডি খসানো হতো। এতদসত্ত্বেও তাকে তার দ্বীন থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারত না। আল্লাহর কসম! এ দ্বীন অবশ্যই পূর্ণতা লাভ করবে। এমন হবে যে, সানআ থেকে হাযরামাওত পর্যন্ত ভ্রমণকারী ভ্রমণ করবে; অথচ সে আল্লাহ ব্যতীত কাউকে ভয় করবে না এবং নিজের মেষপালের জন্য বাঘের ভয় থাকবে। কিন্তু তোমরা তো তাড়াহুড়া করছ’।[1] আর এ ভবিষ্যদ্বাণী ইসলামের প্রারম্ভেই, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশাতেই দ্রুত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছিল।

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হে আদী! তুমি কি হীরা নামক স্থানটি দেখেছ?’ আমি বললাম, দেখি নাই, তবে স্থানটি আমার জানা আছে। তিনি বললেন, ‘তুমি যদি দীর্ঘজীবী হও; তবে দেখবে, একজন উষ্ট্রারোহী হাওদানশীল মহিলা হীরা হতে রওয়ানা হয়ে বায়তুল্লাহ শরীফে তাওয়াফ করে যাবে। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করবে না’। আদী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নিজে দেখেছি, এক উষ্ট্রারোহী মহিলা হীরা হতে একাকী রওয়ানা হয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেছে। অথচ সে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় করে না।[2] এটি সেই ব্যাপক নিরাপত্তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যার দ্বারা মানবজাতি উপকৃত ও সুখী হয়েছিল।

তালহা ইবনু উবায়দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন চাঁদ দেখে বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমাদের প্রতি চাঁদকে উদিত করো নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলামের উপর। (হে চাঁদ!) আমার রব ও তোমার রব এক আল্লাহ’।[3]

ইসলামের ইবাদতসমূহ কেবল নিরাপত্তার ছায়াতেই পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর নিশ্চয়ই ছালাত পূর্ণ নিরাপত্তার অবস্থাতেই আদায় করা হয়। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ছালাতসমূহ ও মধ্যবর্তী ছালাতের হেফাযত করো এবং আল্লাহর জন্য দাঁড়াও বিনীত হয়ে। কিন্তু যদি তোমরা ভয় কর, তবে হেঁটে কিংবা আরোহণ করে (আদায় করে নাও)। এরপর যখন নিরাপদ হবে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করো, যেভাবে তিনি তোমাদেরকে শিখিয়েছেন, যা তোমরা জানতে না’ (আল-বাক্বারা, ২/২৩৮-২৩৯)

আর যাকাতও কেবল নিরাপত্তার অবস্থাতেই আদায় করা সম্ভব। হজ্জ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যখন তোমরা নিরাপদ হবে, তখন যে ব্যক্তি উমরার পর হজ্জ সম্পাদনপূর্বক তামাত্তু করবে; তবে যে পশু সহজ হবে, তা যবেহ করবে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৯৬)

অতঃপর আল্লাহ তাআলা মাসজিদুল হারামে প্রবেশকারীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে বলেন, ‘নিশ্চয় প্রথম ঘর, যা মানুষের জন্য স্থাপন করা হয়েছে, তা মক্কায়। যা বরকতময় ও হেদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য। তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহীম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী’ (আলে ইমরান, ৩/৯৬-৯৭)

ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাঁর প্রতিপালকের কাছে এই পবিত্র স্থানকে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ এবং ফল-ফসলে সমৃদ্ধ করে দেওয়ার দু‘আ করেছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর স্মরণ করো, যখন ইবরাহীম বলল, হে আমার রব! আপনি এ শহরকে নিরাপদ করে দিন এবং আমাকে ও আমার সন্তানদেরকে মূর্তিপূজা থেকে দূরে রাখুন’ (ইবরাহীম, ১৪/৩৫)

আর মহান আল্লাহ উমরা পালনকারীদের নিরাপত্তার নেয়ামত দেওয়ার মাধ্যমে অনুগ্রহ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই আল্লাহ তাঁর রাসূলকে স্বপ্নটি যথাযথভাবে সত্যে পরিণত করেছেন। তোমরা ইনশা-আল্লাহ নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে, কারো মাথা মুণ্ডন করে এবং কারো চুল ছেঁটে; তোমরা থাকবে নির্ভয়’ (আল-ফাতহ, ৪৮/২৭)। এ বিষয়ে আরও বহু আয়াত ও প্রমাণ বিদ্যমান। আর জান্নাত কেবল নিরাপত্তার কারণেই সুন্দর ও পরিপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা এতে প্রবেশ করো শান্তিসহ ও নিরাপদে’ (আল-হিজর, ১৫/৪৬)

