কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

বই থেকে স্ক্রিন: একটি জাতির নীরব পতন (পর্ব-২)

post title will place here

সালাফদের জীবনে বই ও জ্ঞানচর্চা: সালাফে ছালেহীন জ্ঞান অর্জনের জন্য অকল্পনীয় ত্যাগ স্বীকার করেছেন। একজন মুহাদ্দিছ একটি হাদীছ সংগ্রহের জন্য শত শত কিলোমিটার সফর করেছেন।[1] কেউ রাতভর প্রদীপ জ্বালিয়ে অধ্যয়ন করেছেন, কেউ নিজের সম্পদ বিক্রি করে বই সংগ্রহ করেছেন।[2] তাদের কাছে বই অলংকার বা সাজিয়ে রাখার বিষয় ছিল না, ছিল জীবনসঙ্গী। এই কারণেই তাদের রচিত গ্রন্থগুলো আজও পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পড়ানো হয়।

বই বিমুখতা ও ভ্রান্তির বিস্তার: যখন মানুষ মূল গ্রন্থ পড়া ছেড়ে দেয়, তখন সে অন্যের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, কাটাছেঁড়া ভিডিও বা যাচাইহীন তথ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এর ফলে কুরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্মায়। ভ্রান্ত আক্বীদা ও বিদআতের প্রসার ঘটে। গুজব ও বিভ্রান্তি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তির পরিবর্তে আবেগ প্রাধান্য পায়। অনুরূপভাবে আলেমদের পরিবর্তে জনপ্রিয় বক্তা বা ‘ভাইরাল’ ব্যক্তিরা মতামতের উৎস হয়ে ওঠেন। এটি একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতার স্পষ্ট লক্ষণ।

প্রকাশনা শিল্পের সংকট: আসলে প্রকাশনা শিল্পের সংকট মানে প্রকারান্তরে একটি সভ্যতার সংকট। বই বিক্রি কমে যাওয়া কেবল ব্যবসায়িক সমস্যা নয়, এটি একটি সভ্যতার সংকট। আজ বহু প্রকাশক অভিযোগ করেন, আগের তুলনায় পাঠক কমেছে। অনেক বইয়ের প্রথম সংস্করণ শেষ হতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে। কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম সীমিত করেছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন লেখকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, কারণ গবেষণাভিত্তিক বইয়ের পাঠকসংখ্যা কমে যাচ্ছে। যে সমাজে বই বিক্রি কমে যায়, সেখানে কিছুদিন পর চিন্তাবিদ, গবেষক ও মানসম্পন্ন লেখকের সংখ্যাও কমতে শুরু করে। আর যখন চিন্তাবিদ কমে যায়, তখন সেই সমাজ অন্যের চিন্তার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আমাদের পাঠাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে।

একসময় কোনো বই পড়তে হলে তা সংগ্রহ করে কিনতে হতো, কিন্তু এখন একটি স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েক মুহূর্তেই হাজারো বইয়ের পিডিএফ (PDF) বা অনলাইন কপি পাওয়া যাচ্ছে। ফলে মুদ্রিত বই কেনার প্রবণতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। বিশেষত বিনামূল্যে বা অতি সহজে পাওয়া পিডিএফ কপির প্রতি আমাদের এক ধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে পাঠক যেমন ধীরে ধীরে বই কেনার অভ্যাস হারাচ্ছেন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে লেখক, প্রকাশক, মুদ্রণশিল্প ও বই বিক্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুরো একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

সম্মানিত পাঠক! একটু ভেবে দেখুন তো, আপনি নিজে কয়টি বই কিনে পড়েছেন?

বিষয়টি শুধু বই বিক্রি কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব জ্ঞানচর্চার উপরও পড়ছে। স্ক্রিনে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকার ফলে মাইগ্রেনসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়, ধীরে ধীরে মনোযোগহীনতা তৈরি হয়। আসল বই এবং পিডিএফ বইয়ের মাঝে তথ্য গ্রহণের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা একটা বড় ফারাক। তাছাড়াও একজন লেখক দীর্ঘ সময়, শ্রম ও গবেষণা ব্যয় করে একটি বই রচনা করেন। তারপর প্রকাশক সম্পাদনা, মুদ্রণ, বাঁধাই, বিপণন ও বিতরণের পেছনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেন। কিন্তু সেই বই প্রকাশের পর যদি তা অবৈধভাবে স্ক্যান করে পিডিএফ আকারে ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং পাঠক বই না কিনে সেটিই ব্যবহার করেন, তাহলে লেখক ও প্রকাশক উভয়েই তাদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হন। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে মানসম্মত বই প্রকাশের আগ্রহ ও সক্ষমতা কমে যেতে পারে।

তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি আমাদের পাঠসংস্কৃতি ও প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও সচেতন হওয়া জরুরী।

ফিরে আসার সময় এখনই: আজ মুসলিম উম্মাহ যদি আবার জ্ঞানে, নৈতিকতায় ও নেতৃত্বে অগ্রসর হতে চায়, তাহলে কুরআন ও সুন্নাহর পাশাপাশি উপকারী বই পড়াকে পুনর্জীবিত করতেই হবে। ঘরে ঘরে ছোট লাইব্রেরি গড়ে তুলতে হবে, সন্তানদের হাতে স্ক্রিনের আগে বই তুলে দিতে হবে এবং সমাজে পাঠাভ্যাসকে সম্মানের সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। কারণ ইতিহাসের একটি সত্য কখনও বদলায় না, তা হলো- যে জাতি বইকে সম্মান করে, ভবিষ্যৎ তারই হাতে থাকে। আর যে জাতি বইকে ভুলে যায়, ইতিহাসও একদিন তাকে ভুলে যায়।

মুসলিমদের স্বর্ণযুগ তথা যখনবই-ইছিল সভ্যতার ভিত্তি: আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন অনেকেই মনে করেন, মুসলিমরা শুধু ধর্মীয় জ্ঞানেই অগ্রসর ছিল; বিজ্ঞান, গবেষণা ও সভ্যতা নির্মাণে তাদের অবদান সীমিত। অথচ ইতিহাস এই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে। এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগার, সবচেয়ে সমৃদ্ধ গবেষণাকেন্দ্র, সবচেয়ে বেশি বইয়ের বাজার এবং সর্বাধিক জ্ঞানচর্চার পরিবেশ ছিল মুসলিমদের হাতে। কুরআনের ‘ইক্বরা’-এর আহ্বান শুধু মসজিদেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং জ্ঞানচর্চার প্রতিটি অঙ্গনে। আল্লাহ তাআলা বলেন,يَرْفَعِ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ ‘আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন’ (আল-মুজাদালাহ, ৫৮/১১)। এ আয়াত মুসলিমদের শুধু ইবাদতের নয়, জ্ঞানচর্চারও অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।

আজকের বাস্তবতা: আমরা কোথায়? আজ মুসলিম বিশ্বের বহু ঘরে দামি স্মার্টফোন আছে, কিন্তু একটি ছোট ব্যক্তিগত লাইব্রেরি নেই। মাসে হাজার হাজার টাকা মোবাইল, পোশাক কিংবা বিনোদনের জন্য ব্যয় করা হলেও বছরে একটি ভালো বই কেনার মানসিকতা অনেকের মধ্যে দেখা যায় না। অনেকে শত শত অনলাইন পোস্ট পড়েন, কিন্তু একটি মৌলিক তাফসীর, হাদীছের গ্রন্থ বা ইসলামী গবেষণার বই সম্পূর্ণ পড়ে শেষ করতে পারেন না। এটি কেবল পাঠাভ্যাসের দুর্বলতা নয়, এটি চিন্তার গভীরতা হারানোর লক্ষণ।

স্বর্ণযুগ ফিরিয়ে আনার পথ: মুসলিমদের হারানো গৌরব কেবল আবেগ, স্লোগান বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিতর্ক দিয়ে ফিরে আসবে না। বরং তা ফিরে আসবে— (১) কুরআনের আলোকে জ্ঞানচর্চা পুনর্জীবিত করার মাধ্যমে। (২) বই পড়াকে দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত করার মাধ্যমে। (৩) গবেষণাকে ইবাদতের অংশ হিসেবে দেখার মাধ্যমে। (৪) লেখক, গবেষক ও প্রকাশকদের সম্মান ও সহযোগিতা করার মাধ্যমে। (৫) শিশুদের হাতে খেলনা বা মোবাইলের আগে বই তুলে দেওয়ার মাধ্যমে। (৬) পরিবার ও সমাজে পাঠসংস্কৃতি গড়ে তোলার মাধ্যমে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যে উম্মাহ ‘ইক্বরা’ দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তারা বইয়ের মাধ্যমে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। আর আজ যদি সেই উম্মাহ পুনরায় নেতৃত্ব ফিরে পেতে চায়, তবে তাকে আবারও কুরআন, সুন্নাহ, কলম ও বইয়ের কাছেই ফিরে আসতে হবে।

