[২৮ জুমাদাল আখের, ১৪৪৭ হি. মোতাবেক ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খআহমাদ ইবনু আলী ইবনু আব্দির রহমান আল-হুযায়ফী হাফিযাহুল্লাহ। উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন ড.আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]
প্রথমখুৎবা
সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই এবং তাঁর নিকটেই ক্ষমা প্রার্থনা করি। আর আমরা নিজেদের নফসের খারাপী ও মন্দ কাজের ক্ষতি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করছি। আল্লাহ যাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, তাকে কেউ পথভ্রষ্ট করতে পারে না এবং যাকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন, তাকে হেদায়াত করার কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকারের কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো যেমনভাবে তাঁকে ভয় করা উচিত। আর তোমরা মুসলিম না হয়ে কখনো মরো না’ (আলেইমরান, ৩/১০২)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একই ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তা হতে তদীয় সহধর্মিণী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের উভয় হতে বহু নর ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর সেই আল্লাহকে ভয় করো, যার নামের দোহাই দিয়ে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক এবং আত্মীয়-জ্ঞাতিদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করো। নিশ্চয় আল্লাহই তত্ত্বাবধানকারী’ (আন-নিসা, ৪/১)। অন্যত্র আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজগুলোকে শুদ্ধ করে দেবেন এবং তোমাদের পাপগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই এক মহাসাফল্য অর্জন করল’ (আল-আহযাব, ৩৩/৭০-৭১)।
অতঃপর, হে ঈমানদার ভ্রাতৃমণ্ডলী! প্রকৃতপক্ষে তাক্বওয়াই আপনাদের প্রতিপালকের কাছে মর্যাদার মানদণ্ড আর পরকালে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয়ের মাপকাঠি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই লোকই অধিক সম্মাননীয় যে লোক অধিক মুত্তাক্বী’ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১৩)। অতএব, আপনারা তাক্বওয়ার পথে অবিচল থাকুন, তার আলোয় নিজেকে আলোকিত করুন। আর জেনে রাখুন! সুন্দর চরিত্র ব্যতীত উত্তম গুণাবলির সৌন্দর্য প্রকাশ পায় না এবং প্রশংসনীয় গুণাবলির চাঁদও পূর্ণতা পায় না।
অতএব, আপনারা আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীর সূক্ষ্ম ইঙ্গিতের প্রতি লক্ষ করুন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা দ্রুত অগ্রসর হও তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে, যার পরিধি আসমানসমূহ ও যমীনের সমান, যা মুত্তাক্বীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন’ (আলেইমরান, ৩/১৩৩-১৩৪)।
এখানে লক্ষ করুন, কীভাবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সৃষ্টির প্রতি সদাচরণকে মুত্তাক্বীদের গুণ হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং উন্নত চরিত্রের অধিকারীদের ‘মুহসিন’ বলে অভিহিত করেছেন। আর যে ব্যক্তি এমন গুণে গুণান্বিত, সে যেন তাক্বওয়া ও ইহসানের গুণের কারণে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর সান্নিধ্য ও সহায়তার সুসংবাদ গ্রহণ করে। যেমনটি মহান আল্লাহ নিজেই জানিয়েছেন এবং এ কথার মাধ্যমে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাদের সাথে রয়েছেন, যারা তাক্বওয়া অবলম্বন করে এবং যারা সৎকর্মশীল’ (আন-নাহল, ১৬/১২৮)।