আর নিরাপত্তা আল্লাহর প্রতি সর্বদা কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে আবশ্যক করে; যাতে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ আরও বৃদ্ধি করেন এবং মানুষকে এমন গুনাহ ও পাপ থেকে সতর্ক থাকার তাওফীক্ব দান করেন, যা শাস্তি অবতীর্ণ হওয়ার কারণ হয়ে থাকে।

কারণ নেয়ামত যখন কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করা হয়, তখন তা স্থায়ী থাকে; আর যখন তাতে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়, তখন তা দূর হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব। আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, তবে নিশ্চয়ই আমার আযাব অত্যন্ত কঠিন’ (ইবরাহীম, ১৪/৭)

بارك اللهُ لي ولكم في القرآنِ العظيمِ، ونفعنا وإيَّاكم بما فيه من الآياتِ والذكرِ الحكيمِ.

দ্বিতীয় খুৎবা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক এবং মুত্তাক্বীদের অভিভাবক। আমি শুকরগুজার বান্দাদের ন্যায় আমার প্রতিপালকের প্রশংসা করি এবং তাঁর সেই সকল নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, যা আমরা জানি এবং যা আমরা জানি না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার ইলাহ নেই; তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও শক্তিধর। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের নবী ও নেতা মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বিশ্বস্ত বান্দা ও রাসূল।

অতঃপর, মহান আল্লাহকে ভয় করে চলুন এবং সর্বদা তাঁর শুকরিয়া ও যিকিরে মশগূল থাকুন। কেননা আমাদের প্রতিপালকই সর্বাধিক অধিকার রাখেন যে, তাঁর আনুগত্য করা হবে, কখনো তাঁর অবাধ্যতা করা হবে না, তাঁকে স্মরণ করা হবে, কখনো তাঁকে ভুলে যাওয়া হবে না এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে, কখনো তাঁর অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে না।

হে মুসলিমগণ! আপনারা বরকতময় দিন ও সম্মানিত মুহূর্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। তাই এগুলোকে সৎকর্মের মাধ্যমে পূর্ণ করুন এবং সময় ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বেই মৃত্যুপরবর্তী জীবনের জন্য সাধ্যানুযায়ী নেক আমল আগাম পাঠিয়ে দিন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের কল্যাণে উত্তম কাজ সামনে পাঠাও। আর আল্লাহর তাক্বওয়া অবলম্বন করো এবং জেনে রেখো, নিশ্চয় তোমরা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে। আর মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও’ (আল-বাক্বারা, ২/২২৩)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু অগ্রে প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছে উৎকৃষ্টতর ও মহত্তর প্রতিদানরূপে পাবে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (আল-মুযযাম্মিল, ৭৩/২০)

হে আদম সন্তান! যতক্ষণ আপনি সুস্থতার মধ্যে আছেন এবং সৎকর্ম করার সক্ষমতা রাখেন, ততক্ষণ আপনি আখেরাতের জন্য কাজ করতে থাকুন। ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এমন দুটি নেয়ামত আছে, যে দুটিতে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকাগ্রস্ত। তা হচ্ছে সুস্থতা আর অবসর’।[4] উবায়দুল্লাহ বিন মিহছান খাত্বমী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার ঘরে অথবা গোষ্ঠির মধ্যে নিরাপদে ও সুস্থ শরীরে সকাল করেছে এবং তার কাছে প্রতিদিনের খাবার আছে, তাকে যেন পার্থিব সমস্ত সম্পদ দান করা হয়েছে’।[5]


 [1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৯৪৩।

 [2]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৯৫।

 [3]. তিরমিযী, হা/৩৪৫১; মিশকাত, হা/২৪২৮, হাদীছ ছহীহ।

 [4]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪১২; তিরমিযী, হা/২৩২৪।

 [5]. তিরমিযী, হা/২৩৪৬।

Magazine