اَلْحَمْدُ لِلّٰهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلٰى مَنْ لَّا نَبِيَّ بَعْدَهُ
ইয়ামান ইতিহাসসমৃদ্ধ একটি দেশ। সুলায়মান আলাইহিস সালাম-এর যুগে সাবার রানি বিলকিসের যে কাহিনি এসেছে, তা ইয়ামানের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর সময়ের যে উন্নত সাম্রাজ্যের কথা এসেছে, তা বর্তমান ইয়ামানের মারিব অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। আবরাহার যে বাহিনী কা‘বাঘর ধ্বংস করতে এসেছিল, তারা ইয়ামান থেকেই এসেছিল। মদীনার আওস ও খাযরাজ গোত্র মূলত ইয়ামানী বংশোদ্ভূত। অর্থাৎ, আনছারদের অধিকাংশের আদি নিবাস ছিল ইয়ামানে। শুধু তাই নয়, মা হাজেরা (আ.) যখন যমযম কূপের পাশে বসবাস শুরু করেন, তখন জুরহুম গোত্র তাঁর অনুমতি নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করে। গোত্রটি ছিল ইয়ামানী বংশোদ্ভূত। ইসমাঈল আলাইহিস সালাম এই গোত্রের এক নারীকে বিবাহ করেন। এ কারণে বংশপরম্পরায় ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর বংশধরদের সঙ্গে ইয়ামানী গোত্রের আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এমনকি আরবীর মূল ভিত্তি ও আরব জাতির মূল ভিত্তি যে কাহতানীদের ধরা হয়, তারা ইয়ামানী। তথা মূল আরব সংস্কৃতি মূলত ইয়ামানী সংস্কৃতি। আর ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর বংশধরদের আদনানী আরব বলা হয়। যারা মূলত ইয়ামানী কাহতানীদের থেকে আরবী ভাষা শিখেছেন। আর এসব কারণে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অন্তরে ইয়ামানের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিল। ইয়ামানের সাথে আল্লাহর নবীকে বা ছাহাবীদেরকে কখনোই কোনো যুদ্ধ করতে হয়নি। তারা শুধু ইসলামের দাওয়াত পেয়েই দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। যেমন আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়ামান থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মুআয ইবনে জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ইয়ামানে ইসলামের শিক্ষা ও দাওয়াতের কাজে পাঠানো হয়েছিল। আল্লাহর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়ামান এবং শামের জন্য বিশেষভাবে দু‘আ করেছেন। অন্য কোনো দেশ বা অঞ্চলের জন্য তিনি বিশেষভাবে দু‘আ করেননি। তিনি বলেছেন, ঈমান ইয়ামানী আর হিকমাহ বা প্রজ্ঞাও ইয়ামানী। এই কথার ওযন কত বড় ও বিশাল তা একমাত্র চিন্তাশীলরাই অনুভব করতে পারবে। তিনি বলেছেন, ইয়ামানের মানুষের অন্তর নরম। কা‘বাঘরের একটি রুকনকে ইয়ামানের নামে রুকনে ইয়ামানী করা হয়েছে। সেই ইয়ামান আজ রক্তাক্ত। শামের মানুষের রক্তপাত আমাদের যেভাবে ব্যথিত করত, ইয়ামানের মানুষের রক্তপাতও আমাদের সেভাবে ব্যথিত করছে। যে ইয়ামান ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, আতিথেয়তার জন্য বিখ্যাত, আজ সেই ইয়ামানে একজন আরেকজনকে হত্যার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে।
বর্তমান ইয়ামানের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের পটভূমি জানতে হলে সর্বপ্রথম হুথিদের সম্পর্কে জানতে হবে। হুথিরা ইয়ামানের উত্তরাঞ্চলভিত্তিক যায়দী শী‘আ পটভূমি থেকে উঠে আসা একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলন। যায়দিয়্যাহর নামকরণ হয়েছে যায়েদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবী তালেব রাহিমাহুল্লাহ-এর নামানুসারে। তিনি ছিলেন হুসাইন রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নাতি। ১২২ হিজরীতে উমাইয়া শাসক হিশাম ইবনে আব্দুল মালেকের শাসনামলে কূফায় বিদ্রোহের সময় তিনি নিহত হন। ইবনু হাজার রাহিমাহুল্লাহ তাঁকে নির্ভরযোগ্য রাবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যায়েদ ইবনে আলী রাহিমাহুল্লাহ-কে কেন্দ্র করে একটি ঘটনা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। যখন তিনি উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন কূফার একদল শীআ অনুসারী তাকে শর্ত দেয় যে, তারা তাঁকে এই বিদ্রোহে তখনই সমর্থন