স্ক্রিনের নেশা: আজকের পৃথিবীতে কোনো যুদ্ধ ছাড়াই একটি পুরো প্রজন্মকে দুর্বল করে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি হলো অতিরিক্ত স্ক্রিন-নির্ভর জীবন। এই আসক্তি চোখে দেখা যায় না; কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের সময়, মনোযোগ, চিন্তাশক্তি, ইবাদত, পারিবারিক সম্পর্ক এবং জ্ঞানচর্চাকে গ্রাস করে ফেলে। এটি শুধু একটি প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; বরং এটি একটি নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক সংকট।

একজন মানুষ যদি প্রতিদিন মাত্র ৩ ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করেন, তবে বছরে প্রায় ১,১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় সেখানে চলে যায়। এই সময়ে একজন মানুষ পবিত্র কুরআন বহুবার তিলাওয়াত করতে পারেন, শতাধিক মানসম্মত বই পড়তে পারেন, একটি নতুন ভাষা শিখতে পারেন, অথবা একটি বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এই মূল্যবান সময়ের বড় অংশ ক্ষণস্থায়ী বিনোদনে হারিয়ে যাচ্ছে।

প্রিয় পাঠক! অবহেলায় কাটিয়ে দেওয়া এই সময়ের জন্য আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمُرِهِ فِيمَا أَفْنَاهُ ‘ক্বিয়ামতের দিন কোনো বান্দার উভয় পা (আল্লাহর সামনে থেকে) একটুও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে প্রশ্ন করা হবে তার জীবন সম্পর্কে, সে তা কোন কাজে নিঃশেষ করেছে’।[3] আজ এই হাদীছ আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়, প্রতিদিনের অসংখ্য ঘণ্টার স্ক্রলিংয়ের হিসাব আমরা কীভাবে দেব?

স্ক্রিন আমাদের কী কেড়ে নিচ্ছে?

(১) বই পড়ার ধৈর্য: দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়া এখন অনেকের কাছে কঠিন মনে হয়। কয়েক পৃষ্ঠা পড়লেই মন অন্যদিকে চলে যায়। কারণ মস্তিষ্ক দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্য ও ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

(২) গভীর চিন্তাশক্তি: গভীর চিন্তা কখনও তাড়াহুড়ো করে হয় না। একটি ভালো বই মানুষকে থামতে শেখায়, ভাবতে শেখায় এবং প্রশ্ন করতে শেখায়। কিন্তু দ্রুতগতির কনটেন্ট মানুষকে ভাবার সুযোগই দেয় না। আল্লাহ তাআলা বহুবার প্রশ্ন করেছেন, أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ‘তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না?’ (আন-নিসা, ৪/৮২)। তাদাব্বুর (গভীর চিন্তা) এমন একটি আমল, যা ধীরস্থির মনোযোগ ছাড়া সম্ভব নয়।

(৩) ইবাদতের একাগ্রতা: অবিরাম নোটিফিকেশন, অন্তহীন ভিডিও আর তথ্যের কোলাহলে যে মন সারাক্ষণ চঞ্চল থাকে, ছালাতের শান্ত মুহূর্তে তার পক্ষে একাগ্র হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে অবধারিতভাবেই খুশূ-খুযূ কমে যায় এবং যিকির ও কুরআন তিলাওয়াতের সেই চিরায়ত ধৈর্য ও স্বাদ আর খুঁজে পাওয়া যায় না।

(৪) সম্পর্কের অবক্ষয়: একই ঘরে বসে পরিবারের প্রতিটি সদস্য যার যার ডিজিটাল স্ক্রিনে বুদ হয়ে আছে—এই দৃশ্য আজ আমাদের গা-সওয়া হয়ে গেছে। ফলে ফুরিয়ে আসছে হৃদয়ের কথোপকথন, শিথিল হচ্ছে পারিবারিক বন্ধনের সুতো। সন্তানরা আজ বাবা-মায়ের কাছ থেকে রূপকথার গল্প নয়, বরং উপহার হিসেবে পাচ্ছে প্রাণহীন ডিজিটাল স্ক্রিন।