অতএব, আপনারা কুরআনের সেই সূক্ষ্ম অর্থটির প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন, সেখানে কীভাবে আল্লাহ তাআলা তাক্বওয়া ও উত্তম চরিত্রের মধ্যে এক দৃঢ় ও গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। আর এ বিষয়টি আরও সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিম্নোক্ত বাণীতে, আবূ যার রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেছেন, ‘তুমি যেখানেই থাক আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো, মন্দ কাজের পরপরই ভালো কাজ করো, তাতে মন্দ দূরীভূত হয়ে যাবে এবং মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করো’।[1]
এছাড়াও আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রশ্ন করা হলো, কোন কর্মটি সবচেয়ে বেশি পরিমাণ মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে? তিনি বললেন, ‘আল্লাহভীতি, সদাচরণ ও উত্তম চরিত্র’।[2] নিশ্চয় তাক্বওয়া ও উত্তম চরিত্রের মধ্যকার এই দৃঢ় সম্পর্ক ও সুগভীর মর্মার্থ ইসলামের মাহাত্ম্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চ মর্যাদার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ইসলাম মানুষের জীবনের সব দিককে অন্তর্ভুক্ত করেছে, আর তার ব্যাপ্তি এতটাই বিস্তৃত যে, তা একজন মুসলিমের সম্পূর্ণ জীবনকে শামিল করে এবং মানুষের বাস্তব জীবনের ভেতরেই জীবন্ত হয়ে থাকে।
ইসলাম হলো আক্বীদা, আহকাম ও আচরণের সমন্বয়ে গঠিত একটি ধর্ম। ইসলাম কেবল বাহ্যিক ইবাদত ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কোনো ধর্ম নয়, বরং তা মানুষের লেনদেন ও পারস্পরিক আচরণে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় এবং বাস্তব আমল ও ব্যবহারিক জীবনে তা প্রতিফলিত হয়। এভাবে ইসলাম অন্তরের পবিত্রতা ও বাহ্যিক আচরণের শুদ্ধতা উভয়কেই একসঙ্গে সমন্বয় করে।
হে মুমিন নর ও নারীগণ! যখন এই মহান দ্বীন মানুষের অন্তরে নৈতিকতার মর্যাদা উঁচু করতে এবং মানুষের বাস্তব জীবনে তা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে যাতে মুসলিম তার নফসের পরিশুদ্ধতার মতোই বাহ্যিক আচরণেও উন্নত হয়। তার বিশ্বাস যেমন পরিশুদ্ধ হয়েছে তেমনি তার আচার-ব্যবহারও পরিশুদ্ধ হয়, তখন দ্বীন উত্তম চরিত্রকে ঈমানের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করেছে এবং একে ঈমানের পরিপূর্ণতার অংশ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে ঈমানে পরিপূর্ণ মুসলিম হচ্ছে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি। যেসব লোক নিজেদের স্ত্রীদের নিকট উত্তম, তারাই তোমাদের মধ্যে অতি উত্তম’।[3]
সুতরাং সৃষ্টিজগতের মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ ব্যতীত কোনো মুমিনের ঈমান পূর্ণতা লাভ করে না, যাতে তার নফস ও বাহ্যিক আচরণ উভয়ের সৌন্দর্য একত্রিত হয় এবং তার নফসের পবিত্রতা ও জীবনের আচরণগত চরিত্রের নির্মলতা একসঙ্গে পূর্ণতা পায়।
আর হাদীছের শেষ অংশে রয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করে’। উক্ত হাদীছে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এক সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে, তা হলো উত্তম চরিত্র ও উন্নত আচরণের প্রকৃত মানদণ্ড হলো এগুলো মানুষের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং স্বভাবের অংশ হয়ে যাওয়া। যাতে এই মহৎ নৈতিক গুণাবলি এমন সুপ্রতিষ্ঠিত বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়, যা ছোট-বড়, ধনী-গরীব, অধীন ও শাসক সবার মধ্যেই সমানভাবে প্রকাশ পায়। তখন আর মানুষ নিজের স্বার্থের টানে নিজের রূপ বদলায় না, সামান্য লাভের আশায় কৃত্রিম আচরণ করে না কিংবা ক্ষতি এড়ানোর জন্য ভান ধরে না; বরং সকল মানুষের সঙ্গেই তার উত্তম চরিত্র আন্তরিকতার সাথে স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়।