দেবে, যখন তিনি প্রথম দুই খলীফা আবূ বকর ও উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-কে বর্জন করবেন বা তাঁদের গালি দেবেন। যায়েদ ইবনে আলী রাহিমাহুল্লাহ তাদের এই অন্যায় দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন এবং দুই খলীফার প্রশংসা করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই অনুসারীরা তাকে ত্যাগ করে চলে যায়। তাদের এই দলত্যাগের কারণে যায়েদ ইবনে আলী রাহিমাহুল্লাহ তাদের ‘রাফেজী’ (প্রত্যাখ্যানকারী) বলে আখ্যায়িত করেন। পরবর্তীতে শীআদের মধ্যে যারা ছাহাবীদের গালি দেয়, তাদেরকে এই নামেই আরবী ভাষায় সম্বোধন করা হয়ে থাকে। আর যারা তার সমর্থনে তার পাশে থেকে যান, তারা ‘যায়দিয়্যাহ’ নামে পরিচিতি পান। তথা যায়দিয়্যাহরা আহলুস সুন্নাহ ও শীআদের মধ্যবর্তী একটি জামাআত। এই জন্য যায়দী শীআ পরিবারে জন্ম নিলেও পরবর্তীতে অনেক আলেম পূর্ণ আহলুস সুন্নাহর অনুসারী হয়ে অনেক বড় ইমামও হয়েছেন। যেমন ইমাম শাওকানী, ইমাম সানআনীসহ প্রমুখ।
যাহোক, তৃতীয় হিজরী শতকের শেষভাগে আল-হাদী ইয়াহইয়া ইবনুল হুসাইনের মাধ্যমে উত্তর ইয়ামানে যায়দী ইমামতের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। উছমানীয় খিলাফতের অধীনে ইয়ামানের এই উত্তরাঞ্চল এক প্রকার স্বাধীন ছিল অন্যদিকে ইয়ামানের দক্ষিণাঞ্চল ছিল ব্রিটিশদের কলোনি।
ষাটের দশকে আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান হলে মিশরের জামাল আব্দুল নাছের ইয়ামানের সমাজতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী শক্তিকে সমর্থন করে। অন্যদিকে সঊদী আরব উত্তরাঞ্চলে যায়দী শীআদের রাজতন্ত্রকে সমর্থন করে। আরব-ইসরাঈল যুদ্ধে জামাল আব্দেল নাছেরের পরাজয় হলে সে ইয়ামান থেকে তার সৈন্য গুটিয়ে নেয়। একই সময়ে দক্ষিণ ইয়ামানও ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। তখন থেকেই মূলত দুই ইয়ামান একত্রিত করার আলোচনা চলছিল। পরবর্তীতে দুই ইয়ামানের সীমান্তে প্রচুর তেলের খনি আবিষ্কার হলে উভয় ইয়ামান একত্রিত হওয়ার কাজ গতি পায়।
উত্তরে আলী আব্দুল্লাহ ছালেহ ও তাঁর ‘জেনারেল পিপলস কংগ্রেস’ বা জিপিসি ক্ষমতার কেন্দ্রে আসে; দক্ষিণে নেতৃত্ব দেয় ‘ইয়ামানী সোশ্যালিস্ট পার্টি’ বা ওয়াইএসপি। ১৯৮৯ সালের নভেম্বরে ছালেহ ও দক্ষিণের নেতা আলী সালেম আল-বীধ ঐক্য সংবিধানের খসড়া গ্রহণ করেন। ধারাবাহিক আলোচনার পর ১৯৯০ সালের ২২ মে দুই রাষ্ট্র একীভূত হয়ে ‘ইয়ামান প্রজাতন্ত্র’ গঠন করে। প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার প্রভৃতি পদ ভাগাভাগি হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা থেকে যায় সেনাবাহিনী কখনোই পরিপূর্ণ একীভূত হয়নি। বরং দক্ষিণ ও উত্তরের সেনাবাহিনী সবসময় স্বতন্ত্রই থেকে গেছে। যেটিই মূলত আজকের চলমান সংকটসহ পরবর্তী সকল সংঘাতের অন্যতম একটি কারণ। ১৯৯৩ সালের নির্বাচনে ছালেহের একচ্ছত্র বিজয়ে পুনরায় উত্তর ও দক্ষিণ ইয়ামান গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। তবে এই যুদ্ধে ছালেহ বিজয় অর্জন করলেও সকলের চোখের আড়ালে দীর্ঘ সময় যাবৎ ক্ষমতা দূরে থাকা যায়েদী শীআদের ধর্মীয় আন্দোলন শুরু হয় শাবাব আল-মুসলিম নামে। যা কিছুটা ইরানী বিপ্লব অনুপ্রাণিত আমেরিকা-ইসরাঈল বিরোধিতার ফ্লেভার মিশ্রিত ধর্মীয় আন্দোলন। যার নেতৃত্ব দেয় হুসাইন বদরুদ্দীন আল-হুথি। তার নামানুসারেই পরবর্তীকালে অনুসারীরা ‘হুথি’ নামে পরিচিত হন। তবে রাজনৈতিক কারণে বর্তমান হুথিদের আক্বীদা ও বিশ্বাস পূর্বের যায়দীদের চেয়ে বর্তমান ইরানী ইছনা আশারিয়া ফিরক্বা দ্বারা বেশি প্রভাবিত। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়।
২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে ছালেহ সরকার ও হুথিদের মধ্যে ছয় দফা যুদ্ধ হয়। ২০১১ সালের গণআন্দোলন ছালেহর দীর্ঘ শাসনকে বিপর্যস্ত করে। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের উদ্যোগে ক্ষমতা হস্তান্তরের চুক্তির পর ২০১২ সালে তাঁর উপরাষ্ট্রপতি আব্দুর রব্বুহ মানছূর হাদী নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হন। কিন্তু পদ ছাড়লেও ছালেহর রাজনৈতিক দল এবং সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রযন্ত্রে তাঁর অনুগতদের প্রভাব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।
