কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

প্রশ্ন (৩০): রুকইয়া করে অর্থ উপার্জন করা বা রুকইয়া করাকে কি পেশা হিসেবে গ্রহণ করা যাবে?

উত্তর: রুকইয়া একটি শরীআতসম্মত আমল, যা অসুস্থতা থেকে আরোগ্য লাভসহ যেকোনো অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে কুরআন মাজীদের সূরা, আয়াত, হাদীছে বর্ণিত দু‘আ ইত্যাদি পড়ে ঝাড়ফুঁক করার মাধ্যমে করা হয়। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে নিজের উপর রুকইয়া করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৪৪৩৯) এবং ছাহাবীদের উপরও রুকইয়া করতেন (ছহীহ বুখারী, হা/৩৩৭১)। ছাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম কারো চাহিদার ভিত্তিতে তার উপর রুকইয়া করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫০০৭)। উল্লিখিত আলোচনা থেকে বুঝা যায়, রুকইয়া একটি শরীআতসম্মত আমল। কিন্তু এটি কোনো পেশা বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়। বরং রুকইয়ার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর অনুমোদিত পদ্ধতি অবলম্বন করে নিজে উপকৃত হওয়া এবং অন্যের উপকার করা। এ প্রসঙ্গে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, من استطاع منكم أن ينفع أخاه فليفعل ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি (রুকইয়ার মাধ্যমে) তার ভাইকে উপকৃত করার সক্ষমতা রাখে, সে যেন অবশ্যই তা করে’ (ছহীহ মুসলিম, হা/২১৯৯)। এ হাদীছ থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, রুকইয়ার উদ্দেশ্য উপকার করা, অর্থ উপার্জন করা নয়। তবে রুকইয়ার উপর যদি কেউ স্বাভাবিক হাদিয়া প্রদান করে তা গ্রহণ করা যায়, নির্ধারিত ফি হিসেবে নয়। যেমন- কোনো এক গোত্রের সরদারকে সাপে কাটার পর এক ছাহাবী তার ঝাড়ফুঁক করলে তারা ছাগল হাদিয়া দিয়েছিল এবং ছাহাবীগণ তা গ্রহণ করেছেন (ছহীহ বুখারী, হা/৫০০৭)।

বর্তমানে রুকইয়াকে কেন্দ্র করে যেসব অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে তা খুবই দুঃখজনক। এসব অসঙ্গতির মূল কারণ হলো রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা। হিজরী প্রথম তিন শতাব্দী, যা হাদীছের ভাষ্যমতে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ তিন শতাব্দী, এই সময়ের মনীষীদের কেউ রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না। অথচ রুকইয়ার বিষয়টি নববী যুগ থেকে অদ্যাবধি চলমান রয়েছে। এছাড়াও যেসকল কারণে রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা নাজায়েয তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-

১. রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলে এবং এটাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানালে রুকইয়ার মূল উদ্দেশ্য ব্যহত হয়। কারণ এর মূল উদ্দেশ্য হলো নিজে উপকৃত হওয়া এবং অন্যের উপকার করা (ছহীহ মুসলিম, হা/২১৯৯)।

২. বর্তমানে রাকীরা (রুকইয়াকারী) রুকইয়ার মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের জন্য এতটাই উন্মাদ হয়ে গেছে যে, সাধারণ মানুষের কোনো সমস্যার কথা শুনলেই সেটাকে জিন বা জাদুর মিথ্যা প্রভাব হিসেবে দেখায় এবং ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিকে আতঙ্কিত করে ফেলে। ফলে নিজের সুরক্ষা বিবেচনায় আতঙ্কিত ব্যক্তি ওই ভণ্ড রাকীর চাহিদামতো অর্থ প্রদানের জন্য রাজি হয়ে যায়। এভাবে তারা মানুষের সম্পদকে অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করছে। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না’ (আল-বাকারা, ২/১৮৮)।

৩. বর্তমানে রুকইয়ার মাধ্যমে মানুষের ঈমান হরণের এক মহড়া চলছে। ভণ্ড রাকী আতঙ্কিত ব্যক্তির বাসায় যাওয়া মাত্রই দাবি করছে, এই বাসায় প্রচুর জিন বাস করে অথবা এই বাসার প্রত্যেক সদস্যদের জাদু করা হয়েছে ইত্যাদি। অথচ এগুলোর গায়েবী বিষয়। সে নিজে গায়েব জানার দাবি করে নিজের ঈমান নষ্ট করার পাশাপাশি জনসাধারণকেও শিরকে নিমজ্জিত করছে। কত ভয়াবহ ব্যাপার! অথচ আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কেউই গায়েব জানে না (আন-নামল, ২৭/৬৫)।

৪. কিছু নারীলিপ্সু লোক আছে, যারা নারীদের শ্লীলতাহানি ও ইযযত নষ্ট করার জন্য রুকইয়ার মতো একটি শারঈ আমলকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়। কারণ নারীরা সরল। তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে ভণ্ড রাকীরা টার্গেট করে নারীদের সম্ভ্রম নষ্ট করার পাশাপাশি তাদের সাজানো সংসার পর্যন্ত ভেঙে দিচ্ছে। এগুলো বাস্তব ঘটনা। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ ‘তোমরা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য কোনো অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না’ (আল-আনআম, ৬/১৫১)।

৫. বর্তমানে রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার মাধ্যমে আল্লাহর বিধানকে খেলতামাশার বস্তুতে রূপান্তরিত করা হচ্ছে। প্রতারণা, উদ্ভট দাবি, মাত্রাতিরিক্ত ফি নির্ধারণ, বাসায় অবস্থানের শর্তারোপ করা ইত্যাদি যতসব কুকর্মের দ্বারা আল্লাহর বিধান ‘রুকইয়া’-কে খেলতামাশার বস্তু বানানো হচ্ছে, যা হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, لَا تَتَّخِذُوا آيَاتِ اللَّهِ هُزُوًا ‘তোমরা আল্লাহর বিধানসমূহকে হাসিঠাট্টার বস্তু বানিয়ো না’ (আল-বাকারা, ২/২৩১)।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, রুকইয়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা বা এটাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বানানো জায়েয নয়। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকটা বুঝার এবং আমল করার তাওফীক দান করুন। তবে যারা সৎ নিয়্যতে শারঈ বিধিনিষেধ মেনে মানুষের সাথে ধোঁকাবাজি বা অসৎ পথ অবলম্বন না করে সত্য ও সঠিকভাবে রুকইয়া প্রদান করবে, তারা অবশ্যই এর বিনিময়ে আল্লাহর নিকট উত্তম প্রতিদান পাবে।

প্রশ্নকারী : নাসির উদ্দীন

নবাবগঞ্জ, দিনাজপুর।


Magazine