মানুষ যে ঘরটিতে বাস করে, সেটাই তার উত্তম চরিত্রের প্রকৃত মানদণ্ড ও অবিচল মাপকাঠি। কারণ ঘরই হলো সেই পরীক্ষাক্ষেত্র, যেখানে মানুষ কৃত্রিমতা ও ভান পরিত্যাগ করে তার স্বভাবজাত আচরণ করে থাকে। এ কারণেই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম’।[4]
নিশ্চয়ই মুমিন যখন উত্তম চরিত্রের মর্যাদা ও সৃষ্টির সাথে সুন্দর আচরণের ফযীলত সম্পর্কে জানতে পারে, দুনিয়া ও আখেরাতে তার মহৎ অবস্থান ও উচ্চ মর্যাদা উপলব্ধি করে এবং শরীআতের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর যে প্রতিদান নির্ধারণ করা হয়েছে তা অনুধাবন করে; তখন সে উত্তম চরিত্রকে আল্লাহর প্রতি ইবাদতের দৃষ্টান্ত হিসেবে, সৃষ্টির প্রতি শিষ্টাচারের মাধ্যম হিসেবে এবং আত্মশুদ্ধির উপায় হিসেবে ধারণ করে। এর মাধ্যমে সে নিজেকে সর্বোত্তম স্বভাব ও শ্রেষ্ঠ গুণাবলিতে অভ্যস্ত করে তোলে এবং স্বভাবতই সম্মানিত নফস ও উচ্চ মনোবল যেসব মন্দ স্বভাব ও হীন বৈশিষ্ট্য থেকে মুক্ত থাকে সেসব থেকে নিজের নফসকে নিরাপদ রাখে।
আবূ দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন (নেকী) ওযন করার দাঁড়িপাল্লায় সচ্চরিত্রের চেয়ে কোনো বস্তুই অধিক ভারী হবে না। আর আল্লাহ তাআলা অশ্লীল ও কটুভাষী ব্যক্তিকে অপছন্দ করেন’।[5] আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, ‘নিশ্চয়ই মুমিন ব্যক্তি তার ভালো চরিত্রের মাধ্যমে (দিনের) ছওম পালনকারী ও (রাতের) তাহাজ্জুদগুজারীর সমান মর্যাদা লাভ করতে পারে’।[6] এক্ষেত্রে আপনাদের জন্য রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিম্নোক্ত বাণীই যথেষ্ট, তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে আমার প্রিয়তম এবং ক্বিয়ামতের দিন অবস্থানে আমার নিকটতম ব্যক্তিদের কিছু সেইসব লোক হবে, যারা তোমাদের মধ্যে চরিত্রে শ্রেষ্ঠতম’।[7]
হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী বানাও, কারণ সর্বোত্তম চরিত্রের পথপ্রদর্শনকারী তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। আর আমাদের থেকে মন্দ চরিত্রসমূহ দূরে সরিয়ে দাও, কারণ মন্দ চরিত্র থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা তুমি ব্যতীত আর কারো নেই।
أقولُ هذا القولَ الذي سمعتُم، وأستغفرُ الله لي ولكم؛ إنه كان عَفُوَّا غفورًا.
দ্বিতীয়খুৎবা
অফুরন্ত অনুগ্রহ ও অঝোর ধারায় অবতীর্ণ নেয়ামতের জন্য যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য জ্ঞাপন করছি। এমন প্রশংসা জ্ঞাপন করছি, যার মাধ্যমে নেয়ামত বৃদ্ধি পায় এবং অবারিত অনুগ্রহ বর্ষিত হয়। অতঃপর দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ হোক তাঁর উপর, যাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন উত্তম শিষ্টাচার ও মহৎ চরিত্রের অধিকারী করে। আর তাঁর পরিবারবর্গ, তাঁর ছাহাবীগণ আর যারা ক্বিয়ামত দিবস পর্যন্ত উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছে তাদের সকলের উপর এমন দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক, যা ভোর ও সন্ধ্যায়, প্রভাত ও অপরাহ্ণে অবিরাম ধারায় প্রবাহিত হতে থাকবে; যতদিন পাখি কুহু কুহু স্বরে ডাকবে, মেঘমালা বৃষ্টিপাত করবে আর মৃদু বাতাস কোমল ও মনোরমভাবে বইবে।