এরপর ছালেহর রাজনীতিতে ঘটে বড় মোড়। যাদের বিরুদ্ধে তিনি ছয় দফা যুদ্ধ করেছিলেন, সেই হুথিদের সঙ্গেই হাত মেলান। ছালেহ নিজের ক্ষমতাচ্যুতিতে ভূমিকা রাখা প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করতে চেয়েছিলেন। হুথিরা পেল তাঁর সামরিক যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতার সুবিধা; ছালেহ পেলেন হারানো প্রভাব পুনরুদ্ধারের সুযোগ।
এই সহযোগিতা ২০১৪ সালে হুথিদের সানআ দখলের পথ সহজ করে। পরবর্তী সময়ে হাদী সরকারের বিরুদ্ধে হুথি–ছালেহ জোট যুদ্ধ চালায়।
২০১৭ সালের শেষদিকে ছালেহ ও হুথিদের বিরোধ প্রকাশ্য সংঘর্ষে রূপ নেয়। ডিসেম্বরের শুরুতে ছালেহ সঊদী নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। অর্থাৎ এত দিনের সহযোগী হুথিদের ছেড়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে নতুন সমঝোতার পথে যেতে চান। কিন্তু এই পক্ষবদল তাঁর জন্য প্রাণঘাতী হয়। ৪ ডিসেম্বর হুথিরা তাঁকে হত্যা করে; হুথি–ছালেহ জোটের অবসান ঘটে।
ইয়ামানের এই ইতিহাস দেখায়, সেখানে রাজনৈতিক মিত্রতা বারবার বদলেছে। সঊদী আরব একসময় যায়দী রাজতন্ত্রীদের সমর্থন করেছে, পরে প্রজাতন্ত্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে; ছালেহ প্রথমে হুথিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, পরে তাদের সহযোগী হয়েছেন, আবার শেষ পর্যায়ে তাদের ছেড়ে সঊদী জোটের সঙ্গে সমঝোতা চেয়েছেন। এখন ২০২৬ সালে এসে ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় হুথি-সঊদী যুদ্ধ শুরু হয়। বাব-আল মান্দেব দখল নিয়ে সেই যুদ্ধ ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। ইতোমধ্যে রিয়াদ বিমানবন্দরসহ মদীনা মুনাওয়ারা পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে। এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে বিশ্ব রাজনীতিতে যেমন বিশাল পরিবর্তন আসবে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের অর্থনীতিও বিশাল ধাক্কা খাবে। এখন দেখার পালা, এই পরিস্থিতিতে মক্কা চুক্তি কীভাবে কাজ করছে। আংকারা ও ইসলামাবাদ কীভাবে এই সময়ে সঊদীর পাশে দাঁড়াচ্ছে।
যাহোক, আমরা চাই মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো নিরাপদ হোক! মুসলিমদের রক্ত সুরক্ষিত থাকুক! আর আমাদের সবার মহান আল্লাহর এই বাণী স্মরণ রাখা উচিত। তিনি বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে অন্যায় করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; তা তাক্বওয়ার অধিক নিকটবর্তী’ (আল-মায়েদা, ৫/৮)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘মুমিনদের দুই দল পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হলে তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও। অতঃপর তাদের এক দল অন্য দলের ওপর সীমালঙ্ঘন করলে, সীমালঙ্ঘনকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশে ফিরে আসে। যদি তারা ফিরে আসে, তবে তাদের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে মীমাংসা করে দাও এবং সুবিচার করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালোবাসেন’ (হুজুরাত, ৪৯/৯)।
এই আয়াতগুলোর আলোকে আমরা চাই, কেউ যেন জুলুমের শিকার না হয়। বিশেষ করে, নিরপরাধ উমরাহকারী ইহরামের কাপড় পরিধানকারী যাত্রীবাহী বিমানের উপর যে হামলা হচ্ছে, তা স্পষ্ট সীমালঙ্ঘন। অন্তত সকল প্রকার বিবাদ থেকে মক্কা-মদীনা ও উমরাহ-হজ্জযাত্রীদের নিরাপদে রাখতে হবে। যারা এই ন্যূনতম মানবিকতা ও ভদ্রতা রক্ষা করতে পারবে না, তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করা ছাড়া কোনো রাস্তা নেই। মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং নিজেদের সমস্যা সমাধান করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!(প্র. স.)