(৫) জ্ঞানের পরিবর্তেত থ্যেরভিড়: আজ মানুষ আগের চেয়ে বেশি তথ্য জানে, কিন্তু আগের চেয়ে কম প্রজ্ঞাবান।

কারণ তথ্য (Infরাহিমাহুমুল্লাহrmatiরাহিমাহুমুল্লাহn) আর জ্ঞান (Knরাহিমাহুমুল্লাহwledge) এক নয়। তথ্য মুহূর্তেই পাওয়া যায়; কিন্তু জ্ঞান আসে অধ্যয়ন, চিন্তা, গবেষণা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।

স্ক্রিনেরনেশা ও আত্মপ্রবঞ্চনা: অনেকেই বলেন, ‘আমি তো ইসলামী ভিডিওই দেখি’, ‘আমি তো দাওয়াহর পোস্ট পড়ি’—এগুলো উপকারী হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলো কি নিয়মিত কুরআন, হাদীছ, তাফসীর ও নির্ভরযোগ্য বই অধ্যয়নের বিকল্প হতে পারে? কখনোই নয়। একটি ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও আপনাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে; কিন্তু একজন আলেম, গবেষক বা সচেতন মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না।

মুসলিম উম্মাহর সামনে আজকের চ্যালেঞ্জ: আজ আমাদের সামনে দুটি পথ—একটি পথ আমাদের নিয়ে যায় অবিরাম স্ক্রল, বিনোদন, সময়ের অপচয় এবং চিন্তার অগভীরতার দিকে; অন্য পথটি নিয়ে যায় কুরআন, সুন্নাহ, বই, গবেষণা, জ্ঞানচর্চা এবং সভ্যতা নির্মাণের দিকে। দুই পথে একসঙ্গে দীর্ঘদিন চলা সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি বইকে সময় দেয়, সে স্ক্রিনকে সীমিত করে। আর যে ব্যক্তি স্ক্রিনকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সময় দেয়, সে ধীরে ধীরে বই থেকে দূরে সরে যায়।

একটি আত্মসমালোচনার আহ্বান: আমাদের প্রত্যেকের নিজের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন করা উচিত-

  • গত এক বছরে আমি কতটি বই পড়েছি?
  • গত এক বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছি?
  • আমার সন্তান আমাকে বই পড়তে বেশি দেখে, নাকি মোবাইল ব্যবহার করতে বেশি দেখে?
  • আমার ঘরে কি একটি ছোট লাইব্রেরি আছে?
  • সর্বশেষ কবে আমি একটি ইসলামী বই কিনেছি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আমাদের বর্তমান অবস্থার বাস্তব চিত্র তুলে ধরবে।

মুসলিম উম্মাহর অধঃপতনের ১০টি মৌলিক কারণ: কেন আমরা নেতৃত্ব হারালাম? ইসলাম পৃথিবীকে এমন এক জাতি উপহার দিয়েছিল, যারা জ্ঞান, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সভ্যতায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছিল। কিন্তু আজ মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চল রাজনৈতিকভাবে দুর্বল, শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে, গবেষণায় অনগ্রসর এবং অর্থনৈতিকভাবেও অন্যের উপর নির্ভরশীল। এ অবস্থা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা, ভুল অগ্রাধিকার এবং কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফল। আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّ اللهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে’ (আর-রা‘দ, ১৩/১১)।

এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, উত্থান-পতনের সূচনা মানুষের ভেতর থেকেই হয়। এর কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা যেতে পারে—

১. কুরআন ও সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া: মুসলিমদের শক্তির প্রথম ভিত্তি ছিল আল্লাহর কিতাব ও রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ। যখন উম্মাহ এই দুই উৎসকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু বানিয়েছিল, তখন তারা উন্নতির শিখরে পৌঁছেছিল। আর যখন এগুলো কেবল তিলাওয়াত বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেল, তখন দুর্বলতা শুরু হলো।

২. বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলা: একটি বই মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, কিন্তু একটি ক্ষণস্থায়ী ভিডিও শুধু মুহূর্তের উত্তেজনা দেয়। আজ অনেকেই মাসে একটি বইও পড়েন না, অথচ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনে কাটান। এর ফলে জ্ঞানকমছে, মতামতবাড়ছে।

৩. সময়ের অপচয়: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ ‘দুটি নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ উদাসীন, তা হলো সুস্থতা ও অবসর’।[4] আজ অবসর সময়ের একটি বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় হচ্ছে, যা ব্যক্তিগত ও জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা।