অতঃপর, হে মুমিন নর ও নারীগণ! নিশ্চয়ই আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তম চরিত্র, উন্নত আচরণ ও মহান আদবের এক পরিপূর্ণ মানবিক আদর্শ। আর যখন আমরা কুরআনের সেসব আয়াত নিয়ে চিন্তা করি, যেগুলো এই সম্মানিত নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র সম্পর্কে আলোচনা করেছে, তখন আমরা আল্লাহর কিতাবে এমন একটি আয়াতের সন্ধান পাই, যাতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে যে, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কীভাবে সর্বোচ্চ গুণাবলি, সর্বশ্রেষ্ঠ কর্ম ও পূর্ণতার চূড়ান্ত স্তরে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নূন, কলমের শপথ আর লেখকেরা যা লেখে তার শপথ। তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহে তুমি পাগল নও। আর নিশ্চয় তোমার জন্য রয়েছে অফুরন্ত পুরস্কার। আর নিশ্চয় তুমি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত’ (আল-ক্বালাম, ৬৮/১-৪)।
আপনাদের জন্য আদর্শ হিসেবে তাঁর চরিত্রই যথেষ্ট, যাকে মহান আল্লাহ নিজেই অতিশয় মহৎ বলে গণ্য করেছেন। কুরআনুল কারীম অল্প কথায় তাঁর মহান চরিত্রের এমন সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছে, যার স্বল্প শব্দের মাঝেই নিহিত রয়েছে গভীর ও মহিমান্বিত অর্থ। এটা তাঁর যথার্থ প্রশংসা এবং এটি তাঁর সেই মহান চরিত্রকে সর্বাধিক সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এর বাস্তব ব্যাখ্যা আমরা পাই আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর জবাবের মধ্যে। যখন সা‘দ ইবনু হিশাম আয়েশা ছিদ্দীক্বা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর কাছে গমন করে জিজ্ঞেস করলেন, হে উম্মুল মুমিনীন! আমাকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘খুলূক্ব’ (স্বভাব-চরিত্র) ব্যাপারে কিছু বলুন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বললেন, তুমি কি কুরআন পড় না? আমি বললাম, হ্যাঁ পড়ি। এবার তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নৈতিকতা ছিল আল-কুরআন।[8] অর্থাৎ কুরআনে যে আদর্শ ও নৈতিকতা বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন তার জীবন্ত ও বাস্তব রূপ।
নিশ্চয় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ নৈতিকতা ও মহান শিষ্টাচারের ক্ষেত্রে উত্তম আদর্শ ও সর্বোত্তম অনুসরণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য, যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে’ (আল-আহযাব, ৩৩/২১)। তাঁর সমৃদ্ধ জীবনচরিত ছিল নৈতিকতার গুণাবলিতে সুবাসিত, যার মহান স্বভাবের বর্ষণময় মেঘ থেকে অবিরাম কল্যাণ ঝরে পড়ে তাঁর উপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
আর জেনে রাখুন! জুমআর দিন তাঁর উপর বেশি বেশি দরূদ ও সালাম পাঠ করা মুস্তাহাব (উত্তম)। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের সর্বোত্তম দিনগুলোর মধ্যে জুমআর দিনটি উৎকৃষ্ট। কাজেই এ দিনে তোমরা আমার প্রতি বেশি পরিমাণে দরূদ পাঠ করবে। কেননা তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়’।[9]
হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য যেটা ভালো জানেন, সেটাই আমরা চাই; যেটা খারাপ জানেন, তা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই; আর আমাদের সব ভুলের জন্য ক্ষমা চাই। নিশ্চয়ই আপনি সব গোপন বিষয় জানেন।
[1]. তিরমিযী, হা/১৯৮৭; মিশকাত, হা/৫০৮৩।
[2]. তিরমিযী, হা/২০০৪, সনদ হাসান।
[3]. তিরমিযী, হা/১১৬২, হাসান ছহীহ।
[4]. তিরমিযী, হা/৩৮৯৫।
[5]. তিরমিযী, হা/২০০২, হাদীছ ছহীহ।
[6]. আবূ দাঊদ, হা/৪৭৯৮, হাদীছ ছহীহ।
[7]. তিরমিযী, হা/২০১৮, হাদীছ ছহীহ।
[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৭৪৬; মিশকাত, হা/১২৫৭।
[9]. আবূ দাঊদ, হা/১৫৩১, হাদীছ ছহীহ।