৪. দুনিয়া প্রীতি ও আখেরাত বিমুখতা: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের দুর্বলতার কারণ হিসেবে বলেছেন,حُبُّ الدُّنْيَا وَكَرَاهِيَةُ الْمَوْتِ ‘দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা’।[5] যখন ভোগবিলাস, খ্যাতি ও বিনোদন জীবনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে যায়; তখন জ্ঞান, ত্যাগ ও আদর্শ পিছিয়ে পড়ে।

৫. গবেষণা ও চিন্তার অবক্ষয়: ইসলাম শুধু মুখস্থ করার ধর্ম নয়, এটি চিন্তারও ধর্ম। আল্লাহ কুরআনে বহুবার বলেছেন, أَفَلَا يَعْقِلُونَ‘তারা কি বুদ্ধি ব্যবহার করে না?’ (ইয়াসীন, ৩৬/৬৮)। তিনি আবার বলেন,أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ ‘তারা কি গভীরভাবে চিন্তা করে না?’ (আন-নিসা, ৪/৮২)। তিনি আরও বলেন, لَعَلَّكُمْ تَتَفَكَّرُونَ ‘যাতে তোমরা চিন্তা কর’ (আল-বাক্বারা, ২/২১৯, ২৬৬)।

অর্থাৎ বুঝা গেল, গবেষণা ছাড়া কোনো জাতি নেতৃত্ব দিতে পারে না।

৬. অগভীর জ্ঞান নিয়েক থাবলার প্রবণতা: আজ অনেকেই একটি ছোট ভিডিও দেখে নিজেকে বিশেষজ্ঞ মনে করেন। অথচ সালাফদের যুগে একটি বিষয়ে কথা বলার আগে বছরের পর বছর অধ্যয়ন করা হতো। জ্ঞানহীন বক্তব্য বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং সমাজে মতভেদ বাড়ায়।

৭. আদর্শ মানুষের অভাব: একসময় যুবকদের আদর্শ ছিলেন ইমাম বুখারী, ইমাম আহমাদ, ইবনু তায়মিয়্যাহ, ইবনুল ক্বাইয়িম, ইমাম নববী রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ মনীষী। আজ অনেক তরুণের আদর্শ হয়ে উঠছে জনপ্রিয় বিনোদন ব্যক্তিত্ব বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী মুখ। আর এটা তো জানা কথা যে, আদর্শ বদলে গেলে জীবনও বদলে যায়।

৮. পরিবারেপাঠসংস্কৃতিরবিলুপ্তি: একটি শিশু বইপ্রেমী হয়ে জন্মায় না, বরং পরিবার তাকে বইপ্রেমী বানায়। যে ঘরে বই নেই, বই পড়ার পরিবেশ নেই, সেখানে পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে জ্ঞানচর্চার আশা করা কঠিন।

৯. লেখক ও প্রকাশকদের অবমূল্যায়ন: একটি জাতির চিন্তা গড়ে তোলেন তার আলেম, গবেষক, লেখক ও শিক্ষক। কিন্তু যখন তাদের শ্রমের মূল্যায়ন করা হয় না, বই বিক্রি কমে যায়, গবেষণার পৃষ্ঠপোষকতা থাকে না; তখন জ্ঞানচর্চাও দুর্বল হয়ে পড়ে।

১০. আত্মসমালোচনার অভাব: আল্লাহ তাআলা বলেন, فَاعْتَبِرُوا يَا أُولِي الْأَبْصَارِ ‘হে প্রজ্ঞাবানরা! তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো’ (আল-হাশর, ৫৯/২)। যে জাতি নিজের ভুল বিশ্লেষণ করে না, সে কখনও উন্নতি করতে পারে না। আজ আমাদের প্রয়োজন অন্যকে দোষারোপ করা নয়; বরং নিজেদের প্রশ্ন করা, আমরা কতটা পড়ি, কতটা শিখি, কতটা গবেষণা করি এবং কতটা সময় অপচয় করি?

(ইনশা-আল্লাহ! চলবে) 

শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. মুসনাদে আহমাদ, হা/১৬০৪২, ১৬০৪৩।

[2]. জামেউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাযলিহি, লি-ইবনে আব্দিল বার্র, ১/৪১০।

[3]. তিরমিযী, হা/২৪১৭, ‘হাসান ছহীহ’।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৪১২।

[5]. আবূ দাঊদ, হা/৪২৯৭।

Magazine